খালিদ আবু,পিরোজপুর  >>

প্রতিকূলতা ও বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে জীবন সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে সমাজে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে সাফল্যের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হয়েছেন পিরোজপুরের পাঁচ নারী। সরকারের মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের উদ্যোগে ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ শীর্ষক কর্মসূচির আওতায় পিরোজপুর জেলায় ২০১৭-২০১৮ সালের জন্য বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত হয়ে তারা এখন নারীদের অনুসরণীয় দৃস্টান্ত। অতীতে তারা অনেক দুঃখ-কষ্ট ও অভাব-অনটন সহ্য করেও হতোদ্যম না হয়ে সাফল্যের গৌরবগাথায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন। প্রতিকূল পরিবেশে সংগ্রাম করে তারা তাদের জীবনে এনেছেন সাফল্য ।

এদের মধ্যে জেলার মঠবাড়িয়ার এক দরিদ্র বাবার মেয়ে মোসাঃ সাম্মী আক্তার। অভাবের সংসারে বাবা-মা মাত্র ১২ বছর বয়সে বিয়ে দেন সাম্মীকে। স্বামী বেকার হওয়ায় শ^শুরবাড়ির সব কাজকর্ম তাকেই করতে হতো। কিন্তু স্বামী ছিলেন স্বভাব দোষে দুষ্ট। তার ছিল একের পর এক বিয়ে করার মানুসিকতা। সাম্মী যখন দু’সন্তানের জননী তখন স্বামী আর একটা বিয়ে করেন। খোঁজ খবর নেয় না সাম্মী ও তার সন্তানদের। এক পর্যায় সাম্মীকে তালাক দেন। এরপর শুরু হয় দু’ছেলেকে নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। রাস্তায় ইট ভাঙ্গা,পান-সিগারেটের দোকান দেওয়া এবং অন্যের বাড়ী বা দোকানে কাজ করা শুরু করেন সাম্মী। কিন্তু সেখানেও সামাজিকভাবে নানা বাধা ও নির্যাতনের শিকার হন সাম্মী। এরপর এক ভাবীর সাহায্যে পার্লারের কাজ শিখে প্রথমে অন্যের পার্লারে কাজ করেন। পরে কিছু পুঁজি নিয়ে নিজে পার্লার দেন। বর্তমানে তার নিজের ২টি দোকান ও ১টি পার্লার এবং ৪জন কর্মী আছে। এখন সে প্রায় ৭ লক্ষ টাকার মালিক। যা ব্যাংকে রক্ষিত আছে।

শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী প্রিয়ংবদা ভট্টাচার্য্য। পিরোজপুরের কাউখালীর উজিয়ালখান গ্রামের মানিক লাল ভট্টাচার্য্যরে ছোট মেয়ে । জন্মের পর পোলিও রোগে আক্রান্ত হলে ডান পা চলাচলের স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলেন প্রিয়ংবদা। শারীরিক প্রতিবন্ধী হলেও মনের অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে জয় করে লেখাপড়া চালিয়ে যান। এমনকি টিউশনি করেও তার লেখাপড়ার খরচ মেটাতে হয়েছে। প্রিয়ংবদা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স মাষ্টার্স পাশ করে বর্তমানে পিরোজপুর প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন। কর্মক্ষেত্র ছাড়াও প্রিয়ংবদা শারীরীক প্রতিবন্ধী মেয়েদের সাহায্য করে যাচ্ছেন। তিনি প্রতিবন্ধী হয়েও তার লালিত স্বপ্নকে সফল রূপ দিতে সক্ষম হয়েছেন। প্রিয়ংবদা মনে করেন, কোন শারীরিক প্রতিবন্ধী মেয়ে নিজেদেরেকে পরিবার ও সমাজের বোঝা না ভেবে দৃঢ় মনোবল নিয়ে সামনে এগিয়ে গেলে সাফল্য আসবেই।

আর এক সফল জননী গীতা চক্রবর্তী । পিরোজপুর শহরের এক দরিদ্র পুরোহিত কণ্যা। কলেজে পড়াকালিন ২২ বছর বয়সে তার বাবা তাকে বিয়ে দেন। । স্বামী- পরিমল চক্রবর্তী, অন্যের বইয়ের দোকানে সামান্য বেতনে কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন। কিন্তু এতে তাদের ১টি ছেলে ও ১ টি মেয়ে নিয়ে সংসারে অস্বচ্ছলতা লেগেই থাকতো। অবশেষে গীতার নিজের যেটুকু গহনা ছিল তা বিক্রি করে স্বামীকে পুরাতন বইয়ের দোকান দিয়ে দেন। সংসারে অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটলেও তিনি ছেলে-মেয়েকে লেখা পড়া চালিয়ে রাখতেন। নিজের চেষ্টা ও এলাকার হৃদয়বান ব্যক্তিদের সহায়তায় ছেলে ৫ম ও ৮ম শ্রেণীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করে। ৫ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ায় মানুষের সাহায্য সহযোগিতায় ছেলে মেয়ের পড়ালেখা অব্যাহত রাখেন। একপর্যায়ে ছেলেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ে আইন বিভগে ভর্তি করান। এখান থেকে ছেলে অনার্স মাস্টার্স পাশ করে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে চাকুরি পান। মেয়েও বর্তমানে বাংলায় অনার্সে অধ্যয়নরত।

নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যোগে জীবন সংগ্রামী নারী জেলার নেছারাবাদ উপজেলার উত্তর কামারকাঠী গ্রামের দরিদ্র দিন মজুর পিতার কণ্যা হাসি বেগম। সংসারের কাজের ফাকে অন্যের বাড়িতে কাজ করেন তার মা। অভাবের তাড়নায় মাত্র ১৪ বছর বয়সে হাসির বিয়ে হয়। স্বামীর আর্থিক অবস্থা তেমন ভাল ছিলনা। শ^শুর-শাশুড়ী নার্সারীতে দিনমজুরের কাজ করত। স্বামী ঢাকায় ফার্নিচারের দোকানে কাজ করত। স্বামীর অনুপস্থিতে বিয়ের ২ বছর পর লম্পট শ^শুরের লোলুপ দৃষ্টি পড়ে হাসির উপর। একদিন শ^শুর কর্তৃক ধর্ষণের শিকার হন হাসি। এরপর আইনের আশ্রয় নেন সে। এতেই তার জীবনে নেমে আসে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির। স্বামীর অবিশ^াস এবং নানাভাবে নিগৃহীত হয়ে স্বামী তাকে তালাক দেয়। সমাজের কাছে কলঙ্কিত হলেও মনোবল না হারিয়ে হাসি বেগম নিজের পায়ে দাঁড়ানোর দৃঢ় প্রত্যয়ে ভাবতে থাকেন কিভাবে প্রতিকূলতা জয় করে বেঁচে থাকা যায়। এমন সময় বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক তাঁকে ২০,০০০/- টাকা মূল্যমানের ১ টি সেলাই মেশিন ও সীট কাপড় দিয়ে পূনর্বাসনে সহায়তা প্রদান করে। তিনি চান, কোন নারী যেন এরূপ জঘন্য নির্যাতনের শিকার না হন।

সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন ইন্দুরকানী উপজেলার চাড়াখালী গ্রামের দিলরুবা মিলন নাহার। স্বামীর সংসারে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত অবস্থায় থেকেও নিজ উদ্যোগে দীর্ঘ ১৭ বছর যাবত গরিব দুঃস্থ মানুষের কল্যাণে বিভিন্ন সংস্থায় জড়িত হয়ে সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ করছেন। যে সমস্ত নারীরা স্বামীর সংসারে বিভিন্নভাবে নির্যাতিত, নিগৃহীত’ আর্থিক দৈন্যতায় জীবনযাপন করেন তাদেরকে তিনি অর্থনৈতিকভাবে সস্বাবলম্বী হওয়ার জন্য বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা করান এবং নিজে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে সমিতি রেজিস্ট্রেশন করে দুঃস্থ অসহায় মহিলাদেরকে সম্পৃক্ত করেন। তিনি বাল্যবিবাহ, যৌতুক, নারী নির্যাতন, ইভটিজিং,মাদক বিরোধী এবং জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে ভূমিকা পালন করে আসছেন। এরজন্য দলরুবা মিলন (ক) উন্নয়ন সংগঠক হিসেবে স্বীকৃতিস্বরূপ সন্মাননা পুরস্কার (খ) সাউথ এশিয়া পার্টনারশীপ বাংলাদেশ সনদ (গ) যোগাযোগ ও ডাব্লিউ টি সি মেলা-২০১১ সন্মাননা সনদসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে পুরস্কৃত হয়েছেন। এছাড়া তিনি বৃক্ষরোপন নিরক্ষরতা দূরিকরণ,স্বাস্থ্য সচেতনতাসহ বিভিন্ন প্রচারনার মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করায় এলাকায় সুনাম অর্জন করেছেন।

পিরোজপুর জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সালমা জাহান বলেন, সমাজ ও সভ্যতার বির্নিমাণে নারী পুরুষের রয়েছে সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বর্তমানে বাংলাদেশে নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে নজরকড়া অগ্রগতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ কার্যক্রম মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ইনোভেটিভ আইডিয়া। সমাজ বদলের নিরলস কর্মী যারা প্রদীপের পাদদীপে আসতে পারেননি, উন্নয়নের ¯্রােতধারায় তাদের অংশগ্রহণের অব্যাহত রাখার উদ্দেশ্যে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর দেশ ব্যাপী ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ শীর্ষক কার্য়ক্রম বাস্তবায়ন করছে। বাংলাদেশের সামগ্রিক অগ্রযাত্রা ও নারীর অগ্রযাত্রা পরস্পর পরিপূরক। আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অগ্রযাত্রায় নারীর সফল অংশগ্রহণ বাংলাদেশকে আজ বিশ^ব্যাপী রোল মডেলের আসনে বসিয়েছে। ‘জয়িতা’ এক সফল নারীর মূর্ত প্রতিচ্ছবি।

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন