পৌরসভা নির্বাচনের জন্য দাখিল করা মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের দুই দিনে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত মেয়র পদে বিএনপির মনোনীত আট প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।

‘সামান্য ভুলের’ কারণে ধানের শীষ প্রতীকে পৌর নির্বাচনে মেয়র পদে লড়ার সুযোগ হারিয়েছেন তারা, যদি না আপিলে ফিরে পান প্রার্থিতা।
সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দেয়া তথ্যমতে, মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে হলফনামায় তথ্য গোপনের; কেউ আবার আয়কর রিটার্ন দাখিল করেননি; যথাযথভাবে জামানত না দেয়া বা শিক্ষাগত যোগ্যতা লুকানোর ত্রুটিও আছে।
এসব কারণে যাচাই-বাছাইয়ের প্রথম দিন শনিবার বিএনপির চারজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়।
শেষ দিন আজ রবিবার সিলেটের গোলাপগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ঝিনাইদহের মহেশপুর এবং গোপালগঞ্জে বাতিল হয়েছে বিএনপির আরও চারজনের মনোনয়নপত্র। সেখানেও প্রার্থীদের দাখিল করা কাগজপত্রে গরমিল পাওয়ার কথা জানিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা।
তবে বিএনপির প্রার্থীরা দাবি করছেন, তাদের দাখিল করা কাগজপত্রে সবকিছু ঠিক থাকলেও ষড়যন্ত্র করে তাদের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। কেউ আবার এর বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিলের কথাও বলছেন।
বিভিন্ন নির্বাচনে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিলের পেছনে এমন ভুলের ঘটনা নতুন নয়। গত এপ্রিলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে সবকিছু চূড়ান্ত থাকলেও ‘ছোট্ট ভুলে’ প্রার্থিতা টেকেনি বিএনপির নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টুর। মিন্টুর প্রার্থিতার সমর্থনকারী আবদুর রাজ্জাক সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন এলাকার ভোটার না হওয়ায় তার প্রার্থিতা বাতিল করে দেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
নির্বাচন কমিশনের এমন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেছিলেন মিন্টু। সেখানেও তিনি ব্যর্থ হন।
এ ত্রুটি নিয়ে ওই সময় দলের ভেতরে-বাইরে নানা গুঞ্জন শোনা গিয়েছিল। কারো সন্দেহ ছিল, নির্বাচনে না লড়তেই ইচ্ছাকৃতভাবে এমনটা করা হয়েছে।
ওই নির্বাচনে ঢাকা দক্ষিণে মেয়র পদে প্রার্থী বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক নাসির উদ্দীন আহম্মেদ পিন্টুর মনোনয়নপত্রও বাতিল হয়েছিল। কারণ ছিল হলফনামায় মামলাসংক্রান্ত তথ্য যথাযথভাবে উল্লেখ ন করা। বিডিআর বিদ্রোহ মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি পিন্টু নির্বাচনের কিছুদিন পর কারাগারে মারা যান।
ঢাকা সিটি করপোরেশনের পর এবার পৌরসভা নির্বাচনেও এমন ভুলের পেছনে প্রার্থীদের উদাসীনতাই দেখছেন কেউ কেউ।
এবার প্রথমবারের মতো দলীয়ভাবে নির্বাচন হচ্ছে বলে এ ক্ষেত্রে দল হিসেবে বিএনপিরও দায় ছিল প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র সঠিকভাবে জমা দেয়া হচ্ছে কি না তা স্থানীয়ভাবে দেখভাল করা। সেটি তারা করে থাকলেও কোথাও কোথাও যে তার ঘাটতি ছিল এর প্রমাণ আটজনের মতো প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া।
জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পর্ষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ ঢাকাটাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, নামের বানান ভুল, ছবিতে কাটা-ছেঁড়া এটা খুবই নগণ্য ভুল। এসব ভুল নির্বাচন কমিশন ধরলেও পারে, না ধরলেও পারে। তবে ইসি কোন মানসিকতায় বিষয়টি বিবেচনা করছে, সেটাই বড় কথা।
নাজমুল আহসান আরও বলেন, এবারই প্রথম দলীয় প্রতীকে পৌরসভা নির্বাচন হচ্ছে, তাই প্রার্থীদের এ ক্ষেত্রে আরো সচেতন হওয়া উচিত ছিল। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টুর মনোনয়ন বাতিল নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা হয়েছিল। এবারও সে রকম ঘটলে তা বিচিত্র কিছু হবে না।
অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ভুল তো ভুলই। ইসির কাজ ভুলের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া। তবে দেখার বিষয় হলো, সব দলের বিরুদ্ধে একই মাপকাঠিতে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে কি না। বিষয়টি একই মাপকাঠিতে না হলে ইসির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
মনোনয়নপত্র বাতিলের কারণ হিসেবে রিটার্নিং কর্মকর্তারা যেসব কারণের কথা বলছেন, তাকে একেবারে ছোট করে দেখার জো নেই। তবে যেসব প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে, তাদের অনেকে বলছেন, তাদের মনোনয়নে কোনো ভুল নেই। ষড়যন্ত্র করে তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। তাদের একজন চাঁদপুরের ছেংগারচরের সারোয়ারুল আবেদীন।
শনিবার চাঁদপুরের এই ছেংগারচরসহ ফেনী সদর ও পরশুরাম এবং মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিম পৌরসভায় বিএনপির প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়।
ছেংগারচরের সারোয়ারুল আবেদীনের মনোনয়নপত্র বাতিলের বিষয়ে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা কাজী হেকমত আলী জানান, সারোয়ারুল শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ ও আয়কর রিটার্ন জমা দেননি। জাতীয় পরিচয়পত্রে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক উল্লেখ থাকলেও মনোনয়ন ফরমে লেখা হয়েছে এসএসসি।
প্রার্থিতা বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানিয়ে সারোয়ারুল আবেদীন বলেন, “মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র জমা দিয়েছি। কোনো ধরনের ভুল-ত্রুটি ছিল না। এরপরও কেন মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে তা আমার বোধগম্য নয়।”
ফেনী পৌরসভায় বিএনপির প্রার্থী ফজলুর রহমান বকুলের প্রার্থিতা বাতিলের বিষয়ে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. এনামুল হক বলেন, “প্রার্থী তার হলফনামায় তথ্য গোপন করায় এবং পৌর অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি না থাকায় তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়।”
অন্যদিকে বিধি মোতাবেক জামানত না দেওয়ায় পরশুরাম পৌরসভায় বিএনপির প্রার্থী মো. মোস্তাফিজুর রহমানের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে বলে জানান সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা সাহেদা আক্তার।
এদিকে এ পৌরসভায় আর কোনো প্রার্থী না থাকায় একক প্রার্থী হিসেবে বর্তমান মেয়র আওয়ামী লীগের নিজাম উদ্দিন আহাম্মেদ চৌধুরী সাজেল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণার অপেক্ষায়।
অন্যদিকে মিরকাদিম পৌরসভায় প্রার্থী সংকটের কারণে মো. শামসুর রহমান নামে একজনকে বিএনপি প্রার্থী করলেও তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে গেছে। যে কারণে এখন মিরকাদিমে বিএনপির কোনো প্রার্থী নেই।
সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ফয়সাল কাদের জানান, “তিন হাজার ৪৫৭ টাকার পৌর হোল্ডিং কর বকেয়া থাকায় শামসুরের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।” তিনি আরো জানান, পৌরসভার সচিব স্বাক্ষরিত বকেয়া তালিকা অনুযায়ী বিধি মোতাবেক বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।”
তবে বিএনপির এই প্রার্থীর দাবি হোল্ডিং কর বকেয়ার বাড়ির মালিক তিনি নন, তার শ্বশুর। প্রার্থিতা ফিরে পেতে তিনি আপিল করবেন বলে জানান।
ঝিনাইদহের মহেশপুরে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশাফুর রহমান জানান, প্রার্থীর মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দেয়া হলফনামায় ত্রুটি থাকায় তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়।
বিভিন্ন নির্বাচনে নিজেদের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্রে এভাবে ভুল থাকবে, আর তা বাতিল হবে, এটা যেন বিএনপির নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথবা ভুল থেকে শিখছে না বিএনপি বা তার নেতারা।
বাতিল হওয়া মনোনয়নপত্রের বিষয়ে আগামী দুই দিন আপিল করতে পারবেন প্রার্থীরা। সেখানেই নির্ধারিত হবে সত্যাসত্য।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ৩০ ডিসেম্বর দেশের ১৩৫ পৌরসভায় একযোগে ভোট নেয়া হবে।

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন