-নূর হোসাইন মোল্লা 💠

এসো হে বৈশাখ, এসো, এসো
তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষরে দাও উড়ায়ে
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক।

রবীন্দ্র সংগীত দিয়ে ১৪২৫ বঙ্গাব্দকে স্বাগত জানাচ্ছি। গতানুগতিক জীবন ধারার মধ্যে নববর্ষ নিয়ে আসে নতুন সুর আর উদ্দীপনা। পহেলা বৈশাখ বঙ্গাব্দের ১ম দিন। এদিন আমাদের সার্বজনীন লোকউৎসব। ধর্ম-বর্ণ- গোত্র নির্বিশেষে এদিনটি বেশ উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে পালন করা হয়। ধর্মের সাথে এর কোন সম্পৃক্ততা নেই। এটা সম্পূর্ন বাঙালী সংস্কৃতি। এদিনে আমরা প্রিজনের শুভেচ্ছা কামনা করি। কামনা করি নতুন শান্তিময় দিনের। আমাদের জাতীয় জীবনে বঙ্গাব্দ ছাড়া আরও দু’টি সালের অস্তিত্ব আছে। একটি হিজরী অপরটি খ্রিস্টীয় সাল বা সন। সাল ফার্সি শব্দ।আর সন আরবী শব্দ। আমাদের জাতীয় জীবনে তিনটি সালেরই কার্যকারিতা আছে। খ্রিষ্টীয় সাল আমাদের জীবন ব্যবস্থায় বিশেষেভাবে ক্রিয়াশীল। তবে বাংলা ও হিজরী সাল আমাদের অফিস আদালতে এখনও ব্যবহৃত না হলেও জীবনের নানা পর্যায়ে বিশেষভাবে স্মরনীয় হয়ে আছে। হিজরী সাল চন্দ্র মাসের সাথে সম্পৃক্ত। ইসলামী ঐতিহ্য, সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে হিজরী সাল ও চন্দ্রমাস ওতপ্রতভাবে জড়িত।

১৯০ বছর ব্রিটিশ শাসনের ফলে এবং আন্তর্জাতিক কারণে খ্রিষ্টীয় সালের গুরুত্ব আমাদের জীবনে অধিকভাবে প্রভাব বিস্তাার করে আছে। দেশের প্রায় সকল কাজ কর্ম ও ব্যবসা বাণিজ্য খ্রিষ্টীয় তারিখ অনুযায়ী সম্পাদিত হয়। সে কারণে খ্রিষ্টীয় সাল আমাদের কর্মজগতে বিস্তারিত। তাই এদেশে ঘটাকরে খ্রিষ্টীয় নববর্ষ পালিত হয়। এতদসত্বেও বাংলা সালের তাৎপর্য ও গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে যে প্রভাব বিস্তার করে আসছে, তার শ্বাশত প্রেরনা আমাদের জীবনের অনুপরামাণুতে প্রভাবিত। আমাদের সুখ, দুঃখ, আনন্দ-বেদনা ও হাসি-কান্না জড়িত বাংলা বার মাসের তের ফসলে।

বঙ্গাব্দ বা বাংলা সালের প্রচলনের ইতিহাস নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। কারো কারো মতে সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ বাঙ্গাব্দের প্রবর্তক। কালি প্রসাদ জয়সোয়াল, হরিপদ মাইতী, পন্ডিত জগজীবন গনেশজী, অধ্যাপক ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, পলাশবরণ পাল প্রমুখ ইতিহাসবিদদের মতে আকবর বঙ্গাব্দের সূচনা করেন। কিন্তু আকবরের আইন-ই- আকবরীতে এ বিষয় উল্লেখ নেই। আইন-ই- আকবরীতে এলাহী সাল প্রবর্তনের কথা বর্ণিত আছে।
(উল্লেখ্য এ সাল কোথাও গ্রহনযোগ্যতা পাইনি।) এ গ্রন্থে ফসলি বা রাজস্ব বর্ষ চালু করার কথা বর্নিত আছে। এ সাল এ দেশে বঙ্গাব্দ হিসেবে পরিগনিত হয়। ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দীন মোহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গ বিজয়ের পর থেকে মুসলমান শাসকগন হিজরী সাল এ দেশে প্রচলন করেন। এ সালের উপর ভিত্তি করে শাসকগণ প্রজাদের নিকট থেকে ভূমি রাজস্ব আদায় করতেন। আর রাজস্ব আদায় করা হতো উৎপাদিত ফসল থেকে। আবাদি ভূমি রাজস্ব আদায় করতে গিয়ে রাজস্ব কর্মচারীরা বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতো। কারণ হিজরী সাল তথা চন্দ্র মাস কোন মৌসুম মেনে চলে না। সম্রাট আকবার ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবে ৯৬৩ হিজরীতে দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করে দেখতে পেলেন যে, তাঁর অধীনস্থ ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন সাল চালু রয়েছে। তারমধ্যে জালালী সাল, সেকান্দার সাল, শকাব্দ, গুপ্তাব্দ, বিক্রামাব্দ প্রভৃতি। এগুলোর মধ্যে কোনটিই সর্বভারতীয় সাল হিসেবে প্রচলিত ছিল না। তাই এ সমস্যার সমাধানের জন্যে সম্রাট আকবর ১৫৮৪ সালে ১০ মার্চ ফসল তোলার মৌসুমের সাথে মিল রেখে ফসলি সাল প্রর্বতনের আদেশ দেন। পরবর্তীতে এ সাল নামান্তরিত হয়ে বাংলা সাল বা সন বা বঙ্গাব্দ ।তাঁর নির্দেশে তাঁর অর্থ বিভাগের সহকারী সচিব এবং জোতিষ শাস্ত্রবিদ পন্ডিত আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজী সৌর সাল তথা খ্রীষ্টিয় সাল এবং হিজরী সালের সাথে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ওই বছরই সৌর সাল ভিত্তিক একটা নতুন ফসলি সাল তথা এলাহি সাল চালু করেন এবং ১৫৮৫ সালে ১১ এপ্রিল প্রথম নববর্ষ পালন করেন। স¤্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণ কাল ১৫৫৬ খ্রীস্ট্রাব্দ (৯৬৩ হিজরী) স্মরণীয় রাখার জন্যে এ নতুন সাল গননা করা হয় ১৫৫৬ খ্রীস্টব্দ থেকে। বাংলা সালও গননা শুরু হয় ১৫৫৬ খ্রীস্টাব্দ থেকে ।
এটা ছিল মূলত রাজস্ব আদায় বা পুরানো বছরের হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে নতুন রাজস্ব বর্ষ শুরু করার অনুষ্ঠান। দেশব্যাপী সাধারণ্যে তা পালনের কোন রেওয়াজ চালু হয়নি। আধুনিক নববর্ষ পালনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোমকীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৬৭ সালের পূর্বে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় ছিল না। সৌর বছর এবং চন্দ্র মাসের মধ্যে ১১ দিন (৩৬৫-৩৫৪দিন) পার্থক্য থাকায় পরবর্তীতে বাংলা একাডেমির মাধ্যমে জ্ঞান তাপস ডঃ মোহাম্মাদ শহীদুল্লাহ কর্তৃক বর্তমান রূপ পরিগ্রহ করেছে। আলাউদ্দীন হোসেন শাহর আমলে বাংলা সালে প্রচলন শুরু হলেও সম্রাট আকবরের সময় থেকে সর্বভারতীয় রূপ লাভ করে। তখন থেকে এটি বাঙ্গালী সংস্কৃতির সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত হয়।
আমাদের দেশে মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ ধর্মীয় লোক যুগ যুগ ধরে একই পরিবেশে বসবাস করে আসছে। ধর্মীয় ব্যবধান ব্যতিত আমাদের মধ্যে পারস্পারিক সৌহার্দ্য বিদ্যমান। তাই বঙ্গাব্দকে মনে প্রাণে আমাদের ঐতিহ্যের এক অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকতে হবে। আগে পহেলা বৈশাখ তথা নববর্ষের উৎসব ছিল পল্লীকেন্দ্রিক । তা এখন শহর কেন্দ্রিক হয়ে জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। তথ্য ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নববর্ষের নতুন চেতনা ও উপলদ্ধি নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। নববর্ষে আমাদের ব্যবসায়ীরা সাড়ম্বরে শুভ হালখাতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। দোকান পাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বসে আনন্দের ঢল। মিষ্টি মুখের মাধ্যমে খোলা হয় নতুন বছরের হালখাতা। গ্রাম গঞ্জে, হাটে-বাজারে, খেলার মাঠ ও দর্শনীয় স্থানে বসে বৈশাখী মেলা। মৌসুমী ফলমূল, নানা হস্তশিল্পজাত সামগ্রী, পোড়ামাটির যথা খেলনা যথা, হাতী, ঘোড়া, হরিণ,পাখি,কাঠ, বাঁশ বেতের তৈরী প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র ও গাড়ী, বাঁশী, ভেপু, চিড়া, মুরি, মুরকি, বাতাসা ইত্যাদি কেনার ধুম পড়ে যায়। নাগরতোলা, সারক্যাস, ঘুড়ি উড়ানো ও পুতুল নাচের আসরে কেউ কেউ আনন্দ উপভোগ করে। এদিন আয়োজন করা হয় নানা অনুষ্ঠানের । ছায়ানটের উদ্যোগে রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে নামে জনতার ঢল। ১৯৮৯ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখ উৎসবের একটা অন্যতম আকর্ষন হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। উল্লেখ্য পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা ২০১৬ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে, যা বাঙ্গালী হিসেবে বিশ্বে আমাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছে। এদিন শহরে বিভিন্ন সংগঠন র‌্যালি, সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। গ্রাম গঞ্জে আয়োজন কারা হয় জারী গান, পালা গান, ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, মারফতী, বাউল, পুঁথিপাঠ, লাইলী-মজনু, ইউসুফ-জোলেখা, রাধা-কৃষ্ণ কাহিনী, গল্প, নাটক ও দেশাত্ববোধক গানের আসর। এছাড়া, হা-ডু-ডু, লাঠি খেলা, গোল্লাছুট, ঘোড়ার দৌড়, গরুর দৌড়, মোরগের লড়াই ইত্যাদির আয়োজন করা হয়। এদিন সকল শ্রেণীর মানুষ ঐতিহ্যবাহী বাঙ্গালীর পোষাক পরিধান করে। নববর্ষকে স্বাগত জানাতে তরুনীরা লালপেড়ে সাদা শাড়ি, হাতে পরে চুরী, খোপায় ফুল, গলায় ফুলের মালা ও কপালে পড়ে টিপ। তরুনরা পরিধান করে পাজামা ও পাঞ্জাবী। কেউ কেউ ধূতী ও পাঞ্জবী পরিধান করে। উপজাতীয়রা আয়োজন করে খেলা ধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আদিবাসী মেলা।

ইদানিং সারাদেশে পহেলা বৈশাখ পান্তাার সাথে ইলিশ মাছ খাওয়া একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। বৈশাখ এলে ইলিশ বিক্রী বাড়ে। দাম বাড়ে ৫-৬ গুন। শুরু হয় ইলিশ নিধন। ইলিশ প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরলে এর বংশ বিস্তার হ্রাস পায়, যা আমাদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ইলিশ প্রজনন মৌসূমে ইলিশ ধরা থেকে বিরত থাকতে হবে। সম্রাট আকবর পহেলা বৈশাখ পান্তা ইলিশ খেয়েছেন এ তথ্য ইতিহাসের পাতায় নেই। মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি কল্পে পহেলা বৈশাখ ইলিশ না খাওয়ার জন্য আহবান জানিয়েছেন। আসুন, আমরা পান্তা ইলিশ খাওয়ার রেওয়াজ পরিহার করি।

১৪২৪ সালে আমাদের সফলতা ও ব্যর্থতা উভয়ই আছে। ব্যর্থতা দূর করার শপথ নিয়ে ১৪২৫ সালকে অভিনন্দন জানাতে হবে। ১৪২৫ সালের আগমন আমাদের জীবনে সফল হউক, সার্থক হোক আমাদের সকল কর্ম। আমাদের জীবন ভোগ-বিলাস, অন্যায়-অত্যাচার, অশ্লীলতা, পাপ-পংকিলতা থেকে মুক্ত হউক। পহেলা বৈশাখে আমাদের ঐকান্তিক কামনা হউক দেশের সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্যে, নির্মূল হউক জঙ্গিবাদ, মুক্তহোক মাদক ও দুর্নীতি। ত্যাগ তিতিক্ষায়, কর্মে ও ভালোবাসায় নিয়োজিত হউক আমাদের জীবন। মানব সেবায় অনুপ্রাণিত হউক সকল মানুষ। আন্তরিক হোক সকল প্রচেষ্টা। পূর্ন হউক সকল প্রত্যাশা এবং গঠন করি সোনার বাংলা।
সবাইকে বাংলা নববর্ষের আন্তরিক শুভেচ্ছা।

লেখকঃ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ।
মোবাইল ঃ ০১৭৩০৯৩৫৮৮৭

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন