তুষার আহম্মেদ মিলন <>

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ঢাকা মহানগরী অবরোধ ও ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করে। এর বিপরীতে সরকারের পক্ষ থেকে ৯ নভেম্বর সকাল ৬টা থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত সাতদিনের জন্য পাঁচ বা ততোধিক ব্যক্তির সমাবেশ, মিছিল, বিক্ষোভ প্রদর্শন ও সকল প্রকার অস্ত্র-শস্ত্র, বিস্ফোরক দ্রব্য, লাঠিসোটা বহন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। আর এ আদেশ বলবৎ করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োগ করা হয়। যে স্লোগান বুকে-পিঠে লিখে গণতন্ত্রের আন্দোলনে জীবন্ত পোস্টার হয়ে ইতিহাস হয়ে আছেন, সেই স্লোগান নূরের গায়ে সাদা রঙ দিয়ে লিখে দিয়েছিলেন তারই বন্ধু মো. ইকরাম হোসেন। লেখার সময় নূর হোসেনকে বলেছিলেন, “এভাবে বুকে-পিঠে লিখলে পুলিশ যদি তোকে গুলি করে?” প্রতি উত্তরে নূর বলেছিলেন, “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের জন্য প্রায় সারা জীবন জেল খেটেছেন, অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন। আমি কেন পারবো না! আমি গণতন্ত্রের জন্য শহীদ হতে প্রস্তুত।” ঐদিন সকাল ৯টা পর্যন্ত ঢাকা মহানগরীর সর্বত্র জীবনযাত্রা ছিলো মোটামুটি স্বাভাবিক। সকাল ৯টার দিকে তোপখানা রোড পুলিশ বক্সের অদূরে সিপিপি অফিসের সামনে কিছু লোক জমায়েত হলে পুলিশ সেখান থেকে প্রায় ২০ জনকে আটক করে। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে থেকে প্রায় দু’শ লোকের মিছিল শুরু হয়ে পুলিশ বক্সের দিকে এগুতে থাকে। এ সময় পুলিশ হাউজ বিল্ডিং ফিন্যান্স কর্পোরেশন ভবনের সামনে লাঠিচার্জ করে। এরপর থেকে মিছিলে লোক সংখ্যা বাড়তে থাকে। তোপখানা রোডের পুলিশ বক্স থেকে গোলাপ শাহ মাজার পর্যন্ত লোক জমায়েত হতে থাকে। স্বৈরাচারী সরকার পতনের জন্য সংগঠিত সুবিশাল মিছিলের প্রধান ফোকাস ছিলেন একজন সাধারণ বেবিট্যাক্সি চালকের ছেলে বাংলার ইতিহাসের এক অদম্য সাহসী বীর কালো বর্ণের, লম্বা টগবগে যুবক নূর হোসেন। সেদিন তার চোখেমুখে যেন ছিলো আগুনের ফুলকি। বুকে-পিঠে লেখা ছিল স্বাধীন বাংলার জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি। পায়ে কেডস জুতা, পরনে জিন্সপ্যান্ট, কোমড়ে বাঁধা শার্ট, উদোম গতর, বুকে পিঠে লেখা অমর বাণী। সত্যিই জনতার মাঝে সেদিন এক অন্য রকম মুখ ছিলেন তিনি। সকলের চোখে পড়েছিলো তা। ফাঁকি দিতে পারেননি স্বৈরশাসকের লেলিয়ে দেয়া পুলিশ বাহিনীর চোখকেও। মিছিলটি যখন গুলিস্তান জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি পৌঁছায়, ঠিক তখনই শুরু হয় মিছিলের উপর পুলিশের গুলিবর্ষণ। একটি গুলি এসে ছিদ্র করে দেয় নূর হোসেনের বুক। বায়তুল মোকাররমের মূল গেটের কাছে মুহূর্তের মধ্যে লুটিয়ে পড়েন নূর হোসেন। মরণ যন্ত্রণায় ছটফট করা নূর হোসেনকে সুমন নামে এক যুবক রিকশায় করে হাসপাতালের দিকে যান। গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজারের কাছে পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ায় স্বৈরাচারীর পুলিশ বাহিনী। তাদের কয়েকটি গাড়ি এসে রিকশাটিকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। গুলিবিদ্ধ নূর হোসেনকে টেনে হিঁচড়ে রিকশা থেকে নামিয়ে পুলিশ গাড়িতে তুলে নেয়। একজন নিষ্ঠুর পুলিশ সদস্য পায়ের বুট দিয়ে তাঁর বুকে চেপে ধরে। এরপর নূর হোসেনকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে সম্ভবত বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নিতে বাধ্য হন বাংলার এই সাহসী বীর সন্তান। এতক্ষণ যার কথা বলেছি, তিনি এই মাটির সন্তান।

আমাদের যুবসমাজের প্রাণপণ আবেদন, মঠবাড়িয়া গুরুত্বপূর্ণ স্থানে শহীদ নূর হোসেন চত্বর ও ম্যুরাল স্থাপনের দাবি জানাই ।

লেখক <> সাধারণ সম্পাদক , মঠাবাড়িয়া পৌরসভা ছাত্রলীগ

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন