মনোতোষ হাওলাদার, বামনা(বরগুনা) >>

বরগুনার বামনা উপজেলার রুহিতা গ্রামের অশীতিপর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার (অব.) হাতেম আলী হাওলদার দীর্ঘদিন ধরে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। অর্থাভাবে তার উন্নত চিকিৎসা চলছে না।

সুবেদার হাতেম আলী গত ২০১৪ সালের ১৫ আগস্ট মস্তিস্কে রক্তক্ষরণজনিত রোগে আক্রান্ত হন। এর পর তাকে ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে গুরুতর অবস্থায় ঢাকা সিএমএইচ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে কয়েকদফা তাকে কেমোথেরাপী দেওয়া হয়। এর পরে তিনি বরিশাল সিআরপি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তার শরীরের বাম অংশ পক্ষাঘাতে আক্রান্ত। এ ব্যয়বহুল চিকিৎসায় তার প্রায় এ যাবৎ ৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে বলে মুক্তিযোদ্ধার পরিবার সূত্রে জানা গেছে।

বর্তমানে অর্থের অভাবে তার উন্নত চিকিৎসা চলছে না। একদিন দেশ মাতৃকার জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন তিনি। আজ তিনি জীবনের শেষ বেলায় এসে কার্যকর চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত।

মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার (অব.) হাতেম আলী হাওলাদার ১৯৩১ সালে বরগুনার বামনা উপজেলার রুহিতা আমতলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সাব-সেক্টর পটুয়াখালী, সেক্টর-৯ এর অধীনে কমান্ডার হিসেবে আমতলী-কলাপাড়া এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন।

অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার (অব.) হাতেম আলী হাওলদার জানান, তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে নবম সেক্টরের অধীনে আমতলী-কলাপাড়া এলাকায় যুদ্ধকালীন কমান্ডার ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে পটুয়াখালী সাব-সেক্টরের হাই কমান্ড-কমান্ডার কাপ্টেন মেহেদী আলী ইমাম তাকে কমান্ডার হিসাবে নিযুক্ত করে পটুয়াখালী জেলার ১০ টি থানায় বিচ্ছিন্নভাবে থাকা বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাহিনীকে একক কমান্ডের আওতায় আনার জন্য লিখিত নির্দেশ প্রদান করেন। তার একক প্রচেস্টায় বিচ্ছিন্ন থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাহিনী দলকে একক কমান্ডের আওতায় নিয়ে আসেন। এর মধ্যে মরহুম এমপি সিদ্দিকুর রহমানের বাহিনী উল্লেখযোগ্য। তার পরামর্শক্রমে হাই কমান্ড ১০ টি থানাকে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত করে, ট্রাপ্স কমান্ডার নির্ধারণ করে লিখিত আদেশ নামা জারী করেন। এরপর তিনি আমতলী-কলাপাড়া এলাকার দায়িত্ব পান।

নভেম্বর ’৭১ এর মাঝামাঝি সময়ে আমতলী থানার আগাঠাকুরপাড়া নামক স্থানে পাকবাহিনী কলাপাড়া তার বাহিনীর উপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। তখন বেলা আনুমানিক ১.৪৫ মিনিট বাহিনী নিয়ে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে জোড়ালো প্রতিরোধ করেন। আক্রমণের মুখে পাক বাহিনী সেদিন পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই সম্মুখ যুদ্ধে পাকবাহিনীর দুইজন প্রাণ হারায় এবং অনেক আহত হয়। পরবর্তিতে খেপুপাড়া থানা আক্রমণ করে খেপুপাড়া থানা মুক্ত করেন।

এরপর হাইকমান্ডের নিদের্শে পাথরঘাটা থানায় আক্রমণ পরিচালনা করে পাথরঘাটা থানার দায়িত্ব প্রাপ্ত কমান্ডার আলমগীর জহির সাহেবের সহায়তায় পাথরঘাটা থানার মুক্ত করে বাহিনী নিয়ে আমতলী অঞ্চলে চলে যান। পরে আমতলী এলাকার পচাকোড়ালিয়া ইউনিয়নে বাহিনী নিয়ে অবস্থান করেন। সেখানে সম্মূখ যুদ্ধে সি, আই, আনোয়ারসহ আরো প্রায় ৩৫ জন রাজাকার আটক করেন । ১০ই ডিসেম্বর মিত্র বাহিনী এয়ার ক্রাফট পাক বাহিনীর ২টি গান বোট আক্রমণ করে। সাগর দিয়ে গান বোট দুটি চট্টগ্রাম মুখে পালিয়ে যাওয়ার সময় গান বোটের অবস্থান লক্ষ্য করে পিছু ধাওয়া করে মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ চালায়।

শত্রু বাহিনী টিকতেনা পেরে আত্মসমর্পন করে। এ বিজয়ে আমতলী কলাপাড়া এলাকার হাজার হাজার জনতা জয় বাংলা ধ্বনি দিয়ে আমাকে স্বাগত জানায়। এই সময় রাজাকাররা স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করতে থাকে। দেশ স্বাধীন হলে ৭২ এর মাঝামাঝি সময় তিনি হেড কোয়াটারে হাই কমান্ডের নিকট আমার অস্ত্র ও গোলা বারুদ হস্তান্তর করেন এরপর সেনাবাহিনীর চাকুরিতে পুনরায় যোগদান করি।

বর্তমানে এ বীর মুক্তিযোদ্ধা দীর্ঘদিন ধরে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে এখন শয্যাশায়ী। অর্থভাবে তার উন্নত চিকিৎসা চলছে না।

এ ব্যাপারে বামনা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সাবেক কমান্ডার মো. জয়নাল আবেদীন খান জানান, মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার (অব.) হাতেম আলীর শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়া তাকে এখন উন্নত চিকিৎসা প্রদান করা জরুরি। পরিবারের পক্ষে তার চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন সম্ভব নয়। তাই সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন