মঠবাড়িয়ার ভীমনলীর সম্মূখযুদ্ধে ১৫ শহীদেরস্বীকৃতি মেলেনি !


দেবদাস মজুমদারঃ পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার সাপলেজা ইউনিয়নের হিন্দু অধ্যুষিত ভীমনলী গ্রামের ১৫ শহীদেও গণ সমাধিস্থল আজও অযত্ন অবহেলায় পড়ে আছে। এমনকি মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়ও এসকল বীরের নামও লিপিবদ্ধ হয়নি। মেলেনি শহীদের স্বীকৃতি। মুক্তিকামী এ বাঙালীর বীরত্বের ইতিহাস মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময় ধরে যেন এক জনশ্রুতি হিসেবেই টিকে আছে। তাই অযত্নে অবহেলায় পড়ে আছে ১৫ শহীদের গণ সমাধিস্থল।
সরেজমিনে জানাগেছে, মঠবাড়িয়ার সাপলেজা ইউনিয়নের নলীভীম গ্রামের নলী খালের পাড়ে ওয়াপদা বেড়ি বাঁধ লাগোয়া ৮০টি হিন্দু পরিবরের বসবাস। গ্রামের সম্ভ্রান্ত বাড়ই বংশের পরিবারগুলো ছিল এলাকার ধনাঢ্য। মঠবাড়িয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দুরের ওই গ্রামে যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল বিপর্যস্ত। মুক্তিযুদ্ধ সমকালীন সময়ে আশ্রয়ের জন্য একটি নিভৃত জনপদ ছিল এ ভীমনলী গ্রাম। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের সেখানে যাতায়াত গড়ে ওঠে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন গ্রাম থেকে বিতাড়িত হিন্দু বাঙালীরাও সেখানে প্রাণ ভয়ে আশ্রয় নেয়। এ কারনে স্থানীয় স্বাধীনতা বিরোধি রাজাকারদে কাছে গ্রামটি টার্গেটে পরিনত হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় সত্তোরোর্ধ এক মুক্তিযোদ্ধা জানান, ১৯৭১ সালে সাবেক জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বারের নেতৃত্বে উপকুলীয় মঠবাড়িয়া অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল বিশাল এক রাজাকার বাহিনী। সংগঠিত রাজাকার বাহিনী হিন্দুদের ঘর বাড়ি লুটতরাজ,গণহত্যা ও নারী নির্যাতন চালায়।
এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের যাতায়াত ও হিন্দুদের আশ্রয়স্থল হিসেবে ভীমনলী গ্রামের বাড়ই বাড়ি রাজাকারদের বিশেষ টার্গেটে পরিনত হয়। রাজাকারকারা পরিকল্পিতভাবে ১৯৭১ সালের মে মাসে বাড়ই বাড়িতে আক্রমন চালায়। মুক্তিযোদ্ধারও সেদিন রাজাকারদের পাল্টা আক্রমন করে তাদের প্রতিহত করার চেষ্টা করে। সেদিনের সেই সম্মূখ যুদ্ধে রাজাকার লালু খাঁ মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত হন। আর রাজাকারদের গুলিতে শহীদ হন ১৫ জন মুক্তিকামী বীর বাঙালী।
ওই যুদ্ধে সেদিন দুই হাটু আর কোমড়ে গুলি বিদ্ধ হয়ে সেদিন বেঁচে গিয়েছিলেন সাপলেজা মডেল হাইস্কুলের শিক্ষক রমেশ চন্দ্র মিস্ত্রী(৫৮)। তবে তাঁর বড় ভাই গণেশ চন্দ্র মিস্ত্রী সেদিনের সেই যুদ্ধে শহীদ হন।
স্বজন হারানো দুঃখ আর ক্ষোভ নিয়ে তিনি বলেন,সেদিনের সেই সম্মূখ যুদ্ধ ছিল সশস্ত্র রাজাকারদের সাথে স্বাধীনতাকামী নিরস্ত্র বাঙালীর। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়,মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ আর আশ্রয়হীন বাঙালীকে আশ্রয় দেওয়াই ছিল আমাদের অপরাধ। আমাদের দুভার্গ্য এই বীরত্বগাঁথা আর ১৫ বাঙালীর এ জীবন দান আজও স্বীকৃতি পেলনা।
অনুসন্ধানে
জানাগেছে, ১৯৭১ সাল। ২২ মে। বাংলা ৭ জ্যৈষ্ঠ। রবিবার। সকাল দশটা কি সাড়ে দশটা । সূর্যের তেজ বাড়ছে। ভীমনলী নিভৃত গ্রামে। যেন শুন শান নিরাবতা। মাঠে ঘাটে মানুষের কোন চলাচল নেই। তবে সকল নিরাবতা ছাপিয়ে হঠাৎ ঠা ঠা গুলির আওয়াজ থেমে থেমে ভেসে আসছে । গ্রামের হিন্দু পাড়ার মানুষ আতংকে সতর্ক হতে থাকে। সকলে গ্রামের সম্ভ্রান্ত বাড়ই বাড়িতে এসে জড়ো হতে থাকেন। সংখ্যায় দুই শতাধিক মানুষ। লাঠি,ল্যাজা,বল্লম ও ঢাল নিয়ে তৈরী হয় দুই শতাধিক বাঙালী। নলী খালের খেয়াঘাটের পাশে বেড়িবাঁধে তাঁরা দৃঢ় অবস্থান নেয়। ততক্ষণে রাজাকারের দল দুইশত মিটারের মধ্যে এসে গেছে। মুহুর্তেই শুরু হয় এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধারা লেজা,সড়কি,বল্লম দিয়ে সশস্ত্র রাজাকারদের প্রতিহতের চেষ্টা করে। রাজাকাররা পাল্টা গুলি চালায়। দুই ঘন্টা ধরে চলে এই পাল্টা আক্রমনের যুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমনে লালু খাঁ নামে এক রাজাকার নিহত হয়। আর রাজাকারদের গুলিতে ভীমনলী গ্রামের মাঠে শহীদ হন ১৫জন বীর বাঙালী। টিকতে না পেরে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে। তারপর রাজাকাররা ওই ১৫ শহীদের লাশ টেনে হিচড়ে নলী খালের চরে ফেলে দেয়। রক্তের লাল স্রোতধারা বেড়িবাঁধ উপচে পাশ্ববর্তী নলী খালের লোনা পানি রঞ্জিত করে।
তারপর রাজাকার বাহিনী ভীমনলী গ্রামের ৮০টি হিন্দু বাড়িতে পালাক্রমে তান্ডব চালায়। ব্যাপক লুটতরাজ চালিয়ে ওরা ঘর বাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। রাজাকাররা চলে গেলে সূর্য ডুবে সন্ধ্যা নামতে থাকে ভীমনলী গ্রামে। তারপর স্বজন হারানো বেদনায় ভারাক্রান্ত সর্বস্বহারা মানুষগুলো সেই সন্ধ্যা হাতড়ে ১৫ শহীদের নিথর দেহ মাথায় তুলে আনে নলী খালের চর থেকে। খেয়াঘাটের পাশে বেড়িবাধের পশ্চিমপাড়ে গণসমাধিতে ঠাঁই হয় তাঁদের।
সেদিনের সম্মূখ যুদ্ধে শহীদ হন জীতেন বাড়ই, সুরেন্দ্র নাথ বাড়ই আর উপেন্দ্র নাথ বাড়ই তিন আপন ভাই। নিশিকান্ত কান্ত বাড়ই ও তাঁর বড় ছেলে ধীরেন্দ্র নাথ বাড়ই। জগদীশ চন্দ্র বাড়ই,গণেশ চন্দ্র মিস্ত্রী,ভূপাল মিস্ত্রী,বলরাম মিস্ত্রী,ষষ্ঠী হাওলাদার,বসন্ত মিস্ত্রী,সখানাথ খরাতি,ঠাকুর চঁাদ মিস্ত্রী,নেপাল চন্দ্র মিস্ত্রী ও বিনোদ চন্দ্র বিশ্বাস।
আজও ১৫জন শহীদ তালিকায় অন্তভূক্ত হয়নি। ফলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই সংগ্রাম ও সংগ্রামী মানুষের অবদান আজও উপেক্ষিত রয়ে গেছে। রাষ্ট্র কিংবা সমাজ কেউ আর এই সংগ্রামের বীরত্বগাঁথা মনে রাখেনি। তাই অযত্নে পড়ে আছে গণ সমাধি।
সেদিনের সেই যুদ্ধে বাবা নিশিকান্ত বাড়ই আর বড় ভাই ধীরেন বাড়ইকে হারিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা বীরেন্দ্র নাথ বাড়ই। তিনি বলেন,বাবা আর বড় ভাইকেই শুধু হারাইনি, প্রতিবেশী ১৫ স্বজনকে হারিয়েছি। স্বাধীনতার চল্লিশ বছরেও শহীদের স্বীকৃতি হলনা। এই যুদ্ধ যদি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ হয় তাহলে কেন শহীদ পরিবারের স্বীকৃতি আজও উপেক্ষিত থাকবে ?
এ ব্যাপারে সাপলেজা ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমাণ্ডের আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা বীরেন্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেন,মুক্তিযুদ্ধের সময় মঠবাড়িয়া অঞ্চলের যতগুলো যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে তার মধ্যে ভীমনলী গ্রামের বাড়ই বাড়ি যুদ্ধ অন্যতম। রাজাকারদের সাথে সম্মূখ ওই যুদ্ধে ১৫জন সেদিন শহীদ হন। তাঁদের শহীদের তালিকায় অন্তভর্ূক্ত করতে বহুবার শহীদ পরিবারের পক্ষ হতে আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য আজও এটি বাস্তবায়ন হয়নি।
মঠবাড়িয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমাণ্ডার মো. বাচ্চু মিয়া আকন বলেন,মুক্তিযুদ্ধে উপকুলীয় মঠবাড়িয়ায় স্বাধীনতা বিরোধিদের সাথে যতগুলো সম্মূখ যুদ্ধ হয়েছে তার মধ্যে নলী গ্রামের বাড়ই বাড়ির সম্মূখ যুদ্ধ অন্যতম। ইতিহাসে এই বীরত্ব আজও অস্বীকৃত রয়ে গেছে।
মুক্তিযুদ্ধকালীন সুন্দববন অঞ্চলের আসাদ নগরের ইয়াং কমাণ্ডিং অফিসার মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুল হক মজনু কালের কণ্ঠকে বলেন,মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরেও এদেশের স্বাধীনতা বিরোধিদের অপতৎপরতা থেমে নেই। মুক্তিযুদ্ধে উপকুলীয় অঞ্চলে যে কয়টি যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে তারমধ্যে নলী গ্রামের বাড়ই বাড়ির যুদ্ধ অন্যতম ছিল। এ বীরত্বের ইতিহাস এখনও স্বীকৃতি পায়নি।

About The Author

Leave a Reply