কে এম সবুজ, ঝালকাঠি >>

ঝালকাঠির ঐতিহ্যের বাহক কচকচে সুস্বাদু ফল পেয়ারা। এই পেয়ারাকে ঘিরে স্থানীয় ভীমরুলী গ্রামের চারটি খালের মোহনায় গড়ে উঠেছে ভাসমান বাজার। প্রতিদিন পেয়ারা বাগান ও ভাসমান বাজার দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটক আসছেন দল বেধে। তবে এবছর পেয়ারার ফলন কম হওয়ায় শতশত চাষী ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। আর যেসব চাষীর বাগানের ফলন ভাল হয়েছে তাদের উৎপাদিত ফসল নামমাত্র মূল্যে কিনে নিচ্ছে পাইকার নামক মধ্যসত্ব ভোগীরা। বিনাশ্রমে তাঁরা অর্জন করছে বিপুল মুনফা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানাযায়, স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় পেয়ারা পুষ্টিমান সমৃদ্ধ বলেই একে বাংলার আপেল বলা হয়। ঝালকাঠির চাষীরা প্রায় শত বছর ধরে ৫০০ হেক্টর জমিতে চাষ করে আসছেন পেয়ারার। সদর উপজেলার কৃত্তিপাশা, ভীমরুলী, শতদাসকাঠি, খাজুরা, মিরাকাঠি, ডুমুরিয়া, জগদিশপুর, খোদ্রপাড়া, পোষন্ডা, হিমানন্দকাঠি, বেতরা, কাপড়কাঠি, ও পিরোজপুরের স্বরূপকাঠির আটঘর কুড়িয়ানার বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে দেশের বৃহত্তম পেয়ারা বাগান। এ বাগানে প্রতি বছরই কোটি কোটি টাকার পেয়ারা উৎপাদিত হয়। ভরা মৌসুম শুরু হওয়ায় কৃষকরা ব্যস্ত কচকচে কাঁচা ও পাকা পেয়ারার বাগান থেকে তুলে বাজারজাত করার কাজে। এখানকার পেয়ারা বাজারজাত করার প্রধান মাধ্যম হচ্ছে নৌপথ। তাই প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভীমরুলীর খালে বসে ভাসমান পেয়ারার বাজার। ছোট ছোট নৌকায় করে চাষীরা বাগান থেকে ভাসমান বাজারে নিয়ে আসেন পেয়ারা। পাইকাররা এই পেয়ারা কিনে ট্রলারে করে নিয়ে যান দেশের বিভিন্নস্থানে। বর্তমানে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় সড়ক পথেও বাজারজাত হচ্ছে পেয়ারা। তবে এবছর কিছু কিছু পেয়ারায় ছিটপড়া রোগ দেখা দিয়েছে। এতে পেয়ারা বাজারজাত করণের দুশ্চিন্তায় ভুগছেন অনেক চাষী। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মত বড় শহরে এ অঞ্চলের পেয়ারার কেজি ৫০/৬০ টাকা হলেও এখানে তা বিক্রি হচ্ছে ৫/৬ টাকায়। এ উপার্জনে সংসার ও ছেলে মেয়ের লেখা পড়ার খরচ চলে না বলেও অভিযোগ করেন চাষীরা।

এদিকে ফলন কমলেও ক্রেতাদের ভির লেগেই আছে পেয়ারার ভাসমান বাজারে। এখানকার পেয়ারা চাষীদের কাছ থেকে কিনে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্নস্থানে পৌঁছে দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এতে যেমন তারা লাভবান হচ্ছেন তেমনি বাংলার আপেলকে তুলে দিচ্ছেন ক্রেতাদের হাতে। শুধু পেয়ারা কিনতেই নয়, বিশাল বাগান আর পেয়ারার এই ভাসমান হাট দেখতে পর্যটকরাও ঘুরতে আসেন এখানে। আনন্দ হইহুল্লোরে সময় কাটিয়ে যান পর্যটকরা। তবে এখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও থাকার ব্যবস্থা না থাকায় ঘুরতে এসে অসন্তোষ অনেক পর্যটকের।

ভীমরুলী গ্রামের পেয়ারা চাষী শিব শংকর শিবু বলেন, আমরা বাগান থেকে সকালে পেয়ারা পেরে নৌকায় করে ভীমরুলী খালের ভাসমান হাটে নিয়ে আসি। বিকেলের মধ্যে পেয়ারাগুলো বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছি, কারণ দ্রুত পচনশীল এ ফল সংরক্ষণে রাখার জন্য এখানে কোন হিমাগার নেই। যদি একটি হিমাগার থাকতো তাহলেও বেশি দামের জন্য অপেক্ষা করা যেত।

বিমল বারই বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মত বড় শহরে এ অঞ্চলের পেয়ারার কেজি ৫০/৬০ টাকা হলেও এখানে তা বিক্রি হচ্ছে ৫/৬ টাকায়। প্রথম দিকে দুই থেকে তিন টাকাও বিক্রি হয়েছে। এক মন পেয়ারার টাকায় পাঁচ কেজি চাল মিলছে না।
ডুমুরিয়া গ্রামের পেয়ারা চাষী অবনি মোহন বিশ্বাস বলেন, প্রাণ কোম্পানি জেলি তৈরির জন্য এ বছর চাষীদের কাছ থেকে কিছু পেয়ারা কিনেছে। প্রতিবছর তাদের মত বড় বড় কোম্পানি যদি জেলি তৈরির জন্য এখান থেকে পেয়ারা কিনতো তাহলে আমরা বেশি লাভবান হতাম। আর সবচেয়ে ভাল হতো ভীমরুলী গ্রামে জেলি কারখানা স্থাপন করলে আমরা সেখানেই পেয়ারা বিক্রি করে দিতে পারতাম।

ভীমরুলী গ্রামের পেয়ারার আড়তদার (মহাজন) লিটন হালদার বলেন, সারা বছর কঠোর পরিশ্রম করেও পেয়ারা চাষীরা ঋণের বোঝা মুক্ত হতে পারছেন না। দারিদ্রতা আঁকড়ে ধরেছে তাদের জীবনযাত্রাকে। আমরা যটতা পারি তাদের সহায়তা করে থাকি। নিজেদের লাভের কথা চিন্তা না করে, চাষীদের সংসারের চিন্তা আমাদের আছে।

ঝালকাঠি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শেখ আবুবকর ছিদ্দিক বলেন, এ বছর তুলনামুলক পেয়ারার ফলন কম হয়েছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে পেয়ারা চাষীদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর পেয়ারা চাষীদের কথা চিন্তা করে ভীমরুলী গ্রামে একটি কৃষিপণ্য বিক্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। আরো দুটি বিক্রয় কেন্দ্র করা প্রয়োজন।

ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা মাহাবুব আলম বলেন, দেশে কিংবা বিদেশে অনেক যায়গাতেই ভাসমান বাজার রয়েছে। তবে প্রাকৃতিক নৈসর্গ গ্রামীন জনপদের ঝালকাঠির ভীমরুলী খালের ভাসমান বাজার আমাদের আকৃষ্ট করেছে। পেয়ারা বাগান ও ভাসমান হাটকে ঘিরে অসাধারণ একটি পর্যটন স্পট গড়ে উঠেছে এই গ্রামে। এখানে পর্যটকদের থাকার কোন ব্যবস্থা নেই। এখানের অপার সৌন্দর্য আমাদের বিমোহিত করে।

খুলনা থেকে আসা পর্যটক ইন্দ্রানী মন্ডল বলেন, বিদেশে আমরা ঘুরতে গিয়ে ভাসমান হাট দেখেছি। কিন্তু আমার দেশেও এভাবে সৌন্দর্যময় একটি পর্যটনস্পট রয়েছে, তা আগে জানতামনা। খবরের কাগজে, টিভিতে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভীমরুলী পেয়ারা বাগান ও হাটের ছবি দেখে পরিবারের সবাই এখানে ঘুরতে এসেছি।

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন