আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সীমিত পর্যায়ে অনানুষ্ঠানিক আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে বলে দাবি করেছে কয়েকটি সূত্র। তবে অত্যন্ত গোপনে শুরু হওয়া এ তত্পরতার সঙ্গে যুক্ত নেতারা কৌশলগত কারণে এখনই তা স্বীকার করতে চাইছেন না। তাঁদের ভাষ্য, বিষয়টি এখনো অত্যন্ত প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রের দাবি, অনানুষ্ঠানিক এ তত্পরতার সঙ্গে সরকারের দিক থেকে যুক্ত রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী। অন্যদিকে বিএনপির পক্ষে রয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টু, ড. ওসমান ফারুকসহ বেশ কয়েকজন।

সূত্র মতে, গওহর রিজভী সম্প্রতি বিএনপির এই তিন নেতার পাশাপাশি দলটির বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। এর মধ্যে গুলশানে দলটির প্রভাবশালী এক নেতার বাসায়ও গিয়েছিলেন তিনি। তার সঙ্গে আলাপকালে বিএনপির ওই নেতা বিষয়টি স্বীকার করলেও এ বিষয়ে আর কিছু বলতে রাজি হননি।
জানতে চাইলে গওহর রিজভী বলেন, ‘আসলে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বা দায়িত্ব দিয়েছেন, বিষয়টি এমন নয়। তবে এটি ঠিক যে সম্প্রতি আমি নিজে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপ করেছি।’

কী বিষয়ে কথা হয়েছে—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচন কোনো ইস্যু নয়; পরবর্তী, অর্থাৎ ২০১৯ সালের নির্বাচন নিয়ে কথাবার্তা হতে পারে। কারণ সরকার আগামীতে সবাইকে নিয়েই নির্বাচন করতে চায়।’

জানতে চাইলে ড. মঈন খান অবশ্য এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে ড. ওসমান ফারুক বলেন, ‘সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানের ফাঁকে তিনি (গওহর রিজভী) আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। সেটিকে ঠিক সমঝোতার আলাপ-আলোচনা বলা ঠিক হবে না।’

চেয়ারপারসনের আরেক উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টু দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে বিদেশে। টেলিফোনে তিনি বলেন, এটি তো ঠিক যে আগামী নির্বাচন নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়া প্রয়োজন। দেশি-বিদেশি সবাই মনে করে, সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন হওয়া দরকার। ফলে নির্বাচনের আগের এবং পরের দুই পরিস্থিতি নিয়েই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সমঝোতা হতে পারে।

এক প্রশ্নের জবাবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির প্রভাবশালী আরেক নেতা জানিয়েছেন, পর্দার আড়ালে চলা এসব তত্পরতার বিষয়ে খালেদা জিয়া অবগত আছেন। তাঁর মতে, প্রধানমন্ত্রীর সবুজ সংকেত ছাড়া সরকারের কোনো মন্ত্রী বা নেতার পক্ষে কোনো ধরনের আলোচনা শুরু করা সম্ভব নয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রকাশ্যে সরকার কঠোর অবস্থানে থাকলেও একের পর এক ‘অঘটন’ নিয়ে বেশ চিন্তিত সরকার। বিশেষ করে বিদেশি হত্যা, শিয়া মসজিদে বোমা হামলা, দিনাজপুরে রাশ মেলায় ককটেল হামলা ও বগুড়ায় মসজিদের ভেতরে গুলিবর্ষণসহ বিভিন্ন ঘটনায় সরকার অস্বস্তিতে রয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের পাশাপাশি সচেতন জনগোষ্ঠী, এমনকি সরকারের কেউ কেউ মনে করেন, রাজনৈতিক অচলাবস্থার সুযোগে বিভিন্ন অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তা ছাড়া একতরফা নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা সরকারকে কত দূর টেনে নেওয়া যাবে, তা নিয়েও ভেতরে আলোচনা আছে। অনেকের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশেও আইএস মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। এ ছাড়া বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের এক ধরনের চাপের মুখেও রয়েছে সরকার। যে কারণে মন্ত্রীদের অনেকে প্রকাশ্যেই আজকাল যুক্তরাষ্ট্রের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে বক্তব্য দিচ্ছেন।
এদিকে রাজনৈতিকভাবে শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ না থাকলেও বিদেশে অব্যাহতভাবে লবিং চালিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। বর্তমানে দলটির চারজন নেতা ভারতে অবস্থান করছেন। তাঁদের মধ্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান চিকিৎসার জন্য গেছেন বলে জানিয়েছেন। একটি সেমিনারে অংশ নেওয়ার জন্য ব্যাংকক থেকে ভারতে গেছেন আবদুল আউয়াল মিন্টু। আর দুই দিন আগে ভারতের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের অন্য দুই উপদেষ্টা; যাঁরা বিএনপির বৈদেশিক সম্পর্ক রক্ষার বিষয়ে কাজ করেন।

সূত্রের দাবি, খালেদা জিয়ার নির্দেশেই চার নেতা এখন ভারতে। ওই দেশে ক্ষমতার কেন্দ্র বলে পরিচিত দু-একটি প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষমতাসীন মহলের কারো কারো সঙ্গে তাঁদের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সূত্রের দাবি, খালেদা জিয়ার লন্ডন সফরের সময়ই এসব বৈঠকের সময় ও দিনক্ষণ ঠিক করা হয়।
বিএনপির উপলব্ধি হলো, বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন প্রশ্নে আন্তর্জাতিক যে মেরুকরণ—এর সঙ্গে শুধু ভারত যুক্ত হলেই সরকার নতুন নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে। ফলে দলটি ওই দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে এখন সবচেয়ে বেশি মরিয়া। আর তাদের এ তত্পরতা বিষয়ে সরকারও অবগত।
এদিকে গত রাতে ভারতের বিদায়ী হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খানের গুলশানের বাসায় নৈশভোজে অংশ নেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান। ভারতীয় হাইকমিশনারের আজ খালেদা জিয়ার সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাতের কথা রয়েছে।

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন