অপার সম্ভাবনাময়ী প্রযুক্তি মানুষকে আধুনিক সভ্যতার শিখরে পৌঁছে দিয়েছে । বাংলাদেশের উন্নতির মূলে প্রযুক্তি কাজ করেছে প্রভাবক হিসেবে । আজ তরুণ সমাজ গড়ে উঠছে জ্ঞান- বিজ্ঞান, গবেষণা , প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা, সচেতনতা ও সৃজনশীলতার ছোঁয়ায় । ফলশ্রুতিতে ,তরুণ সমাজ এগিয়ে যাবে বাস্তবতার নিরিখে সুদূরপানে । তাদের স্বপ্ন পূরণ হবে আধুনিকতার কোমল স্পর্শে । উদ্ভাবনী মানসিকতা , বাস্তবতা , সম্ভাব্যতা বিচার ও স্থির পরিকল্পনা দেশ ও বিশ্বকে সাফল্যের দিকে ধাবিত করবে-এই প্রত্যাশা প্রত্যেক দেশ প্রেমিক নাগরিকের ।সরকার নিরলস চেষ্টায় গ্রামীণ পর্যায় পৌঁছে দিয়েছে প্রযুক্তি । যার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা মৌলিক দায়িত্ব । নৈতিক তাড়ণা থেকেই প্রযুক্তিকে কল্যাণমুখী কর্ম সম্পাদনে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে হবে । কিন্তু, আমাদের তরুণেরা সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে অগ্রসর হচ্ছে কি ? সেই বিষয়ে আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখা অপরিহার্য । আমাদের মনে রাখতে হবে, বিজ্ঞান ও পযুক্তির আবেগিক প্রয়োগ মারাত্বক বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে । অনেকটা আগুন নিয়ে খেলার মত ।

’ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে সরকার প্রত্যেক ঘরে ঘরে মোবাইল ফোনের সেবা ছড়িয়ে দিয়েছে যাতে কৃষক , শ্রমিক সহ প্রান্তিক মানুষ তথ্যের অবাধ প্রবাহে নিজেকে যুক্ত করতে পারে । মোবাইলের মাধ্যমে সরকার কৃষি , শিক্ষা, চিকিৎসা , পুষ্টি, গর্ভবতী মায়ের সেবা, শিশুদের লালন পালন সহ বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করে উন্নত মানবসম্পদ উপহার দেওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে । সরকারের এ শুভ উদ্দ্যোগ কে স্বাগত জানাই । এরই ধারাবাহিকতায় প্রত্যেক কিশোর কিশোরী বর্তমানে ‘তৃতীয় জেনারেশন নেটওয়ার্ক’ সিস্টেমে উন্নত প্রযুক্তির ‘স্মার্টফোন” ব্যবহার করছে কারণ তাঁরা তাদের হাতের নাগালে পেয়ে যাচ্ছে সুলভে । এই ধরনের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কৌতুহলী মন পুরো পৃথিবীর অতীত ও বর্তমানের রঙ্গমঞ্চকে উপভোগ করতে পারে এবং সেক্ষেত্রে তাদের অনুসন্ধিৎসার কমতি থাকে না । ঘেটেঘুটে কিংবা বন্ধুদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মনের অজান্তে প্রবেশ করছে ‘এডাল্ট জোন’ এ । পরিচিত হচ্ছে অশ্লীলতার সাথে । নীল জগতের বিষাক্ত ছোবল যুবসমাজকে ভ্রষ্ট করে দিতে পারে । এটি সমাজের নৈতিক স্খলনের বহুমাত্রিক কারণের অন্যতম । তাই, আমার সন্তানের উপর আমাকেই ‘মনিটরিং স্কেল’ স্থাপন করা উচিৎ । নেশার মতই সংক্রামিত হচ্ছে আর এক নতুন সামাজিক ব্যাধি ‘সেলফি ম্যানিয়া’ । কিছু কিছু ‘ইমোশনাল কনসেপ্ট’ আমাদের তরুণদের নানাভাবে প্রভাবিত করে এবং সেই কনসেপ্টের বেপরোয়া বিস্তার নতুন উপদ্রব হিসেবে আবির্ভুত হয় । হাল ফ্যাশনের এই নবমাত্রায় ‘ সেলফি ম্যানিয়ার’ ব্যাপক কাটতি । ক্যামেরার কারসাজিতে ছবিগুলোতে যোগ করা যায় বিচিত্র রঙ ঢঙ যা তরুণদের মোহাবিষ্ট করে । আচ্ছন্ন করে রাখে তাদের মন ও মনন । পারিপার্শিক বাস্তবতাকে ছাপিয়ে তাঁরা নিজেদের সেলফি দুনিয়ায় হারিয়ে ফেলে । কিছুদিন আগে খবরের কাগজে দেখলাম ব্রীজের উপরে দাঁড়িয়ে সেলফি করতে গিয়ে তরুণ তরুনীর জীবন হনন । নিছক দুর্ঘটনা বলেই মেনে নিলাম । আবার দেখলাম, সেলফি নিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা । কালক্রমে সেলফি নিয়ে ঘটে যাচ্ছে বহুবিধ ঘটনা যার অভিজ্ঞতা তিক্ত ও বেদনাবিধূর ।  তাহলে এগুলো নিশ্চয় ই আবেগের মনস্তাত্ত্বিক উন্মাদনা ।

বর্তমান সময় সোসাল নেটওয়ার্কিং এর ক্ষেত্রে ফেসবুক অন্যতম ।কানেক্টিভিটির প্রয়োজনে কিংবা ভাব, অভিযোগ , অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে আমরা কিশোর , যুব ,বৃদ্ধ সকলেই এই মিডিয়াকে ব্যবহার করতে কম বেশি পছন্দ করি ।কিন্তু, নির্দিষ্ট মাত্রায় থাকা আবশ্যক । কিশোর কিশোরীদের উপর ফেসবুক এর একটি বিরূপ প্রভাব লক্ষ্যণীয় ।একদিকে, মোবাইলের অতিরিক্ত রেডিয়েশনের কারণে মাথা ঝিমঝিম করে ও মাথার ভিতর প্রকম্পনের সৃষ্টি করে যা তাদের মানসিক পরিপক্কতায় বিঘ্ন ঘটায় ।টিনেজদের ফেসবুক আকর্ষণ বেশি থাকায় তাঁরা ঝুকিপূর্ণ । গভীর রাত জেগে ফেসবুকে আসক্তি তাদের মুখশ্রীকে লুটে নিয়েছে । স্কুল , কলেজ পড়ুয়া ছাত্র/ ছত্রীদের দিকে নজর দিলে ‘নির্ঘুম অবসাদ’ তাদের চোখে মুখে ফুটে ওঠে । পড়াশুনার প্রতি অনিহা জাগে ,পরিপূর্ণ মনোযোগে ব্যর্থ হয় । ক্লাসে এক শিক্ষার্থীর খাতা মূল্যায়নের সময় দেখলাম অসংখ্য বানান ভুল । জিজ্ঞেস করায় উত্তর পেলাম , স্যার ফেসবুকে লেখি তো তাই !

ফেসবুকের মাধ্যমে তরুণেরা বিভিন্ন রকম ছল ,চাতুরী, প্রতারণা, কূটকৌশল ও মোহমায়ায় আবদ্ধ হয়ে জীবনের ঊষালগ্নে নিথর সঙ্কটে নিপতিত হয় । কেউ বা আবার পথভ্রষ্ট হয়ে যায় । উগ্রবাদের সাথে জড়িয়ে পরে জীবন কে তাচ্ছিল্য করে বিপথগামী হয় । আমার সন্তানের প্রতি আমি কতটুকু প্রহরী ? এই প্রশ্নের উত্তর আমাকেই দিতে হবে । আমার ব্যর্থতার কারণে যদি নতুন প্রজন্ম ধ্বংস হয় তার দায় কি আমি এড়াতে পারি ? কবি রবীন্দ্রনাথের ভাষায় , “ ঐ ম্লান, মূঢ়, মুক মুখে দিতে হবে ভাষা”। তাই , তাদেরকে জাগিয়ে তুলতে হবে , প্রযুক্তির আশির্বাদে পুষ্ট হয়ে আলো ছড়িয়ে পড়ুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের অন্তর্লোকে । প্রযুক্তির অশনি সংকেত যেন আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য না হয় ।

লেখক > মো. হাফিজুল হক, সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি মঠবাড়িয়া সরকারি কলেজ, মঠবাড়িয়া, পিরোজপুর। hafizhaque83@gmail.com

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন