ব্রেকিং নিউজ
Home - অন্যান্য - জনস্বাস্থ্য - করোনা ভ্যাক্সিন ও আমার বাংলাদেশ

করোনা ভ্যাক্সিন ও আমার বাংলাদেশ


করোনা ভাইরাস (SARS CoV-2) আবিষ্কারের ৬মাস পূর্ণ হয়েছে ইতোমধ্যে ।পৃথিবীব্যাপী কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে ৫লক্ষাধিক মানুষ মারা গিয়েছে।এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকরী ওষুধ কিংবা ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের প্রানান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা।

♦ভ্যাক্সিন কি ?

মানবদেহে কোন জীবানু(ভাইরাস বা ব্যাক্টেরিয়া) প্রবেশ করলে তার বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির জন্য কৃত্তিমভাবে যে এন্টিজেন প্রয়োগ করা হয়,তার নামই ভ্যাক্সিন।

♦কিভাবে কাজ করে ভ্যাক্সিন?

জীবাণু থেকেই তার দ্বারা সৃষ্ট রোগের ভ্যাক্সিন প্রস্তুত করা হয়। যেকোন জীবাণুর আছে দুইটি বৈশিষ্ট্য- একটি হল রোগ সৃষ্টি করা (Pathogenecity)। অন্যটি দেহের অভ্যন্তরে ঐ একই রোগের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য কিছু পদার্থ (Antibody) তৈরী করা। ভ্যাক্সিন তৈরীর সময় রোগ সৃষ্টির ক্ষমতাটিকে নষ্ট করে দেয়া হয়।সোজা বাংলায় রোগ সৃষ্টির ক্ষমতাহীন জীবাণুকেই ভ্যাক্সিন হিসেবে দেহে প্রবেশ করানো হয়। ফলশ্রুতিতে এই জীবাণু দেহে রোগের কারণ হয় না, উল্টো রোগটি যেন না হয় তার জন্য বিশেষ পদার্থ(Antibody) তৈরী করতে থাকে। আরেকটি সুবিধা হল এই জীবাণুগুলো মেমরি সেল (Memory cell)গঠন করে ফলে পরবর্তীতে একই জীবাণু পুনরায় প্রবেশ করলে সহজেই সনাক্ত করতে পারে।

♦ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের ধাপসমূহ

১)প্রানীদেহে ট্রায়াল (ক্লিনিকাল ট্রায়াল)

প্রথমে ভ্যাক্সিনটি কিছু প্রানীর দেহে যেমন খরগোশ ,বানর,ইঁদুরের শরীরে প্রবেশ করানো হয় এবং এর ফলে মারাত্মক পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হয় কিনা সেটা পর্যবেক্ষণ করা হয়।কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভ্যাক্সিন প্রয়োগের ফলে কি পরিমান অ্যান্টিবডি তৈরি হয় প্রানীর শরীরে তা দেখা হয় এবং ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করলে তার সংক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হয় কিনা দেখা হয়।

এসব ক্ষেত্রে সন্তোষজনক ফলাফল আসলে পরবর্তী ধাপ অর্থাৎ মানবদেহে ট্রায়ালের অনুমতি দেয়া হয়।

২)মানবদেহে ট্রায়াল:

৩টি ধাপের মাধ্যমে এটি সম্পন্ন হয়-
ক)Safety ঃ
অল্প সং্খক প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের শরীরে ভ্যাক্সিন প্রবেশ করানো হয় এবং এর ফলে তাদের শরীরে কোন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হয় কিনা পর্যবেক্ষন করা হয়।বড় ধরণের বিরুপ প্রতিক্রিয়া না হলে পরবর্তী ধাপের ট্রায়ালে যাওয়া হয়।

খ)Immunogenecityঃ
এই ধাপে ভ্যাক্সিন মানব দেহে প্রবেশ করালে ভাইরাসের বিরুদ্ধে কি পরিমান অ্যান্টিবডি তৈরি হয় তা দেখা হয়।অর্থাৎ ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে সক্ষম কিনা দেখা হয়।

গ)Efficacyঃ
এই ধাপে দেখা হয় ভ্যাক্সিনটি শতকরা কতো ভাগ সুস্থ মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে পারছে।এই ধাপে সন্তোষজনক ফলাফল পেলে ভ্যক্সিন উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের অনুমতি দেয়া হয়।

এই ধাপগুলো সম্পন্ন করতে অনেক সময় প্রয়োজন।তাই করোনা ভ্যাক্সিন বাজারে আসতে ২০২১ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে আমাদের।

বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৪০টি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে করোনা ভাইরাস ভ্যাক্সিন আবিষ্কারে চেষ্টা করে যাচ্ছে।ইতিমধ্যে ১০টি শীর্ষ প্রতিযোগী ‘ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল’ ধাপেও পৌঁছে গেছে।

যুক্তরাজ্যঃ এর মধ্যে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এর ভ্যাক্সিন টি (AZD1112) ক্লিনিকাল ট্রায়ালের তৃতীয় পর্যায়ে আছে।ব্রিটিশ ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকা সেপ্টেম্বর মাসেই ভ্যাক্সিন বাজারজাতকরণের ব্যাপারে আশাবাদী।

যুক্তরাষ্ট্রঃ mRNA 1273 ভ্যাক্সিন তৈরি করছে যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না অ্যান্ড এনআইএআইডি। বর্তমানে ক্লিনিকাল ট্রায়ালের দ্বিতীয় পর্যায়ের শেষের দিকে আছে এই ভ্যাক্সিন।

চীন ঃ সিনোভ্যাক বায়োটেক ও চায়না ন্যাশনাল বায়োটেক সহ তিনটি কোম্পানি ক্লিনিকাল ট্রায়ালের দ্বিতীয় ধাপ সম্পন্ন করেছে এবং খুব দ্রুত তৃতীয় ধাপে যাওয়ার চেষ্টা করছে।সম্প্রতি চীন তাদের মিলিটারিদের উপর প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের ক্লিনিকাল ট্রায়ালের অনুমতি পেয়েছে তাদের তৈরি ভ্যাক্সিন।

বাংলাদেশ ঃ গতকাল বাংলাদেশে প্রথম বারের মতো গ্লোব বায়োটেক লিমিটেড করোনা ভাইরাসের ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের দাবি করেছে।তারা প্রানীদেহে ট্রায়ালের প্রথম ধাপ অর্থাৎ প্রিলিমিনারি ধাপ সম্পন্ন করেছে,এরপর তারা দ্বিতীয় বা রেগুলেটরি ধাপে যাবে।সফল হলে ক্লিনিকাল ট্রায়ালের অনুমতি মিলবে।বাংলাদেশে ৮ই মার্চ প্রথম করোনা রোগী সনাক্ত হওয়ার পর থেকেই তারা এটা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।এটা অবশ্যই একটি আশাব্যঞ্জক খবর।যদিও এটি শেষ পর্যন্ত কার্যকরী নাও হতে পারে অথবা হলেও সময় সাপেক্ষ বিষয়।তবুও এই মহামারীর সময় এটি আমাদের নতুন স্বপ্ন দেখতে উদ্বুদ্ধ করছে।সংবাদ সম্মেলনে বিজ্ঞানী ড. আসিফ মাহমুদের কান্না আমাদের আশা জাগায়,যুদ্ধের মাঠে টিকে থাকার স্বপ্ন দেখায়।নিশ্চয়ই তারা প্রশংসার দাবীদার এই প্রচেষ্টার জন্য।এটা সত্য মিথ্যা যাই হোক,আরো অনেকে এইধরণের গবেষণায় এগিয়ে আসুক আরো প্রতিষ্ঠান।জীবন রক্ষাকারী ওষুধ বা ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের জন্য বিনিয়োগ বাড়ানো উচিত।

ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও যদি আমরা লেগে থাকি,একদিন না একদিন সফল হবোই।দুর্নীতি ।বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়ে আমরাও একদিন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষে উন্নত দেশের সাথে প্রতিযোগিতা করবো।

করোনার এই যুদ্ধে অনেকেই নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন যেমন সকল পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা।রোগীকে বাঁচানোর চেষ্টায় হেরে গেলে তারাও কাঁদেন সবার অন্তরালে।যুদ্ধে সবাই জিততে চায়,কিন্তু সবসময় জেতা যায়না।হেরে গেলেও কখনো কখনো প্রানান্তকর চেষ্টা আমাদের সান্ত্বনা যোগায়।

তাই যারা চেষ্টা করে যাচ্ছেন করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য তাদের উৎসাহ দিন,সাহস দিন,সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করুন।বাইরের দেশের দিকে তাকিয়ে না থেকে আমরাই আত্মনির্ভরশীল হওয়ার চেষ্টা করা করি।এই মহামারী নিয়ন্ত্রনে খুব বেশী সফল হতে না পারলেও ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার সময় এখনই।

আমরা করবো জয় নিশ্চয়,
আমরা করবো জয় একদিন।

ডা. ফেরদৌস ইসলাম
আবাসিক মেডিকেল অফিসার
মঠবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

Leave a Reply

x

Check Also

মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই কোরবানি

কোরবানি যেহেতু একটি উত্তম ইবাদত। এ ইবাদতটি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। কারণ আল্লাহ তায়ালা কুরআনে ...