আম্ফানের পর – ১১ 🔻
১৯৮৮ সালের এক সকাল। বড়মাছুয়া লঞ্চঘাটেরে বেরিবাধে সেদিন শত সহস্র মানুষের ভীর। মন্ত্রী আসবেন বলে সেই সকাল থেকে উপজেলা সদর আর প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে মানুষের জটলা বেড়েই চলছিলো। ঐতিহাসিক এক ঘটনা সেদিন ঘটেছিলো আমার আপন জনপদ মঠবাড়িয়ায়। নদী নির্ভর জীবনে তখন সরাসরি বাস সার্ভিস শুরু হয়নি। নদী সখ্য জীবনে জন্মাবধি আমাদের নৌ চলাচল ভরসা। খবর রটেছিলো টানা একমাস ধরে । বলেশ্বর নদীর মোহনার অদুরে খেজুরবাড়িয়ায় স্টিমার ঘাট হবে। কত প্রতীক্ষা আর আকাঙ্খার দিন কেটেছে সেই সময়কালে।
তো ১৯৮৮ সালের সেই এক সকালে তৎকালীন মন্ত্রী মেজর (অবঃ) রফিকুল ইসলাম আসলেন । বড়মাছুয়া মোহনার বাধের ওপর হাজারো মানুষের তালিতে মুখরিত সময়। মন্ত্রী মহোদয় বড়মাছুয়া স্টিমারঘাট উদ্বোধন করলেন। আমরা মঠবাড়িয়াবাসি স্টিমারঘাট পেয়ে গেলাম।
তার পরের ইতিহাস মঠবাড়িয়া জনপদের মানুষের জানা। বড়মাছুয়ার খেজুরবাড়িয়া ইস্টিমার ঘাটে স্টিমার ভিড়তে শুরু করে। ঐতিহ্যবাহী গাজি স্টিমার দেখতে কতদিন গিয়েছি আমি ঘাটে। স্টিমার বাড়তে থাকে ঘাটে । পিএস মাহসুদ, অস্ট্রিচ, টার্ণ ,লেপচা,বাঙালী আর মধুমতি কি বাহারী নামের স্টিমার। একটা অবহেলিত জনপদের মানুষের বেশ নবাবী নৌযাত্রা বিহার বটে। ঢাকা আর খুলনা কত সহস্রবার গেছি এই স্টিমার চড়ে হিসেব নাই। কত স্মৃতি।
দুর্ভাগ্য বুড়ো স্টিমার গাজি ২০০০ সালে খুড়িয়ে চলা জীবন ডকে উঠে যায়। গাজি স্টিমারটা এখন কেবল আমার ছবির অ্যালবামে শোভা পায়।
স্টিমারঘাট হওয়ার পর বড়মাছুয়া লঞ্চঘাট মোহনায় নদী ভাঙনের শব্দ শুনি আমি। জেলে আর কৃষকের জমি যায়, বসতি যায়। ঘূর্ণিঝড় সিডর এসে ভাসিয়ে নেয় স্টিমারঘাট বাজার, আর স্টিমারঘাটও বিপন্ন হয়। সিডরের পর আইলা ,বুলবুল ভাঙে ঘাটের মানুষের কপাল। এরপর ঝুঁকি নিয়ে যাত্রী ওঠানামা। ঘাটের পাকা মসজিদ, যাত্রী বিশ্রামাগার সব বলেশ্বর গিলে খায়। ঘাটের সিঁড়ি নড়বরে আর ঘাটের হতশ্রী দশা বাড়তেই থাকে। অথচ এই স্টিমারঘাট বদলে দিয়েছিলো মঠবাড়িয়াসহ উপকূলের মানুষের জীনধারা। আমাদের উৎপাদিত ফসল, বলেশ্বর নদীর মাছ আর নানা পণ্য সামগ্রী ঢাকা খুলনা থেকে নৌপথে এ ঘাটে ওঠানামা হতো। তখন বেলা মুখরিত ঘাট হাট আর জনপদ ।
কিন্তু ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর থেকে ঘাটের দশা আর বদলায় না। জোড়া তালির সিঁড়ি। আশাপাশের ভাঙন তো চলছেই। সেই মুখরিত বড়মাছুয়া স্টিমার ঘাট এখন প্রাণহীন। নৌযান আসেনা। তীর থেকে বিচ্ছিন্ন দশায় কতবার যে ঘাট টেনে তীরের দিকে নিয়ে আসতে হয়েছে। ঘাটের সিঁড়ি সে যে কতবার বলেশ্বরের পেটে গেছে তার হিসেবটা আমার কাছেই আছে। আমি হিসেব রাখি আর হিসেব মিলিয়ে দেখি কত নেতা জননেতা আমলার প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি । সব আসলে দায়সারা।
স্টিমারঘাট এখন করোনা আর আম্ফানের পর প্রাণহীন ! নৌযানের শব্দ নেই টানা দুইমাস। এর মধ্যে আম্ফান আসে । জলোচ্ছাস তেড়ে আসে বড়মাছুয়ার তীরে । নদী ভেঙে একাকার বড়মাছুয়া লঞ্চঘাট মোহনার বাজার বিপন্ন । বিপন্ন খেজুবাড়িয়া স্টিমারঘাট ।
আজ এ ঘাট, বাধের বিপন্ন দশা দেখতে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব:) জাহিদ ফারুক আসেন । তিনি লঞ্চঘাট থেকে আম্ফানে বিপর্যস্ত বেরিবাধ হেঁটে স্টিমারঘাট অবধি গিয়েছেন। আমিও গিয়েছি । নানা কিসিমের মানুষে ঠাসা মন্ত্রীর সাথে সত্যিকার দুর্ভোগের বৃতান্ত বলা হয়না। এই যে বাধের জীবন কেন এত অরক্ষিত ? এই যে ঘাট শ্রমিকরা আজ বেকার কেন ? এই যে এখানের বাধ কেন উঁচু হয়না ? এই এখানে বলেশ্বর নদী লাগোয়া বাধের পারে ব্লক হয়না কেন ? আর ঐ যে স্টিমারঘাট আম্ফানের ঝড়ে জলোচ্ছাসে জনপদ থেকে এখনও বিচ্ছিন্ন তার দশা কবে বদলাবে ?
মন্ত্রী মহোদয়কে ফুলের শুভেচ্ছা দেওয়া হয়েছে ঘাটে । তবে আমি কাউকে তালি বাজাতে দেখিনি।
আর আমি স্টিমারঘাটের শ্রমিক ইউনুস ঘরামী(৬০), রশীদ খান(৫৮) আর আব্দুল মালেক মৃধা(৬৫) যারা এখন বেকার তাদের ভীরের মধ্যে খুঁজে ফিরেছি। কারও দেখা পাইনি। স্টিমারঘাট এলাকা থেকে মন্ত্রী চলে গেছেন । উৎসুক মানুষজনও কেউ নেই। আমি ঠায় দাঁড়িয়ে কেবল ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে বিপন্ন ঘাটের বিপন্নতা দেখি। বিচ্ছিন্ন স্টিমারঘাটটি আমার দিকে কেবল তাকিয়ে রয়।
🌿
দেবদাস মজুমদার
বড়মাছুয়া
মঠবাড়িয়া,পিরোজপুর।
বুধবার । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৭ মে ২০২০। ৩ শাওয়াল ১৪৪১









Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.