সাইফুল বাতেন টিটো >
মাস দুয়েক আগের কথা। আমি ফার্মগেট কুতুব বাগ দরবার শরীফের সামনে ষাট ফিট আম তলা যাওয়ার জন্য টেম্পু খুঁজছিলাম। ওখান থেকে ষাট ফুটের টেম্পু খুঁজতে হয় না। সব সময় দাঁড়িয়ে থাকে। আমি খুঁজছি কারন আমি সামনের সিটে বসব আবার তাও বসব বাইেরর সাইডে, ভিতরের সাইডে দুই পায়ের মাঝখানে গিয়ার লিভার ফেলে নয়। প্রায় দুই তিনটা টেম্পুতে আগে থেকে এই সিটটা দখল করে মানুষ বসে থাকে। আমি সেদিন গিয়ে চতুর্থ টেম্পুর কাঙ্খিত সিটে গিয়ে বসলাম। আমার বিলাসিতা বলতে এই টুকুই। সামনে বসে যাব। গরমের দিনে মুখে ধুলা যুক্ত হলেও বাতাস লাগবে, কানে হয়তো গান বাজবে আর একটা সিগারেট খাব এই ভালো লাগা। শ্যুটিং শেষে বিগত দুই বছর আমি এভাবেই বাসায় ফিরতাম। সেদিন আমি বসার পর ড্রাইভার আমাকে বলল
– সামনে আর কাউরে বসতে দিয়েন না। বইলেন লোক আছে, মালিক যাইব।
আমি কানে হেড ফোন দিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। আমাদের সামনে এখনও তিনটা গাড়ী। ভরতে সময় লাগবে আর সিগারেটও একটা বেশী লাগবে। একটু সময় পরেই একেবারে সামেনর গাড়ীটা একটু সামনে আগানোর ফলে আমাদের গাড়ীটাও আগাতে যাবে এমন সময় আমার বা পাশের দরজা খুলে একজন বেশ মোটা সোটা লোক মুখে পান হাতে সিগারেট পঞ্চাশ থেকে ষাটের মধ্যে বয়স আমাকে বলল
– নামেন আমি বসব।
– না ভাই লোক আছে।
-আমি সেই লোক। গাড়ীর মালিক।
আমি নেমে ওনাকে উঠতে দিলাম। ড্রাইভার গাড়ী স্টার্ট দিয়ে সামনে এগিয়ে গেলো। মলিক ড্রাইভারকে বললেন
– কাজীরে কি ফোন দিছিলি আবার?
– হ
– কথা হইছে?
– হ, কইছে হে সময় মতো চইলা আইব।
– শিউলির মামু আইছে?
– না, ফোন দিছিলো আম্মায়। আসতেছে নাকি। সাজাহানপুর থাইক্যা আইতে তো জ্যাম পরব।
– শালিসি কয়টায় কইছে?
– ওই তো সবাই এগারটার দিগে আইব আরকি…
– আগে কাজীর কাম সাইরা লবি। মানে তালাকের কাম। পরে শালিসি।
– শালিসির আর কি আছে চুল কামাইয়া জুতা দিয়া গোটা দশেক বাড়ি দিয়া এক কাপড়ে মামুর লগে হাটাইয়া দিবেন।
– যে কাম করছে তাতে দশটা জুতার বাড়ি দিলে আমি সমাজে মুখ দেখাইতে পারুম না। রাবেয়ার মায়রে দিয়া দোররা মারাইতে হইব একশ একটা।
– কি দরকার? চুল কামাইয়া দিলেও তো হইব। একশ একটা দোররা মারতে যাইয়া মইরা টইরা গেলে পরে কেসে ফাসবেন।
আমাদের গাড়ীতে দেখলাম দুয়েকজন যাত্রী ওঠা শুরু করেছে। একটা পিচ্চি ষাইট ফুট ষাইট ফুট করে চিল্লাচ্ছে। এখন সাড়ে দশটা বাজে আমি ছাড়া গাড়ীতে যাত্রী মাত্র দু’জন। আজ ভরতে দেরী হবে।
– ঐ হারামজাদা কই?
– আছে, মিরপুরেই আছে।
-অরেও বোলা। অরও সাস্তি পাওয়া দরকার। ওর তো দোষ বেশী। হারামির বাচ্চারে অর মায় বিয়া করাইব বইলা একশ একটা মাইয়া দেখছে। হারামির বাচ্চায় বিয়া করব না। ক্যান বিয়া করব ক্যান? হ্যার নজর তো ভাইর বউর দিকে। বোলা কুত্তার বাচ্চারে। ওর ও বিচার হওয়া উচিৎ। ফোন কর কুত্তার বাচ্চারে। আইজ গাড়ী চালায় নাই?
– না।
বুঝতে পারলাম এরা একটা মেয়ের ব্যাপারে খুব বাজে একটা সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে। আমি এখানে হস্তক্ষেপ করতে চাই, যা আছে কপালে। আমাকে খুন তো আর করবে না। আমি যথা সম্ভব ভদ্রতার সাথে জিজ্ঞেস করলাম
– কাকা যদি কিছু মনে না করেন তাহলে আপনাদের একান্ত পারিবারিক বিষয়টা আমাকে একটু বলবেন? মনে করেন আমিও আপনার একটা দুষ্ট ছেলে।
– আপনে কি সম্বাদিক?
– না, আমি একজন সাধারন মানুষ। হয়তো আপনার ছেলে মেয়ে আছে আমার বয়সী। আমি একটু বিষয়টা জানতে চাই। আমি কথা দিচ্ছি আমি কাউকে বলব না চাচা।
– কি আর বলব বাবা সব আমার কপাল। আমার বড় পোলার বউ। তারা প্রেম কইরা বিয়া করছে। যারে বিয়া করছে তার এক চাচাতো মামু ছাড়া দুনিয়ায় কেউ নাই, মাইয়া গার্মেনচে চাকরী করে। আর আমার পোলার তখন তিনডা গাড়ি নিজের ক্যাশ ব্যাংকে ছয়লাক টাকা। আমি পোলার বিয়ায় অমত করিনায়। মিথ্যা বলব না বাবা পরের মাইয়া….. মাইয়া খুবই ভালো সে। শশুর শাশুরীর সেবা যত্ন হইতে শুরু কইরা নামাজ রোজা পর্দা পুসিদায় সে নম্বর এক। আমি বাস তলা এলাকায় আইজ আটত্রিশ বছর ধইরা থাকি আমার বিয়াথা সংসার সব এইখানে, আমার তিনটা ছেলে একটা মেয়ে ওর বউ (ড্রাইভারকে দেখিয়ে বলল) সব নিয়া বাবা আমার রাজার সংসার আছিলো। আমার তিন ছেলেরে আমি সবাইরে আলাদা আলাদা গাড়ী কিন্না দিছি। তোরা চালা। না চালালাইলে ভাড়া দিয়া বইসা বইসা খা। আমার আপত্তি নাই। আমাদের গাড়ী ষাট ফুটের উদ্দেশ্যে ছাড়ল মাত্র। ওনার কথায় ছেদ পরল। সামনে রিক্সা নিয়ে একটু চিল্লা চিল্লি হলেও আমাদের গাড়ী এগিয়ে চলল। চাচা আবার শুরু করলেন
“আমার বড় ছেলেটা যেমন হিসাবী তেমনি পরিশ্রমি। আমার দেয়া গাড়ী থেকে তিনখান গাড়ী করল। আমার দেয়া গাড়ীটা বিক্রি করে আমাকে হজে পঠাইল। বলেই লোকটা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। চোখ মুছে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন “বাবায় আমার একসিডেন্ট করল। দুইডা পা কাইটা বাদ দিতে হইল। পুরুষ অঙ্গ নষ্ট হইয়া গেল। তখন ওর বিয়ার বয়স মাত্র আট মাস। আহারে আমার সোনার সংসার ভাইঙ্গা খান খান হইয়া গেলো চোখেে পলকে। আমি প্রায় দিন ভিখারী হইয়া গেলাম বাবা। ছেলের চিকিৎসা করতে যাইয়া আমার সব বিক্রি কইরা দিলাম। তোমার চাচী মানেসর বাসায় কাম করা শুরু করল। তিন বাপ ছেলে গাড়ী চালাইতাম, আর ঐ মাইয়া আবার গারমেনচে চাকরী নিয়া সংসারের দায়িত্ব নিলো। আমার ছেলে আইজ তিন বছর ধইরা লুল হইয়া পইরা রইছে। তবে সংসার সবাই মিলা দার করাইছি আল্লাহর রহমতে। তয় আমার কলিজার টুকরাটা থাইকাও নাই। কথানাই বার্তা নাই সারা দিন হুইল চেয়ারে বসে থাকে। সারা গায়ে সেলাইয়ের দাগ।” আমাদের গাড়ী খেজুর বাগান এলাকায় ভয়ংকর জ্যামে পরল। চারিদিকে সাইরেন বাজছে, পুলিশ হুইসেল বাজাচ্ছে। চাচা বলে চলছে।
” হঠাৎ মাস তিনেক আগে একটা খারাপ ঘটনা ঘটল বাবা”
বলে ভদ্রলোক একটু কেমন যেন আমতা আমতা করতে লাগলেন। তার পর বললেন
– আমার মেঝ ছেলে জয়নালের সাথে তারে একদিন আপত্তিকর অবস্থায় পাওয়া যায়। ঘটনাটা বাইরের লোক দেখায় সমস্যা হইয়া গেছে। এখন সবাই ঘটনার বিচার চাওয়া শুরু করল। দুই কান চাইর কান হইতে হইতে বিষয়টা এমন হইল যে আমাগো রাস্তা ঘাটে বাইর হওয়া মুস্কিল হইয়া দাড়াইল। শেষে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম তার মাথার চুল কাইটা দোররা দিয়া তার মামুর লগে পাঠাইয়া দিমু।” আমাদের গাড়ী এক চুলও নড়ছে না। কোন ভিআইপি যাচ্ছে কে জানে? আমি আবার একটা সিগারেট জালিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ওনাকে জিজ্ঞেস করলাম
– আপনার বয়স কত চাচা?
– কত আর আমি স্বাধীনের সময় বিশ বছরের।
– আপনারে একটা কথা জিজ্ঞেস করি আপনি সত্যি উত্তর দিবেন। ঠিক আছে? আপনার পারিবারিক বিচার আপনি আপনার মতো করবেন তাতে আমি কিছু বলব না। কিন্তু আপনি সত্যি উত্তর দিবেন।
– আচ্ছা বাবা দেব। এত কথা কইতে পারলাম আর এখন মিথ্যা কেন বলতে যাব?
– না মানে আমি আপনাকে যে প্রশ্ন করব সেই প্রশ্ন আপনাকে ইতিপূর্বে কেউ করেনি। খুব বিব্রত কর প্রশ্ন। আমি তো আমাকে আপনার ছেলের সাথে তুলনা করোছি। বাবা ছেলের মাঝে এমন প্রশ্ন বা প্রশ্নের উত্তর হয়ত সচারাচার হয় না। তাই বললাম আর কি।
– ঠিক আছে বাবা তুমি প্রশ্ন কর আমি কথা দিলাম সত্য জবাব দেব।
– অাচ্ছা আপনার কি এখনও সেক্স পাওয়ার আছে?
উনি সত্যিই একটু বিব্রত হলেন তার পরও স্মার্টলি বললেন
– আল্লাহর রহমতে ভালোই আছে তোমার চাচীকে নিয়া আমি এই বয়সেও ভালো আছি।
– বাহ! অালহামদুলিল্লাহ। চাচা আপনার উত্তরে খুশি হইছি। প্রশ্ন নম্বর দুই আশা করছি এটারও সঠিক উত্তর দেবেন। আচ্ছা চাচী যদি আপনাকে অাটমাস যৌবনের স্বাদ দিয়া মারা যাইতেন তাহলে আপনি কি আর কোন দিন কোন নারীর সাথে শুইতেন না?
– তা কেমনে কই বাবা? তবে পুরুষ মানুষ তো না কইতে পারুম না।
– চাচা শোনেন খাওয়া দাওয়া ঘুম এসব মৌলিক চাহিদা। এটা শুধু মানুষের না দুনিয়ার সকল জীবের এই চাহিদা রয়েছে। আর এই চাহিদা থেকেই আমি আপনি তৈরি তাই না?
– তা তো ঠিকই।
– তবে সমাজের সৃংখ্যলা শান্তির জন্য আমরা মানুষেরাই এর কিছু নিয়ম করেছি। যেমন কে কার সাথে করবে, কোন বয়সে করবে ইত্যাদি ইত্যাদি। এখন দেখেন আপনি নিজে ব্যক্তি জীবনে ছেলের দূঘর্টনা বাদ দিলে একজন সফল সৈনিক। আপনি কি করেছেন একটি যুকব ছেলে আর যুবতি মেয়ে যে কিনা কিছুদিন আগে যৌনতার স্বাদ পেয়েছে তাদের দুজনকে একসাথে কাছাকাছি থাকার সুযোগ করে দিয়েছেন। ভালো কথা আপনার মন পরিস্কার ছিলো, তাদের বিশ্বাস করেছিলেন কিন্তু চাচা তারাও তো মানুষ। আর ভুল তো মানুষই করে। আর এই একান্ত যৈবিক চাহিদা মেটানোর অপরাধে আপনি মেয়েটাকে মহল্লার সবার সামনে নারীর অলংকার তার চুল কেটে দিবেন যে কিনা দিনের পর দিন ভোর বেলা শীত গ্রীষ্ম উপেক্ষা করে আপনার জন্য ওজুর পানি গরম করেছে?
– আমি কি করতে পারি বাবা?
– দুজনের বিয়ে দিয়ে দেন….
– আর আমার বড় ছেলে?
– সে মহান স্রষ্টার খেলার শিকার। ভাগ্যকে তার মেনে নিতেই হবে। কিৎছু করার নেই। মেয়েটার জীবন কেন নষ্ট হতে দেবেন? আমি তো মনে করি আপনাদেরই উচিত ছিলো আপনার মেঝ ছেলেকে আর বড় ছেলের বউয়ের বিয়ের ব্যাপারে পারিবারিক ভাবে কথা বলা।
– আমার বড় ছেলেই একসিডেন্টের বছর খানেক পর কইছিল। তখন দুজনের কেউই রাজী ছিলো না।
– তখন ছিলো না এখন তাদের একে অপরকে পেতে ইচ্ছে করছে বলে আপনি একটি মেয়ের চুল কাটবেন?
– না কাটব না বাবা। কিন্তু সমাজকে কি বলব?
– আপনার ছেলেকে সুস্থ করে দিতে বলেন। যদি মনে করেন সমাজ আপনার ছেলেকে ঠিক আগের মতো সুস্থ করে দিতে না পারে তা হলে আপাতত জীবনের প্রয়োজনে সমাজকে সাইট করে রেখে ওদের বিয়ে দিয়ে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিন।
– এইটা তো খারাপ বল নাই বাবা। মজিবর তুই অরে ফোন দে। শালিসি বন্ধ কর। বাবা আপনেও চলেন।
– আগে কিন্তু আপনার বড় ছেলে আর তার স্ত্রীর তালাক হতে হবে।
– হ। আইজই বিয়া হইব। ইদ্দতের সময় দেওনের দরকার নাই। তিন মাসের সাক্ষি আল্লার কাছে আমি দিমু।
চাচাকে অনেক বলে কয়ে আম তলায় আমার বাসার কাছে নামলাম। সে নামতে দিবে না আমাকে বিয়েতে নিয়ে যাবেই। পরের দিন তার বাসায় যাব বলে আমি বিদায় নিলাম।

লেখক : মিডিয়া কর্মী

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন