দেবদাস মজুমদার▶️

গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে স্বৈরাচার বিরোধি আন্দোলনে জীবনদানকারী শহীদ নূর হোসেনের জন্ম ভিটা পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার নিভৃত পল্লী সাপলেজা ইউনিয়নের ঝাঁটিবুনীয়া গ্রামের বাড়িতে স্মৃতি রক্ষার দাবি জানিয়েছেন তাঁর বংশধর ও স্থানীয় গ্রামবাসি। আজ ১০ নভেম্বর শহীদ নূর হোসেন দিবস। গণতন্ত্রের জন্য লড়াই সংগ্রামের অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৮৭ সালের এ উত্তাল দিনে স্বৈও শাসনের বিরুদ্ধে মুক্তিকামী মানুষের আন্দোলন -সংগ্রামে যুবলীগ কর্মী নূর হোসেন প্রতিবাদি যুবকের জীবন্ত পোসটার হয়ে ঢাকার রাজপথে নেমে এসছিলেন । তাঁর উদোম বুকে পীঠে স্বৈচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক লিখে হাজারো মানুষের প্রতিবাদে অংশ নেন যুবক নূর হোসেন। সেদিন স্বৈরাচারের সশস্ত্র বাহিনী জনতার প্রতিবাদ মিছিলে নির্বচারে গুলি চালিয়ে নূর হোসেনের বক্ষ ঝাঁঝরা করে দেয়। প্রতিবাদী নূর হোসেনর বুকের রক্তে সেদিন ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়। সেদিন গুলিতে শহীদ হন আরেক যুবলীগ নেতা নূরুল হূদা ও ক্ষেতমজুর নেতা আমিনুল হুদা টিটো। নূর হোসেনের রক্তধারা ও তাঁর জীবনদানে স্বৈরাচার বিরোধি লড়াই বেগবান হয়। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচার শাসকের পতনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ঘটে। শহীদ নূর হোসেন আমাদের অধিকার ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠেন। প্রতিবছর ১০ নভেম্বর নূর হোসেন দিবস হিসেবে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়।

অকুতোভয় সংগ্রামী নূর হোসেনের পৈত্রিক বাড়ি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার নিভৃত পল্লী সাপলেজা ইউনিয়নের ঝাঁটিবুনীয়া গ্রামে । দুর্ভাগ্য এই যে পৈত্রিক ভিটায় তাঁর স্মৃতি সুরক্ষায় আজও গড়ে ওঠেনি কোন স্মৃতি স্তম্ভ।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে মঠবাড়িয়া উপজেলা সদর হতে ১৪ কিলোমিটার দুরে শহীদ নূর হোসেনের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তাঁর বংশধরদের সাথে কথা হয়। নূর হোসেনের বড় চাচা মৃত মোকলেসুর রহমানের দুই ছেলে ওই বাড়িতে আলাদা বসবাস করেন। নূও হোসেনর পৈত্রিক ভিটায় তাঁর চাচাত ভাই স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম মো. রুহুল আমীন হাওলাদার বসবাস করেন।
তিনি জানান, নূর হোসেনের বাবা ও চাচারা পাঁচ ভাই । নূর হোসেনর বাবা মজিবর রহমান হাওলদার ২০০৫ সালে মারা যান। তিনি পাঁচ ভাইদের মধ্যে তৃতীয় ছিলেন। এ ছাড়া নূর হোসেনের অপর তিন চাচা মোকলেসুর রহমান হাওলাদার চাঁন মিয়া হাওলাদার, রত্তন আলী হাওলাদার মারা গেছেন । নূর হোসেনের ছোট চাচা লাল মিয়া হাওলাদার বেঁচে আছেন। তিনি রাঙামাটিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। তবে গ্রামে বড় চাচা মৃত মোকলেসুরের সন্তানরা ছাড়া বংশধরদের কেউ থাকেন না।

নূর হোসেনের পৈত্রিক ভিটায় বসবাস করেন তাঁর চাচাত ভাই মো. রুহুল ামীন হাওলাদার। তিনি জানান, তাঁর চাচা মজিবর রহমান( নূর হোসেনের বাবা) দেশ স্বাধীনের আগে কাজের সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় যান সেখানে তিনি অটো রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তবে নিয়মিত গ্রামে আসা যাওয়া করতেন নূর হোসেনের জনম ঢাকায়। তারা চার ভাই ও এক বোন । নূর হোসেন দিবতীয় সন্তান। তাঁর অপর ভাইয়েরা হলেন, আলী হোসেন, দেলোয়ার হোসেন, আনোয়ার হোসেন ও বোন শাহানা বেগম। সকলেই ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। তবে চাচা মজিবর রহমান সনতানদেও নিয়ে গ্রামে বেড়াতে আসতেন। নূর হোসেনও গ্রামে আসত।

তখন গ্রামে মোবাইল ছিলনা আমরা ঘটনার দিন রাত ১২টার দিকে গ্রামে খবর পাই সদরের টেলিফোন অফিসের মাধ্যমে যে নূর হোসেন ঢাকায় গুলিতে মারা গেছে। দুইদিন পর আমরা বিস্তারিত জানতে পারি। নূর হোসেন শহীদ হওয়ার পর ামার চাচা কয়েকবার গ্রামের বাড়ি আসছেন । ২০০৫ সালে তিনি মারা যান । তবে চাচাত ভাই ও বোনের সাথে আমাদের কথা হয়। তারা ব্যস্ততায় গ্রামে বেড়াতে আসতে পারেন না।
তিনি বলেন, আমার ভাই গণতন্ত্রের জীবন দিছে । এই গর্ব শুধু আমাদের না গ্রামবাসি ও দেশের। তবে জন্ম ভিটায় শহীদ ভাইয়ের স্মৃতি সুরক্ষায় কোন ব্যবস্থা হইল না। শহীদ ভাইয়ের নামে একটা এবতেদায়ী মাদরাসা করছিলাম পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তা এখন অচল হয়ে পড়ে আছে। গ্রামের কাঁচা রাস্তায় কেবল এ বছর ইট বিছানো হইছে। এর বাইরে আর কিছু না। মাদারাসাটা চালু করতে চাই, পাশে একটি পাঠাগার আর শহীদ ভাইয়ের একটি স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ চাই। সরকার চাইলে কালকেই এসব হতে পারে। শহীদের পৈত্রিক অবহেলার বিষয় যেন না হয় এ দাবি জানাই।

জানাগেছে, ঢাকায় মঠবাড়িয়া বাসি কয়েকজন তরুণ মিলে শহীদ নূর হোসেনের স্মৃতি রক্ষায় জাগো লক্ষ নূর হোসেন নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এছাড়া নূর হোসেনের গ্রাম ঝাঁটিবুনীয়া ও পূর্ব সাপলেজা গ্রামের কতিপয় তরুণ মিলে গড়ে তোলেন নূর হোসেন স্মৃতি পরিষদ। সংগঠন দুটি শহীদ নূর হোসেন দিবসে স্মরণসভার আয়োজন ছাড়া কিছুই করতে পারছেন না।
নূর হোসেন স্মৃতি পরিষদেও অন্যতম উদ্যোক্তা মো. নূরুল আমীন রাসেল বলেন, ১৯৯২ সালে আমরা গ্রামের তরুণরা মিলে সংগঠনটি গড়ে তুলি। কিন্ত সরকারী কোন পৃষ্ঠপোষকতা ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের তেন সাড়া না পেলেও ামরা তরুণরা মিলে দিবসটি কোনমতে পালন করে আসছি । তবে শহীদ নূর হোসেনের পৈত্রিক ভিটয় একটি স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ ও একটি পাঠাগার নির্মাণের দাবি জানাই।

জাগো লক্ষ নূর হোসেন সংগঠনের আহ্বায়ক মো. রাসেল সবুজ বলেন, শহীদ নূর হোসেনের জন্য আমরা গর্ব বোধ করি। কারন তিনি আমাদের মঠবাড়িয়ার সূর্য সন্তান। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সুরক্ষার প্রতীক এই তরুণ। তাঁর পৈত্রিক ভিটায় স্মৃতি সুরক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ জরুরী। জাগো লক্ষ নূর হোসেন সংগঠনের পক্ষ হতে মঠবাড়িয়া উপজেলা সদরে একটি ভাস্কর্য, পৈত্রিকভিটায় ম্যূরাল নির্মাণ, একটি পাঠাগার নির্মাণের দাবি জানাই। সেই সাথে মঠবাড়িয়া সদর হতে সাপলেজা-ঝাঁটিবুনীয়া সড়কটি নূও হোসেনের নামে নামকরণের দাবি জানাচ্ছি।

স্থানীয় নলী ভীমচন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, শহীদ নূর হোসেন এখন সংগ্রামের প্রতীক। আমাদের স্কুল গুলোর ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যেমন খুশী তেমন সাজে নূর হোসেন একটি প্রতীকি সাজ হয়ে উঠছে। এ শহীদের জন্মভিটায় স্মৃতি সুরক্ষা করা গেলে ভবিষ্যত প্রজন্ম দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে।

এ বিষয়ে সাপলেজা ইউপি চেয়ারম্যান মো. মিরাজ মিয়া বলেন, আমি গর্বিত যে শহীদ নূর হোসেন আমার ইউনিয়নের কৃতি সন্তান। তাঁর পৈত্রিক ভিটায় স্মৃতি সুরক্ষা করা হলে আগামী প্রজন্ম অনুপ্রাণিত হবে।

মঠবাড়িয়া উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আশরাফুর রহমান বলেন, শহীদ নূর হোসেন গণতন্ত্র ও মানবাধিার সুরক্ষার প্রতীক। বিপ্লবী এ তরুণ আমাদের মঠবাড়িয়ার কৃতি সন্তান। দেশ প্রেমিক এ তরুণ এখন কোন সাধারণ তরুণ নন। তাঁর জীবনদান ঐতিহাসিকভাবেই স্বীকৃত। আমাদের দ্রোহ ও সংগ্রামের প্রতীক নূর হোসেনের পৈত্রিক ভিটায় স্মৃতি সুরক্ষা প্রয়োজন। সেই সাথে মঠবাড়িয়া পৌর শহরের দর্শনীয় স্থানে একটি ভাস্কর্য অথবা ম্যূরাল নির্মাণও জরুরী ।

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন