ব্রেকিং নিউজ
Home - মঠবাড়িয়া - সহজ মানুষ 🌿

সহজ মানুষ 🌿


🔻
ডা. রাকিবুর রহমান বয়সে আমার ছোট হবেন । কিন্তু তার মেধা ও মননশীতার কাছে আমি হার মানি। রাকিবুর চিকিৎসা বিজ্ঞানে পড়ালেখা করে বিসিএস পাস করে এখন সরকারি হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার। তিনি একজন তরুণ নিবেদিত চিকিৎসক।
আমার আপন জনপদ মঠবাড়িয়ার বলেশ্বর নদী তীরেবর্তী একটা অজপাড়া গা থেকে উঠেছেন। আপদমস্তক একজন ভদ্র তরুণ মুখ রাকিবুর। এ জনপদে যারা তাকে চেনেন জানেন তারা নিশ্চয়ই সহমত পোষণ করবেন।
এই তরুণ আমার চেনা জানা ছিলোনা। তবে বহুবছর ধরে আমার ফেসবুকে আছেন। গত ছয়মাস আগে আমি ঢাকায় ফটোগ্রাফির ওপর পড়াশুনা করতে গেলে টানা দেড়মাস ঢাকায় ছিলাম। রাকিবুর আমায় ফোন করে বলেন দাদা আমি আপনার এলাকার ছেলে । অনেক বছর ধরে ইচ্ছে আপনাকে কাছ থেকে দেখার । আমি হেসে উঠি আর বলি আমাকে দেখার কিছু তো নাই। সেদিন শীত কুয়াশা ভোরে আমার ছবির স্কুলের পাঠ ছিলো জাতীয় চিড়িয়াখানায় । আমি তরুণকে আসতে বলি । সত্যি রাকিবুর সেই মিটফোর্ট হাসপাতাল থেকে আমার জন্য চিড়িয়াখানার গেটে এসে দাড়ায়। আমি হতবাক। খুব উৎফুল্ল এ তরুণ চিকিৎসক। আমার হাত চেপে অনর্গল কথা বলতে থাকেন। নিজের কথা নাই সব আমার প্রশংসা ! আমি বিব্রত বোধ করি। আমরা ফুটপাত ধরে হাটতে হাটতে গুণি চিত্রশিল্পী চঞ্চল কর্মকার এর মিরপুর ফ্লাটের দশ তলায় উঠি। দুপুরে আমরা ওখানে সেদিন দুপুরের আহার সারি। ওই সময় রাকিবুর একটা সুখবর দেন আমায় সে মঠবাড়িয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করছেন।
এরপর রাকিবুর আর আমি ফুটপাত ধরে হেটে মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদ মোড় অবধি আসতে সন্ধ্যা নামে। মসজিদে আজান শোনা যায়। রাকিবুর নামাজ পড়ে আর আমি মসজিদের সামনে দাড়িয়ে থাকি। এরপর রাকিবুরকে ফুটপাতে চা খাওয়াই সে ওতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। রিকশা ধরে সে গন্তব্যে ফেরে।
রাকিবুর বলছিলো দাদা আপনাকে নিয়ে কিছু স্বপ্ন আছে আমার । আমি হা করে এ্ তরুণের মুখাবয়বটা দেখি । কি সরল এক মুখ। স্বপ্নটা বলেনা রাকিবুর । তবে বলে আপন গ্রামে যেখানে আমার শেকড় সেখানে আপনাকে নিয়ে স্বপ্নটা বলতে চাই। আচ্ছা তাই হোক।
এরপর রাকিবুরের সাথে আর দেখা হয়না। আমি বাড়ি ফিরি আরও একমাস পর।
করোনা সংক্রমনের পর থেকে তরুণ চিকিৎসক আপন জনপদে মানুষ বাঁচাতে ভিষণ ব্যস্ত। ঝুঁকির মধ্যে কর্ম। এর মধ্যে হঠাৎ করে শুনি সে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে নিজেই হাসপাতালে। বেদনা জাগে মনে। এরপর লকডাউনে পড়ে আর দেখা হয়না। কথা হয় ফোনে। কিন্তু স্বপ্নটা সে আর বলেনা। সুস্থ হয়ে আবার করোনা যোদ্ধা রাকিবুর মহা ব্যন্ত হয়ে যান। গত এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ফোন আসে রাকিবুরের দাদা সময় দেন। গ্রামে যাবো যেখানে আমার শেকড়। আমি মোটে সময় বের করতেই পারিনা। আজ কাল নয় পড়শু এইসব চলছিলো করোনা লক ডাউনে। রাকিবুর নাছোড়বান্দা গতকাল জোর করেই বলেছে কাল যেতেই হবে। আমি রাজি হয়ে যাই।
রাকিবুরের বাড়ির সদর রাস্তার ধারে বৈঠকখানায় আমার ৮জন তরুণ সঙ্গী নিয়ে বসি। গ্রাম মানে নিভৃত গ্রাম। বলেশ্বর নদীর বেড়িবাঁধটা সহজেই দেখা যায়। কচুবাড়িয়া আর খেতাছিড়া গ্রামের ঠিক সীমান্তবর্তী সম্ভ্রান্ত রাকিবুরের ঘর। বাড়ির সামনে মসজিদ সদ্য খননকৃত বিশাল এক দিঘী ।
রাকিবুর তার স্বপন্নটা বলতে থাকেন …আমি শুনতে থাকি..। দাদা
ঐ যে দেখছেন ইটের পর ইট গাঁথা হচ্ছে ওখানে একটা হাসপাতাল বানাচ্ছি। নদী তীরের মানুষ চিকিৎসা পায়না। আমি তাদের সহজলভ্য চিকিৎসা বিনামূল্যে দিতে চাই। আজ আপানাকে দিয়ে আমার পানিমূল মানুষের হাসপাতালের ভিত্তি প্রস্তরটা উদ্বোধন হয়ে গেলো।
রাকিবুর আমাকে টেনে নিয়ে যান তার নতুন দিঘীর দিকে। বিশাল দিঘী । এখানে দেশী মাছের চাষ হবে। দিঘীর পাড়ে একটা পানি শোধনাগার হবে গায়ের মানুষের সুপেয় পানি নাই। আর পুকুরের চারপাশ জুড়ে ফুল আর ফলদ বৃক্ষ বেড়ে উঠবে। তার মাঝখানে পাকা রাস্তা হবে। প্রতিবছর মাঘি পূর্ণিমায় এই দিঘীজুড়ে জোছনা উৎসব হবে। মেলা বসবে দিঘীর চারপাশ জুড়ে ।

আমি এই সহজ সরল তরুণের স্বপ্নের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি।
রাকিবুরের কথা শেষ হয়না। বলতে থাকে দাদা, পরিবেশ ও কৃষি বান্ধব সমাজ নামে একটা সংগঠন গড়ে তুলতে চাই। এ সংগঠন বিপন্ন কৃষকের পাশে দাড়াবে। কৃষির লড়াইয়ের অংশীদার হবে। কচুবাড়িয়া আর খেতাছিড়া হবে কৃষি পল্লী । আমার গায়ের মানুষের জীবনযাত্রা বদলে যাবে। মানুষকে পরিবেশ বান্ধব আর সু নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে লড়াইটা চালাতে চাই। কৃষিতে বিপ্লব হবে। রাকিবুল মায়ামুগ্ধ মাটিতে হাত দেয় আর বলতে থাকে এই পলিমাটিতে বহুমুখি শস্য দানা ফলবে। আমরা নিরাপদ জীবনে সবাইকে নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই।
আমি রাকিবুরের স্বপ্নময় মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। আর ভাবতে থাকি শেকড়ের টান আসলে মানুষকে আবেগতাড়িত করে বুঝিবা। আবার ভাবি শৈশব ভোলেনা যে মানুষ সে মানুষ শুদ্ধ জীবনের প্রার্থনায় আসলে নিমগ্ন।
এত স্বপ্ন খেলা করছে কেন রাকিবুল ? সে বলে ওঠে সব দাদা আপনার প্রতি নিমগ্নতা আর ভালোবাসা।
আমি থ বনে যাই ! ভাবি আমাদের পূর্ব পুরুষরা আসলে বাউল আর বনজীবি ছিলো। তারা পানিমূলে লড়াই করে সভ্যতা এতদুর নিয়ে এসেছেন। রাকিবুল সহজ মানুষের মতোন আমার হাত চেপে ধরে বলে ওঠেন, দাদা আপনাকে পাশে চাই।
আমি তরুণকে আশ্বস্থ করি । আমি রাকিবুল আপনার স্বপ্ন সারথী।
সহজ রাকিবুরদের পরিবেশ ও জনবান্ধব স্বপ্নগুলো বেঁচে থাক , মানুষের জয় হোক।
🌿

দেবদাস মজুমদার
খেতাছিড়া
সাপলেজা
মঠবাড়িয়া পিরোজপুর।
রবিবার । ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ১৭ মে ২০২০। ২৩ রমজান ১৪৪

Leave a Reply

x

Check Also

মঠবাড়িয়া ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ মেরামতের জন্য ৫কোটি টাকা বরাদ্দ পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় ঘুর্ণিঝড় আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্থ বেড়িবাঁধ বুধবার দুপুরে পরিদর্শণ করেন পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব:) ...