মোঃ নুর হোসাইন মোল্লা >>
১৯৭১ সালের ৪ মে হানাদার পাকিস্তানী বাহিনী পিরোজপুর শহর দখল করলে মঠবাড়িয়ায় মুক্তিযুদ্ধের কার্যক্রম পরিচলনার অস্ত্রাগার তথা কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনা সদস্য সূর্যমণি গ্রামের ফখরউদ্দিন পিতা – আব্দুল হাই মুন্সি মুসলিম লীগ নেতা এম.এ. জব্বার ইজ্ঞিনিয়ারের পরামর্শে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে বিশ্বাসঘতকতা করে ৫ মে পূর্বাহ্নে মঠবাড়িয়া পুলিশ সার্কেল প্রধান কাজী জালাল উদ্দিনের নিকট অস্ত্র¿ জমা দেয়। অস্ত্র জমা দেয়ার বিষয়টি দ্রুত ছরিয়ে পরলে এতদাঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সওগাতুল আলম সগীর এম.পি.এ. এবং মুক্তিযোদ্ধারা আত্মগোপনে চলে যান। সওগাতুল আলম সগীর মে মাসের শেষ দিকে সুন্দরবনে ক্যাপ্টেন জিয়া উদ্দিনের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁরই সহায়তায় জুন মাসের প্রথম দিকে পশ্চিম বঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার হাসনাবাদে যান। বশীরহাট মহাকুমা প্রশাসকের সাথে আলোচনা করে জুলাই মাসের শেষ দিকে তিনি আমলানিতে একটি প্রশিক্ষন ক্যাম্প স্থাপন করেন। ৫ মে বিকেলে মঠবাড়িয়া সার্কেল পুলিশ প্রধান কাজী জালাল উদ্দিন নিজেই কে.এম.লতীফ ইনষ্টিটিউশনের প্রধান শিক্ষক এম.এ.মজিদ এর সম্মূখে গ্রেপ্তার করে তারই ছাত্র বকশির ঘটিচোরা গ্রামের সন্তান এবং ঢাকা বিশ^বিদ্যলয়ের রসায়ন বিভাগের অনার্স ৩য় বর্ষের মেধাবী ছাত্র গণপতি হালদারকে।গণপতি হালদার ১৯৬৬ সালে এস.এস.সি. পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে কে.এম.লতিফ ইনষ্টিটিউশন থেকে যশোর শিক্ষা বোর্ডে ১ম স্থান অধিকার করেন। তিনি ছাত্র ইউনিয়নের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ৬ মে পুলিশ আওয়ামী লীগ, ন্যাপ , ছাত্র লীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতা-কর্মী তথা স্বাধীনতাকামীদের ধর-পাকড় শুরু করে।এদিন সকালে টিকিকাটা গ্রামের অমল কৃষ্ণ মন্ডল,দেবত্র গ্রামের বিরেন্দ্র নাথ মন্ডল এবং এ দিন বিকেলে মঠবাড়িয়া থানা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী আব্দুল খালেকের ভাই জাকির হোসেন পনু মাষ্টার ও রাতে কে.এম. লতিফ ইনিষ্টিটিউশনের ১০ম শ্রেণীর ছাত্র চিত্রা গ্রামের গোলাম মোস্তফা, পিতা- আব্দুর রশিদ মাষ্টার, ৯ম শ্রেণীর ছাত্র ফরুকউজ্জামান ও তার ভাই খুলনা কমার্স কলেজের ছাত্র জিয়াউজ্জামান, পিতা-মতিয়র রহমান ,পাতাকাটা গ্রামের আব্দুল মালেক মুন্সি, পিতা- আব্দুল গনি মুন্সি, সূর্যমনি গ্রামের ডঃ মোস্তাফিজুর রহমান(অধ্যাপক, আরবি বিভাগ , ঢাকা বিশ^ বিদ্যালয় এবং জমায়াত –ই- ইসলামীর অনুসারী)এর ভাতিজা মজিবর রহমান মঞ্জু পিতা: হাবিবুর রহমান মুন্সি ও চিত্রা গ্রামের শশুর বাড়িতে অবস্থানরত শরণখোলা থানার বকুলতলা গ্রামের শামসুল হক বেপারী,পিতা-সৈজদ্দিন বেপারী (গোলাম মোস্তফার ভগ্নিপতি)কে গ্রেপ্তার করে। ৭ মে মধ্যম সোনাখালী গ্রামের নুরুল ইসলাম বি.এসসি (পরবর্তীতে কে.এম.লতিফ ইনিষ্টিটিউশনের প্রধান শিক্ষক) এবং মঠবাড়িয়া কলেজের ভি.পি. আনোয়ারুল কাদির (লেখকের সহপাঠী) সহ মোট ১২ জনকে গ্রেপ্তার করে থানায় আটক রাখে। তাঁদের মুক্তির জন্যে খান সাহেব হাতেম আলী জমাদ্দার এবং আমড়াগাছিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল হাসেম ধলু মিয়া সর্বাত্মক চেষ্টা করেন । পুলিশ সার্কেল প্রধান কাজী জালাল উদ্দিন এবং ও.সি. আব্দুস সামাদ নুরুল ইসলাম বি.এসসি, জাকির হোসেন পনু মাষ্টার, ফরুকউজ্জামান ও মজিবর রহমান মঞ্জুকে মুক্তি দেন। ৯ মে সকালে অবশিষ্ট ৮ জনকে পিরোজপুর কোর্টে চালান দেয়া হয়। এ দিন সন্ধ্যায় ক্যাপ্টেন এজাজ আহমেদের নির্দেশে তাঁদেরকে পিরোজপুর খেয়া ঘাটে গুলি করে তাদের লাশ বলেশ^র নদীতে ফেলে দেয়া হয়।
জাকির হোসেন পনু মাষ্টার এ লেখককে জানিয়েছেন যে,ওই সময়ে খান সাহেব হাতেম আলী জমাদ্দার যে ভূমিকা রেখেছেন, তাতে সবারই মুক্তি পাওয়ার কথা। কিন্তু জামায়াত ইসলামীর নেতা ডাঃ আনিসুর রহমান পিরোজপুরে অবস্থানরত ক্যাপ্টেন এজাজকে বিষয়টি অবহিত করলে পুলিশ সার্কেল প্রধান কাজী জালাল উদ্দিন এবং ও.সি.আব্দুস সামাদ তাঁদেরকে মুক্তি দেননি।দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জিয়াউজ্জামানের পিতা মতিয়ুর রহমান ১৯৭২ সালে মার্চ মাসে থানা শানিÍ কমিটির সভাপতি এম.এ.জব্বার ইজ্ঞিনিয়ার , ডাঃ আনিসুর রহমান, সেরাজুল হক মল্লিক ,আব্দুস সামাদ আকন সহ ১০ জনকে আসামী করে মঠবাড়িয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। আসামীরা পলাতক থাকায় কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে মামলাটি নিস্ক্রিয় হয়।

লেখকঃ অবসর প্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক
মোবঃ ০১৭৩০-৯৩৫৮৮৭

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন