পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার ফুলজুরি গ্রামের কাঞ্চন আলী ফকিরের ছেলে আব্দুর রাজ্জাক (৫৫) । প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বলতে মাত্র দিনকয়েক স্কুলে গিয়েছিলেন। অথচ দূর প্রবাসে গিয়ে মোটা বেতনের চাকরি করছেন তিনি। নিজেই বলেন, ‘আমি লেখাপড়া জানি না। অথচ মাসিক বেতন চার লাখ টাকার বেশি’। যা কুয়েতি মুদ্রায় ১৫শ’ দিনার। এছাড়াও রয়েছে নানা সুযোগ-সুবিধা। পরিবার-পরিজন নিয়ে ভ্রমণ করেন উড়োজাহাজের বিজনেস ক্লাসে। থাকেনও রাজার হালে।

কুয়েতিরা খুব সমীহ করেন তাকে। আর নিজ কর্মস্থলের শ্রমিকদের কাছে তিনি যেন মাথার মুকুট। কুয়েতের ওয়াফরায় এই রাজ্জাক নিজের দক্ষতা আর পরিশ্রম দিয়ে ধূসর মরুভূমিতে হাসি ফুটিয়েছেন সবুজের। সেখানে একরের পর একর জায়গা জুড়ে এখন ফসলের খেত। যাকে বলে এগ্রিকালচার ভিলেজ।
রাজ্জাকের অধীনে এই এগ্রিকালচার ভিলেজ কাজ করেন বাংলাদেশি-ভারতীয়সহ সাড়ে চারশ’র বেশি শ্রমিক। রাজ্জাকের হাত ধরেই ভাগ্য ফিরেছে তার কুয়েতি মালিক পরিবারেরও। প্রায় শূন্য থেকে আজ প্রচুর অর্থ সম্পদের মালিক বনে গেছেন তারা।

একেবারেই সাদাসিধে মানুষ রাজ্জাক। কথাবার্তায় আন্তরিকতা। কুয়েতিদের সঙ্গে কথা বলেন অনর্গল আরবি ভাষায়। আর স্বদেশিদের কাছে বনে যান খাঁটি বরিশাইল্যা। সামনা-সামনি দেখলে তাই মনেই হবে না, মানুষটির মধ্যে এতো গুণ।
নিজেই বললেন সততা আর পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রথমে কুয়েতে আসা এবং পরে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের কথা। ‘মাত্র ৩০ দিনার বেতনে শ্রমিকের ভিসায় এসেছিলাম এই কুয়েতে। সময়টা ১৯৯৬ সালের জানুয়ারি। তার আগে রাজধানী ঢাকার শ্যামলীতে পঙ্গু হাসপাতালের সামনে থাকা বস্তিতে আমি লাকড়ি বিক্রি করতাম’।
‘আমার সম্পর্কের এক বড়ভাই বিদেশ যাইবে। হেরে আমি সম্পদ বেইচ্যা টাহা দেছেলাম। হে সৌদি যাবার পর আমারে চেনে না। চিডির কোন উত্তর দেয় না। হের পর জেদ চাপলে। ঢাকার কাজিপুরের এক লোকের মাধ্যমে ভিসা নিয়ে চইল্যা আসলাম এ দ্যাশে। আইস্যা দেকলাম, ৩০ দিনার বেতন। মাস গেলে বাঁচে মাত্র তিন হাজার টাকা’।

‘দ্যাশে আমি দশ হাজার টাহা কামাইছি। যে ভিসা দেলে, তারে কইলাম, গার্মেন্টেসে কাম কইরা ছেরিরা পায় তিন হাজার টাহা। আর আমি বিদেশে আইস্যা হেই টাহা পাইলে মোর লাভ কি’?- আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে যান আব্দুর রাজ্জাক।
সেই চাকরি ছেড়ে কিছুদিন এক সুদানির অধীনে কাজ করেন রাজ্জাক। সেটাও ভালো না লাগায় মাজরায় (ক্ষেতে) কাজ নেন। তিনি ছিলেন সবার ছোট। কিন্তু কাজে ছিলো নিষ্ঠা আর আন্তরিকতা। আর সেটাই নজর কাড়ে মালিক ফয়সাল আওয়াদ জাহেরে দাম্মাতের। এক পর্যায়ে তার ওপর বাড়তে থাকে দায়িত্ব। তিনিও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করায় ভাগ্য ফেরে এই মালিকের। সামান্য ২৫ হাজার বর্গফুট এলাকা থেকে এখন বিশাল মরুভূমির বড় একটি অংশে তিনি এঁকেছেন সবুজের নকশা।

তাই মালিক বলেন, ‘রাজ্জাক বিসমিল্লাহ বলে পানি দিলেই ফলন হয় ভালো। ওর হাতে বরকত আছে’। ‘আমার ওপর নির্ভর ও বিশ্বাস দুটোই করেন তিনি’- বলেন রাজ্জাক।

এখানকার শ্রমিকদের সম্পর্কে রাজ্জাকের মন্তব্য, ‘আমাকে ওরা সম্মান করে ডাকেন গুরু। কখনো বলেন, ভাই। এজন্যেই তো মরুভূমির বুকে আছি। নইলে কবে চলে যেতাম! তবে হ্যাঁ, যেদিন ওরা আমাকে শ্রমিক ভাববেন , সেদিন থেকে আমি আর থাকবো না। বলতে পারেন, আমাকেই সম্মান আর আদর-যত্নে রেখেছেন ওরা’।
ধূসর মরুভূমির এই এগ্রিকালচার ভিলেজে দেখা মিলবে টমেটো, ক্যাপসিকাম, মরিচ, ঢেঁড়স, বেগুন, ধনে পাতা, লেটুস পাতাসহ নানা ধরনের শাক-সবজির। প্রতিদিন এখান থেকে লরিতে করে ৫০/৬০ টন সবজি যায় কুয়েত সিটিতে। এখানে উৎপাদিত সবজি প্রতিদিন বিক্রি হয় আট হাজার থেকে ১৪ হাজার দিনারে।
কুয়েতের সবজি বাজারে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে রাজ্জাকের হাতে ধরে এগিয়ে যাওয়া এই এগ্রিকালচার ভিলেজ।
স্ত্রী রুমা, এবং দুই ছেলে ওমর (৬) ও আবু বকর সিদ্দিককে(৪) নিয়ে আব্দুর রাজ্জাকের সংসার। রাজ্জাক বলেন, ‘বউ পোলাপানসহ ছুটি নিয়ে মাত্র একমাস ১৮ দিন দেশে ছিলাম। তাতেই মালিক দিশেহারা। ফোন করে বলেন, তুমি না থাকলে আমার সবুজ ফসলের খেত পরিণত হয় রুক্ষ মরুভূমিতে। তাই বেশিদিন থাকতে পারিনি। চলে এসেছি’।

‘এখানে বাংলাদেশিদের কাজের অনেক সুযোগ। কারণ, বাংলাদেশিরা পরিশ্রমী। আমার মতোই তাদের পরিশ্রম আর সততাকে কদর করেন এখানকার কুয়েতিরা। কিন্তু ভিসা পুরোপুরি খুলে না দেওয়ায় দেশ থেকে লোক আনা যাচ্ছে না।

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন