অধ্যাপক ডা. এম. নজরুল ইসলাম

আজ ২৭ নভেম্বর। বিএমএ’র সাবেক যুগ্ম সম্পাদক শহীদ ডা. শামসুল আলম খান মিলনের ২৫তম শাহাদাত বার্ষিকী। ১৯৯০ সালের এই দিনে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, বিএমএ’র ২৩ দফা দাবি ও গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি বাতিলের চলমান আন্দোলনের এক পর্যায়ে স্বৈরাচারী সরকারের পেটোয়া বাহিনীর গুলিতে ডা. মিলন শাহাদাত বরণ করেন। ২৭ নভেম্বর আনুমানিক সকাল ১০ ঘটিকায় তত্কালীন পিজি হাসপাতালে একটি চিকিত্সক সমাবেশে যোগ দিতে ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের সাথে একই রিকশায় যাওয়ার পথে টিএসসির সামনে ডা. মিলন গুলিবিদ্ধ হন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান।

ডা. মিলন লক্ষ্মীপুর জেলার কলাকুপা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম শাহাদাত্ উল্লাহ, মাতা সেলিনা আক্তার ইডেন কলেজের একজন শিক্ষক ছিলেন। মিলনের একমাত্র মেয়ে সন্তান শ্যামার বয়স তখন ৩ বছর। বর্তমানে লন্ডনে পড়াশোনা করে। ডা. মিলন একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ঢাকা নটর ডেম কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করে চিকিত্সা বিজ্ঞানের ওপর পড়াশোনা করতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন। ছাত্র জীবন থেকেই মিলন রাজনৈতিক সচেতন-জাসদ ছাত্রলীগের একজন নেতা ছিলেন। ১৯৮৩ সালে কৃতিত্বের সাথে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। পেশাগত জীবনে ডা. মিলন আমার ১ বছরের জুনিয়র। আমি যখন বিএমএ কার্যকরী পরিষদের সদস্য মিলন তখন সারা দেশের ইন-সার্ভিস ট্রেনিং চিকিত্সক পরিষদের আহ্বায়ক। স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর চিকিত্সকদের ওপর বিভিন্ন কালাকানুন জারি করে। বিএমএ তার বিরুদ্ধে আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করে এবং আন্দোলন গড়ে তোলে। একই সময় চলমান ইনসার্ভিস ট্রেনিং প্রথা বাতিল করলে ডা. মিলনের নেতৃত্বে নবীন চিকিত্সকরাও আন্দোলন শুরু করে। বিএমএ সেই আন্দোলনে সমর্থন জানায়। ফলে চিকিত্সকদের আন্দোলন আরো বেগবান হয়। এর কিছুদিন পর ১৯৮৫ সালে দেশের প্রকৌশলী, কৃষিবিদ ও চিকিত্সক (প্রকৃচি) ৯ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আরো একটি আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করে। কৃষিবিদ ড. মির্জা জলীল, প্রকৌশলী রুহুল মতিন, ডা. সারওয়ার আলী, ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনসহ অনেকেই সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। সারা দেশে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলনকে নস্যাত্ করার জন্য স্বৈরাচারী সরকার প্রকৃচি নেতৃবৃন্দের ওপর নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা-সামরিক আইন-এমএল আর-৯-এ ডা. একেএম মহিবুল্লাহ, ডা. শিশির কুমার মজুমদার, আমি (ডা. এম নজরুল ইসলাম) ও ডা. মিলনসহ আরো কয়েকজন কৃষিবিদ ও প্রকৌশলীকে সরকারি চাকরি থেকে বরখাস্ত করে, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে এবং বিদেশ গমনের ওপর বিধিনিষেধও আরোপ করে। ডা. মিলন তখন তত্কালীন আইপিজিএমআর-এ এমফিল কোর্সে অধ্যয়নরত ছাত্র ছিল। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে তার ছাত্রত্ব বাতিল করে তাকে রংপুরের রৌমারী উপজেলায় বদলি করে। এ ধরনের নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরও প্রকৃচি আন্দোলনের কর্মসূচি স্থগিত না করলে সামরিক সরকার একপর্যায়ে প্রকৃচির সাথে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়। আলোচনার টেবিলে সামরিক সরকার প্রকৃচির যৌক্তিক দাবিদাওয়া মেনে নিলে প্রকৃচি সাময়িকভাবে আন্দোলনের কর্মসূচি স্থগিত করে। কিন্তু স্বৈরাচারী সরকার প্রকৃচির যৌক্তিক দাবি বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করে উপরন্তু দেশে একটি গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি ঘোষণা করে। বিএমএ গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি বাতিলের জন্য নতুনভাবে কর্মসূচি ঘোষণা করে। দেশের চলমান স্বৈরাচার বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন ও বিএমএ’র একপর্যায়ে ২৭ নভেম্বর ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার কর্তৃক প্রকাশ্য দিবালোকে ডা. মিলনকে হত্যার মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। ২৭ তারিখ সন্ধ্যায় মিলনের মরদেহ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে দাফন করার পর আমরা সারা দেশের চিকিত্সক সমাজ গণ-পদত্যাগের ঘোষণা দেই। তত্কালীন ১৫ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাদের দাবি-দাওয়ার সমর্থনে এবং স্বৈরাচার সরকারের পতনের দাবিতে পরের দিন সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় স্বৈরাচার সরকার ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করলে তিনি প্রথমেই জাতীয় প্রচার মাধ্যমে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি বাতিল করেন। তিনটি রাজনৈতিক জোট যৌথভাবে জাতির কাছে একটি অভিন্ন রূপরেখার ঘোষণা দেয়। পরবর্তী সময় জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে যারাই ক্ষমতায় যাবে তারাই চিকিত্সকদের দাবিদাওয়া বাস্তবায়ন করবে এবং একটি গণমুখী স্বাস্থ্য নীতি প্রণয়ন করবে।

অথচ ১৯৯৬ সাল, ২০০৮ সাল ও ২০১৪ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষের শক্তি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর দেশকে উন্নয়নের দিকে, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী করাসহ বিএমএ’র কোনো দাবিদাওয়া পেশ বা কোনো আন্দোলন ছাড়াই জননেত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যেই ১. নবীন চিকিত্সকদের চাকরি, ২. পদোন্নতি বঞ্চিত সকল পর্যায়ের চিকিত্সকের পদোন্নতি, ৩. চিকিত্সা ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও মেডিক্যাল শিক্ষার উন্নয়নের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা এবং চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে আরো ২টি মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় চালু করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা, ৪. জনস্বার্থে হাসপাতালে বেড সংখ্যা বাড়ানো, ৫. বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষায়িত হাসপাতাল তৈরি, ৬. জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করা, ৭. সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে অনেকগুলো মেডিক্যাল কলেজ চালু করা, ৮. সেবিকাদের ৩য় শ্রেণি থেকে ২য় শ্রেণির মর্যাদা প্রদান করাসহ বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন যা ডা. মিলনের চিন্তারই প্রতিফলন।

আমরা ডা. মিলনের চেতনা তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ধারায় সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে জঙ্গিবাদকে প্রতিহত করব, আগুন সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করব, সাম্প্রদায়িক শক্তিকে নির্মূল করে ভবিষ্যত্ প্রজন্মের শান্তিময় সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলব তা হলেই ডা. মিলনের আত্মা শান্তি পাবে। আজকের দিনে এটাই হোক আমাদের সকলের শপথ।

লেখক :এমবিবিএস (ঢাকা), ডি-কার্ড (ঢাকা)
সহযোগী অধ্যাপক, কার্ডিওলজি
যুগ্ম মহাসচিব, পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ
সাবেক সহ-সভাপতি বিএমএ

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন