ব্রেকিং নিউজ
Home-এক্সক্লুসিভ-নাইয়াটের প্রাণের প্রার্থনা

নাইয়াটের প্রাণের প্রার্থনা

খাইরুল ইসলাম বাকু >

নাইয়াটের সাথে পরিচয় মাত্র তিনদিন, গত পরশু জুবায় শিশুদের জন্য আমাদের পরিচালিত বিনোদন কেন্দ্র (চাইল্ড ফ্রেন্ডলি স্পেস) পরিদর্শন কালে প্রায় চার বছর বয়সী ফুটফুটে ছোট্ট নাইয়াট কাছে আশে, ‘মালে’ বলে ওর মাতৃ ভাষায় অভিবাদন জানিয়ে নিজের আঁকা ছবি দেখতে দেয়, পি. ও. সি (প্রটেকশন অফ সিভিলিয়ান), চাইল্ড ফ্রেন্ডলি স্পেস বা পুরো সাউথ সুদানেই বিদেশিদের দেখে শিশুদের এই আচরণ মোটামুটি স্বাভাবিক, নাইয়াটের ভাষায় ও হাসিতে অভিবাদনের জবাব দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে মনোযোগ দিলে সহকর্মী আনেত নাইয়াট সম্পর্কে বলতে শুরু করে, ও চাইল্ড ফ্রেন্ডলি স্পেসের বাইরে কেস ব্যাবস্থাপনার আওতায় আমাদের একজন উপকার ভুগী..

এখন থেকে আট মাস পূর্বে নাইয়াট প্রায়ই অসুস্থ হয়ে যেত, পি ও সির ধুলো, ময়লার অসাস্থ্যকর পরিবেশে থাকে, রোগ, ব্যাধি সহজেই ধরা দিতে পারে, এম, এস, এফ ক্লিনিক শুরুর দিকে টি, বি অনুমান করে মেডিকেশন শুরু করে, কিন্তু দিন দিন উন্নতিতো নয়ই বরং অবনতির দিকে যেতে থাকলে অধিকতর পরীক্ষায় যে রোগটি ধরা পরে তা পৃথিবীর চিকিৎসা বিজ্ঞানের উর্ধে, বিজ্ঞানের এ উৎকর্ষের যুগেও চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা আজো এর প্রতিশোধক আবিষ্কারের কোনো সু খবর দিতে পারে নি

বুকের ভিতরটা হু, হু করে ওঠে, এক দৌড়ে গিয়ে নাইয়াটকে কোলে নেই, সব কিছু ভুলে মুহূর্তেই বাবা হয়ে যাই, হৃদয়ের বাৎসল্য রস চোখদিয়েও বইতে শুরু করে
নাইয়াট হঠাৎ আমার এমন আচরণে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়, ও ওর ব্যাধি সম্পর্কে অবগত নয়, বুঝবার বয়স ও ওর নয়, বুঝতে দেয়াটাও অন্যায়, দ্রুত ওর আঁকা ছবি দেখায় মন দেই, খাতায় ওর আঁকা ছবি দেখতে গিয়ে কভার পেজে হিমালয়ের ছবি দেখে দ্বিতীয়বার বুকের ভিতরটা হু, হু করে ওঠে, হিমালয় সমান এক পৃথিবী যার সামনে দাঁড়িয়ে তাকে সুনিশ্চিত মৃত্যুর ব্যাধিতে বিদ্ধ করে স্রস্টার এ কোন খেলা ?

অনেকের মতো আমিও ভেবেছিলাম হয়তো এ মরণব্যাধি নাইয়াট মাতৃগর্ভেই পেয়েছে, কিন্তু ওর মা সহ পুরো পরিবারের অন্য কেউ আক্রন্ত নয়, হয়তো শৈশবে চিকিৎসা নিতে গিয়ে আক্ৰান্ত কারো ব্যাবহৃত সেনসেটিভ চিকিৎসা সামগ্রী অসচেতন ভাবে ওর ক্ষেত্রে ব্যাবহৃত হয়েছে, এমন ও হতে পারে অন্য কোনো আক্রান্ত শিশুর সাথে খেলার ছলে জীবাণু বহনের মতো রক্তের উপযুক্ত সংযোগ ঘটেছে
নাইয়াটের আসন্ন ক্ষুদ্র জীবনের কথা ভেবে ওর জন্য কিছু করতে খুব মন চায়, ইচ্ছে হয় ওর অবশিষ্ট প্রতিটি দিন হাসিতে, খুশিতে ভরিয়ে দেই, কিন্তু জীবনের গল্প ছিনেমার রঙে রঙিন নয়
অফিসিয়ালি খুব বেশি কিছু করার সুযোগ নেই, আমাকে নিয়ম মেনে নিরপেক্ষ থেকেই করতে হবে, তাছাড়া ব্যাক্তিগত ইচ্ছা, ভালো লাগার বাস্তবায়নের দায় অফিসকে দেয়াটা অন্যায় ও ক্ষমতার অপব্যাবহার, মন থেকে সায় পাই না, অবশিষ্ট প্রতিটা দিন না পারি অন্তত একটা বিকাল/ দুপুরের জন্য তো ওকে আলাদা করে উপহার দিতে পারি,

আজ এক দুপুর ও বিকেলের জন্য নাইয়াটাকে পি ও সির গন্ডির বাহিরে নিয়ে আসি, পি ও সি তেই ওর জন্ম, মুক্ত পৃথিবী হয়তো এর আগে দেখা হয়নি কোনোদিন, বাহিরের মুক্ত পৃথিবী দেখে ওর মুগ্ধ চাহনি সত্যিই ভুলবার নয়,
সেদিন আর আজকের একই পোশাক দেখে জানতে চাইলে সহকর্মী জানায় এটাই ওর একমাত্র পোশাক, যুবার কোনোকোনোতে (ঢাকার বঙ্গ বাজারের মতো) শিশুদের পোশাকের কোনো দোকানে নিয়ে গেলে একসাথে অনেকগুলো পোশাক দেখে ওর বিশ্বয়ের শেষ থাকে না, স্থানীয় আরবি বা ইংলিশ না জানায় সহকর্মীর মাধ্যমেই ওর সাথে ওর ভাষায় যোগাযোগ করতে হয়
এখানে রঙের এতো ছড়াছড়ি কিন্তু ও যে কেবল পি ও সির মলিন পোশাক দেখে দেখেই এটুকু বড়ো হয়েছে, যেটা দেখে সেটাই ভালো লাগে, কোনটা ছেড়ে কোনটা নেবে দ্বিধা দ্বন্ধে পরে যায়, জুতার দোকানে গিয়ে ওর চোখ চক চক করে ওঠে, ওর সাথে বেমানান কোনো একটা চকচকে জুতা দেখেই পরে ফেলে, আমার ও সাথে থাকা সহকর্মীর বুঝতে বাকি থাকে না এটা ও যে কোনো মূল্যে নিতে চায়, হয়তো এমন কোনো জুতায় অন্য কাউকে দেখে মনে মনে পড়ার ইচ্ছা জিইয়ে রেখেছিলো

প্রয়োজনীয় ও ইচ্ছা অনুযায়ী শপিং শেষে ফেরার পথে নাইয়াট আমার সহকর্মীর কাছে ওর ভাষায় আমার পরিচয় জানাতে চায়, ভাবনায় পরে যাই, কি উত্তর দেই, মানুষ? কিন্তু মনুষত্বের ছিটে ফোটার দেখোতো ওর সমাজে নেই, নিজ দেশে প্রবাসী হয়েই ওর জন্ম, গোত্র, গোত্রের চলমান সংঘাত ওদের মতো শিশুকেও বাবা, ভাইদের মৃত্যুকে স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে শিখিয়েছে, ওদের সমাজে মায়েরা বছর বছর সন্তান নয় যোদ্ধার জন্ম দিয়ে চলেন, হাসি দিয়ে সবগুলো উপহার ওর দেখানো ছবির পুরস্কার বলে প্রশ্ন এড়িয়ে যাই, কি লাভ মনুষ্যত্বের এ ক্ষণিক পরিচয়ে ?

লেখক : মঠবাড়িয়া প্রবাসি, একটি আন্তর্জাতিক মানবিক উন্নয়ন সংস্থায় দক্ষিণ সুদানে কর্মরত।

Leave a Reply

x

Check Also

মঠবাড়িয়ায় সাপের কামড়ে প্রাণ গেলো গৃহবধূর

মঠবাড়িয়া প্রতিনিধি 🔻 পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় সাপের কামড়ে সীমা রানী বিশ্বাস(৩৪) নামে এক গৃহবধুর মৃত্যু ঘটেছে। ...