দেবদাস মজুমদার >>

তারুণ্য সভ্য সুন্দর আগামীর ভবিষ্যত । তারুণ্য তাই আমাদের ভরসা। ভরসা প্রবীণের। বার্ধ্যক্য জীবনের অসহায়ত্ব আর জীবনেরও ক্রান্তিকাল । আমাদের সুবিধাবঞ্চিত প্রবীণের জীবন পরিবার সমাজে কখনও বোঝা হয়ে উঠলে তা মানবিক বিপন্নতা। আমাদের প্রবীণের জীবনমান উন্নয়নে তারুণ্য উদাসীন হতে পারেনা। কেননা প্রবীণরা আমারে মানব সম্পদ । সভ্যতায় তারা উপেক্ষিত থাকার নয়। যখন বুদ্ধিবাদী মানবিক তরুণরা মিলে যখন অসহায় মানুষের পাশে দাড়ায় তখন আমরা মানবিক সমাজের ভরসা পাই। তরুণরা তাদের মননশীলতা মেধা পরিশ্রম দিয়ে সম্মিলিতভাবে  নানা সামাজিক উদ্যোগ প্রবীণ অসহায় মানুষের সেবায় ব্রতী হয় তখনই আমরা অন্য আলোর তারুণ্য পেয়ে যাই।

শিক্ষার্থী তরুণরা সংগঠিত হলে গড়ে ওঠে মানবিক এক সংগঠন। তেমন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তরুণদের সংগঠন ‘ প্যারেন্টস এজিং ফাউন্ডেশন’ । ২০১৬ সালের ২৫ জুন ‘বৃদ্ধ মানুষের পাশে থাকাই আমাদের মূল লক্ষ্য’ এই স্লোগানে উজ্জীবিত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন তরুণ-তরুণীর হাত ধরে যাত্রা শুরু করে ‘ প্যারেন্টস এজিং ফাউন্ডেশন’।

‘ প্যারেন্টস এজিং ফাউন্ডেশন’ এর সভাপতি আব্দুল আল জোবায়ের আশির জানান, সংগঠনটি আমাদের অবহেলিত প্রবীণ জনগোষ্ঠী নিয়ে নানা সামাজিক ও মানবিক কাজ শুরু করে। প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে এবং বর্তমান সরকারের প্রবীণ নীতিমালা ২০১৩ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই সংগঠনের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং কয়েকটি প্রকল্প চলমান রয়েছে।

নানা কারণে আমদের দেশ ও সমাজে অবহেলিত হচ্ছে প্রবীণ জনগোষ্ঠী। এই জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে চলেছে অন্য আলোর তারুণ্যের এ সংগঠনটি । তরুণদের এমন একটি সংগঠন ‘প্যারেন্টস এজিং ফাউন্ডেশন’। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে  প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে বাস্তবায়ন করছে নানা কর্মসূচি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, বৃদ্ধ মানুষের আত্মকর্মসংস্থানের এর জন্য ‘উদাহরণ’ নামক প্রজেক্ট। এ প্রজেক্টের আওতায় সুবিধাভোগী মানুষগুলোর স্বাবলম্বী হওয়ার গল্পই যেন একেকটা উদাহরণ।

এছাড়া হারিয়ে যাওয়া প্রবীণ কিংবা বৃদ্ধাশ্রমে থাকা মানুষগুলোকে পরিবারে ফেরানোর লক্ষে ব্যাক- টু-হোম: প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে তথ্যপ্রযুক্তির শিক্ষা দিতে টেকনোলজি ফর অল: বৃদ্ধাশ্রমের অবস্থা দেখতে পরিদর্শন প্রকল্প এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে ভয়েস ফর এইজড পিপলস প্রজেক্টে কাজ করছে প্যারেন্টস এজিং ফাউন্ডেশন।

সমাজ উন্নয়নে অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ইয়াং বাংলা থেকে ২০১৭ সালে “জয় বাংলা ইয়ুথ এওয়ার্ড ” সম্মাননা পেয়েছে সংগঠনটি।  ইয়াং বাংলার পাশাপাশি ইউথোপিয়া  বাংলা ও ইউএনডিপির সঙ্গে কাজ করছে তারা।

সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো, রুবেল মিয়া নাহিদ বলেন, উল্লিখিত কর্মসূচির বাইরে তরুণ প্রবীণদের যোগাযোগ দূরত্ব কমিয়ে অভিজ্ঞতার মেলবন্ধন তৈরির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি আমরা। প্রবীণদের বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোর প্রথা বা মানসিকতা পরিবর্তনেও কাজ করে চলছি আমরা।

এর মধ্যে বৃদ্ধদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, জরুরি রক্ত সরবরাহ, ধর্মীয় উৎসবে নতুন কাপড় বিতরণ, শীতের সময়ে শীতবস্ত্রসহ বিভিন্ন সময় আর্থিক সহায়তাও দিচ্ছে প্যারেন্টস এজিং ফাউন্ডেশন। রমজানে বৃদ্ধদের মাঝে ইফতার বিতরণ করছে তরুণ সেচ্ছাসেবীরা ‘ ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে প্রবীণদের বসবাসযোগ্য দেশ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। বাংলাদেশ সরকারের নেয়া প্রবীণ নীতিমালা ২০১৩ বাস্তবায়ন করে যাবো।

তিনি আরও বলেন, পরিবার, সমাজ, প্রতিষ্ঠান এমনকি যানবাহনে প্রবীণদের বিশেষ গুরুত্ব দিতে সচেতনতার বার্তা ছড়ানো হচ্ছে। সমাজের অবহেলিত বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর পাশে থাকতে সংগঠনটির সেবা কার্যক্রম দেশের প্রতিটি উপজেলা ও গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে দিতে চাই।

প্রবীণরা আমাদের সমাজের বড় মূল্যবান অংশ।তাদের ভালো রাখতে তরুণদের প্রচেষ্টা। আগামীর বাংলাদেশ হবে প্রবীণবান্ধব, এমনটাই প্রত্যাশা প্যারেন্টস এজিং ফাউন্ডেশনের তরুণ স্বদৃষ্টদের।

একজন রুবেল মিয়া নাহিদের মানবিক লড়াই

 রুবেল মিয়া নাহিদ একজন সমাজ সেবকের নাম। তিনি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার সন্তান।  ২০১০ সালে মঠবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ কে,এম,লতিফ ইনস্টিটিউশন থেকে মাধ্যমিক শেষ করেন। বর্তমানে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং ( EEE) বিএসসি শেষ করেন।ছোটবেলা থেকেই তিনি মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করেছেন। বিএসসি পড়াকালীন অবস্থায় তিনি ওতপ্রোত ভাবে মানব সেবায় জড়িয়ে পড়েন।

সমাজের অবহেলিত মানুষের মধ্যে যাদের প্রতি তার বিশেষ দৃষ্টি ছিলো তারা হলেন প্রবীণ। ২০১৬ সালে  প্রবীনদের সেবার জন্য কাজ শুরু করে প্যারেন্টস এজিং ফাউন্ডেশন (PAF) নামে একটি সংগঠন। তিনি সংগঠনটির  সাধারণ সম্পাদক। ২৪ বছরের তরুণ রুবেল মিয়া নাহিদ অসহায় প্রবীণ খুঁজে বেড়ানোই যার নেশা। অসহায় প্রবীণ খোঁজে কখনো ঘুরে বেড়ান ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নারায়াণগঞ্জ, ঢাকা, চট্টগ্রাম  কখনোবা বরিশালে। সেখানে ঘুরে ঘুরে রাস্তা থেকে অসুস্থ অসহায় বৃদ্ধদের পরম মমতায় বুকে তুলে নেন তিনি।

তিনি তার সংগঠন এর ব্যানারে থেকে মানবসেবা চালিয়ে যাচ্ছেন। অবহেলিত ও বিভিন্ন বৃদ্ধাশ্রমে থাকা প্রবীণদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের  প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছেন। প্রবীণদের সমসাময়িক চাহিদা মেটাতে তিনি ও তার সংগঠন সর্বদা সোচ্চার। সমাজের দরিদ্র প্রবীণদের বিভিন্ন মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থান তৈরি করে দিয়ে সমাজে ভালোভাবে বেঁচে থাকার পন্থা বানিয়ে দেখিয়েছেন। ১ হাজারের বেশি সদস্য নিয়ে প্রবীণদের জীবন মান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে প্যারেন্টস এজিং ফাউন্ডেশন। এখন পর্যন্ত ১০,০০০ (দশ হাজার) মানুষকে সাহায্য করেছে এই সংগঠন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নারায়াঙ্গঞ্জ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশালে একযোগে কাজ চলছে এই সংগঠনের। ২০১৭ সালে প্রথম UNDP, UNV, Youthopia.bangla থেকে “বেস্ট ভলান্টিয়ার এ‍ওয়ার্ড” ও ২০১৭ সালে “জয় বাংলা ইউথ এ‍ওয়ার্ড ” অর্জন করে প্যারেন্টস এজিং ফাউন্ডেশন।

এছাড়াও তিনি কাজ করছেন সি,আর,আই, ইয়ং বাংলা ইত্যাদি সংগঠনের সাথে। কোনো সদস্য পদ ছাড়াই তিনি কাজ করেন বিভিন্ন সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যের সাথে। তিনি জড়িত আছে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, ইফটিজিং প্রতিরোধ সেচ্ছায় রক্তদান সংগঠন এর মত বিভিন্ন সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে। তিনি সমাজসেবক এর পাশাপাশি একজন সফল তরুণ  উদ্যোক্তাও। তিনি সমাজের একজন রোল মডেল। তার স্বপ্ন, শুধু তরুণ নয় সমাজের প্রত্যেকটি মানুষকে সাথে  প্রবীণের জীবন মানের উন্নয়ন ঘটোনো।

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন