ব্রেকিং নিউজ
Home - উপকূলের মুখ - যুদ্ধে গিয়েও জনপ্রসাদ পাইকের আজও স্বীকৃতি মেলেনি

যুদ্ধে গিয়েও জনপ্রসাদ পাইকের আজও স্বীকৃতি মেলেনি

দেবদাস মজুমদার <>

৬৮ বছর বয়সী জনপ্রসাদ পাইক মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়ে আজও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পান । তিন দফা আবেদন করলে প্রতিবারই যাচাই বাছাই তালিকায় তার নাম লিপিবদ্ধ হলেও জনপ্রসাদের কপালে কেবল বঞ্চনা । প্রবীণ এ মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময়ে স্টুডেন্ট ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধে অংশ নেন। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ টপ্রাইব্যুনালের একজন প্রসিকিউশন সাক্ষি। যুদ্ধকালীন সময়ে ভারতের বসিরহাট নৈহাটি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেন।
যুদ্ধে গিয়েও জনপ্রসাদ আজও মুক্তিযোদ্ধা নন। যদিও মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই তালিকায় দফায় দফায় তার নাম তালিকাভূক্ত হলেও তদবিরের অভাবে আজও তিনি গেজেটভূক্ত হতে পারেননি।

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার ধানিসাফা ইউনিয়নের ফুলঝুড়ি গ্রামের বঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধা জনপ্রসাদ পাইক জীবনের শেষ বেলায় এসে স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছেন।

তিনি জানান, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মঠবাড়িয়ার ফুলঝুড়ি গ্রামের সম্ভ্রান্ত কুমোদ বন্ধু পাইক এর বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প গড়ে ওঠে। তখন জনপ্রসাদ পাইক ১৯ বছরের যুবক। স্থানীয় আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস ও আব্দুল মোতালেব শরীফ তখন পাকিস্তান আর্মিতে চাকুরী করতেন। যুদ্ধকালীন তারা দেশে এসে আর চাকুরীতে যোগদান না করে দেশের টানে ফুলঝুড়ি গ্রামের পাইক বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প গড়ে তোলেন। জনপ্রসাদ ওই ক্যাম্পে প্রথমে যাতায়াত শুরু করে মুক্তিযোদ্ধার খবর সরবরাহ করতেন। ১৯৭১ সালের ১৬ মে স্থানীয় তুষখালী হাইস্কুল মাঠে শান্তিবাহিনী কমিটির সভাপতি আব্দুল জব্বার ইঞ্জিনিয়ার( বর্তমানে যুপারাধে আমৃত্যু দ-িত পলাতক আসামী) স্বাধীনতা বিরোধিদের নিয়ে সভা করেন। সেখানে তিনি নির্দেশ দেন পাইক বাড়ির মুকিত্তযোদ্ধ ক্যাম্প এর রাজ্জাক বিশ্বাস ও মোতালেব শরীফসহ ওই ক্যাম্পে জড়িত সকলকে জীবিত ও মৃত অবস্থায় আজই ধরে নিয়ে আসতে হবে।
এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিকাল চারটার দিকে গ্রামে গুলির আওয়াজ শোনা যায়। স্থানীয় সংঘবদ্ধ স্বাধীনতা বিরোধিরা মুক্তিযোদ্ধ মোতালেব শরীফ ও রাজ্জাক বিশ্বাসকে গুলি করে হত্যা করে। এখবর ছড়িয়ে পড়লে জনপ্রসাদ তার পরিবার সমেত বাড়ি ছেড়ে আত্ম গোপনে চলে যান। পরদিন ১৭ ডিসেম্বর পাইকবাড়ি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে আগুন ধরিয়ে জনপ্রসাদ এর বাড়িসহ ফুলঝুড়ি গ্রামের হিন্দু বাড়িতে লুটপাট চালায় রাজাকারবাহিনী। জনপ্রসাদ এর পরিবার ওইদিন নৌকাযোগে দেশ ছেড়ে পালানোর সময় বলেশ্বর নদের মাঝের চরে পাকাবাহিনী ও দোসরদের হাতে ধরা পড়েন। যুবক জনপ্রসাদকে শরণখোলা (রায়েন্দা) মিলিটারী ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে জনপ্রসাদের বাবা প্রয়াত জিতেন্দ্র নাথ পাইকের বাল্য বন্ধু এক রাজাকার যুবক জনপ্রসাদের প্রাণ ভিক্ষার ব্যবস্থা নিয়ে সে ক্যাম্প থেকে মুক্তি পায়। এরপর জনপ্রসাদ মনস্থির করেন দেশের জন্য যুদ্ধে অংশ নিবেন। মিলিটারী ক্যাম্প থেকে ছাড়া পেয়ে শরণখোলায় এক আত্মীয় বাড়িতে থাকা অবস্থায় স্থানীয় বগী মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের ২০/২৫জন মুক্তিযোদ্ধার দল শরণেখোলায় আসলে জনপ্রসাদ তাদের সাথে যোগ দেন। বগী মুক্তিযোদ্ধা কব্যাম্পের লেঃ আলতাফ হোসেনর নেতৃত্বে বগী মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে যোগ দেন। এরপর মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যুদ্ধের কৌশল রপ্ত করতে থাকেন। তাদের সাথে মঠবাড়িয়ার সাপলেজৈা, বামনার বুকাবুনীয় এলাকার যুদ্ধে অংশ নেন।
এরপর ভারতের বসিরহাটের নৈহাটি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প ইনচার্জ নিহার রঞ্জন হালদার এর অধিনে প্রশিক্ষণ নেন।
দেশ স্বাধীনের পর জনপ্রসাদ কৃষি অধিদপ্তরে চাকুরি নেন। মঠবাড়িয়া কৃষি দপ্তরে অফিস সহকারী পদে চাকুরি শেষে ২০০৮ সালে অবসরে যান।
একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধকালীন উপকূলে গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ টপ্রাইব্যুনালের একজন প্রসিকিউশন সাক্ষি ( আইড নম্বর-০১২০১৪১৩) । এছাড়া তিনি মঠবাড়িয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সমবায় সমিতির একজন সদস্য। অথচ তাঁর কপালে জোটেনি রাষ্ট্রের কোনও স্বীকৃতি।

স্বীকৃতিহীন জনপ্রসাদ পাইক বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে লড়াই করেছি, আপন দেশ ছেড়ে পালাইনি। এখন জীবনের শেষ বেলা । মুক্তিযোদ্ধা হয়েও কোন সুবিধা আমি নেইনি। আজও নেওয়ার ইচ্ছে নাই। শুধু জীবনের শেষ বেলা মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিটুকু পেয়ে মরে যেতে চাই।

স্থানীয় ফুলঝুড়ি গ্রামের সহযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধা শৈলেন্দ্র নাথ বলেন, জনপ্রসাদ একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। প্রতিবারই যাচাই-বাছাইর তালিকায় তার নাম ওঠে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আজও সে গেজেটভূক্ত মহতে পারেননি।

এ ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধকালীন ভারতের বসিরহাট নৈহাটি ইয়ূথ রিসিপশন মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের ইনচার্জ নিহার চন্দ্র হালদার বলেন, জনপ্রসাদ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা। আজও তিনি স্বীকৃতি না পাওয়া দুঃখজনক ।

মুক্তিযুদ্ধকালীন সাবসেক্টর সুন্দরবন অঞ্চলের ইয়াং অফিসার ও শরণখোলা থানার কমা-িং অফিসার মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুল হক মজনু বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় ফুলঝুড়ি গ্রামের সম্ভ্রান্ত পাইক বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প গড়ে উঠেছিল। যুবক জনপ্রসাদ পাইক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তার স্বীকৃতি পাওয়া উচিত।

Leave a Reply

x

Check Also

মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই কোরবানি

কোরবানি যেহেতু একটি উত্তম ইবাদত। এ ইবাদতটি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। কারণ আল্লাহ তায়ালা কুরআনে ...