নূর হোসেইন মোল্লা▶️

খান সাহেব হাতেম আলী জমাদ্দার বলেশ্বর ও বিষখালী নদীর মধ্যবর্তী ভূ-ভাগে জননন্দিত নেতা ছিলেন। তিনি ১৮৭৭ সালে পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার উত্তর মিঠাখালী গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হেলাল উদ্দিন জমাদ্দার এবং মাতার নাম সহর বানু। তাঁর পিতামহ ফরাজ উল্লাহ জমাদ্দার অষ্টাদশ শতাব্দী প্রথম ভাগে রাজাপুর উপজেলার গালুয়া থেকে মঠবাড়িয়া এসে উত্তর মিঠাখালী গ্রামে বসতি স্থাপন করেন এবং সাপলেজায় প্রায় পাঁচশত একর ভূমি আবাদ করেন। হাতেম আলীর পিতার প্রতিষ্ঠিত মক্তবে লেখাপড়া শেষ করে পিরোজপুর সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেনী পাশ করেন। ইতোমধ্যে তিনি বলেশ্বর ও বিষখালী নদীর মধ্যবর্তী ভূ-ভাগের আর্থ-সামাজিক অবস্থার সাথে পরিচিত হন এবং এ অঞ্চলের জনগণের সার্বিক উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি ১০৫ বছর জীবিত ছিলেন। এর মধ্যে বাল্যকাল এবং মৃত্যুর পূর্বের একযুগ ছাড়া বাকী সবটাই ছিল কর্মবহুল। ১৯২০ সাল থেকে মঠবাড়িয়া ইউনিয়ন বোর্ডের (বর্তমানে পরিষদ) চেয়ারম্যান, শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হকের কৃষক প্রজা আন্দোলনে যোগদান, পূর্ব বাংলা কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের সদস্য, পরিচালক ও সভাপতি, মঠবাড়িয়া কেন্দ্রীয় সমবায়ের ব্যাংকের সভাপতি, কে.এম. লতীফ ইনস্টিটিউশনের সেক্রেটারী, নিখিল বাংলা ঋণ সালিশী বোর্ডের সদস্য, এ অঞ্চলের ঋণ সালিশী বোর্ডের চেয়ারম্যান, বরিশাল জেলা বোর্ড ও শিক্ষা বোর্ডের সদস্য, ১৯৩৭ সাল থেকে বংগীয় আইন পরিষদ এবং তৎকালীন পূর্ব পকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য পদ অর্জন ইত্যাদি তাঁর পুরো জীবনটাই ঢেকে রেখেছে। তিনি ১৯২৬ সালে মঠবাড়িয়া কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক, মঠবাড়িয়ার খাসমহলের অফিসার আবদুল লতিফ চৌধুরী সহতায় ১৯২৮ সালে কে. এম. লতীফ ইনিস্টিটিউশন, ১৯৬৮ সালে হাতেম আলী বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় সহ এ অঞ্চলে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কৃষক সমবায় সমীতি. রাস্তাঘাট ইত্যাদি নির্মাণ করেন। জনসেবায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখায় তৎকালীন সরকার ১৯৩৪ সালে হাতেম আলী জমাদ্দারকে “খান সাহেব” উপাধিতে ভূষিত করেন। তিনি ছিলেন বলেশ্বর ও বিশখালী নদীর মধ্যবর্তী ভূ-ভাগের তথা মঠবাড়িয়া, পাথরঘাটা, বামনা, কাঁঠালিয়া ও ভান্ডারিয়া উপজেলার অর্ধ শতাব্দীর জীবন্ত ইতিহাস।
১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর এবং ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের জাতীয় পরিষদে ৩০০ সাধারণ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬০টি আসন লাভ করে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এবং সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান জনপ্রতিনিধিগণের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে বাঙ্গালি নিধন পরিকল্পনা “অপারেশন সার্চ লাইট” ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত ১১টা ৩০ মিনিটে শুরু করলে বঙ্গবন্ধু রাত ১২টা ২০ মিনিটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীকে সহায়তা করার জন্যে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান কাউন্সিল মুসলিম লীগ প্রধান খাজা খয়ের উদ্দিন এর নেতৃত্বে ৯ এপ্রিল ঢাকায় ১৪০ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি শান্তি কমিটি গঠিত হয় এবং প্রত্যেক জেলা, মহকুমা, থানা ও ইউনিয়নে শান্তি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয় হয়।
কর্ণেল আতিকুর রহমান এবং ক্যাপ্টেন এজাজ আহমেদের নেতৃত্ব হানাদার পাকিস্তানী বাহিনী ৪ মে পিরোজপুর শহর দখল করে। মঠবাড়িযায় মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার কন্ট্রোল রুম কমান্ডার ফখরুউদ্দিন আহমেদ বিশ্বাসঘাতকতা করে ৫ মে অস্ত্র ও গোলাবারুদ পুলিশের কাছে জমা দিলে মুক্তিযোদ্ধারা আত্মগোপনে চলে যান। ওই দিন বিকেলে মঠবাড়িয়া পুলিশ সার্কেল অফিসার জালাল উদ্দিন মঠবাড়িয়ার কৃতি ছাত্র গনপতি হাওলাদারকে গ্রেপ্তার করেন। (মঠবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের সম্মুখ থেকে)। ৬ মে পুলিশ আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, ছাত্র লীগ ও ছ্ত্রা ইউনিয়নের নেতা ও কর্মীদেরকে ধর-পাকড় শুরু করে। এদিন জাকির হোসেন পনু মাষ্টার, জিয়াউজ্জামান, ফারুকউজ্জামান, গোলাম মোস্তফা, আনোয়রুল কাদির, আবদুল মালেক, আবদুল জলিল, নুরুল ইসলাম বি.এসসি সহ ১৪ জন আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতা কর্মীকে গ্রেপ্তার করে। খান সাহেব হাতেম আলী জমাদ্দার এবং আমড়াগাছিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল হাসেম হাওলাদার (ধলু মিয়া) তাদেরকে ছেড়ে দেয়ার জন্য সি.আই. জালাল উদ্দিন এবং ও.সি. আবদুস সামাদকে অনুরোধ করেন। তাঁদের অনুরোধে জাকির হোসেন পনু মাষ্টার, নুরুল ইসলাম বি.এসসি, ফারুকউজ্জামান, আবদুল জলিল সহ ৬ জনকে ছেড়ে দেয়। ৯ মে অবশিষ্ট ৮ জনকে পিরোজপুর কোর্টে চালান দেয়। ওই দিন রাতেই তাদেরকে গুলি করে হত্যা করে। জাকির হোসেন পুন মাষ্টার (মরহুম) এ লেখককে জানিয়ে ছিলেন যে, ওই সময়ে খান সাহেব হাতেম আলী জমাদ্দার যে ভূমিকা রেখেছেন, তাতে সবারই মুক্তি পাওয়ার কথা। কিন্তু জামায়াতের নেতা ডাঃ আনিসুর রহমান পিরোজপুরে অবস্থানরত ক্যাপটেন এজাজকে অবহিত করলে সি.আই জালাল উদ্দিন এবং ও.সি. আবদুল সামাদ তাদেরকে ছেড়ে দেননি।

( চলবে)

লেখকঃ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, মোবাইল নম্বর- ০১৭৩০-৯৩৫৮৮৭

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন