রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একটি কথা প্রচলিত রয়েছে। সেটা হলো, একটি রাষ্ট্র দুইভাবে চলতে পারে। এক, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনেরা একটি সুদূপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে এগোয়। সে পরিকল্পনার ওপর ভিত্তিকরে রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক পরিস্থিতিসহ গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রটিই পরিচালিত হয়। সার্বিক উন্নয়নের ঝান্ডা হাতে রাষ্ট্র নায়কেরা গোটা সমাজকে নেতৃত্ব দিয়ে সামনে এগিয়ে নিয়ে চলেন। দুই, ক্ষমতাসীনেরা যখন এই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা প্রণয়নে ব্যর্থ হন, তখন গোটা সমাজ বিচ্ছিন্নভাবে বা বিশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে চলে। সবস্তরেই অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। আর এটা তখনই ঘটে, যখন ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো গঠনমূলক রাজনীতি করতে ব্যর্থ হন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এখন আমাদের দেশ কিংবা সমাজ কিভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সে বিষয়ে ভাবার কিংবা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। গণমাধ্যমই এই কাজটি করে থাকে।

কারণ, একটি দেশের রাজনীতি,অর্থনীতি কিংবা যে কোনো ক্ষেত্রেই হোক সমাজের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে বলেই গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের ‘চতুৃর্থ স্তম্ভ’ বলা হয়। ফলে রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যান্য ক্ষেত্রগুলোর চেয়ে গণমাধ্যম কোনো ভাবেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে সেক্ষেত্রে অবশ্যই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা-বস্তুনিষ্ঠতা এবং গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন আসবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অবশ্যই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা-বস্তুনিষ্ঠতা কিংবা গ্রহণযোগ্যতা হাজারো প্রশ্নের তীরে বিদ্ধ হবে।

গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে আবুল মনসুর আহমদ তার বিখ্যাত বই ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ এ চমৎকার কিছু কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, “সাহিত্যক ও সাংবাদিকদের সব ব্যাপারেই কিছু-কিছু মত থাকে। বিশেষত: সাংবাদিকদের। সম্পাদকীয় লিখিতে হইলে সম্পাদক দিগকে সব বিষয়ে ‘পন্ডিত’ হইতে হয়। এরা সব-ব্যাপারে সকলের স্বনিয়োজিত উপদেষ্টা। এরা জিন্না সাহেব কে রাজনীতি সম্বন্ধে, গান্ধীজীকে অহিংসা সম্বন্ধে, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রকে রসায়ন সম্বন্ধে, ডা: আনসারীকে চিকিৎসা সম্বন্ধে, হক সাহেবকে ওযারতি সম্বন্ধে শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে দলীয় রাজনীতি সম্বন্ধে, মাওলানা আযাদকে ধর্ম সম্বন্ধে এমনকি জেনারেল দ্যগলকে যুদ্ধ-নীতি ও স্ট্যালিনকে কমিউনিযম সমন্ধে উপদেশ দিয়া থাকেন। সেই উপদেশ না মানিলে কষিয়া গালও দিয়া থাকেন। উপদেশে, দেওয়া এদের কর্তব্য ও ডিউটি। ঐজন্যই তাঁরা সম্পাদক। ঐ জন্যই ওদের বেতন দেওয়া হয়। মাস্টারদেরে বেতন তেমন দেওয়া হয়। বেতনের বদলে তাঁরা ছাত্রদের পাঠ দেন, সম্পাদকরাও দেশের রাষ্ট্র নায়ক ও চিন্তা নায়কদের পাঠ দেন। সম্পাদকরা মাস্টার, নেতারা ছাত্র। কলেজের অধ্যাপকরা যেমন পরের বই পুস্তক পড়িয়া নিজেরা তৈয়ার হইয়া ক্লাসে লেকচার দেন, সম্পাদকরাও ওই বিষয়ে ওয়াকিফহাল হইয়া সম্পাদকীয় ফাদিয়া থাকেন।”

তার এই উদ্ধৃতিটির উল্লেখ করার বিশেষ একটা কারণ রয়েছে। সেটি হলো চলমান বাস্তবতার সাথে এর কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। উপরের উদ্ধৃতিতে বেশ ভালো ভালো কথা বলা হয়েছে। শুনতে ভালো শোনা যায়। একসময় গণমাধ্যম এই ভূমিকা পালনও করতো। কিন্তু বর্তমানের বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। বাংলাদশের গণমাধ্যমের মূল সমস্যার কারণ এটিই। কোনো গণমাধ্যমই রাষ্ট্র নায়ক বা চিন্তা নায়কদের পাঠ দিতে পারছেন না একথা যেমন সত্য। ঠিক তেমনি রাষ্ট্র নায়কেরা গণমাধ্যমের শিক্ষকের ভূমিকা পালন করছে। কোন খবর প্রকাশ করা যাবে, কতটুকু যাবে, সেক্ষেত্রে যেমন প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। ঠিক তেমনি গণমাধ্যমও অন্ধের হাতি দেখার মতো প্রয়োজন মাফিক গোটা পরিস্থির খন্ডাংশ প্রকাশ করছেন। সমাজের সামগ্রিক চিত্র কখনোই প্রকাশ করা হচ্ছে না। এতে উভয়েরই ক্ষতি হচ্ছে। গোটা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের চলার পথ যেমন কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। তেমনি গোটা সমাজেও অস্থিতিশীলতা দেখা দিচ্ছে।
যেখানে রাষ্ট্রের সাথে সমাজের সর্বস্তরের সেতুবন্ধনের কাজটি গণমাধ্যম করে থাকে, সেখানে দেখা যাচ্ছে সমাজ থেকে রাষ্ট্র ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

সমাজ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব কমে যাচ্ছে। ফলে গঠনমূলক রাজনীতি গড়ে উঠছে না। অর্থনৈতিক অগ্রগতির কথা বলা হলেও তার সুফলটুকু মানুষ পাচ্ছে না। রুপকথার গল্পের মতো শোনাচ্ছে। সমাজের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই রাষ্ট্রপরিচালনার কৌশল নির্ধারণ করা হয়। ফলে রাষ্ট্র যা বলে বা করে তার চিত্র সমাজের মাঝেও ফুটে ওঠে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঠিক এর উল্টো চিত্রই আমরা দেখতে পাচ্ছি। রাষ্ট্র যা বলছে। তার সাথে সামাজিক পরিস্থিতির কোনো মিল নেই। এই পরিস্থিতর জন্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি গণমাধ্যমও কোনো ভাবেই দায় এড়াতে পারে না। কারণ গণমাধ্যম রাষ্ট্র এবং সমাজের মধ্যে সেতুবন্ধন করতে রাষ্ট্র নায়ক- রাষ্ট্র চিন্তকদের উপদেশ দিতে কিংবা কষে গাল দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন। একটি গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিক হিসেবে উপরোল্লিখিত প্রতিটি কথা বর্তমান প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যাচিয়ে নেওয়া আবশ্যক।

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন