বাংলাদেশে মোবাইল ও ইন্টারনেটের আগমন যথাক্রমে ১৯৯৪ ও ১৯৯৬ সালে। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৫০০ কোটি মানুষ মোবাইল ব্যবহার করছে এবং বাংলাদেশের প্রায় ৭ কোটি ব্যবহারকারী। ৯০ দশকের সময় আমরা প্রযুক্তি বলতে কেবল কম্পিউটার ও টেলিভিশনকেই বুঝতাম। এবং অনেকেই সেসময় আবার কম্পিউটার চালাতে পারতেন না। বর্তমানে আমরা বলতে গেলে প্রযুক্তির মহাসমুদ্রে বাস করছি। ইন্টারনেট, এন্ড্রয়েড মোবাইল, থ্রিজি ইন্টারনেট, ফেস বুক, টুইটার, ইউটিউব, ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসআপ, ভাইবার, ইমো প্রভৃতি প্রযুক্তি রিলেটেড সহায়ক সামগ্রী। নিঃসন্দেহে এগুলো সবই মানুষের কল্যাণ বয়ে নিয়ে এসেছে। অজো পাড়া গায়ে বসবাস করা একটি যুবক বা যুবতী প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাঁর চাকুরির আবেদন করছে। আগেরকার সময় চাকরির আবেদন তারাই করতে পারতো যারা রাজধানী বা বিভাগীয় শহরগুলোতে বসবাস করত। এখন সময় বদলিয়েছে, তাই গ্রামে অবস্থান করা শিক্ষার্থীও প্রযুক্তির সহায়তায় তাঁর নিজ ঘরে বসেই মুহুর্তে করে ফেলতে পারে কাঙ্খিত চাকুরির আবেদন। ছোট বেলায় আমাদের খেলার সঙ্গী ছিল  পুতুল, ছোট গাড়ি, বা গ্রামের কলাকৌশল দিয়ে বানানো বিভিন্ন প্রকার খেলনা ও গাড়ি। বর্তমানে এর পরিবর্তে এককভাবে স্থান নিয়েছে মোবাইলের বিভিন্ন গেম। প্রতিটি জায়গায় তথ্য প্রযুক্তির ছোয়া। মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষনেও এর ছোয়া মিলে “এখন যুবকরা প্রেমের চিঠি লেখাও ভুলে গেছে এর জায়গা নিয়েছে মেসেজ”। মেসেজও শেষের পথে পরিবর্তে লাইভ বা ভিডিও কলেই মানুষ বেশী অভ্যস্থ হচ্ছে। আগেরকার সময় প্রিয়তমার একটি ছবি এটে থাকতো প্রেমিকের মানিব্যাগে কিংবা লুকায়িত কোন জায়গায়। কোন মেয়ে কাউকে ছবি তুলতে দিতনা। বর্তমানে শত শত ছবি স্থান পাচ্ছে ফেসবুকের ওয়ালে। ফেসবুকে সেলফি না থাকলে সেটা অপূর্ণ মনে করা হয়। যে সব ভাইয়েরা প্রবাসে থাকতেন তাঁরা অনেক বছর পর বাড়িতে আসলে চিনতো পারতো না নিজের ছোট মেয়ে বা ছেলেকে। এখন জম্মের পর পরই ছোট্ট ফুটফুটে শিশুর ছবি চলে যায় বাবার মোবাইলে। আসলে প্রযুক্তি এমনভাবে ছুটছে অনেক সময় বুঝে উঠতেই পারছি না কোনটি সবচেয়ে এগিয়ে একটি প্রযুক্তি মুহুর্তেই দখল করে নিচ্ছে অন্যের জায়গা। ফেসবুকের সবচেয়ে বড় কল্যাণকর আমার কাছে মনে হয়  কেউ আর হারিয়ে যাবেনা আপনার জীবন থেকে মৃত্যুর আগ মুহুর্ত সময় পর্যন্ত দেখতে পারবো আমার জীবনের রেখে আসা স্মৃতিগুলো। স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে টেরিস্ট্রিয়াল সম্প্রচার লাগবে না ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস বা লাইভে এসে বলে দিলেই হবে “ পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর  শেষ সৈন্যটিকে বাংলাশের মাটি থেকে উৎখাত করে চূড়ান্ত বিজয় না হওয়া পর্যন্ত দেশবাসীকে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে” বিতর্ক থাকতো না, কে আগে দিয়েছে স্বাধীনতার ঘোষণা। যেমন কিছুদিন আগে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইপে এরদোয়ান ফেসটাইমে এসে থামিয়ে দিল তাঁর দেশের সেনাবিদ্রোহ। মুর্হুতেই প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে অপরাধীদের পাকড়াও করে ফেলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রযুক্তির যেসব সুবিধা আমাদেরকে দিয়েছে তা বলে শেষ করা যাবেনা।

কিন্তু এতকিছুর পরেও কেন আমরা দিন দিন হিংসাত্মক হয়ে পরছি? ছেলে তাঁর বাব মাকে মেরে ফেলছে। মা তাঁর ছোট সন্তানকে পরকীয়ার টানে মেরে ফেলছে। বিশেষ করে আমরা বৃদ্ধ, শিশু, নারী এদের প্রতি অত্যাচারের হার বাড়িয়ে দিচ্ছি। হয়তো এরা দূর্বল তাই। আবার ঘটা করে বিচারও হচ্ছে যেমন শিশু রাজন হত্যা মামলা। কিন্তু তারপরও কেন থামছে না? কিছুদিন পুর্বে একটি নিউজ দেখলাম চীনে স্কট সার্ভিসের আওতায় (বর্তমানে বাংলাদেশেও চালুর পথে স্বল্প আকারে চালু হয়েছে) বন্ধু ভাড়া পাওয়া যায়। মানুষ বন্ধু সংকটে পরেছে তাঁর জন্য তারা বন্ধু ভাড়া দিচ্ছে, দেখে পুলকিত হলাম।

এগুলো হল আমাদের প্রযুক্তির ক্ষতিকর দিক। বেশির ভাগ মানুষ এখন প্রযুক্তি নির্ভর বন্ধু বান্ধব-এর পিছনে বেশী ছুটছে এখন তাঁরা ভার্চুয়াল জগতটাকে বেশী প্রাধান্য দিচ্ছে। খেলাধুলার সেই পুতুল বা হাডুডু বা গোল্লা ছুট এর পরিবর্তে জায়গা করছে “ক্লাস অব ক্লান” কিংবা “তিন পাত্তি গোল” পুতুল বা হাডুডু বা গোল্লা ছুট খেলা খেলতে বেশ কিছু ছেলে বা মেয়েকে দরকার অংশগ্রহনকারী হিসেবে। এবং এদের সাথে ভাল সম্পর্ক পূর্বশর্ত। এতে করে সমাজে বসবাসকারী সকলের মধ্যে একটি সুহাদ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠতো। কিন্তু বর্তমানে  ক্লাস অব ক্লান বা তিন পাট্টি গোল খেলতে কোন বাস্তব জগতের বন্ধু প্রয়োজন হয় না বা অংশগ্রহনকারীর মধ্যে কোন ভাল সম্পর্কও প্রয়োজন নেই। আর একারণে আমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বোধ সৃষ্টি হচ্ছে না। এসব খেলায় নেই কোন শারিরিক কসরত ফলে আমাদের দৈহিক গঠনে পরিপূর্ণতা পাচ্ছেনা। আমরা দিন দিন দূর্বল থেকে দূর্বলতর হচ্ছি। দৈনদৈনিক বিনোদনের প্রতিটি জায়গা দখল করে নিচ্ছে ভার্চুয়াল জগৎ। কম্পিউটার কিংবা মোবাইলের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখের দৃষ্টিসীমার কমে যাচ্ছে। বিনোদনের সময় শারিরিক কসরত না থাকলে শিশুদের মানসিক বিকাশ কম হয়। শারিরিক পরিশ্রমে মানুষের মস্তিস্কে রক্ত চলাচল বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে ফুটবল হাডুডু কাবাডি বা ক্রিকেট অথবা অন্য কোন খেলা যেসব খেলায় মানুষের শারিরিক পরিশ্রম বেশী এসব খেলায় মানুষের দৈহিক গঠন ভাল হয় এবং ব্যক্তির সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, সাহস, মেধা, নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। পক্ষান্তরে ভার্চুয়াল জগতের খেলাধুলা ধীরে ধীরে মানুষকে উপরোক্ত গুনাবলীর বিপক্ষে নিয়ে যায়। ভার্চুয়াল জগতে বেশী সময় ব্যয় করা ব্যক্তি মেধাহীন, মাদকে আসক্ত, এবং মানসিক চাপ সহ্য করার ক্ষমতা কমে যায় ফলে সে হিংসাত্মক হয়ে উঠে।

প্রযুক্তির আমাদের কল্যাণে অনেক কিছু করেছে কিন্তু আমরা এর ভালো অংশটুকু নিতে পারছিনা। এটা আমাদের ঐতিহ্যগত সমস্যা। আমরা সবসময় খারাপটার প্রতি আকৃষ্ট হই বেশী। ইন্ডিয়ান চ্যানেলগুলোর প্রতিটি সিরিয়ালে ভাল মন্দ দুটি চরিত্র থাকে কিন্তু সেটা থেকে আমরা ভাল দিকটা নেইনি। পাখি, সিরিয়ালে, একটি ভালো মেয়ে সে তার সংসারের সুবিধার জন্য সবসময় কাজ করে সাহায্য করে সবাই তাঁর প্রসংশায় পঞ্চমুখ কিন্তু আমরা তাঁর এসব গুনাবলী না নিয়ে পাখি ড্রেসের জন্য আত্মহত্যা করি। প্রতিনিয়ত শোনা যায় পরকীয়ার খবর। একজন জনপ্রতিনিধি যদি সংসার ছেড়ে চলে আসতে পারে তাহলে সমাজে প্রযুক্তির অপব্যবহার কোন পর্যায় পৌছেছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। প্রযুক্তির কল্যাণে মুহূর্তেই অনেক কিছু পাই Google বা ইউটিউবে একটা সার্চ দিলেই হাজারো তথ্য উপস্থিত। কিন্তু কেউ আমরা সার্চ দিয়ে একটা হাদিস বা একটা কুরআন এর তাফসীর দেখিনা বা দেখি না কোন বিখ্যাত রাষ্ট্রনায়কের  ভাষণ বা কিংবা পড়ালেখা বিষয়ক কোন আর্টিকেল। মালালা ইউসুফ জাই তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় বিবিসি ব্লকে লিখে নোবেল জয় পেল পক্ষান্তরে আমরা দেখি মীরাক্কেল বা ক্রাইম পেট্রোল। তাহলে এই প্রযুক্তি দিয়ে কি আমরা কোন সুবিদা নিতে পেরেছি? উত্তর হবে না কারন এসব আমাদের অনুষ্ঠান না সব ইন্ডিয়ান আমরা মুসলিম জাহান বা বাংলাদেশের উন্নতি হবে এরকম কোন অনুষ্ঠান দেখিনা। যদি  দেখতাম তাহলে মেয়েদের পোশাক দিন দিন ছোট হত না বা মঙ্গল শোভা যাত্রা নিয়ে বিতর্ক হত না। পর্দার ব্যাপারে সূরা আল নুর-এ স্পষ্ট বলা আছে, কিন্তু কখনো মনে হয়না আমরা কেউ ইন্টারনেটে গুগল সার্চ দিয়ে এগুলো দেখি। যদি দেখতাম তাহলে পরকীয়া বা মেয়েদের ড্রেস দিনদিন ছোট হতটা। কেউ যদি পর্দা না করেন সেটা তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমাদের সমাজ ধর্মনিরপেক্ষ তাই যার যার ধর্মীয় বিষয় সে পালন করার পূর্ণ স্বাধীনতা আছে। কিন্তু আমি যদি পর্দা করি তাহলে কেন আমি হাদিস ও কুরআনের আলোকে করবনা? পর্দার বিধান ঘোষণা করে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহপাক এরশাদ করেন­ ‘হে নবী! মুমিন পুরুষদের বলে দিন, তারা যেন নিজেদের দৃষ্টি সংযত করে রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। এটি তাদের জন্য পূতপবিত্র পদ্ধতি। তারা যা কিছু করে, আল্লাহ তা জানেন। আর মুমিন মহিলাদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। আর তারা যেন স্বীয় সাজসৌন্দর্য না দেখায়, তবে যা নিজে নিজে প্রকাশ হয়ে যায়  তা ছাড়া তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে। এবং তারা কারো সামনে তাদের সাজসৌন্দর্য প্রকাশ করবে না এই মাহরাম আত্মীয়গণ ব্যতীত যথা­ স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, ভ্রাতা ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক, অধিকারভুক্ত, বাঁদী, নারীর প্রতি স্পৃহাহীন সেবক, ওই সব বালক যারা নারীর গোপনীয় বিষয় সম্পর্কে অবহিত হয়নি। তারা যেন পথচলার সময় এমন পদধ্বনি না করে যাতে তাদের অপ্রকাশিত সৌন্দর্য পদধ্বনিতে প্রকাশিত হয়ে পড়ে। হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা কর যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ (সুরাঃ নূর, আয়াত৩১)

আমারা ইউটিউবে সার্চ দিয়ে কখনো বিখ্যাত কোন মনীষির জীবনী দেখিনা, বরং দেখি রেইট্রি হোটেলের ধর্ষণের ভিডিও। আমরা বোরকা গায়ে দেই ঠিকই, কিন্তু সেটা দিয়ে সঠিকভাবে পর্দা হয় কিনা তা বির্তকের বিষয়। আবার অনেকেই এখন হিজাব পরিধান করে কিন্তু সেটা কি পর্দার জন্য করি না ফ্যাশন তা শরীরে বিদ্যমান অন্য অংশের পোশাকের দিকে তাকালে বুঝা যায়। কেউ কেউ হিজাব পরে ঠিকই কিন্তু তাঁর সালোয়ার বা বুকের অবস্থা পর্দার মধ্যে পরে না। এটা আমাদের দোষ না আমরা আসলে জানিই না পর্দা করার ধর্মীয় নিয়মাবলী। আমরা চাইলেই প্রযুক্তির সহায়তায় আমাদের প্রতিনিয়ত সমস্যার সমাধান নিতে পারি। কোন আলেম বা মাদ্রাসা পড়া কারো কাছে যাওয়ার দরকার নাই। কিন্তু এগুলো কেউ করিনা। প্রতিদিন যেসময় ফেসবুকে কাটাই সে পরিমান সময় যদি কোন ভাল কাজে ব্যয় করতাম তাহলে কোন অন্য কোন দেশের সানুগ্রহে আমাদের থাকতে হতনা। জ্ঞান বিজ্ঞানে আমরা নিজেরা মাথা উচু করে দাড়াতে পারতাম। প্রতিটি জিনিসের ভাল মন্দ দুটোই দিক থাকে তেমনি প্রযুক্তিরও। কিন্তু আমি কোনটা নিব তার উপর নির্ভর করে আমার সামাজিক অবস্থান এবং বিশ্বে আমার দেশের অবস্থান। আমি ভালো কিছু আয়ত্ত্ব করলে অবশ্যই আমি এগিয়ে থাকব অন্যের চেয়ে। প্রযুক্তির আলোয় আলোকিত হোক আমার মনের আঙ্গিনা-এ হোক আমাদের সকলের প্রত্যয়।

>> লেখক : মোস্তফা ডালিম তন্ময়, ব্যাংকার ।

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন