নূর হোসাইন মোল্লা >>

(প্রথম পর্ব)
রোজা ফারসী শব্দ। আরবীতে বলা হয় সিয়াম। বাংলায় উপবাস। তবে রোজা শব্দটি বাংলা ও উর্দু ভাষায় বহুল প্রচলিত। শরীয়তের পরিভাষায় এর অর্থ হল সুবহে সাদিকের শুরু থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, যৌন সংগম, অসৎ কাজ ও আচরণ থেকে বিরত থাকা। রমজানের রোজা ইসলামের ৫টি  স্তম্ভের মধ্যে তৃতীয় স্তম্ভ। প্রাপ্ত বয়স্ক, সুস্থ মস্তিস্ক, স্বদেশ ও স্বগৃহে অবস্থানকারী ও সক্ষম প্রত্যেক মুসলিম নর ও নারীর ওপর রোজা ফরজ। তবে হায়েজ, নিফাসধারী, গর্ভবতী ও স্তন্যদায়িনী এবং সফরকারীর জন্যে রোজা শিথিল করেছেন। কিন্তু তাদেরকে পরবর্তীতে রোজা কাযা পালন করতে হবে। রমজান মাসে মানুষের দিশারী, সৎ পথের সুস্পষ্ট নিদর্শন এবং সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে। ইবাদত- বন্দেগীর উত্তম মাস হচ্ছে রমজান। রমজান মাসে সঠিকভাবে রোজা পালনের মাধ্যমে যে পরিমান সওয়াব লাভ করা যায় তা অন্য ইবাদতের মাধ্যমে লাভ করা যায় না। রমজান মাসের রোজা অন্য ১১ মাসের রোজার সমান হয় না। অসীম দয়াময় আল্লাহ রব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনের সূরা আল বাকারার ১৮৩ নং আয়াতে বলেন, হে ইমানদারগন, তোমাদের ওপর রমজান মাসের রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা আল্লাহভীতি ও অন্যায় কাজ হতে বিরত থাকতে পার”।
উক্ত সূরার ১৮৪ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, তোমাদের মধ্যে যারা রোজা পালন করতে অক্ষম তারা প্রতিটি রোজার বদলে একজন গরীব-মিসকিনকে অন্য দান কর। যদি কেহ স্বতঃস্ফুর্তভাবে সৎ কাজ করে তা তার পক্ষে অধিক কল্যাণকর। আর রোজা পালন করাই তোমাদের জন্যে অধিকতর কল্যাণপ্রসু যদি তোমরা জানতে”। ১৮৫ নং আয়াতে আল্লাাহ বলেন, তোমাদের মধ্যে যারা রমজান মাসটি পাবে, তারা যেন অবশ্যই এমাসে রোজা পালন করবে এবং কেউ অসুস্থ থাকলে কিংবা সফরে থাকলে অন্য সময়ে এ সংখ্যা পূরন করবে”। রমজান মাসের রোজার ব্যাপক ফজিলত সম্পর্কে পবিত্র কুরআন এবং সহীহ হাদীস শরীফে, বহু বর্ননা আছে। হাদীসে কুদসীতে বর্নিত আছে যে, “ রোজা একমাত্র আল্লাহ রব্বুল আলামীনের জন্যে এবং তিনিই এর বিনিময়ে পুরস্কার দিবেন”।

রোজার সাথে অন্যকিছুর তুলনা হয়না। রোজা পালন অবস্থায় রোজাদারদের দোয়া কবুল হয়। কিয়ামতের দিন রোজা রোজাধারীর জন্যে পরম করুণাময় আল্লাহর নিকট সুপারিশ করে বলবে, “ হে রহমানুর রহীম, তুমি আমার সুপারিশ গ্রহন কর। যেহেতু, আমি তাকে দিনের বেলায় পানাহার ও যৌন সংগম থেকে বিরত রেখেছি”। নবী করিম (সঃ) বলেছেন, “রোজদারদের নিদ্রাও ইবাদতের সামিল, তার নিশ্চুপ থাকা তসবীহ পাঠের মধ্যে গন্য, তার প্রার্থনা মঞ্জুরকৃত এবং তার কাজ- কর্ম দ্বিগুন সওয়াবের অধিকারী। বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্নিত আছে যে, রাসূলে করিম (সঃ) বলেছেন, “ যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় রমজান মাসের রোজা পালন করবে, আল্লাহ রব্বুল আলামীন তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দিবেন”। উক্ত হাদীস শরীফদ্বয়ে আরও বর্নিত আছে যে, রোজা হচ্ছে জাহান্নাম থেকে রক্ষকারী। কেউ ইচ্ছা করে রোজ ছেড়ে দিলে কাযা ও কাফফারা আদায় করতে হবে। তবে বিপদাক্রান্ত এবং মৃত্যুরমুখে পতিতদেরকে উদ্ধারকারীরা যেমন, ডুবুরী ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা প্রয়োজন বোধ করলে রোজা ভঙ্গ করতে পারবে। পরে কাযা পালন করতে হবে।

রোজার বৈশিষ্ট্য ঃ
১। রোজা মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি সৃষ্টি করে এবং নৈকট্য ও সান্নিধ্য লাভের সুযোগ এনে দেয়।
২। রোজা মানুষকে অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। ৩। রোজা মানুষের আত্মাকে পরিচ্ছন্ন করে এবং প্রবৃত্তি তথা কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য দমন করে। ৪। রোজা পালনের মাধ্যমে অসীম দয়াময় আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা যায়।৫। রমজান মাসের ইবাদত-বন্দেগীতে অন্যান্য মাসের চেয়ে ৭০ গুন বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। ৬। আসমান ও জমিনের ফেরেশতাগণ রোজদারদের জন্যে মাগফিরাত কামনা করেন। ৭। দয়াময় আল্লাহ তায়ালা রোজা পালনকারীর দোয়া কবুল করেন। ৮। রোজাদারদের আহার, নিদ্রা, কাজ-কর্ম ও চিন্তা ভাবনা ইবাদতের মধ্যে সামিল হয়। ৯। রমজান মাসে বেহেশতের দরজগুলো খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় ১০। রোজা পালনের মাধ্যমে ভ্রাতৃত্ববোধ, সহনশীলতা, মায়া-মমতা ও উদারতা সৃষ্টি হয়। ১১। রোজা অভুক্ত অভাবী মানুষের কষ্ট অনুভব করতে সাহায্য করে।১২। রোজা গর্হিত, পরনিন্দা, মিথ্যাকথা, অপরের সম্পদ হরণ এবং সর্ব প্রকার অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। ১৩। রোজা পালনের মাধ্যমে শারীরিক সুস্থতা লাভ করা যায়। স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীদের মতে, পরিমিত ভোজনে মেদ(চর্বি) ভূঁড়ি ও ওজন কমে যায়। আরোগ্য হয় জটিল রোগব্যাধি। রোজা হজম যন্ত্র ও পকস্থলীকে সর্বদা কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত রাখে এবং শরীরের বর্জ্য পদার্থ নিঃসরন করে। ১৪। রমজান মাসে রোজাদারদের পানাহারের হিসাব আল্লাহ নিবেন না। ১৫। রোজা পালনের মাধ্যমে আনুগত্য, বিনয়, নম্রতা, শৃংখলা, নিয়মনিষ্ঠা ও সময়ানুবর্তিতা সৃষ্টি হয়। ১৬। রোজা ধুমপানকারীকে দিনের বেলায় ধুমপান থেকে বিরত রাখে এবং এটি পরিত্যাগ করতে তাকে সাহায্য করে।
রোজা অতিশয় গুরুত্বপূর্ন ইবাদত, সেহেতু রোজার সাথে সংশ্লিষ্ট হুকুম-আহকামগুলো জেনে নেয়া প্রত্যেক মুসলমান নর ও নারীর কর্তব্য। মুসলমানদের উচিত ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত, মুস্তাহাব ও নফল কাজগুলো জানা ও পালন করা ।
নিম্নে রোজার আদব-কায়দা ও করনীয়গুলো অতি সংক্ষেপে বর্ননা করা হলঃ
১। রোজার নিয়তঃ রোজা শুদ্ধ হওয়ার শর্ত হচ্ছে সুবেহ সাদেক থেকে রোজা রাখার নিয়ত করা। রোজার নিয়ত করা ফরজ। রাসূল (সঃ) বলেছেন ঃ যে ব্যক্তি ফজর হবাব পূর্বে রোজা রাখার নিয়ত করে নাই তার রোজা হয় নাই। (তিরমিযী, নাসায়ী, আবু দাউদ- হযরত হাফসা (রাঃ) থেকে বর্নিত)

২। সাহরী এবং ইফতারঃ নবী (সঃ) বলেছেন, রোজার উদ্দেশ্যে তোমরা শেষ রাতে খাবার গ্রহন কর। কেননা সাহরীতে বরকত আছে। রাসূল (সঃ) বলেছেন, সূর্য অস্ত যাবার সাথে সাথে সদ্য পাকা খেজুর/শুকনো খেজুর/ পানি দ্বারা ইফতার করবে। সম্ভব হলে অপরকে ইফতার করাবে। এতে উভয়ই সমান সওয়াব পাবে। কিন্তু মূল রোজাদারের সওয়াব একবিন্দুও কম হবে না।
৩। অশ্লীল কথা-বার্তা এবং নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থাকাঃ নবী (সঃ) বলেছেন, রোজা পালনকালে তোমরা অশ্লীল কথা-বার্তা, অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয় কথা-বার্তা, গীবত ও ঝগড়া -বিবাদে লিপ্ত হবে না। এগুলো পাপাচার ও গুনাহের কাজ। রাসূল (সঃ) আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি গর্হিত কাজ ও কথাবার্তা পরিত্যাগ করতে পারবেনা, তার রোজা পালন করার প্রয়োজন নেই। ৪। হুর-হাঙ্গামা ও মারামারিতে লিপ্ত না হওয়া ঃ নবী (সঃ) বলেছেন, যদি কেহ রোজাদারের সাথে মারামারি করতে চায় বা গালিদেয়, তাহলে সে যেনো তাকে দুই বার বলে আমি রোজ পালন করছি।
৫। দান-সদকা ঃ নবী (সঃ) বলেছেন, রমজান মাসে দান-সদকা করলে বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। তিনি এ মাসে বেশি দান করতেন। হযরত আয়শা রাঃ বলেন, রমজান মাসে সদকা করার জন্যে রসূলে করীম (সঃ) এর উৎসাহ উদ্দীপনা অধিক বেড়ে যেত।
৬। কুরআন পাঠ :  কুরআন পাঠ একটি ইবাদত। রমজান মাসের প্রতি রাতেই হযরত জিব্রাইল (আঃ) নবী করিম (সঃ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন এবং পরস্পর কুরআন শিক্ষা করতেন। তিনি বলেন, বিনয়ের সাথে যতবার সম্ভব কুরআন খতম কর। রমজান মাসে কুরআন পাঠের সওয়াব বেশি। রাসূল (স;) বলেন, যে ব্যাক্তি কুরআন পাঠ করবে সে যেন আল্লাহর নিকট কিছু চায়(তিমরীজি শরীফ)
৭। বিনয় ও একাগ্রতার সাথে ২০ রাকায়াত তারাবিহ নামাজ আদায় করতে হবে। কেউ কোন কারণে রোজা পালনে অসমর্থ হলেও তাকে তারাবীহ নামজ আদায় করতে হবে। অন্যথায় সুন্নত ত্যাগ করার গুনাহগার হবে। বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে, যে ব্যাক্তি রমজান মাসে ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় তারাবীহ নামাজ আদায় করবে আল্লাহ তার পূর্বেও পাপকাজ সমূহ মাফ করে দিবেন।
৮। বেশি পরিমানে কালেমায় শাহাদাত পাঠ এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা। এ দুইটি কাজ আল্লাাহর নিকট অতি পছন্দীয় ।
৯। রমজান মাসের শেষ ১০ দিন সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মসজিদে ইতিকাফ করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। হাদীস শরীফে এ বিষয়ে তাগিদ রয়েছে। (  আগামী কিস্তিতে সমাপ্য )

লেখক > অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও পাঠাগার আন্দোলনের সংগঠক, মঠবাড়িয়া, পিরোজপুর।

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন