খালিদ আবু, পিরোজপুর >>
“ছেলে ক্রিকেট খেলতে বিদেশে যায়, পায় নানা পুরস্কার। এতে অনেক ভালো লাগে। গর্বে বুক বড় হয়, কিন্তু পেটতো ভরে না। আশ্রয়ণ প্রকল্পের ভাঙ্গা ঘরে থেকে তারা যে রঙ্গীন স্বপ্ন দেখছে তা অভাবের কারণে আস্তে আস্তে অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে” কথা গুলো বলছিল শারীরিক প্রতিবন্ধী জাতীয় ক্রিকেট দলের সদস্য মো: শাওন সিকদারের মা নাসিমা বেগম।
শারীরিক প্রতিবন্ধী জাতীয় ক্রিকেট দলের সদস্য মো: শাওন সিকদার পিরোজপুর সদর উপজেলার শারিকতলা-ডুমরীতলা ইউনিয়নের কুমরিমারা আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা দিনমজুর মো: বাবুল সিকদারের ছেলে।

শাওনের মা নাসিমা বেগম জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া উপহার আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে তিন ছেলে ও এক কন্যা নিয়ে তাদের সংসার। সন্তানদের মাঝে সবার বড় হচ্ছে শাওন। শারীরিক প্রতিবন্ধী হবার কারণে ছোট সময় থেকেই লেখাপড়ার তেমন আগ্রহ ছিল না শাওনের। তাই অভাবের সংসারের কিছুটা সহযোগিতা করার জন্য তাকে চট্টগ্রামে একটি গার্মেন্টসে কাজ করার জন্য পাঠানো হয়। সেখান থেকেই এই ক্রিকেট খেলায় সে যোগ দেয়। পরে জানতে পারি সে জাতীয় শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের সদস্য হিসেবে সুযোগ পেয়েছে। ঢাকায় আসার পরে আমরা জানতে পারি যে শাওন জাতীয় শারীরিক প্রতিবন্ধী দলের সদস্য হয়ে ক্রিকেট খেলায় চান্স পেয়েছে এবং শাওন জাতীয় শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের সদস্য হিসেবে ইংল্যান্ডে যাবে। তবে অভাবের সংসারের সেই খুশির সংবাদ বেশী সময় থাকে নি। কারণ ক্রিকেট খেলার যে খরচ তা আমাদের জন্য বহন করা খুবই কঠিন। এমনকি বিদেশে ক্রিকেট খেলার জন্য যে পাসপোর্ট করা হয়েছে তার খরচও মানুষের কাছ থেকে ধার করে আনা লাগছে। বর্তমানে ক্রিকেটই শাওনের সব কিছু।

শাওনের বাবা বাবুল সিকদার জানান, ছেলে শারীরিক প্রতিবন্ধী হবার কারণে কখনো সে ক্রিকেটার হবে তা চিন্তাও করিনি। চাকরীর জন্য তাকে পাঠানো হয় চট্টগ্রামে। সেখান থেকেই এই ক্রিকেট খেলায় সে যোগ দেয়। পরে জানতে পারি সে জাতীয় শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের সদস্য হিসেবে সুযোগ পেয়েছে। পরে শাওন জাতীয় শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের সদস্য হিসেবে ইংল্যান্ডে যায়। বর্তমানে সে বাড়ীতে আছে। এখানে ক্রিকেট অনুশীলনের জন্য তেমন কোন ব্যবস্থা নেই। এছাড়া ক্রিকেট খেলা অনুশিলনের জন্য যে সকল সম্যগ্রী দরকার তা কিনে দেওয়ার সমর্থও নেই আমাদের।
শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেটার মো: শাওন সিকদার জানান, ছোট সময় থেকে ক্রিকেট খেলার প্রতি ছিল তার প্রচুর আগ্রহ। বর্তমানে শাওন জাতীয় শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের সদস্য হিসেবে আছে। অংশ নিয়েছেন ইংল্যান্ডে অনুুুষ্ঠিত ২০১৮ ফিজিক্যাল ডিজ্যাবিলিটি ট্রাই-সিরিজ টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট টুর্নামেন্টে। এছাড়া বাংলাদেশের হয়ে খেলেছে ভারত, পাকিন্তান ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে। এ সব খেলায় কয়েকটিতে হয়েছে ম্যান-অব-দি ম্যাচ। তবে তার স্বপ্ন গুলো দিন দিন কমে যাচ্ছে অভাবের কারণে। ক্রিকেট খেলার উপকরণের অভাবের কারণে নিয়মিত করতে পারছে না খেলার অনুশীলন। তাই ক্রিকেট খেলার অনুশীলনের উপকরণের টাকা যোগাতে বাড়ীতে এসে করছে দিনমজুরের কাজ। এছাড়াও টাকা আয়ের জন্য চালাচ্ছে অটো-রিক্সা ও ইজিবাইক। তাই শাওন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনর কাছে আবেদন করে তার ক্রিকেট খেলার ভবিষতের কথা ভেবে সার্বিক সহযোগীতা করবেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আজমীর হোসেন মাঝি জানান, বাংলাদেশের জাতীয় দলের ক্রিকেটারা তো অনেক সুযোগ-সুবিধা পায়। শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও শাওন তো এ দেশের জন্যই খেলে থাকে। জাতীয় শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের সদস্য শাওনকে দেখি জীবনের তাগিদে দিনমজুরের কাজ করছে। আবার সুযোগ মতো নিজের মতো করে বাড়ীর ভিতরে অল্প জায়গায় ক্রিকেট অনুশীলন করতে তখন ভালোই লাগে। জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের যে সকল সুবিধা দেয়া হয়ে থাকে সে রকম কিছু সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করলে এ শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেটার শাওন সিকদার সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে।
পিরোজপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মো: গোলাম মাওলা নকীব জানান, আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (আইসিআরসি)-র সহায়তায় গঠিত বিসিবির শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের সদস্য হিসেবে শাওন সিকদার গত ৬ জুলাই ‘ফিজিক্যাল ডিজ্যাবিলিটি ট্রাই-সিরিজ’ টি-২০ টুর্ণামেন্ট খেলতে ইংল্যান্ডে যায়। ৮ জুলাই থেকে সেখানে শুরু হওয়া সিরিজে শাওন ইংল্যান্ড ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ৩ ম্যাচ খেলে ১২৯ রান করে । এ সিরিজে শাওন একটি ম্যাচে ম্যান অব দ্যা ম্যাচ এবং ম্যান-অব-দি সিরিজ হয়। এছাড়া সে ভারত ও আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে টি-২০ ম্যাচে অংশ গ্রহণ করে।
তিনি আরো জানান, জেলা ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ থেকে শাওনের ক্রিকেট অনুশীলনের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা করা হবে এবং তাকে সার্বিক সহযোগীতা করা হবে।

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন