দেবদাস মজুমদার >>

মানসিক ভারসাম্যহীন নারী মর্জিনা(৩৫) । পথের জীবনে নিদারুণ চলছিল তার বেঁচে থাকা। অজ্ঞাত এ নারী এমন জীবন সংকটে গত কয়েকদিন ধরে পথে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু বেওয়ারিশ এই জীবনে তাঁর পাশে কেউ ছিলনা। মৃত্যুর আগে অন্তত হাসপাতালের নেয়ার মত মানুষ ছিলনা তার। পথচারীরা কৌতুহলবশে একনজর দেখে ঝামেলা মনে করে চলে যাচ্ছিলেন। কিন্তু আব্দুল লতিফ নামে ষাটোর্ধ ব্যাক্তি ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন গুরুতর অসুস্থ মর্জিনাকে পরম মমতায় নিজের দায়িত্বে পথ থেকে তুলে নিলেন। তারপর রিকশায় করে সোজা সদর হাসপাতালে । হাসপাতালে ভর্তির পর ওই সহৃদয় আব্দুল লতিফের নিজের দায়িত্বে মর্জিনার চিকিৎসা ও সেবা শুশ্রুষা চলছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য একদিন চিকিৎসা শেষে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে অসহায় মর্জিনা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। পরে প্রশাসনের উদ্যোগে পরিচয়হীন মর্জিনার লাশ আব্দুল লতিফ হাসপাতাল থেকে গ্রহণ করে দাফনের ব্যবস্থা নেন।

পিরোজপুরের কাউখালীতে অসুস্থ পরিচয়হীন আর মানসিক ভারসাম্যহীন এক নারীকে বাঁচাতে এমন প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়েছেন আব্দুল লতিফ খসরু নামে ষাটোর্ধ বয়সী সামাজিক উদ্যেক্তা। তার এমন মানবিক দৃষ্টান্ত নিয়ে ফেসবুক সামাজিক সাইটে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত ।
হাসপাতাল ও স্থানীয়দের সূত্রে জানাগেছে, পরিচয়হীন ও মানসিক ভারসাম্যহীন নারী মর্জিনা(৩৫)পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলা সদরে গত একমাস আগে আসেন। এরপর সে কাউখালী শহরের বিভিন্ন অলিগলিতে ঘুরে বেড়াত। কেউ কিছু দিলে খেত না দিলে উপোস করে কাটাত। গত চারদিন আগে কাউখালী শহরের সেনালী ব্যাংক চত্বরে মানসিক ভারসাম্যহীন মর্জিনা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকেন। অসহায় এই নারীকে জীবনের অন্তিমকালে একটু হাসপাতালের নেয়ার মত কেউ ছিলন। এমন অবস্থা দেখে স্থানীয় সামাজিক উদ্যোক্তা আব্দুল লতিফ খসরুর মনে দয়া হয়। তিনি বৃহস্পতিবার সকালে অসুস্থ মর্জিনাকে পথ থেকে তুলে নেন পরম মমতায়। তারপর রিকশাযোগে কাউখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। পরে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সাড়ে ৯টার দিকে মর্জিনার মৃত্যু ঘটে। পরে মর্জিনার পরিচয় না মেলায় তার লাশ বেওয়ারিশ হয়ে যায়। এরপর উপজেলা প্রশাসন ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নাম পরিচয়হীন মর্জিনার লাশ আজ শুক্রবার দুপুরে সহৃদয় আব্দুল লতিফের কাছে হস্তান্তর করে। আব্দুল লতিফ উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় অজ্ঞাত মর্জিনার লাশ কাউখালী শহরের দক্ষিণবাজার কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়। এর আগে আছর নামাজবাদ শহরের দক্ষিণবাজার ডেপুটি বাড়ি জামে মসজিদ ময়দানে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে কাউখালী উপজেলা চেয়ারম্যানসহ বিপুল সংখ্যক এলাকাবাসি অংশ নেন।

এ ব্যাপারে সমাজ সেবক আবদুল লতিফ খসরু জানান, অসহায় মর্জিনার পথে পড়ে থাকায় খুব কষ্ট পেয়েছি। মানুষ হিসেবে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছি। কিন্তু সে আর বেঁচে থাকেনি। তার লাশ দাফন করেছি অনেক কষ্ট বুকে নিয়ে।
তিনি আরও জানান, মর্জিনা বেঁচে থাকতে তাকে জানিয়েছিনে সে ফরিদপুর জেলার বালিয়া গ্রামের রোকেয়া বেগমের মেয়ে। তবে তার মৃত্যুর পর পুলিশ সঠিক কোন পরিচয় উদঘাটন করতে পারেনি। এমন অবস্থায় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তিনি লাশ গ্রহণ করে দাফনের ব্যবস্থা নেন।
কাউখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. সিদ্দিুকুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মৃত মর্জিনার পচিয় মেলেনি। উপজেলা প্রশাসন জেলা প্রশাসকের সাথে পরামর্শক্রমে তার লাশ স্থানীয় সমাজসেবক আব্দুল লতিফের কাছে হস্তান্তরে সিদ্ধান্ত দেন। একজন অসহায় নারীকে পথ থেকে তুলে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা তারপর তার লাশ দাফনের ব্যবস্থা করা একটি মহানুভবতার বিষয়।

এ বিষয়ে কাউখালী থানার অফিসার ইনচার্জ(তদন্ত) সরোজিৎ বিশ্বাস বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মৃত মর্জিনার কোন পরিচয় উদঘাটন করা যায়নি। ফলে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে লাশ সমাজসেবক আব্দুল লতিয়ের কাছে হস্তার করে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে কাউখালী উপজেলা চেয়রম্যান এসএম আহসান কবির বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আবদুল লতিফ খসরু ওই অজ্ঞাত অসুস্থ নারীকে পথ থেকে তুলে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করার পর সে মারা যান। আমরা ওই নারীর নাম পরিচয় উদঘাটনে বহু চেষ্টা করেছি। লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের জন্য উপজেলা পরিষদ থেকে সহযোগিতা করা হয়েছে। তবে আব্দুল লতিফ যা করেছেন সেটি সত্যি মানবিক এক দৃষ্টান্ত।

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন