বরগুনা লঞ্চঘাট

ঢাকা-বরগুনা-ঢাকা রুটে লঞ্চ মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতার কাছে দীর্ঘদিন ধরে জিম্মি হয়ে আছে শত শত যাত্রী।

২০-৩০ বছর আগের ঝুঁকিপূর্ণ পুরনো লঞ্চ দিয়েই চলছে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে বরগুনার নৌযোগাযোগ। যাত্রী পরিবহনের চেয়ে পণ্য পরিবহনকেই অধিক গুরুত্ব দিয়ে চলেছে এসব লঞ্চ।

বরগুনা থেকে দুপুর ২টায় ছাড়লেও কখন গিয়ে ঢাকা পৌঁছাবে তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই এসব লঞ্চের। একইভাবে ঢাকা থেকে বিকেল ৫টায় ছাড়লেও কখন বরগুনায় পৌঁছাবে তারও কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই এসব লঞ্চের। এসব নানা কারণে এ রুট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে সাধারণ যাত্রীরা। ফলে জেলা সদরের লঞ্চঘাট রেখে ১০ কিলোমিটার দূরের আমতলী রুটের লঞ্চে যাতায়াত করছে এখন বরগুনার অধিকাংশ যাত্রী।

বরগুনা থেকে ঢাকাগামী একটি লঞ্চের একজন সাধারণ যাত্রী ইউসুফ আলী মল্লিক (৬৫) বলেন, বরগুনার আমতলী উপজেলা থেকে যেসব লঞ্চ ঢাকায় যায় তাতে শুধু আমতলী ও মির্জাগঞ্জ উপজেলার যাত্রীরা যাতায়াত করে। তারপরও তারা ব্যবসার দিক দিয়ে ভালোভাবে টিকে রয়েছে। তাদের লঞ্চের মানও ভালো। অথচ বরগুনা থেকে যেসব লঞ্চ ছেড়ে যায় তাতে বরগুনা ও ঝালকাঠি জেলা সদরসহ, পাথরঘাটা, বামনা, বেতাগী এবং কাঁঠালিয়া উপজেলার শত শত যাত্রী প্রতিদিন যাওয়া-আসার কথা। কিন্তু শুধুমাত্র সেবার নিন্মমান এবং লঞ্চ মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে এসব লঞ্চ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে যাত্রীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরগুনা-ঢাকা রুটে মোট ৯টি লঞ্চ রয়েছে। ৯টি লঞ্চের মধ্যে একজন মালিকেরই রয়েছে চারটি লঞ্চ। এসব লঞ্চের মালিকরা সিন্ডিকেট করে তাদের স্বেচ্ছাচারিতার মধ্য দিয়ে ব্যবসা করে আসছে। বরগুনার ক্রোক এলাকার একজন স্থানীয় অধিবাসী মো. মাসুদ (৪৭) জানান, সিন্ডিকেট করে প্রতিদিন মাত্র একটি লঞ্চ ছাড়ছে মালিকরা। ফলে সেবার মানের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিযোগিতা নেই। কারো কাছে তাদের কোনো জবাবদিহিতাও নেই।

মো. মাসুদ আরো জানান, যাত্রীসেবার মান ভালো হলে দুটি লঞ্চ দিয়েও এখানে চাহিদা মেটাতে পারতেন না মালিকরা। তারা ইচ্ছে করেই যাত্রীসেবার মান ভালো করছেন না। তারা পণ্য পরিবহন করেই অল্প পুঁজিতে বেশি লাভ করতে আগ্রহী।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা-বরগুনা রুটের একটি লঞ্চের একজন সুকানি (চালক) বলেন, “এই রুটে অনেক যাত্রী রয়েছে। কিন্তু নানা কারণে আমরা সময়মতো ঢাকা-বরগুনা পৌঁছাতে না পারায় সেসব যাত্রী বাধ্য হয়েই সড়কপথে যাতায়াত করে থাকে। তারপরও যেসব যাত্রী নৌপথ ভালোবাসেন অথবা অন্যকোনো কারণে বাধ্য হয়ে এসব লঞ্চে ওঠেন, তারা সবাই তাদেরকে ভর্ৎসনা করেন। এসব সমস্যার মূলে লঞ্চ মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতাকেই দায়ী করেন তিনি।

ওই সুকানি আরো জানান, ২০-৩০ বছর আগের পুরনো লঞ্চ দিয়েই চলছে এ রুটের যাতায়াত। কেবিনের মান ভালো নয়, বাথরুম, রেস্টুরেন্ট কোনো কিছুই সময় উপযোগী নয়। মালিকরা যেহেতু বড় কোনো পুঁজি না খাটিয়েই এখানে ব্যবসা করতে পারছেন, সেহেতু সেবার মান বাড়াতে তাদেরও আগ্রহ নেই। যাত্রীর চেয়ে এখন তারা পণ্য পরিবহনকেই গুরুত্ব দেন বেশি।

‘আল্লাহর মর্জি’ নামে বরগুনা-ঢাকা রুটের একটি লঞ্চের একজন সুকানি মো. নান্টু মিয়া বলেন, “ভোলার লালমোহন, চরফ্যাশন এবং বোরহান উদ্দিন উপজেলায় একসময় এমন ভাঙাচোরা লঞ্চ চলতো। সেখানকার জনপ্রতিনিধিরা একদিন লঞ্চ মালিকদের ডেকে বলেছিলেন, ‘এসব পুরনো লঞ্চ আর এ ঘাটে চলবে না। নতুন লঞ্চ এনে চালাতে পারলে চালাও নইলে না।’ তারা নাকি যাত্রা শুরু এবং শেষের সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘ঢাকা থেকে ক’টায় ছাড়বা জানি না। এখানে এসে পৌঁছাতে হবে সকাল ৬টার মধ্যে।’ সেদিনের পর থেকেই নাকি পাল্টে গেছে ওইসব রুটের লঞ্চ ঘাটের দৃশ্য। সময়সীমা মেনে সুদৃশ্য বিলাসবহুল একাধিক লঞ্চ চলছে এখন সেসব রুটে।”

এ বিষয়ে বরগুনা প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসানুর রহমান ঝন্টু বলেন, “বরগুনা রুটের লঞ্চ তো আর এখন যাত্রীবাহী নেই, এসব লঞ্চকে এখন পণ্যবাহী বলাই বোধ হয় ভালো।” এ বিষয়ে তিনি নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্বহীনতাকে দায়ী করে বলেন, “আমতলী থেকে বিকেল ৫টায় ছেড়ে যদি পরদিন সকাল ৬টার মধ্যে ঢাকা পৌঁছানো সম্ভব হয় তবে কেন বরগুনা থেকে বেলা দেড়টায় ছেড়েও পরের দিন ৬টায় ঢাকা পৌঁছাতে পারবে না?”

নৌবন্দর, বরগুনার বন্দর কর্মকর্তা মামুন অর রশীদ জানান, বরগুনায় যেসব লঞ্চ চলছে তার মান খুব ভালো না হলেও একেবারে খারাপও না। যাত্রী পরিবহনের চেয়ে পণ্য পরিবহন এবং সময় মেনে না চলার বিষয়ে তিনি বলেন, “এই রুটে যাত্রী কম হয়, তাই পণ্য পরিবহন করতে হয়। আর পণ্য পরিবহন  করতে হলেই বিভিন্ন ঘাটে পণ্য ওঠা-নামার জন্য সময় বেশি লাগে।”

আমতলী-ঢাকা রুটের লঞ্চগুলো কীভাবে পণ্য পরিবহন ছাড়াই যাত্রী সেবার মান ঠিক রেখে ব্যবসা করে যাচ্ছে- এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

এ বিষয়ে বরগুনা সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আব্বাস হোসেন মন্টু মোল্লা বলেন, “বরগুনার অধিকাংশ যাত্রীই আমতলী রুটের লঞ্চেই যাতায়াত করে। বরগুনা রুটের লঞ্চের মান তুলনামূলকভাবে খারাপ হওয়ায় এবং বরগুনা থেকে ঢাকা এবং ঢাকা থেকে বরগুনা পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগে যাওয়ার কারণে এ রুট থেকে যাত্রীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।” বরগুনা ১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর সঙ্গে আলাপ করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে বলে তিনি জানান। বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ প্রশাসক আলহাজ জাহাঙ্গীর কবীর জানান, বিষয়টি তাঁর নজরে রয়েছে। বিষয়টি তিনি দেখবেন বলেও জানান তিনি।

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন