অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর হিরু>
১৯৭১ খ্রীস্টাব্দে জাতি-রাষ্ট্র স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা লাভের পরে স্বাভাবিকভাবেই জাতির প্রত্যাশা ছিল স্বাধীন দেশে এমন শিক্ষানীতি গ্রহণ করা হবে-যা কর্মমূখী, বিজ্ঞানমুখী, আদর্শ ও নৈতিকতা উদ্দীপক এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় দিক-নির্দেশক হবে। এদেশের ছাত্র সমাজই পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক, বিভেদাত্মক, বৈষম্যমূলক, অবৈজ্ঞানিক শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন। যার ফলশ্রুতিতেই বাঙালীর জাতীয় চেতনা বিকশিত হয় এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
সেই বাংলাদেশে স্বাধীনতা-পরবর্তী গত ৪৩ বছরে আমরা লক্ষ্য করছি: এখনো পর্যন্ত ১৯৬২ খ্রীস্টাব্দে বিচারপতি হামিদুর রহমানের শিক্ষা কমিশন কর্তৃক প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিই কোনো না কোনোভাবে বাংলাদেশে কর্যকর হয়েছে। অথচ, হামিদুর রহমানের শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে ১৯৬২ খ্রস্টাব্দের ঐতিহাসিক আন্দোলনের মুখে পাকিস্তান সরকার উক্ত শিক্ষানীতি বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! স্বাধীন বাংলাদেশে প্রকারান্তরে উক্ত প্রত্যাখ্যাত শিক্ষানীতির মর্মানুসারেই শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে। ধর্ম শিক্ষা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা আরও বিস্তৃত ও পাকাপোক্ত হয়েছে। ভিনদেশী সংস্কৃতি ও মৌলবাদ আসর গাড়ার সুযোগ পেয়েছে। দেশ প্রেম ও জাতীয় চেতনার বদলে ভোগবাদী চিন্তা দৃঢ় ভিত্তি লাভ করছে। জাতীয় সংস্কৃতির বদলে ভিনদেশী অপসংস্কৃতির জোয়ার বইছে।
রাষ্ট্র-চিন্তক সিরাজুল আলম খান ১৯৭২ খ্রীস্টাব্দের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে রাষ্ট্রপরিচালনা সংক্রান্ত ১৫ টি সুপারিশ পেশ করেছিলেন। তাতে শিক্ষা ব্যবসস্থাপনা সংক্রান্ত কতিপয় পরামর্শ ছিল। যেমন, শিক্ষক -ছাত্রদের সমন্বয়ে ‘শিক্ষা ব্রিগেড’ গঠন করে এক বছরের মধ্যে স্বাক্ষরতারর হার শতকরা ৬০ (ষাট) এ উন্নীত করা। শিক্ষিক-ছাত্রদের নিয়ে ছোট ছোট স্কোয়াড গঠন করে সারাদেশে সাক্ষরতা আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়া। উচ্চশিক্ষার জন্য প্রয়োজনে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা। শিক্ষা শেষে কর্মক্ষেত্রে যোগদানের নিশ্চয়তা সৃষ্টি করা। স্বাধীনতা-পরবর্তী সরকার এই সুপারিশসমূহ আমলে আনলে দেশের শিক্ষা পরিস্থিতি আজকের মত অধ:পতিত হতো না।
স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে যে শিক্ষানীতি বলবৎ হয়, তাতে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর চিন্তা-জগতে বিভ্রান্তি ও বিভাজন সৃজিত হয়েছে। পাকিস্তানি আমলের অনুসৃত মাদ্রাসা শিক্ষা, সাধারণ শিক্ষা, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা পদ্ধতি এই তিন ব্যবস্থাই বহাল রেখে কার্যত: ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থাই চালু রাখা হয়। গত ৪৩ বছরে স্বাধীন দেশপোযোগী জাতীয়-চেতনায় জাগ্রত শিক্ষিত দক্ষ জনগোষ্ঠী সৃজনে এই ব্যবস্থা অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। সত্যিকার অর্থে জাতীয়তাবাদী চেতনা-সমৃদ্ধ জ্ঞান-বিজ্ঞানে আলোকিত কর্মমূখী শিক্ষিত জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা আজও চালু করা সম্ভব হয়নি। শিক্ষার কেবল বাণিজ্যিকরণই হয়নি, কৃত্তিম উপায়ে পাসের হার বাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়- বোর্ডের সনদ প্রাপ্ত একটি অজ্ঞ জাতি তৈরী করা হচ্ছে। বিজ্ঞান শিক্ষার বদলে বাণিজ্য ও ধর্ম শিক্ষা প্রসার লাভ করছে। ভোগবাদ ও মৌলবাদ অবাধে বিস্তৃত হচ্ছে। নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার বদলে প্রতারণা করার কুশিক্ষা বিস্তৃত হচ্ছে। ফলত দেশের ভবিষ্যত অন্ধকার যুগের দিকেই ধাবিত হচ্ছে। এর জন্য প্রধানত: বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা ও পদ্ধতিই দায়ী।
তাই, এখন প্রয়োজন, এমন একটি শিক্ষাক্রম সকল ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বাধ্যতামূক করা- যার মাধ্যমে সমগ্র শিক্ষিত সমাজ জাতীয় চেতনা সমৃদ্ধ কর্মমূখী, বিজ্ঞানমূখী, দক্ষ নাগরিকে পরিণত হতে পারে।
বাঙালী জাতির অগ্রযাত্রাকে গতিশীল করতে হলে নাগরিকদের চিন্তার জগতকে দর্শন-ভিত্তিক ঐক্য-চেতনায় সমৃদ্ধ করতে হবে এবং জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার প্রাসঙ্গিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণে জাতিকে প্রস্তুত করতে হবে। এই লক্ষ্যই হওয়া উচিত শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য।

(লেখক- সাবেক সংসদ সদস্য, সমাজবিপ্লবীকামী রাজনীতিক, ভূতর্পূর্ব অধ্যপক হাবিবুল্লাহ বাহর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, ঢাকা)

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন