খায়রুল বাশার আশিক 🔶
যেখানে হাসি-খুশি ও আনন্দ-উল্লাসে বেড়ে ওঠার কথা, সেখানে শুধুই দারিদ্রের কষাঘাত। যে শিশুটির হাতে থাকার কথা ছিলো বই, সেই শিশুটিই হাতে মাছ ধরার বর্শি নিয়ে দিনভর ঘুরে বেড়ায় নদীর বা খালের ধারে। স্কুলের হাজিরা খাতায় কোন না কোন শ্রেনীতে নাম থাকলেও যাওয়া হয়না ক্লাসে। যে চোখে স্বপ্ন দেখার কথা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের, সেই চোখ নির্ঘুম রাত জাগে খুব সকালে উঠে বাবার কর্মের সাথী হবে বলে। দারিদ্রের যাতাকলে নিষ্পেষিত এমন জীবন কাটে উপকূলের হাজারো শিশুর। উপকূলীয় প্রান্তিক শিশুদের অন্তহীন দুর্দশার এই চিত্র দেখা গেছে উপকূলীয় জেলা বরগুনার একাধিক আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলোতে। শিশু অধিকারের কথা জানেনে পরিবারের কেউ, আর শিশু সুরক্ষা যেন অর্থহীন বার্তা এইসব পল্লিগুলোতে।
বরগুনার আশ্রয়ন প্রকল্পগুলোয় বাসবাসরত এসব শিশুদের চালচিত্র তুলে এনেছেন খায়রুল বাশার আশিকে। দুই পর্বের প্রতিবেদনের আজ পড়ুন সূচনা পর্ব।
১ম পর্ব
প্রতিটি শিশুর মত তাদেরও বেড়ে ওথার কথা ছিলো সমান অধিকার নিয়ে, পাবার কথা ছিলো সমান সুযোগ সুবিধা, কিন্তু সেখানে শৈশব থেকেই সূচনা হয় বিবর্ণ জীবনের। সুষম খাদ্য, একটি শিশুর জন্য একধিক বস্র, ভালো শিক্ষা ব্যাবস্থা যেন এখানে আমাবশ্যার চাঁদ। এমন এক অনিশ্চ্যতায় বিবর্ন হয়ে উঠেছে এসব পল্লির হাজারো শিশুর শৈশব।এখনো প্রতিদিন বাবার কাজের ঘানী শিশু ছেলেটাকেও টানতে হয়। শিশুশ্রমের বেড়াজালে বন্দিজীবন আর বাবার কষ্টের কর্মের সঙ্গি হতে ষষ্ঠ শ্রেনীর গন্ডিতে যাওয়া হয়না অধিকাংশ শিশুদের। ফলে কোমলমতি সব শিশুদের কাঁধে ওঠে সংসারের বোঝা। ভবিষ্যতে নতুন একজন দরিদ্র জন্ম নেয়ার সম্ভাবনাকে বুকে নিয়েই কর্মজীবন শুরুকরে এই পল্লিরগুলোর দরিদ্র সব শিশুগুলো।
বরগুনা পোটকাখালি আশ্রয়ন প্রকল্পের শিশু আবির,বাবুল,মিলন,দিপু আর সাইফুল মারবেল খেলছিলেন বিকেলের রোদে। সকালে থেকে পরন্ত বিকেলে খেলতে আশার আগ পর্যন্ত তারা ব্যাস্ত ছিলেন যে যার কাজে। তাদের পাঁচ জনের মাঝে আবির একাই স্কুল থেকে ফিরেছে, বাকি চারজন ছিলেন কাজে। বাবুল চায়র দোকানে কাজ করে, মিলন মাছের আরতে, আর দিপু কোন কাজ না করেও স্কুলে যায়না। সাইফুল প্রতিদিন সকাল বেলেয় বাবা চাচাদের সাথে গড়ার জাল তুলতে যায়।

শিশু সাইফুল বলেন, স্কুলে যাইতে তো ইচ্ছা করে তয় কামের লইগ্যা জাইতে পারিনা। জোয়ার আওয়ার আগেই জাল পাতি, আর ভাডায় পানি টানলে মাছ লইয়া আইয়া আইতে আইতে স্কুলের ছুটি হইয়া যায়।
মাছের আরতে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কাজ করে ফেরা মিলন(১০) নামের শিশুটি বলেন, আমার পরিবারের ভাইবোনদের মাঝে আমি বড়, আমার ছোট আরো দুইটা ভাইবোন আছে। আমরাতো গরীব, পরিবারের সবাই কি লেখাপড়া করতে পারে? আমি করিনা তবে আমার ছোট ভাইটাকে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি করে দিছি এইবছর।
শুধু ওরাই নয়, দারিদ্রের বেড়াজালে এভাবে হাজারো শিশুর শৈশব ও ভবিষৎ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে উপকূলে। শিশু অধিকারের কথা কাগজে কলমে থাকলেও নেই বাস্তবে। তাই উপকূলের হাজারো শিশু বঞ্চিত হচ্ছে তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে।
শিশুদের সুরক্ষায় ১৯৭৪ সালের শিশু আইন সংশোধন করে ২০১৩ সালের ১৬ জুন সংসদে শিশু আইন ২০১৩ পাস হয়। শিশু আইন ছাড়াও শিশু অধিকার রক্ষায় সরকারের অসংখ্য আইন ও প্রকল্প রয়েছে। এগুলোর মধ্যে জাতীয় শিশু নীতিমালা ২০১১, জাতীয় শিক্ষা নীতিমালা ২০১০ এবং জাতীয় শিশুশ্রম নিরোধ নীতিমালা ২০১০ অন্যতম। আগের তুলনায় শিশুশ্রম কিছুটা কমলেও উপকূলের চরাঞ্চল ও প্রান্তিক দরিদ্র পল্লিগুলোতে এর মাত্রা এখনো অকল্পনীয়।

এই পল্লির বাসিন্দা সেলিম মিয়া (৫৫) বলেন, সব পরিবারই এখন বোঝে যে তাগো পোলাপাইন গুলারে পড়ানো উচিৎ, কিন্তু প্যাডের (পেটের) তাগিদে সবাই তো পড়াইতে পারেনা।
স্থানীয় স্কুল শিক্ষক সুমন চন্দ্র গাইন বলেন, আবাসনের অনেক শিশুরা কাজের কারনে বা পরিবারের আগ্রহ না থাকায় স্কুলে আসেনা। আবার যারাও আসে তারাও প্রতিবেশী শিশুটি স্কুলে না আশার ফলে লেখাপড়া থেকে আগ্রহ হারাচ্ছে। প্রতিনিয়ত ঝরে পরছে স্কুল পড়ুয়া এখানকার শিশুগুলো।

বিষয়টি নিয়ে কথা হলে শিশু বিষয়ক গবেষক, ডঃ মোঃ ইব্রাহিম খলিল বলেন, উপকুল অঞ্চলে শিশুদের শিক্ষিত করতে হবে এমন প্রবন্তা কম পরিলক্ষিত হয়। এর অন্যতম কারন হচ্ছে এই অঞ্চলে দরিদ্র ও অভাবী মানুষের বিচরন বেশি। শিশুদের শিক্ষিত করার প্রবনতা তখন বৃদ্ধি পাবে যখন সমাজ থেকে অভাবকে দূর করা যাবে। প্রতিটি শিশুর জীবনের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পরিবারকে সচেতন করতে পারলে কমে আসবে শিক্ষাবঞ্ছিত শিশুর সংখ্যা।

জন্মের পরেই মা ব্যাতিত পরিবারের অন্য মানুষগুলোর মুখে অন্ধকার নেমে আসে। কারন ঘড়ে জন্মনিয়েছে এক কন্য শিশু। ৪-৫ বছরে পা রাখলেই নামমাত্র স্কুল ছাত্রি, বয়স ১৪-১৫ হলেই চলে পাত্র দেখা, তারপর বিয়ের আয়জন। হয়তো বিয়েও হচ্ছে পার্শবর্তি আশ্রয়ন, জেলেপল্লি, বস্তি বা দরিদ্র কোন গৃহস্থের ছেলের সাথে, অতঃপর ঘরনী কিংবা চাকরানি। উপকূলিয় জেলা বরগুনার একাধিক আশ্রয়ন প্রকল্পগুলোতে এমন চিত্র যেন ধরাবাধা। এসব পল্লিতে জন্ম থেকেই অবহেলেয় বেড়ে ওঠে কন্যা শিশুরা। অতঃপর স্বাস্থ্য ঝুকিতে মা ও শিশু।
বরগুনার আশ্রয়ন প্রকল্পগুলোয় বাসবাসরত এসব শিশুদের চালচিত্র তুলে এনেছেন বরগুনা প্রতিনিধি খায়রুল বাশার আশিকে। দুই পর্বের প্রতিবেদনের আজ পড়ুন শেষ পর্ব।
বরগুনা পৌরসভা ৩ নং ওয়ার্ডের সুজারখেয়া ঘাট আশ্রয়ন প্রকল্পের বাশিন্দা জলীল(৫৫) পেশায় একজন রিক্সা চালক, স্থী ফাতেমা বেগম বাসাবাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে, ঘড়ে তাদের তিনটি সন্তান। ১ম সন্তান হাবিবার জন্মের ৩ বছর পর জন্ম নিয়েছে ২য় সন্তান রাসেল। পরবর্তিতে ২য় সন্তান রাসেলের বয়স ছয় বছর হতেই আবার ফাতেমা বেগমের কোলে এসেছে তার তৃতীয় সন্তান ছাদিয়া। ছাদিয়ার বয়স এখন প্রায় ১ বছর। জলীলের স্থী ফাতিমা কাজে না গেলে পরিবারের ৫ টি পেট চলেনা তাদের। আর ফাতিমা বেগমের কাজে জাওয়ার সুবাদেই ছোট বোন ছাদিয়ার দেকভালের দায়ীত্ব চাপে ১০ বছর বয়সি শিশু হাবীবার উপর। ছোট বোনের দায়ীত্ব কোলে তুলে নিতেই কোল থেকে সরে যায় নিজের বইয়ের বোঝা। গত ১ বছর ধরেই হাবীবা আর স্কুলে যাচ্ছেনা।
স্কুল ছেরে দিয়ে আক্ষেপ নেই হাবিবার, হাবিবা বলেন, কপালে স্কুল না থাকলে যামু কেমনে? মায় তো কামে যায়, ছোট ভাই-বুইন দুইডারে তো দেইক্যা রাহা লাগে, মুই স্কুলে গেলে অগো দেখবে কেডা?

এখানকার আরেক শিশু তানিয়া(৯) এর ভাগ্যেও একই হাল, তিন বছর বয়সি ছোট ভাই রাকিবের দায়ীত্ব তার কাধে, মা বাবা কাজে গেছে বৃধ্যা দাদি নিজেদের ঘরের রান্না সামলায়, আর রাকিবকে দেকভাল করতে হয় তানিয়ার।
তানিয়া বলেন আমি ক্লাস ফোরের ছাত্রি, এহন স্কুলে যাইতে পারিনা, তয় ফাইনাল পরিক্ষার কালে যাইয়া পরিক্ষা দিমুয়ানে। আমার ভাই রাকিব আর একটু বড় হইলেই আমার আর স্কুলে যাইতে সমস্যা হইবেনা। তহন আবার ঠিকমতোই যামু।
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ (Convention on the Rights of the Child, CRC)-এ স্বাক্ষরকারি ১৯১ দেশের মধ্যে প্রথম সারির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ১৯৯০ সালের আগস্টে স্বাক্ষর করলেও ১৯৮৯ সালের ২০ নভেম্বর সাধারণ পরিষদে গৃহীত হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশ এ সনদ গ্রহণ করে। ইতোমধ্যেই পেরিয়ে গেছে ২৬ টি বছর। তবুও এর প্রভাব পরেনি প্রান্তিক জনপদের কন্যশিশুদের উপর। কোন অধিকার অধিকারের পালায় পরেনা এই জনপদের মানুষের উপর। বাবার সম্পত্তির অধিকার থেকেও বঞ্ছিত হচ্ছে এখানকার কন্যা শিশুরা।
অত্র আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা গৃহবধু সালেহা বলেন, আমাগো গুরাগারা কি বড় চাকরি করবে? আমাদের সবার জন্ম বড় কিছু করার জন্য না। আমার মাইয়ার বিয়া দিছি ১৪/১৫ বছর বয়ষে। লেহাপড়া তো করেনায়, তারপরেও স্বামি সন্তান লইয়া আল্লাহর রহমতে ভালোই তো আছে।

এ বষয়ে সেচ্ছাসেবি সংগঠন নাগরিক অধিকার এর কার্যনির্বাহি সদস্য সাইমুল ইসলাম রাব্বি বলেন, শিশুদের জন্য বাধাহীন শিক্ষাসুলভ পথ আজও আমরা দিতে পারিনি। মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে চিহ্নিত হলেও আমরা আমাদের সত্তিকার লক্ষে পৌছাতে পারিনি। খুব শিগ্রই যদি দেশের উন্নতি করতে হয় তবে ১ম টার্গেট হতে হবে শিশুদের উন্নয়ন।
আন্তর্জাতিক শিশু বিষয়ক সংস্থা children world এর শিশু বিষয়ক গবেষক এবং London Manchester Metropolitan University এর সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারি অধ্যাপক ডঃ হরিধন ঘোসামি বাংলাদেশের শিশুদের নিয়ে গবেষনার অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন যে, দক্ষিন অঞ্ছলের শিশু শিক্ষার প্রধান বাধা একানকার মানুষের দারিদ্রতা। এবং কন্যাশিশুর জীবনমান উন্নয়নে প্রথম পদক্ষেপ হতে হবে সমগ্র জনসমষ্টির মানষিকতার ঊন্নয়ন।

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন