ব্রেকিং নিউজ
Home - উপকূল - মঠবাড়িয়ার গর্বিত সন্তান মেজর মেহেদী আলী ইমাম (বীর বিক্রম)

মঠবাড়িয়ার গর্বিত সন্তান মেজর মেহেদী আলী ইমাম (বীর বিক্রম)


মেজর মেহেদী আলী ইমাম ১৯৪৯ সালে পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার দাউদখালী গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম জন্মগ্রহণ করেন।তাঁর পিতার নাম অাবু মোহম্মদ মোদাদ্দের বিল্লাহ এবং মাতার নাম অানোয়ারা খাতুন।তাঁর স্ত্রীর নাম লায়লা বেগম।তাঁদের এক পূত্র এক কন্যা।তাঁর পিতা ঢাকার অারমানিটোলা সরকারি হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন।মেহেদী অালী ইমাম ১৯৬৪ সালে অারমানিটোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে এস.এস.সি. এবং ১৯৬৬ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে এইচ.এস.সি. পরীক্ষায় পাস করে ঐ বছরই পাকিস্তান সেনা বাহিনীতে যোগদান করেন।১৯৬৭ সালে তিনি কমিশন প্রাপ্ত হন।চাকরিরত অবস্থায় কোয়েটা স্টাফ কলেজ থেকে তিনি বি.এ. এবং এম.এ. পাস করেন।তিনি ১৯৭০ সালে ক্যাপ্টেন পদে উন্নীত হন।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসের প্রথম দিকে তিনি ছুটিতে গ্রামের বাড়ি দাউদখালী অাসেন।২৫ শে মার্চ মধ্য রাতের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করে এবং বরিশালে মেজর এম.এ.জলিল এবং নুরুল ইসলাম মজ্ঞুর এম,এন,এ, এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। বরিশালের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করার জন্যে মেজর এম.এ.জলিল তাঁকে জুনাহার ক্যম্পের দায়িত্ব প্রদান করেন।জুনাহার ছিল বরিশাল শহর থেকে প্রায় ৮ কিঃমিঃ উত্তরে কির্তনখোলা নদী সংলগ্ন। নদী পথে পাকিস্তান সেনা বাহিনীর অাগমন প্রতিহত করার জন্যে এখানে শক্তিশালী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।

১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল পূর্বাহ্নে পাকিস্তান বাহিনী জুনাহার অাক্রমন করে।পাকিস্তান বাহিনীর ভারী অস্ত্রের অাক্রমনে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাংকার ধ্বংস হয়ে যায় এবং অনেকে নিহত এবং অাহত হন।মুক্তিযোদ্ধারা ভারী অস্ত্রের সাথে টিকতে না পেরে পিছু হটে।জুনাহার পতনের পর পাকিস্তান বাহিনী ২৬ এপ্রিল সকালে বরিশাল শহরে পৌঁছে।

মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্যে মুজিব নগর সরকার সারাদেশকে ১১ টি সেক্টরে ভাগ করেন এবং প্রতি সেক্টরে একজন অধিনায়ক নিযুক্ত করেন।সিনিয়র সামরিক অফিসার যে যে অঞ্চলে যুদ্ধরত ছিলেন তাঁকে সে অঞ্চলের দায়িত্ব দেয়া হয়।বৃহত্তর খুলনা ও ফরিদপুর জেলার কিছু অংশ এবং পুরো বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলা নিয়ে ৯ নং সেক্টর গঠিত হয়।এটি ছিল বৃহত্তম সেক্টর। এ সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন বরিশালের উজিরপুরের সন্তান মেজর এম. এ.জলিল। রাজনৈতিক সমন্বয়কারী ছিলেন নুরুল ইসলাম মঞ্জুর এবং অাব্দুল গফুর। এ সেক্টরে নিয়মিত বাহিনীর সদস্য ছিলো ৫০০ জন এবং গেরিলা প্রায় ৮০০০ হাজার জন।এ সেক্টর ৮ টি সাব-সেক্টরে বিভক্ত ছিলো।সাব-সেক্টর গুলো এবং এর অধিনায়কগণের নাম নিম্নে বর্ণিত হলোঃ
১।হিঙ্গলগঞ্জ-ক্যাপ্টেন নূরুল হুদা।
২।শামসের নগর-ক্যাপ্টেন মাহফুজ অালম বেগ।
৩।দেবহাটা-কলারোয়া-মোঃশাহজাহান মাষ্টার।
৪।খুলনা-লেঃ এ.এস.এম.শামসুল অারেফিন।
৫।বাগেরহাট সুবেদার তাজুল ইসলাম।
৬।সুন্দরবন লেঃ জিয়াউদ্দিন।
৭।বরিশাল- ক্যাপ্টেন শাহজাহান ওমর।
৮।পটুয়াখালী -ক্যাপ্টেন মেহেদী অালী ইমাম।

১৯৭১ সালে ২৬ এপ্রিল বরিশাল শহর পাকিস্তান সেনা বাহিনী দখল করার পর ক্যাপ্টেন মেহেদী অালী ইমাম তাঁর নিজ গ্রাম দাউদখালী অাসেন এবং মুক্তিবাহিনী গঠন করার পরিকল্পনা করেন। ইতোমধ্যে পিরোজপুর কলেজের ছাত্র জহির শাহ অালমগীর নেছারাবাদের অাটঘর কুড়িঅানা থেকে ৬ টি রাইফেল সহ মঠবাড়িয়ার দাউদখালী ইউনিয়নের দেবত্র গ্রামের রাজারহাট বাজার সংলগ্ন তাঁর ভগ্নিপতি অাব্দুল লতিফ মাষ্টারের বাড়িতে অাসেন এবং ক্যাপ্টেন মেহেদীর সাথে যোগাযোগ করেন।অতপর ক্যাপ্টেন মেহেদী ও জহির শাহ অালমগীর অাব্দুল লতিফ মাষ্টার এবং তাঁর বাড়ির মসজিদের ইমাম মাওলানা অালী অাকবর,সুলতান অাহমেদ,নজরুল ইসলাম, ই.পি.অার. মকবুল হোসেন,বুকাবুনিয়ার অবসরপ্রাপ্ত সুবেদার অাব্দুল মজিদ, অাব্দুল মালেক,মোবারেক অালী মল্লিক, বরগুনা কলেজর ছাত্র বাচ্চু মিয়া প্রমূখ এর সাথে অালাপ অালোচনা করে ক্যাপ্টেন মেহেদী ৩০ মে মুক্তিবাহিনী গঠন করার সিদ্ধান্ত জাতীয় পরিষদ সদস্য অাসমত অালী সিকদার এবং প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য শাহজাদা অাব্দুল মালেক খানকে জানান।তাঁরা ক্যাপ্টেন মেহেদী অালী ইমাম এর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী গঠন করেন এবং জহির শাহ অালমগীরকে তাঁর সহ অধিনায়ক নিযুক্ত করেন।ঐ সময় মুক্তিবাহিনী গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন সেনা সদস্য মঠবাড়িয়ার সার্জেন্ট আবদুল লতিফ হাওলাদার, বুকাবুনিয়ার অবসরপ্রাপ্ত সুবেদার অাব্দুল মজিদ, অাব্দুল মালেক, এমাদুল হক,ইয়াকুব অালী,ডৌয়াতলার অানোয়ার হোসেন খান মজনু,হোগলপাতির কামাল ও জামাল হোসেন, বেতাগীর অাব্দুল মান্নান মৃধাও ছাত্রলীগ নেতা হুমায়ুন কবির হিরু,বরগুনার ছাত্রলীগ নেতা সিদ্দিকুর রহমান প্রমূখ।

মুক্তিবাহিনী গঠনের পরপরই বামনা, পাথরঘাটা,কাঁঠালিয়া,মঠবাড়িয়া, বেতাগী ও বরগুনার বহু উৎসাহী যুবকগণ মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দানের জন্যে ক্যাপ্টেন মেহেদী অালী ইমাম জুলাই মাসে বর্তমান পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলা ও বরগুনা জেলার বামনা এবং ঝালকাঠি জেলার কাঁঠালিয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী বুকাবুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ক্যাম্প স্থাপন করেন। স্বা।বুকাবুনিয়া থেকে ক্যাপ্টেন মেহেদীর বাড়ির দূরত্ব প্রায় ২ কিলোমিটার ।বুকাবুনিয়ার ভৌগোলিক গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।বুকাবনিয়ার সাথে স্থল ও জলপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা তৎকালে ভাল ছিলনা।হেঁটে বা ছোট নৌকায় চলাচল করা যেত।এ ক্যম্পটির এলাকা ছিল বর্তমান সমগ্র পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলা এবং মঠবাড়িয়া উপজেলার পূর্বাংশ।যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ থাকায় পাকিস্তান সেনা বাহিনী এ ক্যাম্পটি অাক্রমণ করতে সাহস করেনি।১ম দিকে এ ক্যাম্পে প্রায় ৪ শত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।তাঁদের প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন সুবেদার অানসার অালী।তবে প্রয়োজনীয় অস্ত্র শস্ত্র ছিল না। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এখানে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। পরবর্তীতে মঠবাড়িয়া থানার রাজারহাট এবং বেতাগী থানার করুনায় দুটি ট্রেইনিং ক্যাম্প স্হাপন করা হয় এবং ক্যাম্প পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয় যথাক্রমে নায়েক আবদুল আজিজ ও হাবিলদার গোলাম মাওলা। অস্ত্র শস্ত্র ও গোলাবারুদের জন্যে তিনি ৯ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর এম.এ. জলিলের নিকট পটুয়াখালী সাব-সেক্টরের সহ অধিনায়ক জহির শাহ অালমগীরকে পাঠান।মেজর জলিল তাঁকে জানান অস্ত্র পাঠনোর চেষ্টা চালাচ্ছেন।পাওয়া গেলে পাঠিয়ে দেয়া হবে। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত ও প্রশিক্ষণ দানের জন্যে তাঁকে নির্দেশ দেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের বেশিরভাগ অাক্রমণ ছিল দালাল, রাজাকার ও ডাকাতদের বিরুদ্ধে। উল্লেখ্য, ডাকাতরা মুক্তিযোদ্ধাদের নাম করে গ্রাম- গঞ্জে ডাকাতি শুরু করলে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি জনমনে বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। তিনি ডাকাতদের দমন করতে বদ্ধপরিকর হন এবং তাদেরকে কঠোরহস্তে দমন করেন। রাজারহাট দালালদের ঘাঁটি ছিল। প্রথম অপারেশন শুরু হয় জুলাই মাসের মাঝামাঝি রাজারহাট দালালদের ঘাঁটিতে।একদিন রাতে হঠাৎ দালালদের ঘাঁটি অাক্রমণ করে রত্তন দফাদার সহ ২ জনকে হত্যা এবং ১৫ জনকে বন্দী করেন।ফলে দালালদের কার্যকলাপ বন্ধ হয়ে যায়। বুকাবুনিয়া ক্যাম্প নিরাপদ হয়।
কাঁঠালিয়া থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দক্ষিণে আমুয়া বাজার একটা গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। হাটের দিন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা কয়েকজন রাজাকার নিয়ে বাজারে মাইকিং করে জনগণকে জানিয়ে দেয় যে,তারা যেন মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সহযোগিতা না করে। তাদেরকে আক্রমণ করার জন্যে কাঁঠালিয়া ও আমুয়া বাজারে চলাচলে এক সেতুর নিকটে জুলাই মাসের শেষদিকে এ্যামবুশ বসানো হয়।পাঁচজন পাকিস্তান সেনা সদস্য এবং দশজন রাজাকার সেতুর ওপর ওঠলে এ্যামবুশে পড়ে যায়। এর ফলে দুই জন পাকিস্তানি সৈন্যসহ চারজন নিহত হয়। মুক্তিযোদ্ধারা চারটি রাইফেল দখল করেন। এঘটনার পর কাঁঠালিয়া থানার রাজাকার ও শান্তি কমিটির লোকদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করে। ফলে তারা কাঁঠালিয়া ছেড়ে পালিয়ে যায়এবং পাঁচজন রাজাকার মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট সারেন্ডার করে।

পটুয়াখালীর গাজী দেলোয়ার হোসেন, সরদার অাব্দুর রশিদ,মির্জাগঞ্জের অালতাফ হায়দার ও বাউফলের পঞ্চম অালী মুক্তি বাহিনীর একটি দল গঠন করেন।উল্লেখ্য,গাজী দেলোয়ার হোসেন, সরদার অাব্দুর রশিদ এবং আমি স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭২-১৯৭৪ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের অাবাসিক ছাত্র ছিলাম। বাউফলের ন্যাপ নেতা সৈয়দ অাশরাফ হোসেনের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর অারেকটি দল গঠিত হয়।ক্যাপ্টেন মেহেদী এ দল ২ টি তাঁর কমান্ডে নিয়ে অাসেন এবং মুক্তিযুদ্ধ সফলভাবে পরিচালনার জন্যে বর্তমান পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলাকে ৫ টি অঞ্চলে ভাগ করে ৫ জন কমান্ডার নিয়োগ করেন।৫ টি অঞ্চল এবং কমান্ডারগণের নাম নিম্মে বর্ণিত হলোঃ
১।বামনা ও পাথরঘাটা অঞ্চলঃ জহির শাহ অালমগীর/সুবেদার অাব্দুল মজিদ।
২।বরগুনা ও বেতাগী অঞ্চল -হাবিলদার জুলফিকার অালী জলফু মিয়া।
৩।খেপুপাড়া,অামতলী ও তালতলী- নায়েব সুবেদার হাতেম অালী।
৪।পটুয়াখালী, গলচিপা ও দশমিনা-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মোঃ নূরুল হুদা।
৫।মির্জাগঞ্জ ও বাউফল অঞ্চল – অালতাফ হায়দার ও হাবিলদার বাকের আলী।

ক্যাপ্টেন মেহেদী অালী ইমাম তাঁর সাব-সেক্টর(পটুয়াখালী)এর অাঞ্চলিক কমান্ডারদেরকে নিজ নিজ এলাকায় রেকী করে ঘাঁটি গড়ে তোলার নির্দেশ প্রদান করেন।কারণ,নিজেদের ঘাঁটি গড়ে তুলতে না পারলে পাকিস্তানী সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা যাবেনা।স্থানীয় দালাল ও রাজাকারদের গতি-বিধি পর্যবেক্ষণ করে গেরিলা পদ্ধতিতে অাক্রমন চালিয়ে অস্ত্র-সস্ত্র ছিনিয়ে অানতে হবে।অার অামি অস্ত্র-শস্ত্র সংগ্রহ করতে পারলে অাপনাদের নিকট পৌঁছিয়ে দিব।তিনি নিজ এলাকা ছেড়ে ভারতে যেতে অাগ্রহী ছিলেন না।তিনি বিশ্বাস করতেন এলাকার জনগণের সাথে ঠিক মত কাজ করলে এখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া যাবে।তিনি বিশ্বাস করতেন,জনগণই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত শক্তি।তাদেরকে নিয়ে গেরিলা সংগঠন গড়ে তুলতে পারলে শত্রুদেরকে পর্যুদস্ত করা সম্ভব হবে।বারবার শত্রুকে অাঘাত করে দুর্বল করে দিতে পারলেই অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা অামাদের পক্ষে সহজ হবে।

ক্যাপ্টেন মেহেদীর নির্দেশে অাঞ্চলিক কমান্ডারগণ নিজ নিজ এলাকায় রাজাকার, পুলিশ, পাকিস্তানী সেনা বাহিনীর উপর গেরিলা পদ্ধতিতে অাক্রমন করে তাদের নিকট থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে অানেন।গেরিলা অাক্রমনে দালাল,রাজাকার, পুলিশ ও পাকিস্তানী সেনা বাহিনী ভীত সন্ত্রস্ত থাকে।

৯ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর এম.এ.জলিল অাগষ্ট মাসের মাঝামাঝি সুন্দরবন সাব-সেক্টর কমান্ডার লে.জিয়া উদ্দিনের মাধ্যমে পটুয়াখালী সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন মেহেদীর নিকট ৭ টি এস.এল.অার,২০ টি রাইফেল, ২ টি এনারগা গ্রেনেড,কিছু গ্রেনেড ও গোলাবারুদ ও ৫০ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবককে পাঠিয়ে দেন।তিনি নিজেই গ্রহণ করার জন্যে তাঁর বিশ্বস্ত সহ কর্মী রুহুল অামীনকে সাথে নিয়ে সুন্দরবন সাব-সেক্টরেরর বগী ক্যাম্পে হাজির হন এবং সেখান থেকে অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে বুকাবুনিয়া ফিরে এসে তা ৫ জন অাঞ্চলিক কমান্ডারদের মধ্যে বন্টন করে দেন।তিনি তাদেরকে সামনাসামনি অাক্রমন না করে গেরিলা পদ্ধতিতে অাক্রমন করার নির্দেশ দেন।প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৫০ জন যুবককে পটুয়াখালী ও বরগুনা শহরে পাঠিয়ে দেন।তারা শহরে গেরিলা পদ্ধতিতে কার্যক্রম শুরু করেন।পটুয়াখালী ও বরগুনা শহরের অাশেপাশের খাল দিয়ে গানবোট চলাচল করতো। তারা গানবোটের উপর অাক্রমন চালাতেন এবং সফলতাও লাভ করেন।

অাগষ্ট মাসের শেষ দিকে পাকিস্তানী সৈন্যরা হঠাৎ তালতলীর মহিষপুর অাক্রমন করে।কারণ,মুক্তিযোদ্ধারা এখান থেকে অামতলী ও কুয়াকাটায় অাক্রমন চালাতেন।মহিষপুর ক্যাম্পের দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমে বন-জঙ্গল ও বঙ্গোপসাগর, উত্তরে জনবসতি।পাক সেনারা দালাদের নিকট থেকে মহিষপুর ক্যাম্পের খবর পেয়ে পটুয়াখালী থেকে লঞ্চ ও গানবোটে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা ও রাজাকারদের একটি দল মহিষপুর থেকে ৭/৮ কিলোমিটার উত্তরে অবতরণ করে হেঁটে ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে অাসতে থাকে।অন্য একটি দল গানবোটে মহিষপুর ক্যাম্পের কাছে এসে হঠাৎ অাক্রমন চালায়।উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হলে পার্শ্ববর্তী গ্রামের জনগণ মুক্তিযোদ্ধাদের সমর্থনে চিৎকার শুরু করে।এতে পাকিস্তানী সৈন্যরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পালাতে শুরু করে।এ যুদ্ধে ১১ জন পাকিস্তানী সৈন্য ও ১১ জন রাজাকার নিহত এবং অনেকে অাহত হয়। এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা প্রচুর অস্ত্র-শস্ত্র ও গোলাবারুদ লাভ করে।এ যুদ্ধে ২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।মুক্তিযোদ্ধারা মহিষপুর থেকে অন্যত্র চলে গেলে পাকিস্তানী সৈন্যরা ও রাজাকাররা মহিষপুর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়।

মহিষপুর যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ও তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। ফলে রাজাকার ও দালালরা গ্রাম ছেড়ে শহরে অাশ্রয় নেয়।থানা বর্তমানে উপজেলা সদর ছাড়া তাদের তৎপরতা বন্ধ হয়ে যায়।মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বৃদ্ধির জন্যে ৯ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর এম.এ.জলিল অক্টোবর মাসের শেষ দিকে বেশ কিছু সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা ও অস্ত্র-শস্ত্র পাঠিয়ে দেন এবং ক্যাপ্টেন মেহেদীকে ৯নং সেক্টরের সদর দপ্তর টাকীতে ডেকে পাঠান।তিনি ভারতে যেতে ইচ্ছুক ছিলেন না। কারণ,তিনি ভারতে গেলে মুক্তিযোদ্ধারা মানসিক দিক দিয়ে হতাশ হবেন।এ সময় বুকাবুনিয়া ক্যাম্পে প্রায় ৭০০ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।তবুও সেক্টর কমান্ডারের অনুরোধে তিনি ভারতে উদ্দেশ্যে বুকাবুনিয়া ত্যাগ করেন এবং বহু কষ্টে নভেম্বর মাসের শেষ দিকে ভারতে পৌঁছেন।তাঁর অনুপস্থিতিতে সহ অধিনায়ক জহির শাহ অালমগীর মুক্তিযুদ্ধ চালিয়েযান।
পাকিস্তান সেনা বাহিনী ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় আত্মসমর্পণ করায় বাংলাদেশ স্বধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে আত্মপ্রকাশ ঘটে এবং ক্যাপ্টেন মেহেদী আলী ইমাম সেনা বাহিনীতে থেকে যান।
স্বাধীনতার পর পাথরঘাটা থানা শান্তি কমিটির সহ সভাপতি কালমেঘা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আহের উদ্দিন হাওলাদারকে দালালীর অভিযোগে বুকাবুনিয়া ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়। মঠবাড়িয়ার খান সাহেব হাতেম আলী জমাদ্দার মঠবাড়িয়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা সার্জেন্ট আবদুল লতিফ হাওলাদারের মাধ্যমে সাব সেক্টর কমান্ডার মেহেদী আলী ইমামের নিকট একখানা চিঠি লিখেন। চিঠি পেয়ে তিনি তাকে নিরাপদ স্হানে রাখেন এবং তিনি ব্যক্তিগতভাবে তার খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারেন যে, মুক্তিযুদ্ধকালীন তার ভূমিকা বিতর্কিত ছিল না। অতপর তিনি তাকে মুক্তি দেন।
মুক্তিযুদ্ধে সাহসও বীরত্বের জন্যে সরকার ১৯৭৩ সালে তাঁকে বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত করেন। ১৯৭৩ সালের সরকারী গেজেট আনুযায়ী তাঁর বীরত্ব সনদপত্র নম্বর ১৪।১৯৭৩ সালে তিনি মেজর পদে উন্নীত হন এবং ১৯৭৪ আবসর গ্রহন করেন। অবসর গ্রহনের পর মেঘনা টেক্সটাইল মিলের জেনারেল ম্যানেজার, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট, পেট্রোবাংলার পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বনশিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনকালে কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে জার্মানীতে চিকিৎসাধীন থাকা আবস্থায় ১৯৯৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মৃত্যু বরণ করেন। বনানী কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয।মৃত্যু কালে এক স্ত্রী,এক পুত্র, এক কন্যা, অসংখ্যক আত্মীয়-স্বজন ও গুনাগ্রহী রেখে গিয়েছেন। তার পুত্র শাফায়েত ইমাম একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। কন্যা সাদিয়া ইমাম একজন গৃহিনী।
মেজর আবঃ মেহেদী আলী ইমাম এর সাথে আমার একাধিকবার সাক্ষাৎ হয়েছে। তিনি সৎ,সাহসী,বিনয়ী, অমায়িক,বিচক্ষণ,ন্যায়পরায়ন, নিরহংকার, মিষ্টভাষী,মিতব্যয়ী, দয়ালু ও ধৈর্যশীল ছিলেন। হে আল্লাহ, তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন।
তথ্য সূত্র ১। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র ১০ম খন্ড।
২। মুক্তিযুদ্ধে বরিশাল, নির্যাতন ও গণহত্যা — এম,ফরিদ উদ্দিন মনজু।

১৯৭১ সালে ২৬ এপ্রিল বরিশাল শহর পাকিস্তান সেনা বাহিনী দখল করার পর ক্যাপ্টেন মেহেদী অালী ইমাম তাঁর নিজ গ্রাম দাউদখালী অাসেন এবং মুক্তিবাহিনী গঠন করার পরিকল্পনা করেন। ইতোমধ্যে পিরোজপুর কলেজের ছাত্র জহির শাহ অালমগীর নেছারাবাদের অাটঘর কুড়িঅানা থেকে ৬ টি রাইফেল সহ মঠবাড়িয়ার দাউদখালী ইউনিয়নের দেবত্র গ্রামের রাজারহাট বাজার সংলগ্ন তাঁর ভগ্নিপতি অাব্দুল লতিফ মাষ্টারের বাড়িতে অাসেন এবং ক্যাপ্টেন মেহেদীর সাথে যোগাযোগ করেন।অতপর ক্যাপ্টেন মেহেদী ও জহির শাহ অালমগীর অাব্দুল লতিফ মাষ্টার এবং তাঁর বাড়ির মসজিদের ইমাম মাওলানা অালী অাকবর,সুলতান অাহমেদ,নজরুল ইসলাম, ই.পি.অার. মকবুল হোসেন,বুকাবুনিয়ার সুবেদার অাব্দুল মজিদ, অাব্দুল মালেক,মোবারেক অালী মল্লিক, বরগুনা কলেজর ছাত্র বাচ্চু মিয়া প্রমূখ এর সাথে অালাপ অালোচনা করে ক্যাপ্টেন মেহেদী ৩০ মে মুক্তিবাহিনী গঠন করার সিদ্ধান্ত জাতীয় পরিষদ সদস্য অাসমত অালী সিকদার এবং প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য শাহজাদা অাব্দুল মালেক খানকে জানান।তাঁরা ক্যাপ্টেন মেহেদী অালী ইমাম এর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী গঠন করেন এবং জহির শাহ অালমগীরকে তাঁর সহ অধিনায়ক নিযুক্ত করেন।ঐ সময় মুক্তিবাহিনী গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন সেনা সদস্য মঠবাড়িয়ার সার্জেন্ট আবদুল লতিফ হাওলাদার, বুকাবুনিয়ার সুবেদার অাব্দুল মজিদ, অাব্দুল মালেক, এমাদুল হক,ইয়াকুব অালী,ডৌয়াতলার অানোয়ার হোসেন খান মজনু,হোগলপাতির কামাল ও জামাল হোসেন, কাঁঠালিয়ার এ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সিকদার, বেতাগীর অাব্দুল মান্নান মৃধাও ছাত্রলীগ নেতা হুমায়ুন কবির হিরু,বরগুনার ছাত্রলীগ নেতা সিদ্দিকুর রহমান প্রমূখ।

মুক্তিবাহিনী গঠনের পরপরই বামনা, পাথরঘাটা,কাঁঠালিয়া,মঠবাড়িয়া, বেতাগী ও বরগুনার বহু উৎসাহী যুবকগণ মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দানের জন্যে ক্যাপ্টেন মেহেদী অালী ইমাম জুলাই মাসে বর্তমান পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলা ও বরগুনা জেলার বামনা এবং ঝালকাঠি জেলার কাঁঠালিয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী বুকাবুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ক্যাম্প স্থাপন করেন।বুকাবুনিয়া থেকে ক্যাপ্টেন মেহেদীর বাড়ির দূরত্ব প্রায় ২ কিলোমিটার ।বুকাবুনিয়ার ভৌগোলিক গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।বুকাবনিয়ার সাথে স্থল ও জলপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা তৎকালে ভাল ছিলনা।হেঁটে বা ছোট নৌকায় চলাচল করা যেত।এ ক্যম্পটির এলাকা ছিল বর্তমান সমগ্র পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলা এবং মঠবাড়িয়া উপজেলার পূর্বাংশ।যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ থাকায় পাকিস্তান সেনা বাহিনী এ ক্যাম্পটি অাক্রমণ করতে সাহস করেনি।১ম দিকে এ ক্যাম্পে প্রায় ৪ শত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।তাঁদের প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন সুবেদার অানসার অালী।তবে প্রয়োজনীয় অস্ত্র শস্ত্র ছিল না।অস্ত্র শস্ত্র ও গোলাবারুদের জন্যে তিনি ৯ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর এম.এ. জলিলের নিকট পটুয়াখালী সাব-সেক্টরের সহ অধিনায়ক জহির শাহ অালমগীরকে পাঠান।মেজর জলিল তাঁকে জানান অস্ত্র পাঠনোর চেষ্টা চালাচ্ছেন।পাওয়া গেলে পাঠিয়ে দেয়া হবে। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত ও প্রশিক্ষণ দানের জন্যে তাঁকে নির্দেশ দেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের বেশিরভাগ অাক্রমণ ছিল দালাল ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে। রাজারহাট দালালদের ঘাঁটি ছিল। প্রথম অপারেশন শুরু হয় জুলাই মাসের মাঝামাঝি রাজারহাট দালালদের ঘাঁটিতে।একদিন রাতে হঠাৎ দালালদের ঘাঁটি অাক্রমণ করে রত্তন দফাদার সহ ২ জনকে হত্যা এবং ১৫ জনকে বন্দী করেন।ফলে দালালদের কার্যকলাপ বন্ধ হয়ে যায়। বুকাবুনিয়া ক্যাম্প নিরাপদ হয়।

পটুয়াখালীর গাজী দেলোয়ার হোসেন, সরদার অাব্দুর রশিদ,মির্জাগঞ্জের অালতাফ হায়দার ও বাউফলের পঞ্চম অালী মুক্তি বাহিনীর একটি দল গঠন করেন।উল্লেখ্য,গাজী দেলোয়ার হোসেন, সরদার অাব্দুর রশিদ এবং আমি স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭২-১৯৭৪ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের অাবাসিক ছাত্র ছিলাম। বাউফলের ন্যাপ নেতা সৈয়দ অাশরাফ হোসেনের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর অারেকটি দল গঠিত হয়।ক্যাপ্টেন মেহেদী এ দল ২ টি তাঁর কমান্ডে নিয়ে অাসেন এবং মুক্তিযুদ্ধ সফলভাবে পরিচালনার জন্যে বর্তমান পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলাকে ৫ টি অঞ্চলে ভাগ করে ৫ জন কমান্ডার নিয়োগ করেন।৫ টি অঞ্চল এবং কমান্ডারগণের নাম নিম্মে বর্ণিত হলোঃ
১।বামনা ও পাথরঘাটা অঞ্চলঃ জহির শাহ অালমগীর/সুবেদার অাব্দুল মজিদ।
২।বরগুনা ও বেতাগী অঞ্চল -হাবিলদার জুলফিকার অালী জলফু মিয়া।
৩।খেপুপাড়া,অামতলী ও তালতলী- সুবেদার হাতেম অালী।
৪।পটুয়াখালী, গলচিপা ও দশমিনা-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মোঃ নূরুল হুদা।
৫।মির্জাগঞ্জ ও বাউফল অঞ্চল – আলতাফ হায়দার।

ক্যাপ্টেন মেহেদী অালী ইমাম তাঁর সাব-সেক্টর(পটুয়াখালী)এর অাঞ্চলিক কমান্ডারদেরকে নিজ নিজ এলাকায় রেকী করে ঘাঁটি গড়ে তোলার নির্দেশ প্রদান করেন।কারণ,নিজেদের ঘাঁটি গড়ে তুলতে না পারলে পাকিস্তানী সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা যাবেনা।স্থানীয় দালাল ও রাজাকারদের গতি-বিধি পর্যবেক্ষণ করে গেরিলা পদ্ধতিতে অাক্রমন চালিয়ে অস্ত্র-সস্ত্র ছিনিয়ে অানতে হবে।অার অামি অস্ত্র-শস্ত্র সংগ্রহ করতে পারলে অাপনাদের নিকট পৌঁছিয়ে দিব।তিনি নিজ এলাকা ছেড়ে ভারতে যেতে অাগ্রহী ছিলেন না।তিনি বিশ্বাস করতেন এলাকার জনগণের সাথে ঠিক মত কাজ করলে এখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া যাবে।তিনি বিশ্বাস করতেন,জনগণই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত শক্তি।তাদেরকে নিয়ে গেরিলা সংগঠন গড়ে তুলতে পারলে শত্রুদেরকে পর্যুদস্ত করা সম্ভব হবে।বারবার শত্রুকে অাঘাত করে দুর্বল করে দিতে পারলেই অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা অামাদের পক্ষে সহজ হবে।

ক্যাপ্টেন মেহেদীর নির্দেশে অাঞ্চলিক কমান্ডারগণ নিজ নিজ এলাকায় রাজাকার, পুলিশ, পাকিস্তানী সেনা বাহিনীর উপর গেরিলা পদ্ধতিতে অাক্রমন করে তাদের নিকট থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে অানেন।গেরিলা অাক্রমনে দালাল,রাজাকার, পুলিশ ও পাকিস্তানী সেনা বাহিনী ভীত সন্ত্রস্ত থাকে।

৯ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর এম.এ.জলিল অাগষ্ট মাসের মাঝামাঝি সুন্দরবন সাব-সেক্টর কমান্ডার লে.জিয়া উদ্দিনের মাধ্যমে পটুয়াখালী সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন মেহেদীর নিকট ৭ টি এস.এল.অার,২০ টি রাইফেল, ২ টি এনারগা গ্রেনেড,কিছু গ্রেনেড ও গোলাবারুদ ও ৫০ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবককে পাঠিয়ে দেন।তিনি নিজেই গ্রহণ করার জন্যে তাঁর বিশ্বস্ত সহ কর্মী রুহুল অামীনকে সাথে নিয়ে সুন্দরবন সাব-সেক্টরেরর বগী ক্যাম্পে হাজির হন এবং সেখান থেকে অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে বুকাবুনিয়া ফিরে এসে তা ৫ জন অাঞ্চলিক কমান্ডারদের মধ্যে বন্টন করে দেন।তিনি তাদেরকে সামনাসামনি অাক্রমন না করে গেরিলা পদ্ধতিতে অাক্রমন করার নির্দেশ দেন।প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৫০ জন যুবককে পটুয়াখালী ও বরগুনা শহরে পাঠিয়ে দেন।তারা শহরে গেরিলা পদ্ধতিতে কার্যক্রম শুরু করেন।পটুয়াখালী ও বরগুনা শহরের অাশেপাশের খাল দিয়ে গানবোট চলাচল করতো। তারা গানবোটের উপর অাক্রমন চালাতেন এবং সফলতাও লাভ করেন।

অাগষ্ট মাসের শেষ দিকে পাকিস্তানী সৈন্যরা হঠাৎ তালতলীর মহিষপুর অাক্রমন করে।কারণ,মুক্তিযোদ্ধারা এখান থেকে অামতলী ও কুয়াকাটায় অাক্রমন চালাতেন।মহিষপুর ক্যাম্পের দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমে বন-জঙ্গল ও বঙ্গোপসাগর, উত্তরে জনবসতি।পাক সেনারা দালাদের নিকট থেকে মহিষপুর ক্যাম্পের খবর পেয়ে পটুয়াখালী থেকে লঞ্চ ও গানবোটে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা ও রাজাকারদের একটি দল মহিষপুর থেকে ৭/৮ কিলোমিটার উত্তরে অবতরণ করে হেঁটে ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে অাসতে থাকে।অন্য একটি দল গানবোটে মহিষপুর ক্যাম্পের কাছে এসে হঠাৎ অাক্রমন চালায়।উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হলে পার্শ্ববর্তী গ্রামের জনগণ মুক্তিযোদ্ধাদের সমর্থনে চিৎকার শুরু করে।এতে পাকিস্তানী সৈন্যরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পালাতে শুরু করে।এ যুদ্ধে ১১ জন পাকিস্তানী সৈন্য ও ১১ জন রাজাকার নিহত এবং অনেকে অাহত হয়। এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা প্রচুর অস্ত্র-শস্ত্র ও গোলাবারুদ লাভ করে।এ যুদ্ধে ২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।মুক্তিযোদ্ধারা মহিষপুর থেকে অন্যত্র চলে গেলে পাকিস্তানী সৈন্যরা ও রাজাকাররা মহিষপুর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়।

মহিষপুর যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ও তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। ফলে রাজাকার ও দালালরা গ্রাম ছেড়ে শহরে অাশ্রয় নেয়।থানা বর্তমানে উপজেলা সদর ছাড়া তাদের তৎপরতা বন্ধ হয়ে যায়।মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বৃদ্ধির জন্যে ৯ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর এম.এ.জলিল অক্টোবর মাসের শেষ দিকে বেশ কিছু সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা ও অস্ত্র-শস্ত্র পাঠিয়ে দেন এবং ক্যাপ্টেন মেহেদীকে ৯নং সেক্টরের সদর দপ্তর টাকীতে ডেকে পাঠান।তিনি ভারতে যেতে ইচ্ছুক ছিলেন না। কারণ,তিনি ভারতে গেলে মুক্তিযোদ্ধারা মানসিক দিক দিয়ে হতাশ হবেন।এ সময় বুকাবুনিয়া ক্যাম্পে প্রায় ৭০০ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।তবুও সেক্টর কমান্ডারের অনুরোধে তিনি ভারতে উদ্দেশ্যে বুকাবুনিয়া ত্যাগ করেন এবং বহু কষ্টে নভেম্বর মাসের শেষ দিকে ভারতে পৌঁছেন।তাঁর অনুপস্থিতিতে সহ অধিনায়ক জহির শাহ অালমগীর মুক্তিযুদ্ধ চালিয়েযান।

পাকিস্তান সেনা বাহিনী ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় আত্মসমর্পণ করায় বাংলাদেশ স্বধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে আত্মপ্রকাশ ঘটে এবং ক্যাপ্টেন মেহেদী আলী ইমাম সেনা বাহিনীতে থেকে যান।
মুক্তিযুদ্ধে সাহসও বীরত্বের জন্যে সরকার ১৯৭৩ সালে তাঁকে বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত করেন। ১৯৭৩ সালের সরকারী গেজেট আনুযায়ী তাঁর বীরত্ব ভূষন নম্বর ১৪।১৯৭৩ সালে তিনি মেজর পদে উন্নীত হন এবং ১৯৭৪ আবসর গ্রহন করেন। অবসর গ্রহনের পর মেঘনা টেক্সটাইল মিলের জেনারেল ম্যানেজার, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট, পেট্রোবাংলার পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বনশিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনকালে কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে জার্মানীতে চিকিৎসাধীন থাকা আবস্থায় ১৯৯৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মৃত্যু বরণ করেন। বনানী কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয।মৃত্যু কালে এক স্ত্রী,এক পুত্র, এক কন্যা, অসংখ্যক আত্মীয়-স্বজন ও গুনাগ্রহী রেখে গিয়েছেন। তার পুত্র শাফায়েত ইমাম একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। কন্যা সাদিয়া ইমাম একজন গৃহিনী।
মেজর আবঃ মেহেদী আলী ইমাম এর সাথে আমার একাধিকবার সাক্ষাৎ হয়েছে। তিনি সৎ,সাহসী,বিনয়ী, অমায়িক,বিচক্ষণ,ন্যায়পরায়ন, নিরহংকার, মিষ্টভাষী,মিতব্যয়ী, দয়ালু ও ধৈর্যশীল ছিলেন। হে আল্লাহ, তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন।

নুর হোসাইন মোল্ল,  লেখক, ইতিহাসবিদ

নুর হোসাইন মোল্ল, লেখক, ইতিহাসবিদ

Leave a Reply

x

Check Also

জন্মাবধি কাদা রাস্তা কাঁদাচ্ছে দক্ষিণ গুলিসাখালী গ্রামবাসিকে

দেবদাস মজুমদার :তিন গ্রাম, ছয়টি মসজিদ, তিনটি বাজার আর চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিত্য যাতায়াতের জন্য ...