Home-এক্সক্লুসিভ-আমার কিছু অপরিশোধ্য ঋণ

আমার কিছু অপরিশোধ্য ঋণ

এক
– এই মেয়ে? লিখছো না কেন? কি দেখছো বাইরে তাকিয়ে?’
মেয়েটিকে এই ধমক বিন্দুমাত্র বিচলিত করলো বলে মনে হলো না। দৃষ্টির মুগ্ধতা তার কন্ঠেও ছড়িয়ে গেল।
– বক দেখছি স্যার।দেখুন কি সুন্দর সাদা সাদা বক।
পরিদর্শক অবাক।
– তুমি জানো তুমি কি পরীক্ষা দিচ্ছো?’
– জি জানি। কেন জানবো না স্যার? আমি ক্লাস ফাইভ এর বৃত্তি পরীক্ষা দিচ্ছি।
– গুড। তাহলে? পরীক্ষার হলে না লিখে তুমি বক দেখছো?
– আমার তো লেখা শেষ।
– দেখি তো কি লিখেছো।
মেয়েটি অনিচ্ছা সত্ত্বেও খাতাটা এগিয়ে দিলো। পরিদর্শক খাতাটি দেখতে গিয়ে পিছনের পৃষ্ঠায় একটি লেখা আবিষ্কার করে হা হয়ে গেলেন।
– তুমি অংক খাতায় ছড়া লিখেছো কেন?
– স্যার ,বক দেখে মনে এলো। তাই লিখে রাখলাম।
– মানে কি! এটা তুমি লিখেছো !! তোমার ছড়া !!!
– জি স্যার। পরে তো ভুলে যাবো। তাই লিখে রাখলাম।
– কিন্তু এ খাতা তো তোমাকে জমা দিয়ে দিতে হবে। তখন?
-ওহ ! তাইতো! তা তো ভাবিনি স্যার।
পরিদর্শক স্যার খাতা সহ মেয়েটিকে নিয়ে এলেন হেড মাস্টারের কক্ষে। হেড মাস্টার মেয়েটিকে আগে থেকেই চিনতেন। পরিদর্শক সহ মেয়েটি কক্ষে ঢুকতেই তিনি খুব অবাক হলেন। কারন মেয়েটিকে তিনি অপরিমেয় স্নেহ আর ভালোবাসা দিয়েছেন এতদিন। এলাকার সবাই মেয়েটিকে চেনে এক ভদ্র,মেধাবী আর ভাবুক মেয়ে হিসেবে। শুধু তাই নয় এলাকার প্রতিটি মানুষের কাছে মেয়েটি অনেক আদরের। সবাই মোটামুটি মেয়েটিকে চেনে। না চেনার কোন কারনও নেই। যে মেয়েটি স্কুল থেকে ফিরে বাবার সাথে ব্যাডমিন্টন খেলতে নেমে যেত আর সবাই অবাক তাকিয়ে সেই পুচকে মেয়ের কাছে তুখোড় সব ব্যাডমিন্টন প্লেয়ারদের হেরে যাবার দৃশ্য দেখতো তাকে না চেনার কোন কারনই নেই। তাছাড়া মেয়েটি ছোট্ট এই মফস্বল শহরকে এনে দিয়েছে কিছু সাফল্য ও সম্মান তার কৃতিত্ব দিয়ে। সেই মেয়েটি কী এমন অপরাধ করতে পারে যার কারনে পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে খাতা সমেত তাকে এখানে আনা হলো?
দুই
সময়টা একাশি বা বিরাশি সনের দিকে বাবা অফিস থেকে বাসায় ঢুকে গম্ভীর মুখে বসে আছেন। গম্ভীর মুখের এই বাবার সাথে আমাদের দুইভাই বোনের পরিচয় কম। বাবা ঘরে ফেরা মানেই আমাদের নিত্যকার ঈদ। কত হইচই গল্পগাথা। অথচ আজ বাবা চুপ। মা চায়ের কাপ নিয়ে বাবার সামনে।
– নীলু আমার ট্রান্সফার অর্ডার পেয়েছি। আগামী সপ্তাহেই জয়েনিং।
মা বিরস মুখে ও আচ্ছা বলে তার কাজে মন দিলেন। মা এর জন্যে এ নতুন কিছু নয়। বাবা চাকরি সুবাদে যেখানেই গিয়েছেন কখনই মা আর আমাদের ছেড়ে যাননি। সাথে করে নিয়ে গিয়েছেন। মা জানেন এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।
– ভাবছি এবার আর তোমাদের সাথে নেবো না।
এমন কথায় মায়ের হাতের কাজ থেমে গেল। বলে কি লোকটা? যে তার স্ত্রী সন্তান ছাড়া একদিন থাকতে রাজি নয় সে কিনা চাকরি স্থলে একা যেতে চাইছে। একি সে সত্যি বলছে না মায়ের সাথে মজা করছে? মা মজা করে বললেন,’ কি গো হঠাৎ আমাদের ছেড়ে একা যেতে চাইছো? পুরানা কেউ আছে নাকি ওখানে?’ আসলে মজা করে বাবার মনটা ভালো করাই ছিলো মায়ের উদ্দেশ্য। কিন্তু খুব একটা সফল হলো বলে মনে হলো না।
– একে তো উপজেলা শহর তার উপর যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই খারাপ বলে শুনেছি। তাই আগে নিজেই যাই। গিয়ে দেখি। আমার রাজকন্যা কেবলই ভর্তি হলো স্কুলে। ওখানে ভালো কোন স্কুল আছে কিনা কে জানে।
মা আর কথা বাড়াননি। বাবাকে তুলে দিতে মা আমাকে আর ছোট ভাইকে নিয়ে বরিশাল এলেন। বাবার জিপ গিয়ে থামলো বরিশাল লঞ্চঘাটে। আমি অবাক হয়ে দেখলাম সেখানে কোন গাড়ি নয়। বাবার জন্য খুব ছোট্ট ছিমছাম একটা লঞ্চ আর একটা স্পিড বোট দাঁড়িয়ে। বরিশাল থেকে মঠবাড়িয়া যাবার জন্যে তখন নদীপথই একমাত্র ভরসা। সড়ক পথে যাওয়া যে যেতো না ঠিক তেমনটি নয়। তবে তাতে পথ শেষ হলেও ভোগান্তি শেষ হতো না। যাই হোক আমি লঞ্চটি দেখে এতই মুগ্ধ যে সব কিছু ভুলে লঞ্চের এমাথা ওমাথা দৌড়াদৌড়ি করছি। হঠাৎ আমি মুগ্ধ আবিষ্কারক। লঞ্চের ছাঁদের এক কোনে একটা সাদা তুলতুলে বেড়াল আর খাচায় পোষা একটা টিয়া পাখি। আর যায় কোথায়? মিনিটেই দারুন দুটো বন্ধু জুটে গেল আমার। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই লঞ্চের সারেং চাচা বাবাকে তাগাদা দিলেন রওনা দেবার জন্য। বাবা থমথমে মুখে আমাকে কোলে করে লঞ্চ থেকে নেমে মায়ের কাছে দিলেন,
‘রাজকন্যা আমি দুএক দিনের মধ্যেই ফিরবো। মা আর ভাই কে দেখে রেখো। ভুল্লে চলবে না তুমি রাজকন্যা। রাজকন্যাদের চোখের পানি মাটিতে ফেলতে নেই।‘
আমি ঠোট কামড়ে,নাক ফুলিয়ে প্রাণপণ কান্না আটকাবার চেষ্টা করছি। শত হলেও রাজকন্যা। বাবা বলেছে রাজকন্যাকে কাঁদতে নেই। আবেগ দমাতে মায়ের হাত খামচি দিয়ে ধরে আছি। বাবা চোখের পানি লুকিয়ে লঞ্চে উঠলেন। লঞ্চ ছেড়ে দিলো। বাবা হাত নাড়ছে। আমার বুকটা দুমড়ে মুচড়ে ভেঙ্গে যাচ্ছে। ভেতরটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। হঠাৎ মনে হলো, না বাবাকে এভাবে কিছুতেই যেতে দেয়া যায় না। যে করেই হোক বাবাকে ফেরাতে হবে। রাজকন্যা তার সব নিয়ম কানুন ভুলে চিৎকার করে কান্না জুড়ে দিলো।
‘ও বাবা,রাতে যদি মিউ মিউ বা টিয়া পাখিটা তোমার পা কামড়ে দেয় কে তোমাকে ওষুধ লাগিয়ে দেবে। এক্ষুনি লঞ্চ থামাও। আমাকে নিয়ে যাও। নইলে তুমিই বিপদে পড়বে।‘
অতদূর থেকে বাবা কিছু শুনতে পেয়েছিলেন কি পাননি জানি না কিন্তু আমার কান্না আর বাবার নিজের কষ্টেই লঞ্চ ফেরাতে বাধ্য হলেন। লঞ্চ ঘাটে ভিড়তে দেখে মনে হলো লঞ্চ না আমিই কূল পেলাম। বাবার সাথে লঞ্চে উঠে বসলাম মা আমি আর আমার ছোট ভাইটি। আহা! কি আনন্দ! আমি কাঁদবো, হাসবো, গাইবো কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। বাবা আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ছিলো অনেকক্ষন।

তিন
মঠবাড়িয়াতে আমাদের এক নতুন জীবন শুরু হলো। চারদিক কেমন সবুজ আর সবুজ। মায়া মায়া একটা ভাব। সকালে ঘুম থেকে উঠে এক দৌড়ে বাড়ির ছাদে। কি আশ্চর্য সুন্দর। দোতলা বাড়িটার পিছনে এক পাশে মস্ত পুকুর।পাড় ঘেসেই একটা কৃষ্ণচূড়া আর একটা সোনালু ফুলের গাছ ঝুকে আছে পুকুরের অর্ধেকটা জুড়ে। গাছের ছায়া মেখে পুকুরের জল ডুবে আছে লাল হলুদের পাপড়িতে। দেখে মনে হয় লাল হলুদ ছাপা শাড়ি পেঁচিয়ে আছে কোন গায়ের কিশোরী মেয়ে। একট চিকন মেঠো পথ মাঝখানে রেখে পুকুরের পুরো ডান দিকটা জুড়ে সবুজ আর সবুজ ধানক্ষেত।আর বাদিকে আমাদের বাড়িটার পাশেই এক বিশাল ফলের বাগান। আমের বাগান থেকে ফলবতী আমগাছগুলোর কয়েকটা আমাদের ছাদে ঝুকে আছে। কি আনন্দযজ্ঞ চারিদিকে! কি অদ্ভুত সুন্দর! কি প্রানময়! আমি সারাদিন আর ছাদ থেকে নামলাম না। মায়ের কাছে শুনেছি বিকেলে ছাদেই ঘুমিয়ে পড়ায় বাবা কোলে করে ছাদ থেকে নিয়ে এসেছিলেন। আমি নামবো কি? আমার তো বিস্ময়ই কাটেনা। সন্ধ্যার মুখে ঘুম ভেঙ্গে আবার এক দৌড়ে ছাদে। চিলেকোঠার দরজায় দাঁড়িয়ে অন্ধকার দেখে একটু ভয় ভয় লাগছিলো। হঠাৎ কোথায় উবে গেল সেই ভয়। আমি প্রগাঢ় আবেশে আলোর নাচন দেখছি। আমায় ঘিরে আলোগুলো নেচে বেড়াচ্ছে। আমার মনে হতে লাগলো জোনাকিরা নেচে নেচে আমাকেই স্বাগত জানাচ্ছে। একটু দূরে ঝিঝিপোকারাও ছন্দসুরে জানান দিলো তাদের অস্তিত্ব। জলভরা ধানক্ষেত থেকে ব্যাঙের ডাক তাতে বাড়তি মাত্রা যোগান দিলো। লঞ্চ থেকে নেমে আসবার সময় মিউ মিউ আর টিয়া পাখি কে তো সাথেই নিয়ে এসেছিলাম। এরাই আমার সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয়ে উঠলো। বাড়ির সামনে বিশাল বাঁশবাগানের মাথায় এক চিলতে চাঁদ দেখে জীবনে প্রথম কবিতার চিত্ররূপ দেখতে পেলাম।
‘বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে অই।’
তৃতীয় দিন মায়ের ব্যাগ গুছানো দেখেই চটজলদি ঘোষনা দিলাম, “এমন সব বন্ধু ছেড়ে আমি কোথাও যাবো না।”
“এখানে ভালো স্কুল নেই,ভালো চুড়ির দোকান নেই”–মা আমার দূর্বলতম বিষয়ে আঘাত করে আমাকে নিরুৎসাহিত করার সব রকম চেষ্টা চালালেন। রাতে ঘুমাতে গিয়ে আমিও আমার শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করলাম।
“জানো বাবা, মা না তোমায় একটুও ভালোবাসে না।” –ফিসফিসিয়ে বাবার কানে বলতেই বাবাও ফিসফিস করে উত্তর দিলেন।
“তাই বুঝি? কি করে বুঝলি রে রাজকন্যা?”
“নইলে এমন করে তোমায় একা রেখে যেতে চায়? তুমিই বলো? আমার আর কি। এখানে ভালো স্কুল নেই,চুড়ির দোকান নেই। তবু তোমার কথা ভেবেই আমি থেকে যেতে চাইছি। আর মা তোমার কথা একটু ও ভাবছে না।”
বাবা মুখটা কপট গম্ভীর করে বললেন, ‘ঠিকই তো। ব্যাপারটা একদমই খেয়াল করিনি। তুইই ঠিক রে মা। মা ছাড়া ছেলেকে আর কেই বা ভালোবাসে?”
“তাহলে আমি থেকে যাই। কি বলো?’
আমি ভাবেছিলাম মা বুঝি ঘুমিয়ে আছে। দুজনে একসাথে হেসে উঠলে আমি মা আর বাবার মুখ চেয়ে হা হয়ে রইলাম। কেন হেসেছিলেন এখন বুঝলেও তখন অর্থটা বুঝিনি।
যাই হোক মঠবাড়িয়াতে আমাদের থাকা পাকাপোক্ত হয়ে গেল। বাবা-মা আমাকে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দিলেন। আমি মহা খুশী। সাত দিনের মধ্যে স্কুলের শিক্ষক,ছাত্র-ছাত্রী, কর্মচারী থেকে দারোয়ান পর্যন্ত সবাই আমার খুব আপনজন হয়ে উঠলো। স্কুল ছুটি তো বই পত্র বাবার আর্দালি রহিম চাচার হাতে দিয়ে দিব্যি এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে বেড়িয়েছি। পুরো মঠবাড়িয়া আমার শিশুমনে এক অপার বিষ্ময় হয়ে দেখা দিলো। ইট,কাঠ,পাথরে বড় হওয়া আমি হঠাৎই এত সবুজ আর মায়া ছুঁতে পেরে কেমন এক অপার্থিব আনন্দে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলাম। এতদিন জেনেছি তিন বা চার কামড়ার সংযুক্তি আর তাতে যে জনা চারেক মানুষ সেই তোমার বাড়ি,তোমার আপনজন। অথচ এখানে এসে আবিষ্কার হলো পাড়ার সব বাড়ি মিলে একটি বাড়ি, আর সব মানুষ আমার আপনজন। নইলে মায়ের কাছে আবদার করা চালতার আচার সন্ধ্যে বেলায় কেন হাজির হয় শৈলেন কাকুর ঘর থেকে? মায়ের রান্না করা শর্ষেইলিশ কেন খুকু খালার হেসেলে? সারা বিকেল দল বেধে হইহল্লা শেষে বিকেলের জলখাবার খেতে কখনও বিচ্ছিন্ন হতে হয়নি আমাদের।

প্রকৌশলী বাবা আর সাহিত্যানুরাগী মা-দুই বিপরীতমুখী স্রোতের এক মোহনায় মিলে যাবার দারুন দৃশ্য দেখে দেখে বড় হয়েছি আমি ও আমার ভাই। মা টুকটাক লিখতেন। তাতে বাবার উৎসাহ ছিলো অপরিমেয়। আর বাবার সব খটোমটো প্রকৌশল বিদ্যার বই রিডিং রুমে কোথায় রাখা তা বাবার চেয়ে মা ই ভালো জানতেন।মা কে একদিন জিজ্ঞেস করেই বসলাম,
– মা, বাবার বইতে কি কোন গল্প বা কবিতা আছে?
– কেন বলতো?
– নইলে এই সব আঁকাআঁকি করা বই এত যত্ন করে গুছিয়ে রাখো কেন?
– এ বইগুলোতে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ গল্প ও কবিতা লুকিয়ে আছে –বলেই একটা মুচকি হাসি দিতেন।
এই কথা আর হাসির মানে বুঝতেই জীবনের এতগুলো বছর কেটে গেল। আর তার অনুভবের সুরভী আজও পুরো হৃদয় জুড়ে ছড়ানো গেল না। এক জীবনে সম্ভব কি না তাও জানি না।

এ অবধি পড়ে অনেকেই ভাবতে পারেন লেখক হয়ে ওঠার গল্পে এসব কেন। আসলে আমি শুধু একটি শিশুর পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বোঝাতে চাইছি যা তার মনোজগৎ বিস্তৃত বা সংকীর্ণ করতে বিরাট ভুমিকা রাখে। বেড়ে ওঠা সময়ের আচড় হয় তার মনোজগতকে রক্তাক্ত করবে নয় দারুণ এক ছবির অবতারনা করবে। আমার চারপাশে এমন এক সতেজতা ছিলো যা আমাকে শিশিরসিক্ত করতো। জগত সংসারের এই অনুষঙ্গই আমায় চলতে শিখিয়েছে সব সত্য,সুন্দর,সততা,স্বপ্ন ও সংকল্পের সাথে ; দেখিয়েছে সম্ভাবনা, বুঝিয়েছে সম্প্রীতি। আজ আমরা নিজ গৃহে পরবাসী। আকাশ ছুঁতে পারি তবু এক বাড়ির এক ঘর থেকে আর এক ঘরের মানুষদের ছুঁতে পারি না। অথচ তখন পুরো পাড়াটাকেই আমার একটা বাড়ি মনে হতো। ভরদুপুরে গল্প শোনাবার ছলে যে কোন এক বাড়ির দাদু নানুরা ডেকে নিত। সবাইকে গল্প শোনাবার ছলে এক খাটে শুইয়ে দিত। গল্প শেষের আগেই ঘুম। এখন মাঝে মাঝে ভাবি, আমরা কতটা ছোট ছিলাম যে এক খাটে সাত আট জন ঘুমিয়ে পড়তে পারতাম অবলীলায়। আর এখন কত বড় হয়েছি যে এক খাটে একা ঘুমিয়েও হয় না। নাকি আমাদের উন্নাসিকতা, দাম্ভিকতা, হীনমন্যতারা এতই বড় হয়েছে যে মানবিকতা আর সহমর্মিতারা খাটের মতোই ছোট হয়ে যাচ্ছে?
আমি চতুর্থ শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হলাম। রিপোর্ট কার্ড হাতে পেয়ে আমি হাপুস নয়নে কাঁদতে বসলাম। আমার কান্না দেখে হেড স্যার অবাক।
-কি হয়েছে? কাদঁছো কেন?
আমি রিপোর্ট কার্ড স্যারের দিকে বাড়িয়ে দিলাম।
– বাহ! তুমি তো খুব ভাল করেছো।তবে কাদঁছো কেন?
– সে জন্যেই কাদঁছি স্যার।
– বল কি? এত ভাল ফলাফলে হলে কেউ কাদেঁ?
– এতদিন তো আসাদ, জাকিয়া আমার চেয়ে ভালো করতো। আসাদ, জাকিয়াকে পিছে ফেলে আমি ভালো করতে চাইনি। আমার রিপোর্ট কার্ডে আপনি ওর আর জাকিয়ার নাম আগে লিখে দিন। আর আমাকে তার পরে দিন। আমি আমার বন্ধুদের মন খারাপ করাতে চাই না।
হেডস্যার আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।মাথায় আশির্বাদের হাত রেখে বললেন,”আশির্বাদ করি জীবনে এমনি করেই ভাবতে শিখিস”
বাবার সাথে দেখা হতেই স্যার সব কথা বাবাকে বলাতে তিনি হেসে স্যার কে বললেন, “স্যার ওকে আর কিছু হতে হবে না। ও যেন শুধু ভালো মানুষ হয় সেই আশির্বাদ টুকু করবেন।”
গুরুজনদের সাথে সাথে আমার কানে ঝি ঝি পোকারা দল বেঁধে বলতে সুরু করলো, “ভালো মানুষ হও,ভালো মানুষ হও।ব্যাঙও সুর মেলাতো ঝি ঝি পোকার সাথে। এই রকম আনন্দময় প্রাপ্তিতে দিনগুলো বেশ যাচ্ছিলো। পঞ্চম শ্রেণিতে উঠতেই বৃত্তি পরীক্ষা নামক এক আতংক উপস্থিত হলো। স্কুল থেকে নির্বাচিতরাই এই পরীক্ষায় বসতে পারতো। আমি যত না আতংকিত তার চেয়ে মাকে বেশি আতংকিত মনে হলো। মায়ের ভয় কাটাতে হেড স্যার একদিন আর একজন স্যারকে নিয়ে বাসায় এলেন।
– ভাবী ও’কে নিয়ে আমাদের অনেক আশা। আমরা সব ছাত্র ছাত্রী নিয়েই আশাবাদী কিন্তু ও’কে নিয়ে আশাটা সত্যি করতে চাই। কারন আমি জানি ওকে দিয়ে তা সম্ভব।
– স্যার বলেন কি? আমি তো ওকে ক্লাস ফোরেই আর এক বছর রাখতে চেয়েছিলাম। বয়স কম। পরে না কুলাতে পারলে?
– কি যে বলেন। ওকে এই কয়েকদিনের জন্য আমাদের তত্ত্বাবধানে দিয়ে দিন। দেখুন ও কি করতে পারে।
– আপনারা যা ভালো মনে করেন।
– কাল থেকে স্কুল ছুটির আধা ঘন্টা পরে একজন স্যার বাসায় আসবেন। এভাবে সপ্তাহে দুএকদিন এসে ওকে দেখিয়ে দিয়ে যাবেন।
মা স্যারের ওপর আস্থা রেখে রাজি হয়ে গেলেন। যাবার সময় স্যার আমায় আদর করে বললেন, “মা রে অনেক বড় মুখ করে তোকে চেয়ে নিলাম তোর মায়ের কাছ থেকে। সেই সম্মানটা রাখিস।”
রোজ রোজ স্কুল ছুটি হতেই আমি স্যারের জন্য অপেক্ষা করতাম। এতে ভেবে নেবার কারন নেই যে আমি খুব মনোযোগী আর অধ্যবসায়ী ছাত্রী ছিলাম। স্যারের সাথে আসার একটা মজার কারন ছিলো। বরাবরই আমার পাঠ্যসূচির চেয়ে প্রকৃতির সূচিপত্র বেশি টানতো। পিতৃসম এই মানুষটিকে কখনই বিরক্ত হতে দেখিনি আমার হাজারো প্রশ্নবাণে। গাছ,ফুল,পাখি, ঘুড়ি, নাটাই,নদী, সাগর,মাছ থেকে ইট,সুরকি, বালু,দালানকোঠা সব কিছু আমার প্রশ্নের আওতায়। কি অসীম ধৈর্য আর সহনশীলতা নিয়ে আমার ক্ষুদ্র মনের ব্যাকুল জিজ্ঞাসার তৃষ্ণা তিনি মিটিয়ে চলতেন। অই সময়ে আমার বিপুল বিস্ময় ছিলো বাবুই পাখির বাসা। স্কুল থেকে ফেরার পথে সারি সারি তালগাছে ঝুলানো বাবুই পাখির বাসা দেখতে রোজ দাড়াতেই মনে হতো একবার হাতের কাছে এনে দেখতে পারতাম এই বিষ্ময়কে। স্যার যেদিন তার ছেলেকে গাছে উঠিয়ে আমার জন্যে একটা পরিত্যাক্ত বাবুই পাখির বাসা নামিয়ে আনালেন সেদিন পাখির বাসা আমাকে যতটা না মুগ্ধ করেছিলো তার চেয়ে বেশি আপ্লুত করেছিলো স্যারের ভালোবাসা। স্যারের নামটা না হয় পরেই বলি। আমি জানি না এই লেখা কোনদিন আপনি পড়বেন কি না,তবু এই লেখাই আপনার প্রতি ,মঠবাড়িয়ায় ঋণী হয়ে থাকা প্রতিজন মানুষের প্রতি,প্রকৃতির প্রতি আমার শ্রদ্ধার্ঘ আর ভালবাসার ক্ষুদ্র নিবেদন।

চার
এবার শুরু করেছিলাম যেই গল্প দিয়ে সেখানেই ফিরে যাবো। পরিদর্শক যখন খাতাটা হেড স্যারকে দেখালেন দুজন কিসব আলাপ করে বাবাকে ফোন দিলেন। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না আমি কি এমন অপরাধ করেছি যার জন্যে অভিভাবক ও ডাকতে হচ্ছে। আমার ভীত সন্ত্রস্ত চেহারা দেখে হেডস্যার আর পরিদর্শক স্যার দুজনেই খুব আশ্বস্ত করছিলেন। কিন্তু যতই সান্ত্বনা দিক আমার ভেতরের অস্বস্তি কি করে কাটাই? যাই হোক বাবা এলেন। এরই ফাঁকে পরিদর্শক স্যার আমার কাছে জানতে চাইলেন আমি এমন করে আরো লিখেছি কি না। আসলে অনেক কিছু দেখে বিভিন্ন সময় নানা ছন্দ ঘুরতো মাথায়। এ যে ছন্দ তখন তাও বুঝতাম না। তবে মিলিয়ে মিলিয়ে কথা বলার অভ্যেস ছিলো বলে বাবাই একদিন লিখে রাখার বুদ্ধিটা মাথায় ঢুকিয়েছিলেন। কিন্তু তাই বলে যে তা পরীক্ষার খাতায় লিখে রাখা যায় না তা আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে ঢুকবে কেন?
– স্যার এটা লেখায় কি খুব অপরাধ হয়েছে?
আমার চোখ তখন ছলছল। আমার এহেন অসহায় অবস্থা দেখে হেড স্যার আর পরিদর্শক স্যার দুজন সস্নেহে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
– না রে মা। কোন অপরাধ করিসনি। বরং লিখে রেখে খুব ভালো কাজ করেছিস। কিন্তু কি করে এত সুন্দর ছন্দে লিখলি? কে শেখালো তোকে? তোর বাবাকে ডেকেছি শুধু এইটুকু অনুরোধ জানাতে যেন সে তোর লেখালিখির দিকে বিশেষ নজর দেন। এ বিষয়টা তাকে আমার জানানো প্রয়োজন বলে মনে করছি। আর লেখাটাও তাকে দেয়া দরকার। তোর প্রথম লেখা।
আমি হতবাক হয়ে চেয়ে রইলাম স্যারের দিকে। পরিদর্শক স্যার আদর করে বললেন, “যেদিন অনেক বড় লেখক হবি সেদিন আমাদের কথা মনে পড়বে তোর। আমি নিশ্চিত জানি তুই অনেক বড় লেখক হবি।”
এই চার লাইন লেখা নিয়ে সবাই এত কথা কেন বলছে বুঝতে পারিনি সেদিন। আজ আমার পাঠকের উদ্দেশ্যে সেই চার লাইনে লেখা আমার জীবনের প্রথম লেখাটি নিবেদন করলাম।
“দূর বনে বক
ধবল পালক ,
উড়ে উড়ে যায়
হায় কোথায়।”
সেদিন রাতেই বাবা আমার জন্যে এক সঙ্গী নিয়ে এলেন। সে যে সত্যিই আমার এত ভালো বন্ধু হয়ে যাবে বুঝতে পারিনি। বন্ধু,আপনজন সবাই সময়ের প্রয়োজনে রূপ বদল করে। ও তেমনি রয়ে গেছে আমার জীবনে। আমার একলা রাতের কথা বন্ধু। সেই থেকে লিখেই চলেছি। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, চাকরী জীবন,ঘর,সংসার মোট কথা যাপিত জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে আমি চেষ্টা করেছি লিখে যেতে। কখনও হোচট খেয়েছি,বাধা পেয়েছি। তবু থেমে যাইনি। খুব অসহায় বোধ করলেই মনে পড়ে সেই নমস্যজনদের উৎসাহ, মনে পড়ে ফেলে আসা সেই রোদ,মেঘ আর সবুজের কথা,মনে পড়ে বাবা আর মায়ের আশায় ভরা চোখ। আমি সাহস সঞ্চয় করি। আবার উঠে দাঁড়াই। চলতে শুরু করি।
ছেলেবেলার উৎসাহ ছিলো পুরষ্কার প্রাপ্তি। গল্প,কবিতা,ছড়া, যে কোন কিছু লিখে পুরষ্কার পেলেই মনে হতো আমি পেরেছি। এখনও যে কোন স্বীকৃতিতে আনন্দ পাই বটে তবে অনুভবের জায়গা থেকে সতর্ক হই। আরো দায়বদ্ধ হই। ক্ষুরধার আর যোগ্য মস্তিষ্কের সমালোচনাকে মাথায় করে রাখি। তারাই আমার সত্যিকারের শিক্ষক। এই লেখাই এনে দিয়েছে অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা। এই লেখার মাধ্যমেই খুঁজে পেয়েছি কিছু অসাধারন বন্ধু। আমি কৃতজ্ঞ প্রত্যেকের কাছে।
লিখতে চেয়েছিলাম আমার লেখক হয়ে ওঠার গল্প। সত্যি বলতে কি লেখক হবার কিছু মাত্র যোগ্যতা আজো অর্জন করতে পারিনি। লিখতে গেলেই মনে হয়, আরো পড়া দরকার। আর পড়তে গেলে মনে হয় কিছুই তো জানি না। কত কি জানার বাকী রয়ে গেল। না জেনে লিখি কি করে? মনের মাধুরী মেশানো যে ছবি তাকে পরিচ্ছন্ন করে প্রকাশ না করলে পুরো চিত্রকল্পই যে তার সৌন্দর্য হারাবে। তবু মন মহাশয় মাঝে মাঝে অবাধ্য হয়। অতৃপ্তিতে ভর করেই তখন হাতে কলম তুলি। ভাবি, হলোই না হয় কিছু রেখাপাত। এই এলোমেলো শব্দসম্ভার জড়ো হতে হতে ফুটিয়েও ফেলতে পারে কোন ঘাসফুল সাহিত্যের বাগিচায়।
গোছানো বাক্যে জীবন ও পরিবেশ থেকে নেয়া কিছু সত্যাশ্রয়ী ঘটনা পুঞ্জি প্রেম,ভালোবাসা,পরিমিত আবেগ,ধৈর্য আর কিছু আলোকিত শব্দ প্রকাশের মধ্য দিয়েই একজন লেখকের মুন্সিয়ানা খুঁজে পাওয়া যায়। সামগ্রিক দৃশ্যায়নের সুচারু সম্পাদনায় একজন লেখক ঋণী থাকে অনেক কিছুর কাছে। আর সে ক্ষেত্রে আমার ও কিছু ঋণ আছে। আমি ঋণী সেই কৃষ্ণচূড়া আর সোনালু ফুলের কাছে যাদের রঙের প্রলেপ মাখাতে চেয়েছি আমার লেখায়, আমি ঋণী সেই ঝিঁঝিঁ পোকা আর ব্যাঙ এর কাছে যারা আমায় শিখিয়েছে কি করে ছন্দে আবদ্ধ হতে হয়,জোনাক আর বাবুই শিখিয়েছে মৌলিকত্ব। যেই মানুষগুলোর ভালোবাসা আমার লেখাকে ঋদ্ধ করেছে, যে সবুজ আমার লেখায় সতেজতা ধারন করেছে প্রত্যেকের কাছে আমার অনেক ঋণ। লিখতে গিয়ে অধৈর্য হলেই মনে পড়েছে সেই শিক্ষা গুরু শাহজাহান স্যারের কথা যে অসীম ধৈর্য নিয়ে আমার সব প্রশ্নের উত্তর দিতেন। শব্দে,বাক্যে নিগূঢ় প্রেম এঁকেছি আমার মা বাবার নিঃশব্দ প্রেম দেখে। সমাজ ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা শিখেছি সেই পরিদর্শক ও হেড স্যারের কাছ থেকে যাদের জন্যে আমার প্রথম লেখাটি আজো বেঁচে আছে। ভালোবাসা ও উদারতার নিপাট বুননে যে স্নেহময় শীতল পাটি বুনেছিলেন আমার শিক্ষক, গুরুজন,বাবা,মা আর বন্ধুরা মিলে সেই পাটিতে বসে আমি কেন যে কেউই লিখে ফেলতে পারবে কালজয়ী সব লেখনী। আমি বরং লজ্জিত,অনুতপ্ত সেই সব ভালোবাসার কাছে যাদের যোগ্য সম্মান আমি দিতে পারিনি। প্রকৃতির এই সফেদ সন্তানদের কাছে শিখেও আমি আজ অবধি তুলে আনতে পারিনি সেই সাবলীলতা আমার লেখায়। জানি জীবনের ধন তবু কিছুই যাবে না বৃথা। এরাই আমার চলার শক্তি,লেখার অনুপ্রেরণা, বলার গৌরব। বেলা কি দ্রুত ফুরিয়ে যায়। তবু আর একবার যদি যাওয়া যেত সেই প্রকৃতির সন্তানদের কাছে। সেই আদিগন্ত বিস্তৃত সবুজের কাছে গিয়ে যদি বলা যেত….
“যে আমারে দেখিবারে পায়
অসীম ক্ষমায়
ভালো মন্দ মিলায়ে সকলি,
এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি।
তোমারে যা দিয়েছিনু তার
পেয়েছো নিঃশেষ অধিকার।
হেথা মোর তিলে তিলে দান,
করুন মুহূর্তগুলি গন্ডুস ভরিয়া করে পান।
হৃদয় অঞ্জলি হতে মম।
ওগো তুমি নিরুপম,
হে ঐশ্বর্যবান,
তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান—
গ্রহণ করেছো যত ঋণী তত করেছো আমায়।…..’

নাহিদা আশরাফী

Leave a Reply

x

Check Also

মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেলেন আরো ১৬ বীরাঙ্গনা

আজকের মঠবাড়িয়া অনলাইন 🔻 মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিতা আরো ১৬ বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়েছে সরকার। এ নিয়ে ...