দেবদাস মজুমদার >>

আমাদের পাঠাগার কেন্দ্রিক বই পাঠ হতাশাজনক। পাঠক মেলেনা । তরুদের দিনদিন সদ গ্রন্থ পাঠে আগ্রহ নেই। তবে কখনও কখনও কোন কোন তরুণ বিরুদ্ধে স্রোতে দাড়ায়। মননশীল পাঠে আলোর তারুণ্য এমন চেতনায় কিছু তরুণ মিলে পাঠক বিহীন একটি পাঠাগারকে সচল করে দেন। তারা সম্মিলিত উদ্যোগে একটি পাঠাগারকে টিকিয়ে রাখার জন্য নানা উদ্যোগ নেন । পাঠাগারে পাঠচক্র, বিশেষ দিবস পালন, সাংস্কৃতিক কর্মকা- আর শহরের গুণিজন,বিদ্বজনদের ডেকে এনে জীবনের পাঠ নিয়ে নানা আলোচনাসভার আয়োজন করে। সমাজ ভাবনা, রাজনীতি, সমাজনীতি, সু দৃষ্টিভঙ্গী সম্পন্ন মানুষ, পরিবেশ প্রকৃতি, মানুষের মানবিক দায়বোধ, ইতিহাস, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা,সংস্কৃতি কোন কিছুই বাদ পড়েনা তরুণদের পাঠে। এভাবে নানা ইস্যুভিত্তিক পাঠচক্র করে একটি স্থবির অচল পাঠক বিহীন একটি পাঠাগারকে সচল করে তোলে কতিপয় উদ্যোমী তরুণ।
আর তাদের এমন মহতী উদ্যোগে সাড়া দিয়ে সময় উপযোগি নানা বই পত্র জমা হতে থাকে পাঠাগারটিকে । জ¦রাজীর্ণ ভবনের ভেতর গড়ে ওঠে আলোর এক পাঠশালা।
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার শেরে বাংলা সাধারণ পাঠাগার আন্দোলন নামে তরুণদের গড়ে তোলা সংগঠনটি গত এক বছরে ১০০ তম পাঠচক্র আয়োজন করে স্থবির কেটি পাঠাগারকে সচল করে দেন। আর এমন মহতী আয়োজনে দিনদিন তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ছে।

আজ শুক্রবার বিকাল ৫টায় মঠবাড়িয়ার শেরে বাংলা পাঠাগার আন্দোলন সংগঠনের আয়োজনে পাঠাগার মিলনায়তনে ১০০ তম পাঠচক্রের বিশেষ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। ভাষা সৈনিক অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক মো. হাবিবুর রহমান খান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জি.এম সরফরাজ এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন, লেখক নূর হোসাইন মোল্লা, কে.্্রম লতিফ ইনস্টিটিউশনের প্রধান শিক্ষক মো. মোস্তাফিজুর রহমান, থানার অফিসার ইনচার্জ মো. শওকত আনোয়ার ইসলাম, সাংবাদিক দেবদাস মজুমদার,সংগঠক মোস্তাফিজ বাদল,সহকারী জজ মো. খালিদ সাবিবর, , মোস্তফা ডালিম তন্ময়, কবি মেহেদী হাসান প্রমূখ।
শেষে উপস্থিত অতিথিবৃন্দকে বই উপহার প্রদান করা হয়। সেই সাথে জ¦রাজীর্ণ ভবনে পাঠাগারের পাঠ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়।

সন্ধ্যায় কেক কেটে ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ১০০তম পাঠ চক্রের সমাপ্তি হয়।

পাঠাগার সূত্রে জানাগেছে, শেরে বাংলা স্মৃতি সংসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি কবি মুহাম্মাদ আব্দুল খালেক এর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মঠবাড়িয়া উপজেলা পরিষদ ও কে. এম. লতিফ ইনস্টিটিউশন এর দানকৃত জমিতে ১৯৮৪ সালে শেরে বাংলা সাধারণ পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এইচ. এম. এরশাদ দ্বিতল ভবনের এ পাঠাগারটি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে দ্বিতল পাঠাগার ভবনটির একটি কক্ষ ছাড়া অবশিষ্ট কক্ষগুলো পর্যায়ক্রমে একাধিক বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দখলে চলে যায়। পরে পাঠকদের দাবির মুখে মঠবাড়িয়া প্রি ক্যাডেট ইনস্টিটিউশন কর্তৃপক্ষ ২০১৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর একটি কক্ষের চাবি উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাহেবের নিকট হস্তান্তর করেন । সেই সাথে সম্পুর্ণ ভবনটি ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ছেড়ে দেয়ার অঙ্গিকার করেন।
১৯৯৩ সাল থেকে মঠবাড়িয়া পৌরসভা কর্তৃপক্ষ ১ জন কর্মচারীর দ্বারা ক্ষুদ্র পরিসরে (১টি কক্ষে) দৈনিক ২ ঘন্টা পাঠাগারটি চালু রাখার ব্যবস্থা নেন। কিন্তু অপরিসর কক্ষ, জ¦রাজীর্ণ ভবনে বই পাঠের কোন পরিবেশ না থাকায় পাঠাগারটিতে পাঠকের যাতায়াত কমতে থাকে।
বর্তমানে পাঠাগার ভবনটি অত্যন্ত জরাজীর্ণ। দরোজা ভেঙ্গে গেছে। সারাভবন জুড়ে ফাটল আর পলেস্তরা খসে পড়েছে। বর্ষাকালে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। এমন অবস্থায় পাঠাগারে পাঁচ হাজারেরও অধিক বই পত্র নষ্ট হওয়ার পথে। আসবাবপত্র এর অভাবে অনেক বই ফ্লোরে রাখা হয়েছে। পর্যাপ্ত চেয়ার ও টেবিলের অভাবে পাঠকদের ভোগান্তি হচ্ছে।
১৯৯৬ সাল থেকে পাঠাগার ভবনে মঠবাড়িয়া প্রি ক্যাডেট ইনস্টিটিউশনের কার্যক্রম চালু রেখে পাঠাগারের কার্যক্রম ব্যাহত করা হচ্ছে।
এমন অবস্থায় স্থানীয় কয়েকজন তরুণ পাঠাগারটি বাঁচানোর উদ্যোগ নেন। পাঠাগারে পাঠ পরিবেশ আর পাঠকদের আগ্রহ সৃষ্টির জন্য নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন। উদ্যোক্তা তরুণ মো. খালিদ সাব্বির, রাসেল সবুজ, দেবদাস মজুমদার, মেহেদী হাসান বাবু ফরাজি,আরাফাত খান, মোস্তাফিজ বাদল,আমীন রুমান ও মেহেদী হাসান মিলে গড়ে তোলেন পাঠাগার আন্দোলন সংগঠন। পরে এতে যক্ত হন আরও শতাধিক তরুণ আর স্কুল কলেজের উদ্যোমী শিক্ষার্থী। এরপর শুর হয় পাঠাগারে নিয়মিত যাতায়াতসহ প্রতি শুক্রবার নির্ধারিত ইস্যুতে পাঠচক্রের আয়োজন। এসব তরুণরা মিলে পাঠাগার সভাকক্ষে ১০০ তম পাঠচক্র আয়োজন করে। এভাবেই একটি স্থবির অচল পাঠাগার নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়।
তরুণদের এমন উদ্যোগে সাড়া দিয়ে ২০১৭ সাল থেকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার কর্মকর্তা জি.এম সরফরাজের নেতৃত্বে একটি পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি পাঠাগারটি পরিচালনা করে আসছেন।

পাঠাগার আন্দোলন কর্মী ও পাঠচক্রের প্রধান সমন্বয়ক কবি মেহেদী হাসান বলেন, পাঠাগার আমাদের জ্ঞানের ভা-ার । সেখানে আমাদের তরুণ সমাজ পাঠাগার বিমুখ। মননশীল পাঠে আলোর তারুণ্য ধরে রাখতেই আমরা পাঠচক্রের আয়োজন করছি। অচল পাঠাগারটি কিছুটা হলেও পাঠকের প্রাণের মিলন ঘটছে। তবে পাঠাগারটি জ¦রাজীর্ণ সেখানে পাঠের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরী।

শেরে বাংলা সাধারণ পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক অবসরপ্রাপÍ স্কুল শিক্ষক নূও হোসাইন মোল্লা বলেন, পাঠাগারই জ্ঞানের ভান্ডার যেখানে সুরক্ষিত মানুষের চিন্তা-ভাবনা ও ধ্যান-ধারণা। পাঠাগার সভ্যতার ধারক ও বাহক। পৃথিবীর বিভিন্ন সভ্যতা ও বিভিন্ন জাতির ইতিহাস আমরা জানতে পারি বই পড়ে, আর বই সংগ্রহ থাকে পাঠাগারে। পাঠাগারটি নানা সংকটে অচল হয়ে পড়েছিল। কতিপয় তরুণ সামাজিক উদ্যোগ নিয়ে পাঠচক্র আয়োজন করে সেটি সচল করে দেন এটি একটি সম্ভাবনা। এখন জনস্বার্থে পাঠাগারটি সরকারি করণের দাবি জানাই।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জি.এম সরফরাজ বলেন, একটি স্থবির পাঠাগারকে বাঁচানোর তরুণদেও উদ্যোগ সত্যি প্রশংসনীয়। বই পাঠ ছাড়া বুদ্ধিদীপ্ত আলোকিত তরুণ গড়ে ওঠা অসম্ভব। পাঠাগার বাঁচাতে কতিপয় তরুণের উদ্যোগে ১০০ তম পাঠচক্র আয়োজন একটি দৃষ্টান্ত। পাঠগারটির পাঠ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে দ্রুত প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

 

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন