নূর হোসাইন মোল্লা >

(২য় পর্ব)
সাবেক রাষ্ট্রপতি লেঃ জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ সাপ্তাহিক বিচিত্রায় “যেভাবে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল” শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন, ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা আমাদের কাছে গ্রীণ সিগন্যাল বলে মনে হল। আমরা বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাকে চূড়ান্ত রূপ দিলাম। গ্রীণ সিগন্যাল এবং চূড়ান্ত রূপদান জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর নিকট থেকে পেয়েছেন তা তিনি উক্ত প্রবন্ধে অকপটে স্বীকার করেছেন। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার পর জনসাধারণ, সেনাবাহিনী, বাঙ্গালী এবং অবাঙ্গারীদের মধ্যে সংঘর্ষ ছিল নিত্যকার সাধারণ বিষয়। ফলে হতাহত হয় অসংখ্য মানুষ।
এ সময়ে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের উপ প্রধানের  দায়িত্বে ছিলেন বাঙ্গালি ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুর রহমান মজুমদার। তিনি চট্টগ্রামে অবস্থানরত সিনিয়র সামরিক অফিসারদের নিয়ে একটি সামরিক পরিকল্পনা তৈরী করে বঙ্গবন্ধুর সামরিক উপদেষ্টা এবং জাতীয় পরিষদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল (পরবর্তীতে জেনারেল) এম, এ, জি, ওসমানির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর নিকট পেশ করার জন্যে ক্যাপ্টেন আমিন আহমেদ চৌধুরীর (পরে মেজর জেনারেল) মারফত এম,এ,জি, ওসমানির নিকট প্রেরণ করেন। বাঙ্গালি নিধন পরিকল্পনা “অপারেশন সার্চ লাইট” সফলকল্পে সামরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করার জন্যে ধুরনধর ইয়াহিয়া খান ১৫ মার্চ ঢাকায় আসেন এবং বঙ্গবন্ধুর সাথে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে আলোচনা করেন। আলোচনার এক পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট পি,পি,পি, এর নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোকে আলোচনার জন্যে ঢাকায় আহবান জানালে তিনে ২১ মার্চ ঢাকায় আসেন। ২২ মার্চ সকালে প্রেসিডেন্ট- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব-ভুট্টোর মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। প্রেসিডেন্টকে সহায়তা করেন, লে: জেনারেল জি.এম. পীরজাদা, বিচারপতি এ.আর. কর্নেলিয়াস.  কর্ণেল এম.এ. হাসান ও পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান এম.এম. আহম্মেদ, বঙ্গবন্ধুকে সহায়তা করেন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহম্মেদ, ড. কামলাল হোসেন, খন্দকার মোশতাক আহম্মেদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এইচএম কারুজ্জামান ও ভুট্টোকে সহায়তা করেন, জেএ রহিম, মাহবুব আলী কাসুরী ও মোবাশ্বের হাসান । কিন্তু সমঝোতা হয়নি। বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনার নামে গোপনে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অস্ত্র ও সৈন্য আনয়ন করতে থাকে। ২২ মার্চ অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ইসফাকুল মজিদ ও কর্ণেল ওসমানির নেতৃত্বে প্রাক্তন সৈনিকেরা বাংলার স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে বায়তুল মেকাররমে এক সভা করেন। সভা শেষে জেনারেল মজিদ ও কর্নেল ওসমানির নেতৃত্বে অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র কর্মকর্তাগণ বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাত করে আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে তাঁকে একটি তরবারী উপহার দেন। প্রতিদিন পি, আই, এ, এর বোয়িং -৭০৭বিমানে বেসামরিক পোষাকে পাকিস্তান থেকে সৈন্য আনার বিষয়টি কর্ণেল এম,এ, জি, ওসমানি আঁচ করতে পেরে ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুর রহমান মজুমদারের সামরিক পরিকল্পনাটি অনুমোদনের জন্য বঙ্গবন্ধুর নিকট পেশ করেন। বঙ্গবন্ধু ওসমানি সাহেবকে বলেন যে, আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হবে। ওসমানি সাহেব নানান যুক্তি প্রদর্শন করলে বঙ্গবন্ধু বলেন, যদি রাজনৈতিক সমাধান না-ই করেন তাহলে প্রেসিডেন্ট আলোচনা চালাচ্ছেন কেন?
২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসকে ছাত্ররা প্রতিরোধ দিবস ঘোষণা করেন। এ দিন সেনানিবাস, প্রেসিডেন্ট হাউজ ও গভর্নর হাউজ ছাড়া বঙ্গবুন্ধর বাড়ীসহ দেশের সর্বত্র বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। এ দিন কামরুল আলম খান খসরুর নেতৃত্বে জয় বাংলা বাহিনী সকালে পলটন ময়দানে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয় এবং বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে বঙ্গবন্ধুকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন।
ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুর রহমান মজুমদার বাঙ্গালিদের উপর গুলিবর্ষন এবং এম,ভি, সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ খালাস করতে অস্বীকার করলে ২৪ মার্চ মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা এবং ইফতেখার জানজুয়া সুকৌশালে তাঁকে গ্রেফতার করেন এবং তাঁর স্থানে অবাঙ্গালি ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ হোসেন আনসারীকে চট্টগ্রামের দায়িত্বে নিযুক্ত করেন। অতঃপর তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয় এবং পরে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। কোর্ট মার্শালে তাঁকে কারাদন্ড দেয়া হয়। চট্টগ্রাম ত্যাগ করার পূর্বে তিনি তাঁর স্ত্রীর মাধ্যমে মেজর জিয়াকে বিদ্রোহ করে পাকিস্তানী সৈন্যদেরকে বন্দি করার নির্দেশ দেন। উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়ার পর ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুর রহমানকেও মুক্তি দেয় হয়। বাঙ্গলি নিধন পরিকল্পনা অপারেশন সার্চ লাইট প্রস্তুতি সম্পন্ন শেষ হলে ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। বঙ্গবন্ধু তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী তাজউদ্দিন আহমেদ ছাড়া সকল নেতাকে ভরতে চলে যেতে নির্দেশ দেন। তিনি নিজ বাড়ি ত্যাগ করলেন না। ঐ দিন তিনি রাত দেড়টায় গ্রেফতার হলেন। তাঁর জীবন বিপন্ন হল। তিনি অন্যান্য নেতাদের মত সীমান্ত অতিক্রম করতেন তা হলে ইতিহাসের গতিধারা সঠিক পথে প্রবাহিত হত। মুজিব নগরের সুপ্ত উপদলীয় কোন্দল বহিঃ প্রকাশ হতনা। তিনি পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করলেন। কিন্তু মুজিব নগর সরকারের রাজনীতি ও ইতিহাস তাজউদ্দিন আহমেদের কাছ থেকে জানার চেস্টা করেন নি। স্বাধীণতা বিরোধী পাকিস্তান এবং সি,আই,এ-এর প্রতিনিধি খন্দকার মোস্তাক আহমেদ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দিন আহমেদের মধ্যে দূরত্ব সৃস্টি করেন। বঙ্গবন্ধু মুজিব- তাজউদ্দিনের মধ্যে দূরত্ব শুধু দুই জন ব্যাক্তির সম্পর্কের ভাংগন নয়, ঐ দূরাত্বে দেশ ও জাতির মহা সর্বনাশ হল। খন্দকার মোস্তাকের ষড়যন্ত্রে ১৯৭৫ সালে নির্মমভাবে নিহত হলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, তাজউদ্দিন আহমেদ এবং আরো অনেকে। রাত ১১ টায় শুরু হয় অপারেশন সার্চ লাইট। বঙ্গবন্ধু ইয়াহিয়া খানের ওপর বিশ্বাস না রেখে ওসমানি সাহেবের সামরিক পরিকল্পনা অনুমোদন করলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমান কম হত। কারণ ওই সময়ে ভারতের আকাশ ও জলসীমা ব্যবহারে পাকিস্তানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারী ছিল। শ্রীলংকার আকাশ ও জলসীমা ব্যবহার করে পাকিস্তানকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে আসতে হত। ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুর রহমান মুজুমদারের সামরিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকা বিমান বন্দর অচল, চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর অচল, নারায়নগঞ্জের গোদনাইল সরকারী তেল ডিপো ধ্বংস, অবসরপ্রাপ্ত এবং কর্মরত বিদ্রোহী সামরিক কর্মকর্তা ও সৈনিকদের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিকল্প ক্যান্টনমেন্ট করা হলে শুরুতেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ভীষণ অসুবিধায় পড়ত। উল্লেখ্য, ১৭ ফেরুয়ারি পর্যন্ত এদেশে এক ডিভিশন (প্রায় ১৪ হাজার) পাকিস্তানী সৈন্য ছিল। তখন এ দেশে পাকিস্তানী সৈন্যদের চেয়ে বাঙ্গালী সৈন্য অনেক বেশি ছিল। যুদ্ধে বিজয় নিশ্চিত ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু বিষয়টি আমলে নেননি। ১৮ ফেব্ররুয়ারি থেকে মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বেসামরিক পোষাকে দুই ডিভিশন সৈন্য পি, আই, এ, এর বোয়িং ৭০৭ বিমানে ঢাকায় আনা হয়। অন্যদিকে ২ মার্চ এম,ভি, সোয়াত নামের একটা পাকিস্তানী জাহাজে প্রায় ৯ হাজার টন অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করে। এতে বুঝা যায় পাকিস্তানীরা কত দ্রুত এদেশে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেছিল। ২৫ মার্চ রাত ১১ টায় অপারেশন সার্চ লাইট শুরু করে ওই রাতেই শুধু ঢাকা শহরে ৭ হাজারেও অধিক মানুষেকে হত্যা করে । কিন্তু ২৫ মার্চের মধ্য রাতের গণহত্যা সম্পর্কে যাতে পত্র পত্রিকায় সংবাদ প্রচার না হয় সেজন্য দেশী-বিদেশী সাংবাদিকদের পূর্বেই হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে আটক রাখা হয়। পরদিনই সাংবাদিকদের দেশত্যাগে বাধ্য করা হয় ।

জেনারেল এএকে নিয়াজির ভাষ্যে একটা শান্তিপূর্ণ রাত পরিনত হয় দু:স্বপ্নে, চারদিকে আর্তনাদ ও অগ্নিসংযোগ । জেনারেল টিক্কা খান তার সরবশক্তি দিয়ে ঝাপিয়ে পড়েন নিজ দেশের বিপদগামী মানুষের সাথে নয়, একটি শত্রুর সাথে যুদ্ধ করছেন। ২৫ মার্চ মধ্য রাতে সামরিক অভিযানের হিংস্রতা ও নৃশংসতা বুখারায় চেঙ্গিস খান, বাগদাদে হালাকু খান এবং জালিয়ানওয়ালাবাগের ব্রিটিশ জেনারেল ডায়ারের নিষ্ঠুরতাকেও ছাড়িয়ে যায়। জেনারেল টিক্কা খান সৈন্যদের নির্দেশ দেন, আমি পূর্ব পাকিস্তানের মাটি চাই, মানুষ নয় ।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান অনুধাবন করলেন না, বাঙ্গালি জাতি যেখানে প্রস্তুত, নেতৃত্ব যেখানে সবল সেখানে স্বাধীনতাকে কোন শক্তিই দাবিয়ে রাখতে পারে না। হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক গণহত্যার সংবাদ শুনে বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চ রাত ১২টা ২০ মিনিটে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন । ঘোষণাটি ছিলঃ “This may be my last message. From to day Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangaldesh wherever you might be and with whatever you have, to resist the army of occupation to the last. your fight must go on until the last soldier of the pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved“……………………… ( চলমান )

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন