কয়েকদিনের ভার্চুয়াল লাইভ অনুষ্ঠানের উপর বিশ্লেষণ


কয়েকদিন ধরে চমৎকার লাইভ অনুষ্ঠানে জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আলোচনা শুনছিলাম। রাজনীতিবিদরা এত সুন্দর করে কথা বলতে পারেন যা আগে অনুভব করিনি! হ্যাঁ বলছিলাম মঠবাড়িয়ার কথা।

মঠবাড়িয়ার ২ জন সম্মানিত সঞ্চালক লাইভ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন! ১ জন কুয়েত থেকে জনাব সাইদুল হক খান অন্যজন মঠবাড়িয়া থেকে জনাব ইসমাইল হাওলাদার! বুলেট নামে একজন সাংবাদিকও একদিন একটি লাইভ করেছিলেন! যাইহোক, এই লাইভ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কিছুটা হলেও মঠবাড়িয়ার জনগণ তাদের প্রতিনিধি নেতৃবৃন্দের বক্তব্য শুনতে পেরেছেন। আমি কারো বিপক্ষে বা পক্ষে কিছুই বলতে চাইনা! একজন সচেতন সাধারণ নাগরিক হিসেবে শুধুমাত্র বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করবো মাত্র!

প্রথমেই মাননীয় MP মহোদয়ের কথা বলতে চাই; আজ অব্দি ওনার অনুষ্ঠানটি প্রায় ৪৫ হাজর মানুষ দেখেছেন, লাইক কমেন্টস শেয়ারও কম হয় নি! ওনার বক্তব্যে কিছুটা অহমিকা দাম্ভিকতা ছিলো বৈ-কি, যেটা অস্বীকার করা যায় না! এটাও সত্যি উনি নানা কৌশলে মঠবাড়িয়ায় সবচেয়ে বেশী বার (৫ বার) নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। বৃহৎ ৩ টি দল থেকে এবং স্বতন্ত্র থেকেও নির্বাচিত হয়েছেন তিনি! উপজেলা চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হয়েছিলেন একবার। এমন ভাবে অন্যরা যদি ৪/৫ বার সাংসদ নির্বাচিত হতেন তিনি বা তারাও যে দাম্ভিকতা বা অহমিকা দেখাতেন না তা-ই বা কি করে বলি!?

উনি বিমানের চাকুরী ছেড়ে দিয়ে তখনকার সময়ে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন বিনে পয়সায়। অনেককে নিজ পকেট থেকে ওষুধ পত্তর কিনতে টাকাও দিয়েছেন। তখন রাস্তা- ঘাট উন্নত ছিলনা। যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর। এখন মোটরসাইকেলে নিমিষেই যেখানে খুশী সেখানে যাওয়া যায়! এটা তখন আমরা ভাবতেও পারিনি! তখন হাতে হাতে মোবাইল ছিলোনা! প্রত্যন্ত এলাকায় প্যান্ট উচিয়ে কাঁদা ভেংগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা দিয়ে মানুষের মন জয় করেছিলেন ডাঃ ফরাজি। তখন আমরা ওনার মনের খবর জানতাম না বা বুঝতামওন! এটাও অস্বীকার করা যায়না, তখন ওনার জনসমর্থন ছিল ব্যপক। জন মানুষের ভরষা ছিল ডাঃ ফরাজি! উনি কখনো লাঠিয়াল পোষেন নি এটি হলফ করেই বলা যায়! রাজনীতিতে অসত্য কথার ছড়াছড়ি এটি কেউ স্বীকার করুক চাই না করুক! নিজেকে অন্যের চেয়ে ভাল বলে ফুটিয়ে তুলতে কে না চায়!? তবে মানুষ কিন্তু মন্দের ভালটাই বেছে নেয়!

জনাব ফরাজি’র যেমন দোষ আছে তেমনি গুন নেই তাও বলা যাবে না! ঢালাওভাবে অভিযোগও কতটুকু যুক্তিযুক্ত তাও ভাববার বিষয়। যারা গত নির্বাচনে তার পক্ষাবলম্বন করে তাকে নির্বাচিত করলেন তারাই হঠাৎ করে শুধুমাত্র ADP’র ৬০ লক্ষ টাকা ফেরৎ যাওয়া নিয়ে বিরুদ্ধাচারণ একমাত্র কারণ বলে অন্তত আমি মনে করি না! ডাল মে কুচ কালা হায়!

তবে উনি প্রতিবারই কোন না কোন চমক দেখিয়ে ওনার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ অর্জন করে এসেছেন! সুতরাং আগামিতে উনি নির্বাচন করবেন না এটাও বলা যায় না! যদি নির্বাচন না করেন-তো ভালই কিন্তু এমন কোন আলাদীনের চ্যারাগ নিয়ে আবার হাযির হবেন না তা-ই বা অবিশ্বাস করি কি করে!?

পরেরদিন প্রাক্তন উপজেলা চেয়ারম্যান জনাব আশ্রাফুর রহমানের আলোচনা আজ অব্দি ৩৬ হাজার মানুষ দেখেছেন। তাঁর বক্তব্য ছিল শ্রুতি মধুর শালীন এবং সান্ত! তবে MP’ র বিরুদ্ধে ছিলেন বিষোদগার! যতটুকু বুঝলাম আশ্রাফুর রহমান মঠবাড়িয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস ভালই চর্চা করেছেন। যেটি আমরা চাক্ষুষ দেখেছি সেটি তিনি না দেখেও উপস্থাপনা করেছেন কিছুটা গরমিল থাকাটাই স্বভাবিক! ছিলেন ছাত্রনেতা, বয়স কম তাই বক্তব্যে কিছুটা তারুণ্যের ভাবও ছিল। তরুন এবং যুবকদের নিয়ে তার পথ চলা কিন্তু এই তরুনদের আগামী দিনে পথ চলতে কতটুকু প্রশিক্ষিত করে গড়ে তুলেছেন সেটি বিবেচ্য (লেখাপড়া নৈতিকতা চরিত্র গঠন ইত্যাদি বিষয়ে)? মঠবাড়িয়ায় মাদক সন্ত্রাস রাজনৈতিক হানাহানি এবং হত্যা বিষয়গুলো বাঞ্চনীয় নয়! এটিও নিয়ন্ত্রণে আনতে এই তরুন রাজনৈতিক কর্মীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তৈরী করা বাঞ্চনীয় নয় কি!? মানুষ মাত্রই ভুল হওয়া স্বাভাবিক। জনাব আশ্রাফ বর্তমানে মঠবাড়িয়ায় আলোচিত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে তরুন! তাই তার ভুল হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। অনেক সময় রাজনীতিতে ছোট ভুলও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে! দলিয় রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় সর্বোচ্চ নেতৃত্বের নির্দেশাবলি মান্য করাটাও বিড়াট বিবেচ্য বিষয় বৈ-কি! (যে কথাটি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মেয়ের মহোদয় তাঁর লাইভ আলোচনায় প্রকাশ করেছেন) আশাকরি তরুন রাজনৈতিক কর্মী এবং নেতৃত্বরাও বিষয়টি ভেবে দেখবেন! রাজনীতি করতে শুধু শ্লোগান নির্ভর হলেই চলবেনা; বড় ভাই, আমার নেতা, আমার গুরু ইত্যাদি ধারণ করলেই নেতৃত্ব বা বড় স্থান পাওয়া যায় না। রাজনীতিতে সকলেই কিন্তু সামনের দিকে অগ্রসর হতে চায়! তাই তুঙ্গে পৌঁছাতে টার্গেট নিয়ে এগুতে হয়! সততা শিক্ষা প্রজ্ঞা সর্বোপরি নেতৃত্বের গুণাবলী সময়ের চাহিদা। অযোগ্যরা ধিরে ধিরে ঝড়ে পরে কেউ কেউ হতাশায় ভুগতে থাকে। কোথাও কোন স্থান না পেয়ে একসময় নিজেকে-ই নিজের বোঝা বলে মনে হয়! দিন আসে দিন যায়, সময় বয়ে যায় নিজ গতিতে, কারো জন্য অপেক্ষা করে না। তাই সব দলের তরুন কর্মীদের প্রতি অনুরোধ রাজনীতির পাশাপাশি লেখাপড়া চালিয়ে যেতে হবে। ভাল রেজাল্ট করতে হবে! রাজনীতিতে নেতৃত্বের গুণাবলী অর্জন করতে হবে!নচেৎ তোমাদের উপর ভর করে একদল একদিন উঁচু তলায় আসিন হবেন, আর তোমরা তিমিরেই রয়ে যাবে!!

এরপরে লাইভে এলেন মঠবাড়িয়ার BNP’র সাধারণ সম্পাদক জনাব রুহুল আমিন দুলাল। অনুষ্ঠানটি আজ অব্দি ২০ হাজার মানুষ দেখেছেন। তিনিও MP মহোদয়ের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছেন! স্বভাবিক কারনেই উনি বিষোদগার করতেই পারেন! কারণ একসময়ে ডাঃ ফরাজি সাহেব তাদের ঘরও আলোকিত করেছিলেন। বিপত্তি ঘটে দল ত্যাগ করায়। জনাব রুহুল আমিন দুলালের বক্তব্যও শাবলিল ছিলো। যদিও ১১ বছর সরকারের বাহিরে থাকায় নানা ভাবে দলের নেতা কর্মীরা নির্যাতিত কোনঠাসা, তাছাড়াও কঠিন দিন পার করতে হচ্ছে! সরকারের কঠিন অবস্থান এবং পুলিশের কঠোর নজরদারির কারনে তারা জাতীয়/স্থানীয় অনেক ইস্যু থাকা সত্যেও শান্তিপ্রিয় ভাবেও কোন আন্দোলন গড়ে তুলতে পারছেন না। তথাপি জনাব রুহুল আমিন দুলালের নেতৃত্বে মঠবাড়িয়ার BNP অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম রয়েছেন। বিরোধী দলকে ছায়া সরকারও বলা হয়ে থাকে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত এর অস্তিত্ব থাকা দরকার, যেটা আমরা জনগণ খুব একটা দেখতে পাইনা! এর নানাবিধ কারণও রুহুল আমিন দুলালের আলোচনায় উঠে এসেছে! পুলিশের কঠিন অবস্থান কোন কোন ক্ষেত্রে গুলি করা নিয়েও BNP’র নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন ভাবে প্রকাশ করে থাকেন, যেটা আমরা মিডিয়ার বদৌলতে শুনতে এবং দেখতে পাই। রুহুল আমিন দুলালের আলোচনায়ও তা ফুটে উঠেছে।

সর্বশেষ গতকাল পৌর মেয়র জনাব রফিউদ্দিন আহমেদ ফেরদৌসও লাইভ অনুষ্ঠানে এলেন। ওনার আলোচনাও আজ পর্যন্ত ১০ হাজার মানুষ দেখেছেন! সামনে ২/৩ দিনে হয়তো আরো মানুষ দেখবেন! যিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পালন করে ঐক্য জোটের প্রার্থী ডাঃ ফরাজি সাহেবকে দলবল নিয়ে সর্বোচ্চ শক্তি সামর্থ্য নিয়ে সাপোর্ট দিয়ে সাংসদ বানাতে সহোযোগিতা করলেন তিনিও দের বছরের মাথায় সাংসদের উপর বিষোদগার করলেন। সাংসদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে ধরলেন।

মোট কথা বর্তমান সাংসদ বারবার নির্বাচিত হওয়া সত্যেও তার বিরুদ্ধে নেতৃবৃন্দের এহেন বিষোদগার ইতিপূর্বে দেখা যায় নি। উল্লেখ্য ১১ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও MP মহোদয়ের বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছেন। তাঁর আপন ভাই উক্ত চেয়ারম্যানদের ১ জন হওয়া সত্যেও তাদের পক্ষাবলম্বন করেছেন। অথচ দের বছর আগেও এই সকল চেয়ারম্যানরাই MP মহোদয়কে সমর্থন করেছিলেন। লাইভ আলোচনায় জনপ্রতিনিধি ও নেতৃবৃন্দের বক্তব্যে MP মহোদয়ের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এবং বিষোদগার জানা গেলেও সাধারণ জনগণের কথা জানার মাধ্যম কিন্তু নির্বাচন!

যাইহোক, আমরা দেখছি বর্তমানে মঠবাড়িয়ায় নেতৃবৃন্দের মধ্যে একটি অদৃশ্য দেয়াল বিরাজমান! সকল দলের সকল নেতাদের একই বক্তব্য তাহলো তারা জনগণের জন্য রাজনীতি করেন। জনগণের সুখে দুঃখে পাশে থাকেন। আমরা সাধারণ জনগণ তা বিশ্বাসও করতে চাই। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রশাসন জনপ্রতিনিধি গোয়েন্দা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সকল কিছুর অস্তিত্ব থাকা সত্যেও দিন দিন জনগণের দুর্ভোগ বেড়েই চলছে বৈ-কমছে না! শীত গ্রীষ্ম বর্ষায় রাস্তার বেহাল দশা। পরিবার সহ বরগুনা থেকে মঠবাড়িয়া আসার সময়ে রামনা খেয়া পার হয়ে একটি CNG তে উঠলাম, চালককে জিজ্ঞেস করছিলাম মঠবাড়িয়া আর কতদূর ভাই, চালক হেসে হেসে বলছিলেন স্যার একটু অপেক্ষা করেন, যেই দেখবেন ভাঙ্গা রাস্তা শুরু মনে করবেন মঠবাড়িয়া পৌরসভাও শুরু। বাস্তবেও দেখলাম তাই। শুধু কি রাস্তা খারাপ!? চিকিৎসা ব্যবস্থার কি বেহাল দশা মঠবাড়িয়ার মত একটি উপজেলায় প্রাইভেট ক্লিনিক ১৫/১৬ টি! অপারেশন সহ সিজারও হয় ভূয়া ডাক্তার দ্বারা। একজন মাছ ব্যবসায়ী যদি বনে জান সার্জিক্যাল স্পেশালিষ্ট তাহলে আমরা কোথায় বাস করছি!? খাল ভরাট ভিটি দখল প্রায় শেষ! অভিযোগের ফিরিস্ত তুললে অনেক লম্বা হয়ে যাবে! দুর্নীতির সীমাপরিসীমা নেই! এই করোনা মহামারীতেও মানুষের খাইখাই বন্ধ হচ্ছেনা তখন আমাদের ভাগ্যের উপরেই সব ছেড়ে দেয়া ছাড়া কি-ই বা উপায় থাকতে পারে!? আমরা গ্রাম ছেড়ে দূরে থাকলেও মনটা গ্রামেই পরে থাকে। এলাকায় আত্মীয় স্বজন থাকেন, ডিজিটাল যুগ কোন কিছুই আর গোপন থাকেনা। সময়ে সবই প্রকাশ হয়ে যায়। আত্মীয়রা ভাল থাকলে আমাদেরও ভাল লাগে। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে আমরাও বছরে ২/৪ বার এলাকায় আসতে পারি।

শিক্ষারপশাপাশি নৈতিক শিক্ষা চরিত্র গঠন অতিবও জরুরী কিন্তু ঘুণে ধরা রাজনীতির ছোবলে শিক্ষার্থীরা দগ্ধ হচ্ছে। যাদের দেখভাল করার কথা তারা নিজেরা কাদা ছোড়াছুড়িতে ব্যস্ত থাকলে শিক্ষার্থীদের দিকে লক্ষ রাখা কি করে সম্ভব!? তাই সকল দলের নেতৃবৃন্দ সহ জনপ্রতিনিধিদের নিকট আমাদের মঠবাড়িয়ার জনগণের আকুল আবেদন আপনারা নিজেরা ভাল থাকুন আমাদেরও ভাল রাখুন!!

আল্লাহ সকলকে সুমতি দান করুন। আমিন।।

গোলাম মোস্তফা
প্রশাসনিক কর্মকর্তা, মাছরাঙা টেলিভিশন

About The Author

Leave a Reply