মঠবাড়িয়া প্রতিনিধি >>

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায প্রবহমান খালে জালের খাঁচায় মাছ চাষ করে সুফল পেয়েছেন স্কুল শিক্ষক সাইদুল ইসলাম খান। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি মুক্ত জলাশয়ে খাচা পদ্ধতিতে মাছ চাষে বাড়তি অর্থ উপার্জন করে এলাকার বেকার যুবকদের কাছে অনুকরণীয় হয়ে উঠেছেন। জালের খাচায় মাছের পোনা প্রতিপালন করে মাত্র ছয় থেকে সাত মাসের মধ্যে এ মাছ বাজারে বিক্রির উপযোগী করে তুলছেন । এতে তিনি আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
উপজেলার দাউদখালী ইউনিয়নের রাজারহাট শহীদ বাচ্চু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইদুল ইসলাম খান দুই বছর আগে মৎস অফিসের খাচায় মাছ চাষ দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে রাজারহাট বাজার সংলগ্ন মিরুখালী-আমুয় সংযোগ খালে জাল ও বাঁশের তৈরি খাঁচায় ভাসমান মাছ চাষ শুরু করেন।

শিক্ষক সাইদুল ইসলাম খান জানান, প্রায় ত্রিশ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি ফ্লেমের সাথে ৯টি খাঁচা তৈরি করে প্লাস্টিকের ভাসমান ড্রামের মাধ্যমে খাঁচাগুলোকে ভাসমান রেখে মাছের প্রতিপালন করে আসছেন । প্রতিটি খাঁচার গভীরতা ১০ ফুট, প্রস্থ ৮ ফুট এবং দৈর্ঘ্য ১৬ ফুট। এসব খাঁচায় মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষ কেের তিনি লাভবান। বছরের জুলাই মাসে ০.২ মি.মি. সাইজের পোনা মাছ কিনে খাঁচায় ছাড়েন। পাঁচ মাসের মধ্যেই মাছ বিক্রির উপযুক্ত হয়। সাধারণত ৫০০ গ্রাম হলেই স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন এই মাছ। স্থানীয় খুচরা বাজারে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয় এ মাছ।
তিনি আরও জানান, একটি ইউনিটে ৯টি খাঁচা আছে। এতে মোট ৬ হাজার মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষ করা হয়েছে। এদের প্রতিদিন দুই বেলা খাবার দিতে হয়। খাচার মাছ ৫০০ গ্রাম থেকে ৬০০ গ্রাম হতে পাঁচ/ছয় মাস সময় লাগে। এরপর চাষকৃত মাছ বাজারাব করার উপযাগি হয়।

খাঁচায় মাছ চাষ করলে পুকুর বা কোনো জলাশয়ের প্রয়োজন হয় না। উপরন্তু যে কোনো সময়ই খাঁচার সংখ্যা বৃদ্ধি করে মাছ চাষ সম্প্রসারণ করা সম্ভব। এছাড়া প্রবহমান খালের পানিতে প্রচুর অক্সিজেন থাকায় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। খাঁচার মাছের বর্জ্য প্রবাহমান পানির সাথে অপসারিত হয় বিধায় পানি দূষিত হয় না। পানি প্রবাহমান থাকায় প্রতিনিয়ত খাঁচার অভ্যন্তরের পানি পরিবর্তন হতে থাকে ফলে পুকুরের চেয়ে অধিক ঘনত্বে মাছ চাষ করা যায়। পাশাপাশি প্রাকৃতিক উৎস থেকেও অনেকটা খাবার পায়। মাছ চাষে যা খরচ হয় তার মধ্যে সাধারণত খাঁচা তৈরি করতেই খরচ বেশি পড়ে যায়। একটি খাঁচা দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায়, তাই খরচ পুষিয়ে যায়। বাজারে পাওয়া যায় এমন সাধারণ মাছের খাবারই এদের দেয়া হয়। একটি ইউনিট তৈরি করে এক মৌসুমে পুরো খরচ উঠিয়ে আনা সম্ভব। ৯টি খাঁচার মাছের জন্য প্রথমে ১ বস্তা পরে ২/৩ বস্তা করে খাবার লাগে। এতে মাছ বাজারে আসা (খাঁচা, মাছ, খাদ্যসহ) পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়। সকল খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৬০/৭০ হাজার টাকা লাভ করা সম্ভব।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজারহাট বাজারের সেতু সংলগ্ন খালে পলিইথিলিন জাল, রাসেল নেট (খাদ্য আটকানোর বেড়া তৈরীতে), নাইলনের দড়ি ও কাছি, কভার নেট বা ঢাকনা জাল (পাখির উপদ্রব থেকে রক্ষার জন্য), বাঁশ, ফ্লেম ভাসমান রাখার জন্য শূন্য ব্যারেল/ড্রাম ফ্রেমের সাথে বাঁধার জন্য মাঝারী আকারের সোজা বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ভাসমান মাছ চাষের খাঁচা। দৈর্ঘ্য ১৬ ফুট, প্রস্থ ১০ ফুট, উচ্চতা ৮ ফুট আকারের ফ্রেমের ভাসমান খাচায় এ মাছ চাষ করা হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, বাজারে যে তেলাপিয়া মাছ পাওয়া যায়, তার থেকে এই খাঁচার চাষ করা মাছ আকারে তুলনামূলক বড় ও সুস্বাদু। ফলে এই মাছের দামও বেশি, চাহিদাও বেশি।

মাছচাষি শিক্ষক সাইদুল ইসলাম খান জানান, মাছ চাষে উপজেলা মৎস অফিস থেকে পরামর্শ ছাড়া অন্যকোন সহায়তা পাইনি । তবে মাছ চাষে সরকারিভাবে সহয়োগিতা পেলে খাচায় মাছ চাষ সম্প্রসারণ ঘটানো সম্ভব।

মঠবাড়িয়া উপজেলা সিনিয়র মৎস কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক জানান, আমাদের দেশে সাম্প্রতিক সময়ে খাঁচায় মাছ চাষ নতুন আঙ্গিকে শুরু হলেও বিশ্ব অ্যাকুয়াকালচারে খাঁচায় মাছ চাষের ইতিহাস অনেক পুরোনো। বাংলাদেশে প্রচুর খাঁচায় মাছ চাষের উপযোগী খাল/নদী রয়েছে। সারা বছর খাঁচায় মাছ চাষ করে মাছের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। আমরা এলাকার মাছচাষিদের খাচায় মাছ চাষে উদ্বুদ্ধ করছি।

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন