Home-এক্সক্লুসিভ-প্রকৃতি-প্রাণ 🔴🌿 ডুমুর প্রাণবান্ধব ভেষজ ফল

প্রকৃতি-প্রাণ 🔴🌿 ডুমুর প্রাণবান্ধব ভেষজ ফল

দেবদাস মজুমদার 🟠
ছেলে বেলায় ডুমুর চিনতাম বুখই নামে। আমার গ্রামদেশে ডুমুরকে আজও কেউ কেউ বুখই বলে। আমার গৃহস্থ বাড়ির বাগানের নালার পাশে আর পুকুর ধারে অনেক ডুমুর গাছ ছিলো। অচাষকৃত ডুমুর গাছ এমনি এমনি জন্মায়। আমার ছেলে ছেলে বেলায় কাঁচা ডুমুর তরকারিতে খেতাম। আর পাকা ডুমুর ফল বালক বেলায় খেয়েছি। পাকা ডুমুর রসালো আর হালকা মিস্টি স্বাদ। এখন ডুমুরের তেমন দেখা মেলেনা। এর পরিকল্পিত আবাদ নেই । ভেষজ উদ্ভিদে পরিপুর্ন ছিল আমাদের প্রাণ-প্রকৃতি। ডুমুর এক বিস্ময়কর ভেষজ উদ্ভিদ। নানা রকমের ঔষুধিগুণ বিদ্যমান ডুমুরে। এখন ডুমুর পাকার মৌসুম ।
পরিবেশ ও প্রাণ বান্ধব ডুমুর হারিয়ে যাওয়া ঔষুধি ফলের মধ্যে অন্যতম। ডুমুর ফল নরম ও মিষ্টি রসালো ফল । ফলের আবরণ ভাগ খুবই পাতলা এবং এর অভ্যন্তরে অনেক ছোট ছোট বীজ রয়েছে। এর ফল শুকনো ও পাকা অবস্থায় খাওয়ার উপযোগি। উষ্ণ জলবায়ু অঞ্চলে এ প্রজাতির গাছ জন্মে। কখনো কখনো ডুমুর জ্যাম হিসেবে এর ব্যবহার হয়ে থাকে।এছাড়াও, স্ন্যাক জাতীয় খাবারেও ডুমুরের প্রয়োগ হয়ে থাকে। শহর নগরে নয় একদা গ্রামগঞ্জে যেখানে-সেখানে ডুমুর গাছ দেখতে পাওয়া যেত। ডুমুরগাছ কেউ লাগায় না, প্রকৃতিগতভাবে জন্মে। এর ফল কান্ডের গায়ে থোকায় থোকায় জন্মে। পাকা ডুমুরের থোকা দেখতে বেশ দৃষ্টিনন্দন।
ডুমুর খুবই উপকারী ফল। দুই ধরনের ডুমুর দেখা যায় – গোল ডুমুর ও যজ্ঞ ডুমুর। ডুমুরের পাতা খসখসে হয়। গোল ডুমুরের পাতা লম্বা এবং যজ্ঞ ডুমুরের পাতা গোল। ডুমুর হাটবাজারে কিনতে পাওয়া যায় না। গোল ডুমুর ডালনা ছেঁচকি খাওয়া যায় । কাঁচা ডুমুরের তরকারি উপদেয়। তবে পাখিরাই প্রধানত এই ডুমুর খেয়ে থাকে । পাখির বিষ্ঠার মাধ্যমে বীজের বিস্তার হয়ে থাকে।
ডুমুর কয়েক প্রজাতির রয়েছে। বর্তমানে আমাদের দেশে সচরাচর যে ডুমুর পাওয়া যায় (Ficus hispida) তার ফল ছোট এবং খাওয়ার অনুপযুক্ত। এর আরেক নাম ‘কাকডুমুর ‘। এই গাছ অযত্নে-অবহেলায় কোনো মতে টিকে আছে।
বিভিন্ন দেশে একে তীন,আঞ্জির ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। মধ্যপ্রাচ্যে যে ডুমুর ( আঞ্জির) পাওয়া যায় (Ficus carica) তার ফল বড় আকারের; এটি জনপ্রিয় ফল হিসেবে খাওয়া হয়। বানিজ্যিকভাবে এর চাষ হয়ে থাকে আফগানিস্তান থেকে পর্তুগাল পর্যন্ত। এর আরবি নাম ‘তীন’; হিন্দি, উর্দু, ফার্সি ও মারাঠি ভাষায় একে ‘আঞ্জির’ বলা হয়। এই গাছ ৬ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এর আদি নিবাস মধ্যপ্রাচ্য ।
জগ ডুমুর বা যজ্ঞ ডুমুর নামে আরেক প্রজাতির ডুমুর রয়েছে, যার বৈজ্ঞনিক নাম Ficus racemosa । এছাড়া অশ্বত্থ বা পিপল নামে আরেকটি ডুমুর জাতীয় গাছ আছে, যার বৈজ্ঞানিক নাম Ficus religiosa । এটি বট গোত্রীয় বৃক্ষ, এর পাতার অগ্রভাগ সূচাল। উপরিউক্ত প্রজাতি ছাড়াও ডুমুরের আরো অনেক প্রজাতি রয়েছে।
ডুমুর অত্যন্ত উপকারী ফল হলেও অবহেলিত এ উপকারী ফল। ডুমুর পিত্ত ও আমাশয় রোগে উপকারী । এতে লোহা বেশি আছে বলে বেশি খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে । ডুমুর রক্তপিত্তা, রক্তপ্রদর, রক্তপড়া অর্থাৎ রক্তহীনতা রোগে উপকারী । জ্বরের পর ডুমুর রান্না করে খেলে টনিকের কাজ করে । মেয়েদের মাসিকের সময় বেশি রক্তস্রাব হলে কচি ডুমুরের রসের সঙ্গে সামান্য মধু মিশিয়ে খেলে উপকার হয় । দুধ ও চিনির সঙ্গে ডুমুরের রস খেলেও অধিক ঋতুস্রাব বন্ধ হয় । ডুমুরের রসের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খেলে রক্তপিত্ত উপশম হয় । আমাশয় হলে কচি ডুমুরের পাতা আতপ চালের সঙ্গে চিবিয়ে খেলে ভালো হয় । তিন দিন খেতে হয় । সাদা ও রক্ত আমাশয় হলে, ডুমুরগাছের ছাল রস দুই বেলা দুই চামচ রসের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খেলে ভালো হয় । মাথাঘোরা রোগে ডুমুর ভাজি করে খেলে ভালো হয় । সবসময় ডুমুরের বাইরের অংশ রান্না করে খাওয়া যায় । হেঁচকি উঠা রোগে ডুমুরের বাইরের অংশ কেটে পানিতে ভিজিয়ে এক ঘন্টা রেখে তারপর ছেঁকে ওই পানি এক চামচ করে আধা ঘন্টা অন্তর খেলে হেঁচকি ওঠা বন্ধ হয় । ডায়াবেটিস রোগে ডুমুর গাছের মূলের রস খুবই উপকারী ।
ডুমুর আসলে পরিবেশ ও প্রাণ বান্ধব এক বিস্ময় ফল। ভেষজ চিকিৎসায় ডুমুর দরকারি । তবে আমাদের প্রাণ প্রকৃতি থেকে ডুমুর এখন বিলুপ্তির দিকে।

Leave a Reply

x

Check Also

মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেলেন আরো ১৬ বীরাঙ্গনা

আজকের মঠবাড়িয়া অনলাইন 🔻 মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিতা আরো ১৬ বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়েছে সরকার। এ নিয়ে ...