সওগাতুল অালম সগীর ১৯৪০ সালের ২৭ মে পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়ার উপজেলাধীন গুলিসাখালী গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসিলম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।তাঁর পিতার নাম মোসলেহ উদ্দিন অাহম্মেদ(রত্তন মিয়া)ও তাঁর মাতার নাম অামেনা বেগম।তাঁর দাদা অাজাহার উদ্দিন অাহম্মেদ ১৯২০-১৯২৬ সাল পর্যন্ত বঙ্গীয় অাইন পরিষদের সদস্য ছিলেন।তিনি নিজ বাড়িতে মুসাফির খানা ও ১৯২৮ সালে গুলিসাখালী জুনিয়র মাদ্রাসা স্থাপন করেন। সগীর সাহেবের পিতা ১৯৪৮ সালের ২ জানুয়ারী গুলিসাখালীতে জুনিয়র মাদ্রাসার সাথে একটি হাইস্কুল(জি.কে.ইউনিয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়) স্থাপন করেন।মাদ্রাসা ও স্কুলের পাঠক্রম একই ধরনের হওয়ায় তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলার(বর্তমানে বরিশাল বিভাগ) বিদ্যালয় পরিদর্শক উক্ত মাদ্রাসাটিকে হাইস্কুলের সাথে একীকরণ করতে নির্দেশ দিলে মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটি মাদ্রাসাটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারী থেকে হাইস্বুলের সাথে একীকরণ করেন।সগীর সাহেব এই স্কুল থেকে ১৯৫৬ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ন হয়ে বরিশাল বি.এম.কলেজে ভর্তি হন।এ কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্রলীগের সাথে সম্পৃক্ত হন।১৯৫৮ সালে তিনি বি.এম.কলেজ থেকে অাই.এ.পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে বি.এ.অনার্স ক্লাসে ভর্তি হন এবং ১৯৬২ সালে বি.এ.অনার্স ও ১৯৬৩ সালে এম.এ পাশ করেন।ঐ বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অাইন বিভাগে ভর্তি হন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।তিনি১৯৬২-১৯৬৩ সালে ইকবাল হলের (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল)ছাত্র সংসদের ভি.পি. ছিলেন।তিনি একজন ভাল ফুটবল ও ভলিবল খেলোয়ার ছিলেন।

অাইয়ুব খানের ৪৪ মাস সামরিক শাসন ১৯৬২ সালের ৮ জুন অবসানের পর ১৯৬৩ সালে ১ম শহীদ দিবস(অমর ২১ ফেব্রুয়ারী)উদযাপনে সওগাতুল অালম সগীর গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেন।সামরিক শাসনোত্তর ১ম শহীদ দিবসে ছাত্র সমাজের বক্তব্য শিরোনামে ১৯ ফ্রেব্রুয়ারী যে প্রচারপত্র বিলি করা হয়েছে তাতে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের ২৯ জন স্বাক্ষর করেন।সওগাতুল অালম সগীর ১৩ তম স্বাক্ষরকারী ছিলেন।

১৯৬৪ সালের ২২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশন অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ও প্রাদেশিক গভর্নর অাব্দুল মোনায়েম খানের হাত থেকে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা সার্টিফিকেট গ্রহণ করতে অস্বীকার করলে গোলযোগ সৃষ্টি হয়।সরকার এ ব্যাপারে মামলা দায়ের করেন এবং গোলযোগের কারণে শেখ ফজলুল হক মনি ও অাসমত অালী সিকদার (বামনা,বরগুনা)এর এম.এ ডিগ্রী বাতিল করেন।সওগাতুল অালম সগীর, রাশেদ খান মেনন, এ.কে বদরুল হক ও কে.এম ওবায়দুর রহমানকে ৫ বছরের জন্যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করা হয় এবং পুলিশ তাদেরকে গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ করেন।ছাত্রদের অন্দোলনের চাপে সরকার মামলাটি প্রত্যাহার করলে তাঁরা মুক্তি পান।সওগাতুল অালম সগীর ১৯৬৭ সালে ডিসেম্বর মাসে ঝালকাঠির মাহমুদা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে অাবদ্ধ হন।মাহমুদা বেগম ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এম.এ ডিগ্রী লাভ করেন।

সওগাতুল অালম সগীর ১৯৬২ সালের শিক্ষা অান্দোলন (এস.এম.শরীফ শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টের বিরুদ্ধে),১৯৬৬ সালের ৬ দফা অান্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের অাইয়ুব খান সরকার বিরোধী অান্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। উল্ল্যেখ্য,১৯৬২ সালে শরীফ শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি বেশ কিছুদিন কারাবাস করেন।তিনি মঠবাড়িয়ায় ছাত্রলীগ ও অাওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু তাঁকে জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে বলেন।কিন্তু তাঁর চাচা জনাব মহিউদ্দিন অাহমেদ ন্যাপ (ওয়ালি খান)থেকে কুঁড়েঘর প্রতীকে জাতীয় পরিষদে নির্বাচন করতে অাগ্রহী হলে তিনি প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচন করেন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মোজাম্মেল হক কেদার মিয়াকে বিপুল ভোটে পরাজিত করেন।১৯৭০ সালের নির্বাচনে অাওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদের ৩০০ অাসনের মধ্যে ১৬০ টি অাসনে জয়লাভ করে।পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর না করে বাঙ্গালী নিধনের পরিকল্পনা “অপারেশন সার্চ লাইট” গ্রহণ করতঃ ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত ১১ টার কিছু পরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকাবাসীর উপর ঝাপিয়ে পরে গণহত্যা শুরু করলে বঙ্গবন্ধু রাত ১২:২০ মিনিটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।সেনাবাহিনীর বাঙ্গালী সদস্যরা তাদের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এরুপ অবস্থায় ৪ এপ্রিল রাতে সগীর সাহেবের নেতৃত্বে ১১ সদস্য বিশিষ্ট মঠবাড়িয়া থানা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্যে তিনি মঠবাড়িয়া পোষ্ট অফিসের নতুন ভবনে কন্ট্রোল রুম স্থাপন করেন।লে.জিয়াউদ্দিন পিরোজপুর থেকে মঠবাড়িয়ায় এসে তাঁর নেতৃত্বে থানা থেকে অস্ত্র এনে কন্ট্রোলরুমে রাখেন।সগীর সাহেব সেনা সদস্য সূর্যমনি গ্রামের হাবিলদার ফখরুদ্দিনকে কন্ট্রোলরুমের দায়িত্ব প্রদান করেন।উল্লেখ্য, হাবিলদার ফখরুদ্দিন জামায়াত পন্থী ড.মোস্তাফিজুর রহমানের চাচাতো ভাই।কতিপয় সেনা সদস্য ৬ এপ্রিল থেকে কে.এম.লতীফ ইনষ্টিটিউশনের খেলার মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেন। কৌশলগত কারনে১ সপ্তাহের মধ্যে গুলিসাখালী হাইস্কুল মাঠে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়।প্রশিক্ষণ কার্যক্রম দায়িত্বে ছিলেন সগীর সাহেবের বড় ভাই ডা.শামসুল অালম। এখানে ৩ শতাধিক লোক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।এখানে অামিও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছি। এখানে প্রশিক্ষন দান কার্যক্রমে ছিলেন সুবেদার মেজর অাব্দুল লতীফ হাওলাদার (গুলিসাখালী), সেনা সদস্য সার্জেন্ট অাব্দুল লতীফ হাওলাদার (বহেরাতলা,মঠবাড়িয়া), কর্পোরাল অাব্দুল মোতালেব মৃধা (ঘটিচোরা),,সার্জেন্ট হাবিবুর রহমান (সাপলেজার গেরিলা হাবিব) ও অানসার ভি.ডি.পি. কমান্ডার লাল মিয়া (গুলিসাখালী) ।

১৯৭১ সালের ৪ মে কর্ণেল অাতিক মালিক এবং ক্যাপ্টেন এজাজ অাহমেদ পিরোজপুর শহর দখল করলে ৫ মে সকালে কন্ট্রোল রুম প্রধান হাবিলদার ফখরুদ্দিন পুলিশ সার্কেল প্রধান কাজী জালাল উদ্দিনের নিকট অস্ত্র স্যারেন্ডার করে মঠবাড়িয়ার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মীর জাফর হিসেবে চিহ্নিত হন।অতপর মুক্তিযোদ্ধারা অাত্মগোপনে চলে যান। সওগাতুল অালম সগীর মে মাসের শেষ দিকে সুন্দরবন যান।লে.জিয়াউদ্দিনের সাহায্যে তিনি জুন মাসের ১ম দিকে ভারতে যান।ভারতে গিয়ে তিনি অাগস্ট মাসে পশ্চিম বঙ্গের বশিরহাট মহকুমার হাসনাবাদ থানার অামলানীর অাম বাগানে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প (যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র) স্থাপন করেন।এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের থাকা,খাওয়া ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হত।এ ক্যাম্পের অন্যতম প্রশিক্ষক ছিলেন মঠবাড়িয়ার মাঝেরপুলের কর্পোরাল শরীফ অালমগীর হোসেন। ক্যাম্পটি পরিচালনার জন্যে সগীর সাহেবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ছিল। সগীর সাহেব অনিয়ম দূরীকরণে চেষ্টা করেন, কিন্তু কতিপয় স্বার্থানেষীরর জন্যে তিনি সম্পূর্ন সফল হননি।অামলানী ক্যাম্পে তাঁর বিরুদ্ধে একটি দল সৃষ্টি হয়।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর হানাদার পাকিস্তান বাহিনী বাংলাদেশ-ভারত যৌথবাহিনীর নিকট ঢাকায় স্যারেন্ডার করায় সওগাতুল অালম সগীর কোলকাতা-ঢাকা হয়ে ৪ জানুয়ারী, ১৯৭২ মঠবাড়িয়া অাসেন। মঠবাড়িয়ায় এসে বিধ্বস্ত মঠবাড়িয়াকে পূনর্গঠনে অাত্মনিয়োগ করেন।১৯৭৩ সালের ৩ জানুয়ারী রাত ৮ টার পরে থানা থেকে বাসায় ফেরার পথে দুর্বৃত্তরা মঠবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের উত্তর পাশে রাস্তায় গুলি করে হত্যা করে। তিনি নিহত হওয়ায় মঠবাড়িয়ার অপূরনীয় ক্ষতি হয়েছে, যা অাজও পূরন হয়নি। এ হত্যাকান্ডের ব্যাপারে মঠবাড়িয়া থানায় একটি মামলা হয়।মামলার অাসামী ছিলেন, ১।রফিকুল ইসলাম মাহতাব ২।রফিকুল ইসলাম খোকন ৩।হাবিবুর রহমান শরীফ ৪।অাব্দুস ছালাম মোল্লা প্রমূখ। মামলাটি দীর্ঘদিন চলার পর শহীদ সগীর সাহেবের চাচা জনাব মহিউদ্দিন অাহমেদ মামলাটি প্রত্যাহার করেন। মুক্তিযুদ্ধে সগীর সাহেবের বিপুল অবদান অাছে। অামরা অকৃতজ্ঞ, তাঁকে মূল্যায়ন করিনি। তিনি এক স্ত্রী,এক পুত্র ও এক কন্যাসহ অসংখ্য অাত্মীয়স্বজন রেখে গিয়েছেন। তাঁর স্ত্রী মাহমুদা সওগাত তেজগাঁও মহিলা কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপক ছিলেন। ১৯৯৬ সালে জাতীয় নির্বাচনে অাওয়ামী লীগ জয়লাভ করায় মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা অাসন -১৩ (পিরোজপুর,ঝালকাঠি ও বরিশাল) এর সদস্য মনোনীত করেন। ২০০১ সালে তিনি জাতীয় সংসদের সাধারণ অাসনে পিরোজপুর-৩ থেকে অাওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। দলীয় কোন্দলে তিনি বি.এন.পি. এর প্রার্থী ডাঃ মোঃ রুস্তম অালী ফরাজীর নিকট পরাজিত হন। বর্তমানে তিনি তাঁর কন্যার সাথে কানাডায় বসবাস করতেছেন।

 লেখক > অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও সামাজিক উদ্যোক্তা।
<> প্রচ্ছদে ব্যবহৃত ছবি শিল্পী চঞ্চল কর্মকার এর ম্যুরাল অবলম্বনে ।

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন