৭ মার্চের ভাষণের দিন তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত ছিলেন বঙ্গবন্ধুর অন্যতম সহচর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা উত্তোলনকারি সাবেক ডাকসু ভিপি মুক্তিযোদ্ধা আ স ম আবদুর রব।এই সংগ্রামী যোদ্ধা শোনালেন সেদিনের অজানা অনেক তথ্য। সাক্ষাতকারটি গ্রহণ করেছেন – মো. সবুজ রাসেল ।

৭ মার্চের প্রেক্ষাপট বলুন?

আ স ম আবদুর রব: ৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ১০৪ ডিগ্রী জ্বর ছিলো।১ মার্চের পর থেকেই প্রায় প্রতিদিনই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমাদের কথা-বার্তা হতো।আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড এবং নিউক্লিয়াসের সঙ্গেও যোগাযোগ থাকতো নিয়মিত।

৭ মার্চের সভা নিয়ে ৬ মার্চ রাত পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে। ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’- স্লোগান কোনটা আগে আর কোনটা পরে তা নিয়ে মতানৈক্য ছিলো।

আওয়ামী লীগ বলছিলো, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ আগে হবে, আর নিউক্লিয়াস বলছিলো ‘মুক্তির সংগ্রাম’ আগে বলা।কারণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি না আসলে স্বাধীনতা আসবে না।পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড নিউক্লিয়াসের যুক্তি মেনে নেয়।আর্কাইভসে বঙ্গবন্ধুর যে ভাষণ সংরক্ষিত আছে সেখানে একবার এই স্লোগান আছে।কিন্তু তিনি এটি দুইবার উচ্চারণ করেছিলেন।

# ৭ মার্চ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কোনো স্মৃতি?

আ স ম আবদুর রব: ৬ মার্চ রাত পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার বক্তৃতা কি হবে, এরপরে কি ঘটবে বা ঘটতে পারে এবং এর পরিণতি কি হতে পারে তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়েছে।৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ওখানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান, বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন।

আমরা জানতে পারি, স্বাধীনতা ঘোষণা করলে তাকে ওখানে মেরে ফেলা হবে।খসরু, মন্টু, তোফায়েল আহমেদ, আবদুর রাজ্জাক, সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, শাজাহান সিরাজ, আমি বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে ট্রাকে করে মঞ্চে নিয়ে আসি।

বঙ্গবন্ধু সিরাজ ভাইকে বলতেছিলেন, আমি যদি ইমোশনাললি মুক্তির সংগ্রাম ও স্বাধীনতার সংগ্রাম ভুলে যাই কিংবা আগে-পরে হয়ে যায় তখন কি হবে? সিরাজ ভাই বললেন, আপনি বলেন।বঙ্গবন্ধু বললেন, এক কাজ করো- রবকে আমার পাশে বসতে দাও।আমি যদি ভুলে যাই তাহলে ও আমাকে আকার ইঙ্গিতে মনে করিয়ে দেবে।

# ওইদিন আশে-পাশের পরিবেশ কেমন ছিলো?

আ স ম আবদুর রব: চতুর্দিকে ছিলো মানুষে মানুষে সুরাসুর। কারো হাতে লাঠি, বাঁশ, নৌকার দাঁড়। বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলা হবে- দশ লক্ষ লোকের মধ্যে এজন্য হেলিকপ্টারও উড়তে ছিলো রেসকোর্স ময়দানের ওপরে। বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত কৌশলে বক্তব্যটি দিলেন।

জনগণ বুঝতে পেরেছিলো, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ পুরো নয় মাস মুক্তি পাগল বাঙালিদের মনোবল বাড়িয়েছে এবং সংগ্রামে প্রাণের সঞ্চার করেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর ঐতিহাসিকরা বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণকে গেটিসবার্গের ভাষণের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

# বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার পেছনে কারা অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছেন?

আ স ম আবদুর রব: সামনে বঙ্গবন্ধু।পিছনে সিরাজুল আলম খান।বঙ্গবন্ধু স্থপতি আর সিরাজুল আলম খান রুপকার।৬২’ সাল থেকে যতগুলো আন্দোলন হয়েছে সবগুলোর পেছনেই নিউক্লিয়াস, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, সিরাজুল আলম খান, কাজী আরেফ আহমেদ, শাজাহান সিরাজ, আবদুর রাজ্জাক, আ স ম আবদুর রব এদের ভূমিকা ছিলো।আর সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতেন বঙ্গবন্ধু।

এগুলো হলো পেছনের ইতিহাস, যা ধারাবাহিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সফলতা অর্জন করে।কিন্তু আজকে অনেকে এসব অস্বীকার করছে।খুঁটি ছাড়া তারা যদি বিল্ডিং রাখতে চায় সেটা তো সম্ভব নয়।আমাদেরকে যদি অস্বীকার করা হয় তাহলে বঙ্গবন্ধুকে তো বড় করা যাবে না।আইন করে বঙ্গবন্ধুকে তো মহান নেতা বানানো যাবে না।

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন