মার্চ ২৯, ২০২০

আজকের মঠবাড়িয়া

সত্য প্রচারে সোচ্চার

মঠবাড়িয়ায় কলাগাছের মিনার থেকে প্রথম পূর্ণাঙ্গ শহীদ মিনার

 

দেবদাস মজুমদার  <>

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় ১৯৬৮ সালে ফ্রেব্রুয়ারী মাসের শুরুতে মঠবাড়িয়া শহরের ঐতিহ্যবাহী কে.এম লতিফ ইনস্টিটিউশনে একুশ উদযাপনের প্রথম উদ্যোগ নেয় সেখাকানকার কয়েকজন শিক্ষার্থী। তখনও এ জনপদে কোন শহীদ মিনার গড়ে ওঠেনি। উদ্যোগী কয়েকজন ছাত্র মিলে শহীদ মিনার বানাবেন ঠিক করলেন। এজন্য দু চারআনা করে পয়সাও উত্তোলন করে ছাত্ররা নিজেরা মিলে। বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ভবনের সামনেই স্থান ঠিক করা হয়। এরপর গৃহস্থের বাড়ি থেকে কেটে আনা হয় কলাগাছ। দণ্ডায়মান কলাগাছে কালো কাপড় মুড়িয়ে তৈরী হয় মঠবাড়িয়ার প্রথম শহীদ মিনার।

অনুসন্ধানে জানাগেছে, ১৯৬৮ সালেই প্রথম কলাগাছের শহীদ মিনারে একুশ উদযাপন করা হয়। আর এই প্রথম শহীদ মিনার তৈরীর কাজে ওই সময় কারা জড়িত ছিলেন তাদের সকলের নাম উদ্ধার করা আপাতত না গেলেও কয়েকজনের নাম উদ্ধার করা গেছে। এরা হলেন তৎকালীন কে.এম লতিফ ইনস্টিউশনের জিএস মুক্তিযোদ্ধা এমাদুল হক খান,আব্দুল মোতালেব ফারুকী,মো. দেলোয়ার হোসেন(বাংলাদেশ স্কাউটের পরিচালক),ডা. এম. নজরুল ইসলাম,মো. শাহ আলম জমাদ্দার,মুক্তিযোদ্ধা এ.ইউ.এম নাছির উদ্দিন,হালিম জমাদ্দার,মুক্তিযোদ্ধা মোস্তফা শাহ আলম দুলাল,আব্দুল ওয়াদুদ তালুকদার। এসকল উদ্যোক্তা মানুষেরা তখন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আন্দোলনে এ জনপদে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন ।

এর পর ১৯৬৯ সালে এসে কলাগাছ আর কালো কাপড়ে মোড়া শহীদ মিনারটি বদলে যায়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ উদ্যোগ নেয়। তৈরী হয় পাকা শহীদ মিনার । ওই শহীদ মিনার নির্মাণে রাজমি¯ত্রী ছিলেন ঘটিচোরা(বর্তমান সবুজ নগর ) গ্রামের মো. মতিয়ার রহমান। পাকা এ শহীদ মিনারে কালো রঙ জোগার করতে না পারায় মাইকের ব্যাটারীর কার্বনদণ্ডের গুড়া দিয়ে শহীদ মিনারটিকে কালো রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়।
১৯৭১ সালে কে.এম লতিফ ইনস্টিটিউশনের পাকা শহীদ মিনারটি মুক্তিকামী বাঙালীর মত সেদিন বিপন্ন হয়ে পড়ে। ওই সময় স্থানীয় স্বাধীনতা বিরোধী টাইগার ফোর্সের রোষানলে পড়ে মঠবাড়িয়ার মেধাবী ছাত্ররা। পাক আর্মিরা তাদের সহযোগিতায় মঠবাড়িয়ার মেধাবী ছাত্রদের আটক করে। সেই সঙ্গে স্বাধীনতা বিরোধীরা প্রথম শহীদ মিনারটি ভেঙ্গে মাটিতে গুড়িয়ে দেয়। প্রথম শহীদ মিনার গুড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি বর্ণাঢ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা বিলুপ্ত হয়ে যায় সেদিন।
দেশ স্বাধীনের পর তৎকালীন গণ পরিষদ সদস্য ও উপকুলীয় অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শহীদ সওগাতুল আলম সগীর এর নেতৃত্বে মঠবাড়িয়ায় একটি পূর্ণাঙ্গ শহীদ মিনার গড়ে তোলার উদ্যোগ শুর হয়। শহীদ মিনার নিমাণ বাস্তবায়ন কমিটিও গঠন করা হয় তখন। সওগাতুল আলম সগীর ওই কমিটির সভাপতি ও তৎকালীন সিও আব্দুল হাই সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
জনাগেছে, সেই কমিটিতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী কর্পোরাল আব্দুস সামাদ মৃধা,আ.লীগ নেতা আব্দুল খালেক মিঞা,আব্দুর রশীদ ফরাজী,শামসুল আলম মোক্তার,আদম আলী খান,ইব্রাহিম মল্লিক,সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব মো.আব্দুল জব্বার (ব্যাংক ম্যানেজার) সহ আরও উদ্যোক্তাগণ সম্পৃক্ত ছিলেন। মঠবাড়িয়া শহরের প্রাণকেন্দ্রের কমিউনিটি সেন্টার এর সামনে(বর্তমান পৌরভবন) শহীদ মিনারের স্থান নির্ধারণ করা হয়। প্রথমে ২১ হাজার টাকা ব্যয়ে সেখানে শুরু করা হয় পূর্ণাঙ্গ শহীদ মিনারের ভিত্তি প্রস্তর। ২৯ ফুট উচ্চতার শহীদ মিনারটি সেদিন নকশা করেন প্রকৌশলী মো. শফিকুল আলম। যিনি এলাকায় সকলের মেজদাদা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
১৯৭২ সালের মার্চ মাসের প্রথম দিকে শহীদ মিনারের নির্মাণ কাজ শুর হয়। প্রথম ধাপে ২১ হাজার টাকায় নির্মাণ সম্পন্ন না হওয়ায় আরেক ধাপ বরাদ্দ বেড়ে যায়। সর্বমোট ৮৭ হাজার টাকা ব্যায়ে তৈরী হয়ে যায় ২৯ ফুট উচ্চতার আমাদের শহীদ মিনার। এ শহীদ মিনার নির্মাণ দায়িত্ব পালন করেন দুই ঠিকাদার আব্দুল আজিজ মৃধা ও প্রমথ রঞ্জন হালদার। শহীদ মিনারের নকশা চূড়ান্ত করতে তিনটি নকশা করেন প্রকৌশলী মো. শফিকুল আলম । পরে সকলের সম্মতিক্রমে শহীদ মিনারের নকশাটি অনুমোদন হয়। কি ছিল সেই নকশার অন্তর্গত আদলে ? তিনটি দণ্ডায়মান স্তম্ভ। তিন ধাপের উচ্চতার এ স্তম্ভ সংযক্ত ছিল আড়াআড়ি একটি পিলারে। মা যেমন সন্তান আগলে রাখেন তেমনি বোধের সৃজনশীল নিমাণ ছিল আমাদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ শহীদ মিনার। ওই শহীদ মিনারের পাশে একটি গণগ্রন্থাগার নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল শহীদ সওগাতুল আলম সগীরের। আমাদের দুর্ভাগ্য ১৯৭৩ সালের ৩ জানুয়ারী একদল আততায়ীর গুলিতে তিনি শহীদ হন। ফলে তার সে পরিকল্পনা স্থবির হয়ে যায়। এমনকি পূর্ণাঙ্গ শহীদ মিনারটি নির্মাণের আগেই মঠবাড়িয়াবাসি একজন দেশপ্রেমিক নেতাকে চীরতরে হারান।
তবে ৭৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী আগেই শহীদ মিনার নির্মাণ সম্পন্ন হয়। ওই বছর প্রথম শহীদ মিনারে মঠবাড়িয়াবাসী একুশের অনুষ্ঠান উদযাপন করেন।

এরপর টানা ৪৩ বছর প্রিয় শহীদ মিনারটি লালন করেন মঠবাড়িয়াবাসি। তিনযুগেরও বেশী সময়কাল ধরে এই শহীদ মিনার স্থাপনাটি স্থানীয় জনমানুষকে চেতনায় জাগিয়ে রাখে। সংকট ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও বিপ্লবে এর পদতলে সমবেত হয়েছেন এ জনপদের মানুষ। সেই সাথে সংস্কৃতি লালনে এখানেই সোচ্চার থেকেছে মানুষ। শহীদ মিনারটির নির্মাণ শৈলীতে অনন্য ছিল এ জনপদ। এমন নকশার শহীদ মিনার দেশের আর কোথাও নেই এমন স্বকীয়তার শহীদ মিনার নিয়ে এ জনপদের মানুষ গর্ব করতেন। সেই ঐতিহ্যের ঐতিহাসিক স্থাপনাটি এখন অতীত হয়ে যায়। নগরায়নের নামে প্রিয় শহীদ মিনারটি হঠাৎ হারিয়ে যায় । জনপদের একুশ, মহান বিজয় ও স্বাধীনতা দিবস উদযাপন চির চেনা সেই শহীদ মিনারে উদযাপনের আর কোন সুযোগ বঞ্চিত হয় মঠবাড়িয়ার মানুষ। পুরানো শহীদমিনারটি গুড়িয়ে দিয়ে স্থানচ্যূতকরে পাশেই নতুন আদলের নকশায় পৌরকর্তৃপক্ষ একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করেছেন। ২০১৩ সালে ৪৩ বছরের পুরাতন শহীদ মিনারটি ভেঙ্গে স্থানান্তর করে পৌর প্রশাসন। এতে শহীদ মিনারের মূল নকশাটি বিলুৃপ্ত হয়ে যায়।

তিনযুগেরও বেশী সময়কাল ধরে ঐতিহাসিক স্থাপনার মিনারটি সম্পূর্ণ ভেঙ্গে অন্য আদলে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ হয়েছে। পৌর কর্তৃপক্ষ প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যায়ে এটি নির্মাণ করেন। তবে আমাদের সেই চেনা শহীদ মিনারের নকশা পুরোপুরি লুপ্ত। সেই সাথে উচ্চতাও খর্ব হয়ে গেছে তার।

স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠক ও ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক মো. ইকতিয়ার হোসেন পান্না বলেন,পৌরভবন দৃষ্টিনন্দন ও দৃশ্যমান করতেই আমাদের ঐতিহ্যবাহি স্থাপনাটি স্থানান্তর করা হয়। আর তা হয়েছিল নাগরিক সমাজের একটি সভায়। তবে আগের নকশা সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার পক্ষে অনেকেই মত দেননি। নতুন গড়ে তোলা শহীদ মিনারটির বেদী উচু হলেও এর স্তম্ভ খর্বকায়। আগের নকশাটি ঠিক রাখাই যথাযথ ছিল। কারন ঐতিহাসিক একটি স্থাপনা এভাবে বাদ দেওয়া যুক্তিসংগত হয়নি।

এ ব্যাপারে মুক্তিযোদ্ধা এমাদুল হক খান বলেন,শহীদ মিনার পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে স্থানান্তরিত হতে পারে যদি সকলের সম্মতি থাকে। তার মানে আমাদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ শহীদ মিনারের নকশা বাদ দিয়ে ভিন্ন নকশায় শহীদ মিনার অগ্রহণযোগ্য। কারণ এভাবে জনগুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা বিলুপ্ত করা ইতিহাস বিস্মৃতির শামিল।

প্রতিবেদনের ছবি : প্রকৌশলী ফরিদ আহম্মেদ মিঠু