দেবদাস মজুমদার >
১.
দিন মজুর বাবার পক্ষে পেটের ভাত জোগার করাই দুরুহ। এমন অবস্থায় মেধাবী মেয়ে শান্তা রানীর লেখা বন্ধ হওয়ার পথে। অদম্য মেধাবী শান্তাকে নিকট আত্মীয়দের সাহায্য নিতে হয়। আত্মীর বাড়িতে আশ্রয়ে থেকে মেধাবী শান্তা পড়া মুনার জন্য লড়াই করেছে। সে এবারের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় মানবিক বিভাগে জিপিএ ৫ পেয়েছে। দারিদ্রতায় কয়েকদফা পড়া লেখা বন্ধ থাকলেও অদম্য মনোবল এবং প্রবল ইচ্ছা শক্তির কারনে সে আজ ভাল ফলাফল করতে পেরেছে। কিন্তু ভাল ফল অর্জন করলেও দিনমজুর বাবার আর্থিক দারিদ্রতার কারনে ভবিষৎত উচ্চ শিক্ষা অনিশ্চিত । শান্তার আশংকা অর্থাভাবে তার আর লেখা পড়া যদি না হয় ।
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার তুষখালী কলেজ থেকে শান্তা রানী এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় মানবিক বিভাগে জিপিএ ৫ অর্জন করেছে। সে পার্শ্বপর্তী বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদোয়ানী ইউনিয়নের আমড়াতলা গ্রামের দিন মজুর স্বপন মিস্ত্রী ও গৃহিনী তাপতী রানী মিস্ত্রীর মেয়ে।
শান্তা জানান, দিনমজুর বাবার অভাবের সংসারে খেয়ে না খেয়ে বড় হয়েছেন। যে দিন বাবার কাজ জুটত সে দিন দু’বেলা খেতে পারত আর যে দিন বাবার কাজ জুটতানা সে দিন অর্ধাহারে থাকতে হত। এমন শত দুরাবস্থায় শান্তার এসএসসি পাসের পর লেখা পড়া বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল তার অভাবী পরিবার।
বাবার আর্থিক দরাবস্থার কারণে এসএসসি পাশের পর মঠবাড়িযার শাখারী কাঠি গ্রামের নিকট আত্মীয় সুশান্ত মিস্ত্রীর বাড়িতে আশ্রয়ে থেকে স্থানীয় তুষখালী কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ মেলে তার। ওই কলেজ থেকেই এবারের এইচএসসিতে শান্তা রানী জিপিএ ৫ পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়।

স্থানীয় তুষখালী কলেজের অধ্যক্ষ মো. আনোয়ার হোসেন জানান, শান্তা অতি দরিদ্র একটি পরিবারের সন্তান হলেও মেধাবী। মনোযোগ দিয়ে লেখা পড়া কারনেই শান্তা পরীক্ষায় ভাল করেছে। ওর ফলাফলে কলেজ ও এলাকাসি খুব খুশী।

শান্তা জানায়, সে ভবিষ্যতে বড় কোন বিশ্ব বিদ্যালয়ে অনার্স পড়তে চায়। লেখা পড়া করে সে একজন ভাল শিক্ষক হতে চায়।

তবে শান্তার বাবা দিনমজুর স্বপন মিস্ত্রী বলেন, নিকট আত্মীয় ও কলেজের সহায়তায় ও এত দুর পড়তে পেরেছে। এখন শহরে লেখা পড়া এখন কে করাবে ? আমার তো কোন উপায় নাই। সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে হয়ত মেয়েটির আরও লেখা পড়া সম্ভব।

২.
মুড়ি বিক্রেতা ক্ষিতিশ চন্দ্র মিস্ত্রী ও গৃহিনী মেরী রানীর মেয়ে মিতু রানীকে বাবা মায়ের কাজে নিয়মিত সাহায্য করেই নিজের লেখা চালাতে হয়েছে। বাড়িতে মুড়ি ভেজে তা হাটে বাজারে বিক্রি করেই মিতুর পরিবার চলছে।
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার তুষখালী কলেজ থেকে মিতু রানী মানবিক বিভাগে জিপিএ ৫ পেয়েছে। দরিদ্র বাব ক্ষিতিশ চন্দ্র মিস্ত্রী প্রতিদিন স্থানীয় গুদিঘাটা ও তুষখালী বাজারে মুড়ি বিক্রি করে প্রতিদিন ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ টাকা আয় করেন। ওই আয়েই ছয় সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ চলে। সেই সাথে মিতুসহ চার সন্তানের পড়াশুনার খরচ । অবাবের সংসারে শত লড়াই করেই মিতুকে লেখা পড়া করতে হয়েছে। বাবা ও মায়ের সাথে রাত দিন মুড়ি ভাজার কাজে পরিশ্রমের পর নিজের পড়াশুনা । অদম্য মিতু শত বাঁধায় লেখাপড়ায় অমেনাযোগি ছিলনা।
মিতু রানীর বাবা ক্ষিতিশ চন্দ্র জানান, তাঁর বসত ভিটা বলতে চার কাঠা জমি । তার উপরে বসত ঘর। দীর্ঘ ত্রিশ বছর ধরে মুড়ি বিক্রি করে সংসারের ভরণপোষণ চালাতে হচ্ছে। সেই সাথে অন্য চার সন্তানের লেখা পড়া চলছে। বড় মেয়ে শংকরী রানী বর্তমানে পিরোজপুর সোহরাওয়াদি কলেজে পড়ছে ও একমাত্র ছেলে মৃনাল তুষখালী কলেজে চলতি বছরে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছে। আর ছোট মেয়ে মুক্তা স্থানীয় সরোজিনি মাধ্যমিক বিদ্যালয় অস্টম শ্রেণীতে পড়ছে। মেজ মেয়ে মিতু রানী এবার এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ায় পরিবারের সকলেই খুশী।

তিনি আরও জানান, মিতু রানীকে ঢাকায় রেখে বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় পড়ানোর প্রশ্নই আসেনা। কি করে চলবে ! চার ভাই বোনের পড়া শুনা । মুড়ি বিক্রি সংসারের খর তো ঠিকমত চলেনা। মিতকেু মায়ের সাথে সারা দিন মুড়ি ভাজতে হয়। মিতরু বিশ্ব বিদ্যালয়ে অনার্স-মাস্টার্স লেখা পড়া করে ভবিষ্যতে অধ্যাপনা করার ইচ্ছা থাকলেও মুড়ি বিক্রেতা বাবার আর্থিক সামর্থ না থাকায় চিন্তিত হয়ে পরেছে।
মিতু রানী জানায়, আমাকে উচ্চ শিক্ষা নিতেই হবে । উচ্চ শিক্ষা নিয়ে আমি অধ্যাপনা করতে চাই । সমাজের বিত্তবানরা সহযোগিতা করলে হয়ত আমার উচ্চ শিক্ষা নেওয়া সম্ভব।

এ ব্যাপারে তুষখালী কলেজের অধ্যক্ষ মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, মিতুর পরিবারের সংসার চলে বাড়িতে মুড়ি ভেজে তা বাজারে বিক্রি করে। সংগত কারনে মিতুকে পরিবারের মুড়ি ভাজার কাজে সময় দিতে হয়েছে। অভাবের সংসারে পরিশ্রমী মিতু পড়াশুনায় তবু ভিষণ মনোযোগি। পরিবারের অস্বচ্ছলতায় মিতুর লেখা পড়া বন্ধ হোক আমরা তাই চাইনা। নিশ্চয়ই একটা সুযোগ মিলবে মিতুর।

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন