শুক্র. জানু ২৪, ২০২০

আজকের মঠবাড়িয়া

সত্য প্রচারে সোচ্চার

শহীদ নূর হোসেন মঠবাড়িয়ার যুব ও তরুন সমাজের আদর্শ হওয়া উচিত

১০ নভেম্বর ১৯৮৭, জেনারেল এরশাদের স্বৈরসরকারকে পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত নূর হোসেনকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১৭ জানুয়ারি ১৯৮৯ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা সেদিনের ঘটনা ও শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে একটি প্রবন্ধ রচনা করেন।যা পরবর্তীতে “শেখ মুজিব আমার পিতা ” নামক বইয়ে ছাপানো হয়।লেখাটির অংশবিশেষ আমি তুলে ধরছি এখানেঃ “কথা ছিলো ১০ নভেম্বর সকাল ১০ টায় অবরোধ শুরু হবে। সমগ্র প্রশাসন যন্ত্র অচল করে দিয়ে সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করা হবে।প্রেসক্লাবের সামনে দিয়ে সচিবালয়ের পাশে তোপখানা রোডে এলাম।মূহুর্তে দু’পাশ থেকে জনতার ঢল নামলো,যেন এ জন্যই এতোক্ষণ অপেক্ষা করছিল সবাই।মিছিল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। পনেরো দলীয় ও আওয়ামীলীগ দলীয় নেতারা গাড়ির ভেতরে।চারদিকে হাজার হাজার মানুষ। গাড়ির পাশে পাশে আমাদের দলীয় কর্মীরা। সামনে স্লোগান দিতে দিতে এক তরুন এগিয়ে যাচ্ছে।লম্বা কদম,দোহারা শরীর, মাথাভরা চুল, কোমল কপোল ছাপিয়ে দুটি শান্ত চোখ এবং বাংলার শ্যামল মাঠের মতো গায়ের রং।রক্তজবার মতো লাল রংয়ের শার্টটি কোমরে বাঁধা।বুকে-পিঠে সাদা রংয়ের কালিতে লেখা দুটি শ্লোগান — বুকে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’ পিঠে ‘ গণতন্ত্র মুক্তি পাক’।

আমি দারুনভাবে চমকে উঠলাম। ধীর পদক্ষেপে শ্লোগান দিতে দিতে এক সময় থেমে আমাকে লেখাগুলি দেখাল সে।শিল্পীর তুলিতে আঁকা লেখা।গাড়ি তখন মুক্তাঙ্গন ছাড়িয়ে জিরো পয়েন্টের দিকে অত্যান্ত ধীর গতিতে এগোচ্ছে।আমি ইশারায় তাকে কাছে ডাকলাম।সে বুঝতে পারল না।গাড়ির জানালা দিয়ে কর্মীদের অনুরোধ করলাম তাকে কাছে নিয়ে আসতে।জনতার স্রোতে মাঝে মাঝেই সে আমার দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছিল।আর তখনই কি এক অজানা আশংকায় আমার মন কেঁপে উঠছিল। কে একজন গিয়ে তাকে কাছে নিয়ে এলো, জানাল ওর নাম নূর হোসেন। মনে পড়ে আমি তাকে বলেছিলাম– ‘জামাটা গায়ে দাও, একি সর্বনাশ করেছো,ওরা যে তোমাকে গুলি করে মারবে।’ নূর হোসেন মাথাটা এগিয়ে দিল আমার কাছে।বলল–‘জান দিয়া দিমু আপা, আপনে শুধু মাথায় হাত বুলাইয়া দ্যান।’ আমি ভীষণভাবে তার কথার প্রতিবাদ করলাম–‘না, জীবন দেবে ক্যানো, আমি আর শহীদ চাইনা, আমি গাজী চাই। একথা আর মুখেও আনবেনা। জামাটা গায়ে দাও। ওরা তোমাকে গুলি করবে বলে নূর হোসেনের ঝাঁকড়া কালো চুলে হাত বুলিয়ে দিলাম।চুলগুলি মুঠো করে ধরে আবার বোনের দাবি নিয়ে অনুরোধ করলাম জামাটা পরতে।আমার হাত ধরে বেশ কিছুক্ষণ নূর হোসেন গাড়ির পাশে পাশে হাঁটল।তারপর কখন যেন জনতার স্রোতে হারিয়ে গেল’।” এর পরপরই শুরুহয় নির্বিচারে গুলি।অনেকেই গুলিবিদ্ধ হয়।শেখ হাসিনা আরো লেখেনঃ “এর মধ্যে আমাদের নজরে পড়ে গুলিবিদ্ধ নূর হোসেনকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে পনেরো দলের একজন কর্মী। পুলিশের লোকেরা রিকশা থেকে জোর করে নূর হোসেনকে ভ্যানে তুলে নেয়।এদিকে আমার গাড়িও সম্পূর্ণভাবে ঘেরাও করে রেখেছে।আমি পুলিশকে অনুরোধ করলাম ওকে আমার গাড়িতে তুলে দিতে।হাসপাতালে নিয়ে যাবো।কিন্তু আমাকে এক ইঞ্চিও এগোতে দিলনা।ওকে নাকি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে। ওরা মিথ্যা বলেছিল।নিহত ও আহতদের পুলিশ কন্ট্রোল রুমে নিয়ে অযত্নে ফেলে রেখেছিল।

” শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার এই স্মৃতিচারনের পরে আমার নতুন করে বলার কিছু নেই। বলার আছে মঠবাড়িয়ার যুব ও তরুন সমাজের জন্য। কারন তিনি মঠবাড়িয়ার সন্তান।সাপলেজা ইউনিয়নের ঝাটিবুনিয়া তার পিতৃভূমি। এটা আমার আপনার তথা মঠবাড়িয়ার সকলের জন্য গর্বের ও সম্মানের। আমাদের সমাজের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ যুব ও তরুন সমাজ।

মঠবাড়িয়ার যুব ও তরুন সমাজের একটা বড় অংশ আজ অবক্ষয়ের অতল গহ্বরে।দেশের প্রয়োজনে হাসতে হাসতে জীবন বিসর্জন দেয়া শহীদ নূর হোসেনের প্রিয় মাতৃভূমি মঠবাড়িয়ার কোনো সন্তান কারো সাথে বেয়াদবি করলে,জুলুম অত্যাচার করলে,পিতা মাতার অবাধ্য হলে,বিশেষ মহলের উদ্দেশ্য হাসিল করতে কাউকে জখম করলে,মাদক গ্রহণ বা ব্যাবসা করলে তার বিদেহী আত্মা নিশ্চয়ই কষ্ট পায়।

শহীদ নূর হোসেনের আদর্শ মঠবাড়িয়ার প্রতিটি ঘরে ঘরে ছড়িয়ে দিতে আমাদের সকলের দায়িত্ব নিতে হবে।শিক্ষকের দায়িত্ব হবে তার ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া,রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব তাদের কর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া,সাংবাদিকদের দায়িত্ব তাদের লেখনিতে ফুটিয়ে তোলা এভাবে যার যেভাবে সম্ভব।

আমরা যদি মঠবাড়িয়ার প্রতিটি যুবক ও তরুনের মাঝে শহীদ নূর হোসেনের দেশপ্রেমের আদর্শ ছড়িয়ে দিতে পারি আমার বিশ্বাস মঠবাড়িয়ার মানুষের জীবনে সুখ, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধির কোনো অভাব হবেনা সাথে সাথে আমরা পাবো আদর্শিক যুব ও তরুন সমাজ।

পরিশেষে আমি কয়েকজন মানুষকে ধন্যবাদ দিতে চাই যারা শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে মঠবাড়িয়ায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। সাংবাদিক  দেবদাস মজুমদার, জাগো লক্ষ নূর হোসেন সংগঠক সবুজ রাসেল, আজকের মঠবাড়িয়ার প্রকাশক  মেহেদী হাসান বাবু ফরাজি, শহীদ নূর হোসেন স্মৃতি পরিষদ এর সংগঠক নুরুল আমিন রাসেল ও  সাইফুল ইসলাম হেলাল।

আপনাদের সুরে সুর মিলিয়ে আমি বলতে চাই মঠবাড়িয়ায় শহীদ নূর হোসেনকে স্মরণীয় করে রাখতে তাঁর নামে “চত্বর, রাস্তা,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,হাসপাতাল ও পাঠাগার চাই।

আমাদের স্বপ্ন অবশ্যই পূরন হবে এ আশাবাদ।

লেখক <>   বরকত হোসেন হাওলাদার

               সহ-সভাপতি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ                                

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com