
মহররম আরবী বছরের প্রথম মাস। মহররম অর্থ পবিত্র বা সম্মানিত বা নিষিদ্ধ । আশুরা শব্দটি আরবী। এর অর্থ হচ্ছ দশম।ইসলামের পরিভাষায় মহররম মাসের দশ তারিখকে আশুরা বলে।এ মাসে ঝগড়া -বিবাদ ও যুদ্ধ -বিগ্রহ করা নিষিদ্ধ। আশুরা নামকরণ নিয়ে ইসলামী চিন্তাবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে। তবে অধিকাংশ চিন্তাবিদ মনে করেন যে,এ দিনটি মহররম মাসের ১০ তরিখ বলেই এর নামকরণ হয়েছে আশুরা। ১০ মহররম মানব জাতির ইতিহাসে অতি স্মরণীয়। কারণ এ দিনে অনেক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।
কেউ কেউ বলেন, আল্লাহ তাআলা উম্মতে মুহাম্মাদিয়াকে ১০ টি বরকতময় দিন উপহার দিয়েছেন। তার মধ্যে আশুরার দিনটি ১০ম স্হানীয়। কেউ কেউ বলেন, ১০ মহররম আল্লাহ তায়ালা ১০ জন নবীকে ১০টি ভিন্ন ভিন্ন রহমত দান করেছেন। তাই এর নামকরণ হয়েছে আশুরা। এদিন পৃথিবীতে অনেক অসাধারণ ঘটনা ঘটেছে। যেমনঃ
১। আল্লাহ তাআলা ১০ মহররম পৃথিবী সৃষ্টি করেন এবং এ দিনেই আকাশ থেকে প্রথম বৃষ্টি বর্ষণ করেন। এ দিনেই কোন এক শুক্রবারে হযরত ইসরাফিল আঃ এর শিংগার ফুতকারে পৃথিবী ধ্বংস হবে। এ দিন দুনিয়ার প্রথম মানুষ হযরত আদম আঃ কে সৃষ্টি করেন। অতঃপর তাঁর স্ত্রী হযরত হাওয়া আঃ সৃস্টি করেন এবং তাঁদেরকে বেহেশতে রাখেন। শয়তানের প্ররোচনায় তাঁরা নিষিদ্ধ গাছ থেকে কিছু ভক্ষণ করায় আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে পৃথিবীতে ভিন্ন ভিন্ন স্হানে প্রেরণ করেন। তাঁরা আল্লাহ তাআলার নিকট তওবা করলে, তিনি তওবা কবুল করেন এবং পুনর্মিলিত হন।
২। আল্লাহ তাআলা এ দিন হযরত ইদ্রিস আঃ কে সম্মানিত উচ্চস্হানে উঠিয়ে নেন।
৩। এ দিন আল্লাহ তাআলা হযরত নুহ আঃ কে তুফান থেকে মুক্তি দেন এবং তাঁর নৌকা জুদী পাহাড়ের গায়ে ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন।
৪। আল্লাহ তাআলা এ দিন হযরত ইউনুস আঃ কে মাছের পেট থেকে মুক্তি দেন।
৫। আল্লাহ তাআলা এ দিন হযরত দাউদ আঃ এর তওবা কবুল করেন এবং তাঁর পুএ হযরত সুলায়মান আঃ কে বাদশাহী দান করেন।
৬। আল্লাহ তাআলা এ দিন হযরত আইউব আঃ কে রোগ থেকে মুক্তি দেন।
৭। আল্লাহ তাআলা এ দিন হযরত মুসা আঃ এর সাথে তুড় পাহাড়ে কথা বলেন, তাঁর প্রতি তাওরাত কিতাব নাযিল করেন। এ দিনেই হযরত মুসা আঃ এবং তাঁর অনুসারী বনি ইসরায়েলের জন্যে নীল নদীতে পথ করে দেন এবং ফিরআউন এবং তার দলকে নীল নদীতে ডুবিয়ে মারেন।
৮। এ দিন হযরত ইব্রাহীম আঃ জন্ম গ্রহন করেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে খলিল উল্লাহ উপাধি দান করেন এবং নমরুদের অগ্নিকুন্ড থেকে মুক্তি দেন।
৯। আল্লাহ তাআলা এ দিন হযরত ঈসা আঃ কে এ দুনিয়ায় পঠান এবং ৩৩ বছর বয়সে তাঁকে আসমানে তুলে নেন ও শএুদের কবল থেকে মুক্তি দেন।
১০। আল্লাহ তাআলা এ দিন আখেরী নবী হযরত মুহাম্মাদ সঃ এর রুহ মুবারক সৃস্টি করেন এবং এ দিন হযরত জিবরাইল আঃ আল্লাহ তাআলার রহমত নিয়ে তাঁর নিকট হাজির হন। এ দিন হযরত মুহাম্মাদ সঃ এর প্রিয় নাতী হযরত ইমাম হোসাইন রাঃ কে কারবালা ময়দানে হযরত মুয়াবিয়া রাঃ এর পুএ ইয়াজিদের বাহিনী কর্তৃক সপরিবারে শহীদ হন। হযরত ইমাম হোসাইন রাঃ জীবন দিলেন, কিন্তু অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেন নি। এ মর্মান্তিক ও করুন হত্যাকান্ডে খৃষ্টান ঐতিহাসিক গীবন ব্যথিত হয়ে বলেন, In a distant age and climate the tragic scene of the death of Imam Hossain will awaken the sympathy of the coldest reader.
আশুরা’র দিনের ইবাদত অত্যন্ত বরকতময় ও ফযিলতপূ্র্ন। পবিত্র হাদিস শরীফে এ সম্পর্কে অনেক বর্ননা আছে। হযরত আবু হোরায়রা রাঃ থেকে বর্নিত আছে যে, হযরত রাসুলে করিম সঃ বলেছেন, রমযানের রোযার পর মহররম মাসের রোযাই শ্রেষ্ঠ বটে। হযরত আলী রাঃ থেকে বর্নিত আছে যে, এক ব্যক্তি রাসুলে করিম সঃ কে জিজ্ঞেস করলেন, রমযান মাসের পর কোন মাসের রোযা রাখতে আপনি আমাকে নির্দেশ দেন? রাসুলে করিম সঃ বলেন, মহররম মাস। কারন,এটি আল্লাহ তাআলার মাস। এ মাসে এমন একটি দিন আছে যেদিন আল্লাহ তাআলা এক সম্প্রদায়ের তওবা কবুল করেছেন এবং তিনি আরেক সপ্রদায়ের তওবাও এদিনে কবুল করবেন।(সহীহ তিরমিজি, হাদিস নং৬৮৮)
হযরত অাবু কাতাদা (রাঃ) থেকে বর্নিত আছে যে, রাসূল (সঃ) বলেন, অামি মহান অাল্লাহর নিকট অাশা করি যে,অাশুরার দিনে রোজা রাখার মাধ্যমে তিনি পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহার ক্ষতিপূরণ দিবেন।(তিরমিজি শরীফ হাদিস নং ৭০০)।
হযরত আয়শা রাঃ থেকে বর্নিত আছে যে, আশুরা ছিল এমন একটি দিন, যে দিন কুরাইশরা যাহেলী যুগে রোযা রাখতেন। মদীনায় আসার পরও তিনি এদিন রোযা রাখতেন এবং লোকজনকে রোযা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। রমযানের রোজা ফরজ হওয়ার পর রমযানই ফরজ হিসেবে রয়ে গেল এবং অাশুরার রোজা বাদ পরে গেল। ফলে যার ইচ্ছা সে এদিনে রোজা রাখতে পারেন।অার যার ইচ্ছা নাও রাখতে পারেন।(তিরমিজি শরীফ,হাদিস নং ৭০১)।
হযরত ইবনে অাব্বাস (রাঃ) থেকে বর্নিত আছে যে, রাসূল (সঃ) মহরমের ১০ তারিখ অাশুরার রোজা রাখতে অাদেশ দিয়েছেন। (তিরমিজি শরীফ হাদিস নং ৭০৩)।
হযরত অাব্দুল কাদের জিলানী রহঃ এর লিখিত গুনিয়াতুত ত্বালেবীন কেতাবে বর্নিত আছে, যে ব্যক্তি অাশুরার দিনে রোজা রাখবেন এবং ২ রাকাত করে ৪ রাকাত নফল নামাজ (সূরা ফাতিহা, অায়াতুল কূরসী, কাফেরুন ও ইখলাস ৩ বার করে পাঠ) অাদায় শেষে ১০০ বার দরুদ শরীফ পাঠ করে কারবালার শহীদদের প্রতি সওয়াব রেসানী করবেন সে পরকালে শহীদদের সুপারিশ লাভ করবেন।তাঁর জন্যে বেহেশতের ৮ টি দরজা খুলে দেয়া হবে এবং সে যেকোন দরজা দিয়ে বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে।
মহররমের ১০ তারিখে কারবালার মর্মান্তিক ও করুন ঘটনা ওৎপ্রোতভাবে জড়িত থাকলেও শুধু হায় হোসেন! হায় হোসেন! বলাই অাশুরার মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নয়।অাশুরার হাজারও ঘটনাবলীর মধ্যে কারবালার ঘটনা একটি মাত্র।এজন্যে শোক করা,মাতম করা,নারী-পুরুষের অানাগোনা, নাচ-গান করা, হৈ হুল্লা করা, কালো বস্ত্র পরিধান করা,খই-মুড়ি ছিটানো, খিচুরির অাড্ডা জমানো, মটকা ভরা পানি যত্র তত্র ছিটানো,তাজিয়া তৈরি করা,শোভাযাত্রা করা,কৃত্রিম কবর জিয়ারত করা,মনগড়া কিচ্ছা কাহিনীর মাধ্যমে বক্তৃতা মঞ্চ গরম করা ইত্যাদি শরীয়তের নির্দেশ মোতাবেক হারাম।এ হারামকে হালাল মনে করে অনেকেই শেরেক ও বেদঅাতে লিপ্ত।
মহররম মাসের ১০ তারিখে কারবালা ময়দানে হযরত ইমাম হোসাইন রাঃ সপরিবারে শহীদ হয়েছিলেন বলেই ১০ মহররমকে আশুরা বলা নেহায়েত বোকামী ছাড়া আর কিছুই নয়। কারবালার ঘটনার হাজার হাজার বছর আগ থেকেই এ দিনটি আশুরা হিসেবে পরিচিত ছিল। হযরত আদম আঃ থেকে হযরত ঈসা আঃ পর্যন্ত নবী ও রাসুলগণের আমলে আশুরার দিনে হাজারো ঘটনা ঘটেছে। সেগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করা উচিৎ। কারবালার শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা সওয়াব রেসানী করা নিঃসন্দেহে সওয়াবের কাজ। কিন্তু এ ঘটনাকে হিন্দু ও ইহুদিদের পূজা পার্বণের মত স্মরণ করা ইসলামের পরিপন্থী।
এ দিন আমাদের কর্তব্য হচ্ছে রোজা রাখা, রাতে নামায পড়া, দান -সদকা করা,যিকির করা,পরিবার – পরিজনের জন্যে ভাল খাবারের ব্যবস্হা করা, কুরআন তেলাওয়াত করা, মৃত ব্যক্তিদের জন্যে দোয়া করা ইত্যাদি শরীয়ত সম্মত কাজে আত্মনিয়োগ করা। আসুন,
আমরা কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক সুখী ও সমৃদ্ধ জীবন গঠন করি। আল্লাহ হাফিজ।
লেখক
নূর হোসাইন মোল্লা
অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক
গুলিশাখালী জিকে ইউনিয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়







Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.