🇧🇩

উপকূলীয় পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ঝাটিবুনিয়ার যুদ্ধ ছিল বৃহত্তম।ঝাটিবুনিয়া মঠবাড়িয়া উপজেলার সাপলেজা ইউনিয়নের একটি গ্রাম।নলী ভীম চন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে প্রায় ৫০ মিটার পশ্চিমে এবং অামার বাড়ি থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দক্ষিন পশ্চিমে এ গ্রামটি অবস্থিত। সাপলেজা ইউনিয়নের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন ডাঃ গোপাল কৃষ্ণ গুহরায়। মঠবাড়িয়া থানা শান্তি কমিটির নেতা এম.এ.জব্বার ইজ্ঞিনিয়ার ১৯৭১ সালের ১২ মে মঠবাড়িয়ায় এক জনসভায় হিন্দুদের নিরাপত্তা প্রদানে অপারগতা প্রকাশ করলে ডাঃ গোপাল কৃষ্ণ সপরিবারে ভারতে চলে যান। এম.এ.জব্বার ইজ্ঞিনিয়ার তাঁর চাচাতো ভাই আব্দুল বারী কবিরকে সাপলেজা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করেন।তিনি ঝাটিবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা।তিনি সাপলেজা ইউনিয়ন শান্তি কমিটির সভাপতিও ছিলেন। তিনি হিন্দু ও স্বাধীনতাকামীদের প্রবল বিরোধী ছিলেন।তিনি নলী গ্রামের প্রয়াত ভীম চন্দ্র হাওলাদারের উত্তরাধীকারীদের জমিতে সৃজিত ইরি ধান কর্তন করার জন্যে ১৯৭১ সালের ২৩ অক্টোবর রোজ শনিবার সকালে ৩০-৩৫ জন রাজাকারের একটি দল নিয়ে পূর্ব বাদুরতলী-ঝাটিবুনিয়া রাস্তা দিয়ে নলী গ্রামের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন।পথিমধ্যে চেয়ারম্যান অাব্দুল বারী কবিরের প্রতিবেশী এবং ন্যাপের কর্মী হাতেম অালী হাওলাদার এবং তাঁর ২ পূত্র শামসুল হক ও নূরুল হককে ধরে নিয়ে অাসেন। অনুসন্ধান করে জানা গেল রাজাকার দলে ছিল ঝাটিবুনিয়া নিবাসী অাব্দুল গফুর হাওলাদার, শামসুল হক ওরফে শামসু দরবেশ পিতা অাব্দুর রশিদ হাওলাদার, শামসুল হক পিতা মমিনউদ্দিন হাওলাদার, হাবিবুর রহমান,হাফেজ মোঃ জয়নাল অাবেদীন, অাবু তাহের, ছলেমান,মকবুল,বাদুরতলীর অাদম অালী, বুখইতলা বান্ধবপাড়ার অাব্দুলগণি জমাদ্দার,সাপলেজার অাব্দুল কুদ্দুস চাপরাশি,উত্তর সোনাখালীর রুহুল অামীন,মধ্যম সোনাখালীর অাবু জাফর,দক্ষিণ সোনাখালীর অামীর হোসেন,অামড়াগাছিয়া মানিকখালীর সাইদুর রহমান,পূর্ব সেনের টিকিকাটার অাব্দুর রহিম ও মানিক মিয়া,সেনের টিকিকাটার মাওলানা অাব্দুল হক,সূর্যমনির মো: ইউসুফ প্রমূখ।নলী অাসার পথে তারা জানতে পারে যে,ঝাটিবুনিয়া গ্রামের অার্শেদ অালী গাজীর বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল অবস্থান করতেছেন।উল্লেখ্য, অার্শেদ অালী গাজী সাপলেজা ইউনিয়ন শান্তি কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন।তার ছেলে অাব্দুল লতিফ প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্যে জুলাই মাসে ভারতে গিয়েছিলেন।কিন্তু সেখানে সে গ্রেফতার হয়।স্বাধীনতার পর সে দেশে অাসেন।২৩ অক্টোবর সূর্য উদয়ের পূর্বে ৩৭ জন মুক্তিযোদ্ধা অার্শেদ অালী গাজীর বাড়িতে অাশ্রয় গ্রহণ করেন।তাঁরা সকালের নাস্তা খেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন।বেলা ১০ টার দিকে গাজী বাড়ি থেকে প্রায় ১৫০ মিটার উত্তর দিকে অবস্থিত সাপলেজা-নলী রাস্তায় রাজাকাররা হাতেম অালী ও তাঁর ২ পূত্রকে গুলি করে হত্যা করে।

রাজাকারদের গুলি বর্ষনের শব্দ শুনে সুবেদার তুজাম্বর আলীর নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধারা বাড়ির বাগান,বেড় ও নালায় পজিশন নেন।রাজাকাররা গাজী বাড়ির উত্তর এবং পশ্চিম দিক থেকে অবিরাম গুলি বর্ষন করতে থাকলে সুবেদার তুজাম্বর অালী এল.এম.জি. দিয়ে ফায়ার শুরু করলে সাথে সাথে মুক্তিযোদ্ধারা রাইফেল দিয়ে অবিরাম গুলি বর্ষন করতে থাকেন।স্থানীয় জনগণের নিকট থেকে জানা গেল যে,অবস্থা বেগতিক দেখে রাজাকার অাব্দুল গণি জমাদ্দার, শামসুল হক ওরফে শামসু দরবেশ ও অাব্দুল কুদ্দুস চাপরাশি অস্ত্র ফেলে পশ্চিম দিকে (শামসুল হকের বাড়ির দিকে) এবং অন্যান্যরা উত্তর দিকে ধান ক্ষেতে দৌড়াতে থাকে। সুবেদার ইস্কান্দার অালীর গুলিতে রাজাকার হাফেজ মো:জয়নাল অাবেদীন এবং সাইদুর রহমান গাজী বাড়ির সামনের রাস্তার পশ্চিম দিকে ধান ক্ষেতে লুটিয়ে পড়ে। মানিকখালী ফরাজী সাহেবের মাদ্রাসার ছাত্র মো: ইউসুফ পিতা অাব্দুর রাজ্জাক মুন্সী গ্রাম সূর্যমনি ধান ক্ষেতে একটি রাইফেলসহ হাত উঁচু করে সারেন্ডার ভঙ্গিতে দাড়িয়ে থাকলে মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হক হাওলাদার দৌড়িয়ে গিয়ে তার রাইফেল কেড়ে নিয়ে তাকে বেঁধে ফেলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে অামড়াগাছিয়ার মানিকখালীর সাইদুর রহমান, উত্তর মিঠাখালীর মো:শাহজাহান,দক্ষিন মিঠাখালীর ধলু মিয়া,হারজীর অাব্দুস সালাম সহ ১১ জন রাজাকার নিহত হয় এবং রুহুল অামীন মৃধা গুলি বিদ্ধ অবস্থায় ধান ক্ষেতে পড়ে থাকে। ২৫-৩০ মিনিটের মধ্যে যুদ্ধ শেষ হয়। যুদ্ধ শেষে ধান ক্ষেত থেকে ১১ টি লাশ ও ১৭ টি রাইফেল পাওয়া যায়। সাপলেজা-নলী রাস্তার উত্তর পাশে কুখ্যাত রাজাকার মাওলানা আব্দুল হক একটি রাইফেল সহ মাথা নিচু করে বসা থাকা অবস্থায় ফজলুল হক মাতুব্বর তাকে ঝাপটে ধরে বেঁধে ফেলেন।

উল্লেখ্য, মাওলানা আব্দুল হক টিকিকাটা নূরিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক এবং মঠবাড়িয়া থানা জামায়াত ই ইসলামীর অন্যতম নেতা ছিল। সে বহু মানুষকে হত্যা করেছে। অামি খবর পেয়ে দ্রুত ঝাটিবুনিয়ায় যাওয়ার পথে মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকার মাওলানা আব্দুল হক ও অাবু ইউসুফকে নিয়ে পাথরঘাটা থানার(বর্তমানে উপজেলা) রায়হানপুর ইউনিয়নের বেতমোর গ্রামে যাওয়ার পথে নলী ভীম চন্দ্র হাই স্কুল সংলগ্ন রাস্তায় অামার সাক্ষাৎ হয়। চৌধুরী নজরুল ইসলাম, অামার সহপাঠী সিদ্দিকুর রহমান ওরফে নবালী সিদ্দিক ও অালতাফ হোসেন অামাকে বলে অাসতে বিলম্ব কেন? ঘটনাস্থলে রাইফেল থাকতে পারে। গিয়ে খোঁজ কর। রাইফেল পাওয়া যায়নি।পাওয়া গেল গুলিবিদ্ধ মূমুর্ষু অবস্থায় রুহুল অামীন মৃধাকে। ইতোপূর্বে রাজাকার কর্তৃক ধৃত অামার পিতার মুক্তির ব্যাপারে সে সহায়তা করায় তাকে তার আত্মীয়-স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মুক্তিযোদ্ধারা বেতমোর গ্রামের আব্দুল মান্নান মাষ্টারের বাড়িতে অাশ্রয়গ্রহণ করেন।রাতে ছিদাম চৌধুরীর বাড়ি সংলগ্ন বাজারে মাওলানা অাব্দুল হককে কুপিয়ে হত্যা করে লাশ খালে ফেলে দেয়া হয়। মো: ইউসুফ মুক্তিযোদ্ধা ইউনুস অালী মুন্সীর সহোদর ভাই বিধায় তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়নি। এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার তুজাম্বর অালী (সাফা), সুবেদার ইস্কান্দার অালী (কাকচিড়া),চৌধুরী নজরুল ইসলাম,চৌধুরী আফজাল হোসেন,চৌধুরী অাব্দুল লতিফ,চৌধুরী বজলুল অালম,চৌধুরী শাহ অালম(উত্তর হলতা), আলতাফ হোসেন(বোমা আলতাফ),ফজলুল হক হাওলাদার, সিদ্দিকুর রহমান ওরফে নবলী সিদ্দিক(দূর্গাপুর),সু্বেদার শামসুল আলম(চলাভাঙ্গা),গোলাম মোস্তফা পান্না(উত্তর কাকচিড়া),ফজলুল হক মাতুব্বর (ভেচকী),কমরেড অাব্দুল হালিম(বরগুনা), বিধান চন্দ্র কির্তুনীয়া (নলী),অাব্দুল হক হাওলাদার (অামড়াগাছিয়া),বিনয় কৃষ্ণ হাওলাদার (পাথরঘাটা) প্রমূখ। নিহত রাজাকারদের মধ্যে শাহজাহান, ধলু মিয়া ও অাব্দুস সালামের লাশ মঠবাড়িয়া থানায় আনা হলে রাজাকার ও দালালরা শোকসভা করে।

লেখক >> অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন