শাব্দিক বিশ্লেষণঃ একবচনে তারবীহাতুন , বহুবচনে তারাবীহ।
রমজান মাসের তারাবীহকে এজন্যই তারাবীহ নাম করণ করা হয়েছে যে, লোকজন চার রাকাতের পর বিশ্রাম গ্রহন করে।
নামাযের আলোচনায় তারাবীহ বলা হয় যেই নামাজে প্রতি দুই সালামের মধ্যে মুসুল্লীগন বিশ্রাম গ্রহন করেন। [°১]

আত তারাবীহ শব্দটি তারবীহাতুন এর বহু বচন। অর্থ বিশ্রাম গ্রহ করা, একবার বিশ্রাম গ্রহন বুঝাতে আররাহাতু শব্দটি ব্যবহৃত হয়। এখানে রাহাতুন থেকে তাফয়ীলের ওজনে শব্দরূপ গ্রহন করা হয়েছে, যা আধিক্য বুঝায়।
যেমন আরবী তাসলীমাতুন শব্দটিও আস সালাম ধাতু মূল হতে তাফয়ীলাতুন ওজনে অধিক সালামের ক্ষেত্রে তাসলীমাতুন ব্যবহৃত হয়। সুতরাং শব্দের গঠন পরিচিতিই শাব্দিক অর্থে প্রমান করে, তারাবীহের নামায ৮ রাকাতের অধিক। কেননা, একবার তারবীহাতুন (বিশ্রাম) ৪ রাকাত নামাযের পরে।
যদি দুই তারবীহাহ হত, তাহলেই এই নামায অন্তত কম হলেও ১২ রাকাত আবশ্যক হয়ে যায়।
(কেননা, ৪ রাকাতের পর এক তারবীহ, অতঃপর ৪ রাকাত পরে আরেক তারবীহ এবং শেষ চার রাকাত, সর্বোমোট ১২)। অথচ সত্য হল, উম্মতের ইজমা তথা ঐক্যমতে বিতর ছাড়াই তারাবীহের নামায ২০ রাকাত তারাবীহ নামাজ।
চার মাযহাবের নির্ভরযোগ্য মতামত হল, বিতর সহ ২৩ রাকায়াত। হানাফী এবং মালেকী মাযহাবের এটিই প্রসিদ্ধ মত। এবং শাফেয়ী ও মালেকী মাযহাবেও। তবে মালেকী মাযহাবে প্রসিদ্ধ মতের বিপরীতে আরো একটি মত বর্ণিত হয়েছে যে, তারাবীহ নামায ৩৬ রাকাত।

তারাবীহ নামায আট রাকাত এমন কথা এই উম্মত বর্তমান যামানার পূর্বে জানতো না, শুনেনি।
বৈপরীত মতামতের কারণ হচ্ছে হাদীস শরীফের “ভুল অনুধাবন” এবং “সমস্ত হাদিসের সম্মিলিত করে মতামত গ্রহনে অপারগতা” এবং “সাহাবায়ে কিরাম রাঃ থেকে কাওলী এবং ফে’লী (মৌখিক এবং কার্যত) ঐক্যমতের প্রতি যত্নবান না হওয়া।”

যারা ৮ আট রাকায়াত তারাবীহ নামাযের স্বপক্ষে নিচের হাদীসটি দলীল হিসেবে বর্ণনা করে সেটি উম্মুল মু’মেনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রাঃ এর হাদীস। (মূল হাদীসটি এ রকম)
“হযরত আবূ সালামাহ‌ ইবনু আবদুর রাহমান থেকে বর্ণিত, তিনি হযরত ‘আয়িশা সিদ্দীকা রা. জিজ্ঞেস করেন, রমযান মাসে আল্লাহ্‌র রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামাজ কেমন ছিল? তিনি বললেন, আল্লাহ্‌র রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমযান মাসে এবং অন্যান্য সময় রাতে এগার রাক’আতের অধিক নামাজ আদায় করতেন না। তিনি চার রাক’আত নামাজ আদায় করতেন। তুমি সেই নামাজের সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে আমাকে প্রশ্ন করো না। তারপর চার রাক’আত নামাজ আদায় করতেন, এর সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে আমাকে প্রশ্ন করো না। অতঃপর তিনি তিন রাক’আত বিতর নামাজ আদায় করতেন।” [°২]

আর এই হাদীসে রাসূলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের (রাত্রিকালীন) নফল নামাজ, কিয়ামুল লাইল তথা তাহাজ্জুদ সম্পর্কে (উমুমান) সাধারন ভাবে বর্ণিত হয়েছে। এ হাদীসটি তারাবীহের নামাজ সম্পর্কে উপস্থাপন করা হয় নি। কেননা, তারাবীহ হচ্ছে রমজান মাসের সাথে খাস বা নির্দিষ্ট। এটা রমজান মাসে নির্দিষ্ট রাতে জেগে ইবাদত করা। এটা প্রকৃত অর্থে শরীয়তে বৈধতার দিক দিয়ে নববী সুন্নাত হলেও আদায়ের ধরণ বা পদ্ধতির দিক থেকে হযরত উমর (রাঃ) এর সুন্নাত।
এর অর্থ হল, নিশ্চয়ই উম্মতে মুহামাদী সাঃ সমস্ত রমযান মাসে রাত্রি জাগরণের ব্যাপারে একত্রিত হওয়ার ব্যাপারে হযরত উমর রাঃ এর সুন্নাতের উপর (প্রতিষ্ঠিত)।
আর রাকাতের সংখ্যার ব্যাপারে যা, হযরত কা’ব বিন উবাই (রাঃ) এর উপর ঐক্যমতের ভিত্তিতে মানুষেরা একত্রিত হয়েছিল। (তা হল, ২০ রাকাত)
প্রিয় নবীজী সাঃ ইরশাদ করেছেন, ”তোমাদের উপর কর্তব্য হল আমার সুন্নাত এবং আমার হেদায়েত প্রাপ্ত সাহাবায়ে কিরাম রাঃ আজমাঈন গনের সুন্নাত আঁকড়ে ধরা। তোমরা উহা মাড়ির দাঁত দিয়ে কামড়ে থাকার ন্যায় দৃঁঢ়তার সাথে আঁকড়ে ধরবে। [°৩]

সায়্যিদুনা উমর (রাঃ) এর কর্ম, যেহেতু উম্মতের কাছে নির্ভরযোগ্য হচ্ছে না, তাহলে এক ইমামের পেছনে, মসজিদে, মাসব্যাপী জামায়াতে তারাবীহ পড়ারও কোন অর্থ নেই। কেননা, নবীজী সাঃ এক ইমামের পিছনে মানুষদেরকে দীর্ঘ মাসব্যাপী তারাবীহ আদায়ের জন্য একত্রিত করেন নি। বরং এটি ফারুকে আযম হযরত উমর রাঃ সুন্নাত ছিলো। ফলতঃ তারা হযরত উমর রাঃ এর সুন্নাত অনুযায়ী মসজিদে মাসব্যাপী জামাতের সাথে তারাবীহ আদায়ের সুন্নাত গ্রহন করেছে এবং পক্ষান্তরে তারাবীহ নামাযের রাকাতের সংখ্যার ব্যাপারে তারঁ সুন্নাতকে ছেড়ে দিয়েছে। অথচ তারা ধারণা করছ যে, তারা রাসূলে আকরাম (সাঃ) এর সুন্নাতের উপর আমল করছে। কিন্তু বাস্তবতা হল এই যে, তারা প্রিয় নবীজী (সাঃ) এর সুন্নাত পালন করতে পারে নি, এমনকি হযরত উমর রাঃ এর সুন্নাতকেও গ্রহন করে নি। কেননা, তারা যেমনি ভাবে ধারণা করে যে, তারা রাসূলে কারীম (সাঃ) এর সুন্নাতের পরিপূর্ণ অনুসরণ করছে, তাতে তাদের কর্তব্য ছিলো তাদের নিজ গৃহে তারাবীহ আদায় করা। আর মানুষদেরকে পুরোপুরি ছেড়ে দেয়া (৮ রাকাতের বেদাতী ফেতনা বন্ধ রাখা) যেনো তারা আল্লাহ প্রদত্ত দ্বীন পরিপালন করতে পারে। লা হাওলা ওয়া লা কুয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আযীম।

সায়্যিদুনা হযরত উমর রাঃ এর তারাবীহর ২০ রাকাত সংক্রান্ত দলীল যা নিম্নোক্ত গ্রন্থ সমূহে বর্ণনা করা হয়েছে।
১.ইমাম মালিক রহঃ তাঁর মুয়াত্তা গ্রন্থে
২.ইমাম বুখারী রহঃ তাঁর সহীহ বুখারী শরীফে
৩.ইমাম বায়হাক্বী রহঃ তাঁর সুনানুল কুবরা গ্রন্থে আবদুর রহমান বিন আবদুল ক্বারী হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ” রমজানের এক রাতে (★) হজরত উমর (রাঃ) এর সাথে মসজিদের দিকে বের হলাম। মানুষেরা মসজিদে পৃথক পৃথক দলে বিভক্ত। কোন কোন ব্যক্তি ছোট দলে নামাযরত। অতঃপর হযরত উমর (রাঃ) বললেন, আমি যদি সকল নামাযীকে এক ইমামের পেছনে একত্র করে দেই, সেটি দৃষ্টান্তমূলক হত। অতঃপর অনুরূপ সংকল্প করলেন এবং হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রাঃ)-পিছনে একত্রিত করেন। অতঃপর হযরত ফারুকে আযম (রাঃ) এর সাথে আরেকদিন রাতে বের হলাম। মুসুল্লীগন তাদের ইমাম উবাই বিন কা’ব (রাঃ) এর নেতৃত্বে নামাযরত। হযরত উমর (রাঃ) বললেন, এটি কতইনা উত্তম বিদয়াত (নতুন ব্যবস্থা)! তোমরা রাতের যে অংশে ঘুমিয়ে থাক তা রাতের ঐ অংশ অপেক্ষা উত্তম যে অংশে তোমরা সালাত আদায় কর, এর দ্বারা তিনি শেষ রাত বুঝিয়েছেন, কেননা তখন রাতের প্রথমভাগে লোকেরা সালাত আদায় করত।” [°৪]

সায়্যিদুনা হযরত উমর রাঃ মানুষদেরকে যে নামাজে একত্রিত করেছিলেন তা-ই তারাবীহ এর নামাজ। এই নামাজ ২০ রাকাত। যা বহু বর্ণিত (সহীহ) হাদীস দ্বারা স্বীকৃত এবং প্রমানিত।
ইমাম মালিক রহঃ তাঁর মুয়াত্তা গ্রন্থে,
ইমাম বায়হাক্বী রহঃ তাঁর সুনানুল কুবরা গ্রন্থে নিচের হাদীস দু’টি বর্ণনা করেছেন।

১.ইয়াজিদ ইবনে খুসাইফা (রহঃ) বলেন, সাহাবি সায়েব ইবনে ইয়াজিদ (রাঃ) বলেছেন, সাহাবায়ে কেরাম হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর যুগে রমজান মাসে বিশ রাকাত তারাবি পড়তেন। তিনি আরো বলেন যে, তারা নামাজে শতাধিক আয়াত বিশিষ্ট সূরাসমূহ পড়তেন এবং হজরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর যুগে দীর্ঘ নামাজের কারণে তাদের (কেউ কেউ) লাঠিসমূহে ভর দিয়ে দাঁড়াতেন। [°৫]

২.হযরত মালিক (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইয়াজিদ বিন রুমান (রাঃ) বলেছেন, “সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-এর যুগে রমজান মাসে বিতর সহ ২৩ রাকাত নামায আদায় করতেন। [°৬]

চার ফিকহী মাযহাব এই ২০ রাকাত এর ওপর একমত পোষণ করেছেন।
১.হানাফীগনের অভিমতঃ
===================
অতঃপর হানাফিদের রায় সম্পর্কে তাদের কিতাব পত্র থেকে নিম্নোক্ত মতামত গুলো তুলে ধরছি। ক. ইমাম সারাখসী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তার আল মাবসুত কিতাবে বলেন, “আমাদের নিকট নিশ্চয়ই তারাবি নামাজ বিতরের নামায ব্যতীত ২০ রাকাত।”
ইমাম মালেক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “সুন্নত হল ৩৬ রাকাআত।” [°৭]
খ. ইমাম কাসানী (রহঃ) তার বাদায়েউস সানায়ে’ গ্রন্থে যা বর্ণনা করেছেন, যা উপরোক্ত মতকে অগ্রাধিকার দেয়। এমনকি তিনি বলেন, অতঃপর তারাবি এর নামাজ ৫ বিশ্রামে ১০ সালামে ২০ রাকাত। আর এটিই সাধারণ আলেমগনের বক্তব্য। [°৮]
গ. আল্লামা ইবনে আবেদীন তার হাশিয়াতু ইবনে আবেদীন গ্রন্থে বলেন, “তারাবির নামাজ ২০ রাকাত এবং এটি জমহুর উলামাদের বক্তব্য প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের মানুষ এর উপরেই আমল করেন। [°৯]
২. মালেকীগনঃ
===========
অতঃপর মালেকীগন, তাদের মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত জমহুর ওলামা গনের সাথে সম্মতি জ্ঞাপক। ক. আল্লামা দারদীরী (রহিমাহুল্লাহ) আল্লামা ছওয়ী রহমাতুল্লাহ আলাইহি এর হাসিয়ার ব্যাখ্যাগ্রন্থ শরহুস সাগির গ্রন্থে বলেন, “আর রমজান মাসে তারাবির নামাজ এশার নামাজের পর বিতর সংশ্লিষ্ট ২ রাকাত ব্যাতিরেখে, ২০ রাকাত। দুই দুই রাকাতে সালাম ফিরাবে এবং বিতরের নামাজ আর তারাবীহের নামাজে কোরআন খতম করা মানদুব তথা বৈধ। কেননা প্রতি রাতে ২০ রাকাতের মধ্যে পার্থক্য করার জন্য এটি পাঠ করা হয়। [°১০]
খ. আল্লামা নাফরবী তার ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী গ্রন্থে জমহুর ওলামা গনের মতকে শক্তিশালী করে এবং এজন্য এর স্বপক্ষে ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহ এর অনুসরণ সম্মতি জ্ঞাপক বলেছেন। এমনকি ইমাম মালেক রহঃ এর ৩৬ রাকাত সম্পর্কিত দ্বিতীয় বক্তব্য সম্পর্কে বলেন, সালাফুস সালিহগন তথা সাহাবায়ে কেরাম গান ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর খেলাফত এর সময়ে মসজিদে তাঁর নির্দেশে বিশ রাকাত প্রতিষ্ঠা করেছেন যা পূর্বের আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে। [°১১]

আর এই ২০ রাকাতের মত ইমাম আবু হানিফা (রহঃ), ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) এবং ইমাম আহমাদ (রহঃ) এর নির্বাচিত মত এবং এর উপরেই তারাবীহ ২০ রাকাত সমগ্র আমসারে আমল চালু রয়েছে। অতঃপর ২০ রাকাতের পরে তাগলীবুল আশরাফ তথা পূর্ববর্তীদের অনুসরণে তিন রাকাত বিতরের নামাজ আদায় করবে। কিন্তু তিন রাকাতই বিতরের নামাজ নয়, যে বিষয়ে পূর্বে আলোচনা হয়েছে। এর দ্বারা এ কথার উপরে দালালাত করে বিতর এবং বিতর সম্পর্কিত জোড়া দু’রাকাত নামাজের মধ্যে এক সালাম দ্বারা পার্থক্য করা মুস্তাহাব। এমনকি মিলিয়ে আদায় কারীর পিছনে অনুসরণ করা ব্যতিরেখে একত্রে আদায় করা মাকরুহ।
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) বলেন, বিতরের তিন রাকাত নামাজের মধ্যে সালাম দ্বারা পার্থক্য করবে না এবং ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) তিন রাকাত বিতর এর নামাজ সালাম দ্বারা পৃথক করা বা না করার উপর ইফতিয়ার প্রদান করেছেন। এবং প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের মানুষের মধ্যে ২৩ রাকাত রাকাতের প্রচলন ছিল। অতঃপর মদীনা শরীফে যুদ্ধের ঘটনার পরে সালাফগন যারা পূর্ববর্তী গণের মত অগ্রগামী ছিলেন না। (সালাফ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ এর সময়কাল) কেননা ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর সময়কাল ছাড়া সে সময়ে বিতরের নামাজ ছাড়াই ৩৬ রাকাত আদায় করা হত। এমনকি আল্লামা নাফরাবী (রহঃ) ৩৬ রাকাতের মত সম্পর্কে বলেন, এটি ইমাম মালেক (রহঃ) তার মুদাওয়ানাহ গ্রন্থে মুস্তাহসান বলে উল্লেখ করেছেন। হযরত উমর বিন খাত্তাব (রাঃ) এর পরে মদিনাবাসীর আমল চালু ছিল। কিন্তু মালেকী মাযহাবের কতিপয় অনুসারীগণ প্রথম থেকেই প্রাধান্য দিয়েছেন যা ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর সময় কালে সমগ্র আমসার প্রচলন ছিল।

৩. শাফেয়ীগনের মতামতঃ
===================
অতঃপর শাফেয়ীগনও স্পষ্ট করেছেন যে, তারাবির নামাজ নামাজ হলো ২০ রাকাত।

ক. ইমাম নববী (রহিমাহুল্লাহ) তার মাজমু’ গ্রন্থে উল্লেখ পূর্বক বলেন, “আমাদের মাযহাবে তারাবীহের নামাজ পাঁচ বিশ্রামে, দশ সালামে, বিতর ব্যতিরেকেই বিশ রাকাত। আর প্রত্যেক বিশ্রাম হলো চার রাকাত অথবা দুই সালাম এর পরে। এটাই আমাদের মাযহাব আর এর পক্ষে ইমাম আবু হানিফা (রহঃ), তার সঙ্গীগন, ইমাম আহমাদ (রহঃ), ইমাম দাউদ যাহেরী (রহঃ) এবং অন্যান্য গন মতামত প্রাধান্য দিয়েছেন। [°১২]
খ. ইমাম কাজী আয়ায (রহঃ) জমহুর ওলামাগণের থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন এবং আসওয়াদ ইবনে ইয়াজিদ হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি ৪০ রাকাত আদায় করতেন এবং সাত রাকাত বিতরের নামাজ আদায় করতেন।
ইমাম মালেক (রহমাতুল্লাহ আলাইহি) বলেন, তারাবীহ নামাজ হল ৯ বিশ্রামে তথা বিতরের নামাজ ছাড়াই ৪*৯ = ৩৬ রাকাত। তিনি আহলে মদিনা তথা মদিনাবাসী গনের আমল দ্বারা দলিল প্রদান করেছেন। কেননা, তারা অনুরূপ ৩৬ রাকাত আদায় করতেন।
গ. আল্লামা ইবনে হাজার হাইতামি (রাহিমাহুল্লাহ) তার তুহফাতুল মুহতাজ গ্রন্থে বলেন, মদীনার অধিবাসীগণ ব্যতীত আমাদের নিকট তারাবির নামাজ ২০ রাকাত। যেমনি ভাবে হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর সময় কালে এর প্রচলন ছিল। যখন তিনি তাঁর সুক্ষ্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে একজন ইমামের পিছনে মানুষদিগকে একত্রিত করার রায় দিয়েছিলেন এবং তিনি সম্মতি জ্ঞাপন করেন। অতঃপর তারা তিন রাকাত বিতরের নামাজ আদায় করতেন। [°১৩]
ঘ. অনুরূপভাবে এই মতকে ইমাম আল্লামা রমলী (রহঃ) তার নিহায়াতুল মুহতাজ গ্রন্থে যা উল্লেখ করেছেন তা জোর প্রদান করেছে। তিনি বলেন রমজান মাসে প্রতি রাত্রে তারাবির নামাজ ১০ সালামান্তে ২০ রাকাত। যেরূপভাবে বর্ণিত আছে যে, তারা হযরত উমর বিন খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর সময় রমজান মাসে ২০ রাকাত আদায় করতেন। মালেক ইমাম মালেক (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) এর রেওয়ায়েতে মুয়াত্তা ইমাম মালেক গ্রন্থে ২৩ রাকাত বর্ণিত হয়েছে। [°১৪]
ঘ. ইমাম বায়হাকী উভয় বর্ণনার মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে বলেন যে, তারা তিন রাকাত বিতরের নামাজ আদায় করতেন রমজান মাসে মানুষ তারাবির নামাজে একত্রিত হতেন, পুরুষেরা উবাই ইবনে কাব (রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু) এর পিছনে এবং মহিলাগণ সুলাইমান ইবনে আবি হাসনা (রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু) এর পিছনে। আর প্রত্যেক চার রাকাতের পরবর্তী বিশ্রাম কে এক তারববিহা নামে নামকরণ করা হয়েছে। কেননা, তারা প্রতি চার রাকাতের পরে বিশ্রাম গ্রহণ করতেন।”

৪.হাম্বলীগনঃ
===========
অতঃপর হাম্বলীগন স্পষ্ট করেছেন যে, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল এর নিকটে তারাবির নামাজ ২০ রাকাত।
ক. অতঃপর আল্লামাহ ইবনে কুদামা আল মুকাদ্দাসী (রহঃ) তার প্রখ্যাত আল মুগনী গ্রন্থে বলেন, আমাদের আবু আব্দুল্লাহ (রাহিমাহুল্লাহ) এর নিকটে তারাবির নামাজ এর নির্বাচিত রাকাত সংখ্যা হল ২০। এটি ইমাম সুফিয়ান সাওরী (রহঃ), ইমাম আবু হানিফা (রহঃ), ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) প্রমুখের অভিমত। ইমাম মালেক বলেন, তারাবির নামাজ হলো ৩৬ রাকাত। তবে ধারণা করা হয়, এটি তার প্রাচীন মত এবং এটি মদিনাবাসীর কর্মের সাথে সম্পর্কিত। [°১৫]
খ. অনুরূপভাবে আল্লামা বাহুতী (রহঃ) তার কাশশাফুল কিনা’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, হাম্বলী মাযহাবে তারাবীহ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য মত হল, তারাবীহকে তারাবীহ নামে এজন্যই নামকরণ করা হয়েছে যে, তারা প্রতি চার রাকাত নামায আদায়ান্তে বসতেন এবং বিশ্রাম গ্রহণ করতেন।
কেউ কেউ বলেন শব্দটি মুরাবাহাতুন থেকে নিঃসৃত। যার অর্থ হলো কোন কাজ বারবার করা। আর রমজান মাসে তারাবি এর নামাজ হলো ২০ রাকাত। যেমনটি হযরত ইয়াজিদ ইবনে রুমান থেকে ইমাম মালেক (রহঃ) বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, “হযরত উমর (রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু) এর সময় মানুষ রমজান মাসে২৩ রাকাত তারাবীহ আদায় করতেন।” [°১৬]
গ. ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) নিজেও এই মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। যেদিকে অন্যান্য ইমামগণ মত পোষণ করেছেন। এমন কি তারাবি নামাজ কে অসংখ্য ওলামায়ে কিরামগন সুন্নাহ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। অতঃপর তিনি তার ফতোয়ায়ে কুবরা গ্রন্থে বলেন, “রমজানে তারাবির নামাজ এর সংখ্যা নির্ধারণে উলামায়ে কিরামগন কতিপয় দৃষ্টিভঙ্গিতে পরস্পর মতপার্থক্য করেছেন। কেননা, উবাই ইবনে কা’ব (রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু) থেকে এ কথা প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি মানুষদেরকে নিয়ে ২০ রাকাত তারাবীহ এবং তিন রাকাত বিতরের নামাজ আদায় করতেন। অতঃপর অধিকাংশ আলেমগণ এই অভিমত কে সুন্নাত হিসেবে মত পোষণ করেছেন। কেননা তিনি এই ২০ রাকাতের তারাবীহ নামাজ মুহাজির ও আনসার সাহাবীগনের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, অথচ তাদের কেউ খারাপ বলেনি কিংবা অস্বীকার ও করেননি। অন্যান্যরা ৩৬ রাকাতকে মুস্তাহাব বলেছেন। স্বপক্ষে দলীল, মদীনাবাসীদের পুরাতন কর্মের উপরে প্রতিষ্টিত। [°১৭]

পরিসমাপ্তিতে আমরা পূর্বের আলোচনা দ্বারা দেখতে পাই ইমামগণ, ফুকাহায়ে কিরামগন, সালাফ তথা পূর্ববর্তীগন, খলাফ তথা পরবর্তীগন, প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের সকলেই ২০ রাকাত তারাবীহ এর নামাজের উপরে যুগের পর যুগ অতিক্রান্ত করেছেন। তারাবীহের নামাজ সুন্নাতে মুয়াক্কাদা, ওয়াজিব নয়। সুতরাং যে ব্যক্তি তা তরক বা পরিত্যাগ করবে সে মহাপূণ্য থেকে বঞ্চিত হবে আর যে ব্যক্তি ২০ রাকাত এর চেয়েও অধিক আদায় করবে তার ওপরে এটি দোষণীয় নয়। কোন ব্যক্তি একে কিয়ামুল লাইল মনে করে ২০ রাকাতের কম আদায় করলে তার জন্য তাও দোষণীয় নয়। তবে তারাবীহ এর সুন্নাত মনে করে কম আদায় করা সঙ্গত নয়।।

#মূলঃ মিশরের রাষ্ট্রীয় ফতোয়া বোর্ডের সাবেক গ্রান্ড মুফতী, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ ড. আলী জুম’আ। অধ্যাপক, আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়।

#অনুবাদঃ মুহাম্মাদ সাদিকুর রহমান, ইসলামী আইন অনুষদ,আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়,মিশর

—————————————————————
#গ্রন্থ সহায়িকা ও টীকাটীপ্পনীঃ
—————————————————————
[°১ঃ অভিধান, লিসানুল আরব, কৃতঃ আল্লামা ইবনে মানযুর, দারুস ছদির প্রকাশনী, বৈরুত]
[°২ঃ সহীহ বুখারী: হাদীস নং ১১৪৭]
[°৩ঃ সহীহ ইবনু হিব্বান, জামে’ তিরমিযী শরীফ, মুসনাদে আহমাদ বিন হাম্বল]
[°৪ঃ মুয়াত্তা ইমাম মালিক, সহীহ বুখারী, সুনানুল কুবরা লিল ইমাম বায়হাক্বী]
[°৫ঃ আস সুনানুল কুবরা লিল ইমাম বাইহাকী, মুয়াত্তা ইমা মালিক]
[°৬ঃ আস সুনানুল কুবরা লিল ইমাম বাইহাকী, মুয়াত্তা ইমা মালিক]

[°★: রাতটি ছিল ১৪ হিজরীর রমযানের কোন এক রাত]
[°৭ঃ কিতাবুল মাবসুত, ২/১৪৪, দারুল মারেফাহ প্রকাশনী]
[°৮ঃ বাদায়েউস সানায়ে, ১/২৮৮, দারুল কুতুব ইলমিয়্যা, বৈরুত]
[°৯ঃ হাশিয়াত ইবনি আবেদীন, ২/৪৬, দারুল ফিকর প্রকাশনী, বৈরুত]
[°১০ঃ আশ শরহুস সগীর বি হাশিয়াতিস ছওবী, ১/৪০৪-৪০৫, দারুল মায়ারিফ প্রকাশনী]
[°১১ঃ ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী, ১/৩১৮-৩১৯, দারুল ফিকর প্রকাশনী, বৈরুত]
[°১২ঃ আল মাজমু’, ৩/৫২৭, দারুল ফিকর প্রকাশনী, বৈরুত]
[°১৩ঃ তুহফাতুল মুহতাজ, ২/২৪১-২৪২, আল মাকতাবাতুত তিজারিয়্যা আল কুবরা]
[°১৪ঃ নিহায়াতুল মুহতাজ, ২/১২৭, দারুল ফিকর প্রকাশনী, বৈরুত]
[°১৫ঃ আল মুগনী, ১/৪৫৬, মাকতাবাতুল ক্বহিরাহ]
[°১৬ঃ কাশশাফুল ক্বিনা’, ১/৪২৫, দারুল কুতুব ইলমিয়্যা, বৈরুত]
[°১৭ঃ আল ফতোয়া আল কুবরা, ২/২৫০, দারুল কুতুব ইলমিয়্যা, বৈরুত]

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন