সাইফুল বাতেন টিটো >>

অনেক ছোট বেলায় যখন গল্পের বই পড়তাম তখন মনে হতো আমিও এমন লিখতে পারি। খাতা কলম নিয়ে বসে চেষ্টাও করতাম। কিন্তু কোনদিন ছাপাতে ইচ্ছে করেনি। বয়স বাড়ার সাথে সাথে পড়ার পরিমান বাড়লো। মাঝে মধ্যে নিজের লেখা পড়ে হাসতাম, কাউকে দেখাতাম না। কিন্তু লেখা থামালাম না। ক্লাস নাইনে থাকতেই একটা রহস্য উপন্যাসের ৫০% লিখে ফেললাম। কলেজে উঠে সেই লেখা পড়ে হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হয়ে গেলো। কিন্তু লেখা কখনও থামাইনি।

ছোট ছোট কবিতাও লিখেছিলাম কয়েকটা। প্রথম লেখা ছাপা হলো মঠবাড়িয়া সমাচার নামে একটি লোকাল সাপ্তাহিক পত্রিকায়। সম্ভবত ১৯৯৯ সালে। নিজের নাম, লেখা কবিতা ছাপার অক্ষরে দেখার ঐ আনন্দ ছিলো প্রেমিকার সাথে প্রথম সাক্ষাতের মতো আনন্দের। লেখার উৎসাহ বেড়ে গেলো। কিন্তু কোথাও ছাপতে দেয়ার কথা তেমস করে ভাবিনি কখনও। সম্ভবত ২০০৫/০৬ এ আর্মিতে থাকাকালিন ‘অশ্রু’ নামে একটা ছোট গল্প লিখলাম। এক সহকর্মীকে দিলাম টাইপ করতে। সে টাইপ করে প্রিন্ট করে আমার কাছে নিয়ে এসে বলল লেখাটা যায়যায়দিনে পাঠাতে। আমি গাঁইগুই করতে লাগলাম। কেমন কি হয়েছে, ওসব সম্পাদক পড়ে বিরক্ত হবেন। লেখাটা ছিলো সোলজারদের ফোনে কথা বলার অব্যবস্থাপনা নিয়ে। সহকর্মী সোহেলের চাপাচাপিতে শেষ পর্যন্ত লেখাটা পাঠালাম। তবে ছদ্দ নামে। ওমা সেই লেখা যায়যায় দিন ছাপলো তাও সবার প্রথমে! আমি তো অবাক! সন্ধ্যার মধ্যে ব্যাটলিয়নের সবার পড়া শেষ! পনের দিনের মধ্যে রাঙামাটি বান্দরবন খাড়াছড়িতে মোবাইল ফোনের ব্যববস্থা করলেন সেনা প্রধান।
তার পর যায়যায় দিনে আরেকটি লেখা পাঠালাম। পড়ে সম্পাদক মহদয় ফোন দিলেন দেখা করতে বললেন। তার পর লিখেই চলেছি…

সবাই বই ছাপাতে বলেন। আমি বছর তিনেক আগ পর্যন্ত বইয়ের কথা ওভাবে ভাবিনি। কিন্তু দেখতে দেখতে লেখা বেড়েই চলেছে। ২০১৭’র বই মেলায় যখন বই বের করব ভাবলাম, ততদিনে সময় পেরিয়ে গেছে। এবার মনে হলো একটু আগেভাগে চেষ্টা করে দেখি। এগিয়ে এলেন অগ্রজ শতাব্দী কাদের ভাই। বললেন আমি প্রুফ দেখে দিচ্ছি। সাহস পেলাম। শেষ করে বললেন এবার প্রকাশকের সাথে যোগাযোগ কর। আমি বললাম আমি তো কোন প্রকাশককে ওভাবে চিনি না। তিনি ঐতিহ্য প্রকাশনীর নাইম ভাইয়ের কথা বললেন। জিনি নবিন লেখকদের জন্য এক বাতিওয়ালা। কেন জানিনা প্রকাশক এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন।
আমার প্রথম বই আমার প্রথম সন্তানের মতোই। বইটি একটি ছোট গল্প সংকলন। এখানে প্রায় আমার এক দশক ধরে লেখা বিভিন্ন ধরনের দশটি ছোট বড় গল্প রয়েছে। দশটি গল্পের সাতটি গল্পই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। তিনটি গল্প একেবারেই নতুন। বইটি আমি উৎসর্গ করেছি নিশাত জাহান নিশা নামের একজনকে, যে কিনা আমাকে সবচেয়ে বেশী মূল্যায়ন করেছে এবং সবচেয়ে বেশী অবমূল্যায়ন করেছে। নয় ফর্মার বইটির প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ, প্রকাশ করেছে ঐতিহ্য প্রকাশনী। ২৫% ছাড়ের পর বইটি মূল্য সবার হাতের নাগালেই রয়েছে আশা করি।

আর যে যাই বলুক আমি চেষ্টা করি আমার প্রতিটি লেখায় সমাজকে এক ধরনের ট্রিটমেন্ট দিতে। আমি মনে করি একজন লেখকের দায়িত্ব একজন মনচিকিৎককের মতোই। প্রকারন্তরে লেখকও একজন সমাজ কর্মী, একজন সমাজ বিজ্ঞানী, সমাজের একজন চিকিৎসক। আমি আমার প্রত্যেকটি লেখায় সে দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকি। আমি মনে করি অন্য কেউ কোন কারণে দয়িত্ব এড়িযে গেলেও এজন লেখকের তার দায়িত্ব এড়ানোর কোন সুযোগই থাকে না। কারণ তার কাজের জাবাদিহিতা একমাত্র তার কাছেই করতে হয়।
ক্লিনিক্যাল লায়ার বইয়ে প্রত্যেকটি গল্পই আমাদের বর্তমান সমাজের প্ররিপ্রেক্ষিতে লেখা। আর সেই সমাজের আমিও একজন মানুষ, যে আমি একজন কারো সন্তান, একসময় ছাত্র ছিলাম, চাকরি করেছি, না খেয়ে থেকেছি, নাটক করেছি, পথে পথে হেঁটেছি, পাহাড়ে গিয়ে সাধারণ জীবনের বাইরে জীবন কাটিয়েছি এমন কি বছর চারেক ঘর সংসারও করেছি। একজন লেখকের লেখা আসলে তার জীবনের প্রতিচ্ছবি। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। গল্প গুলো পড়ে আপনার মনে হবে এতো আপনার চারপাশের জীবনেরই গল্প কিংবা আপনারই গল্প। আমি সাধারণত একটা কথা বলে থাকি – দেখি শিখি লিখি। সত্যিই তাই। আমি যা জানি না তা লিখতেও পারি না। বাস্তাবস্তার আধিক্য না থাকলে আমার অনুর্বর মস্তিস্ক সাড়া দিতে চায়না। গল্প যেমন বাস্তবতা ছাড়া হয় না তেমনি কল্পনা ছাড়া লেখা আপনার ভালোও লাগবে না। অগ্রজ হরি শংকর জলদাস বলেছিলেন- কল্পনা হলো দুই ইটের মাঝখানের মশলা।
বাবা শিক্ষক হওয়ার কারণে ছোট বেলা থেকেই বাড়িতে অনেক বই পেয়েছি। জীবনে প্রথম পড়া বাই শরৎ চন্দ্রের শ্রীকান্ত। বাবার সংগ্রহ থেকে চুরি করে পড়া। কিশোর বয়সে বাম রাজনীতিতে হাতেখড়ি হওয়ার ফলে রাশিয়ান অনুবাদ পড়ার সুযোগ হয়। একই সময় মানিক, রবীন্দ্রনাথ, বিভুতি, তারা এসব পড়ার সৌভাগ্য হয় কলেজ জীবনেই। বুভুক্ষের মতো গিলতাম কাজী আনোয়ার, রকিব হাসান, হুমায়ূ আহমেদ, শীর্শেন্দু, সুনীল, সমরেস, সত্যজিৎ, বুদ্ধদেব, বনফুল, নারায়ন, সঞ্জিব, বুদ্ধদেব এসব। ফলে আমার লেখায় এদের সবার প্রভাব থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তার পরও আমি চেষ্টা করি আমার নিজস্ব স্টাইলে লিখতে। জানি না কতটা পারি।
ক্লিনিক্যাল লায়ার বইটিতে দশ রকমের দশটি গল্প রয়েছে। থ্রিলার, মুক্তিযুদ্ধের গল্প, ডার্ক রোমাঞ্চ, নিখাঁদ প্রেমের গল্প, রয়েছে ক্ষুধার গল্প, এমনকি আপনি একটি ভূতের গল্পও পাবেন একটি। আমি বলছি না এখানকার সব কটি গল্পই আপনার ভালো লাগবে, তবে প্রত্যেকটি গল্পই আপনাকে আলাদা ভাবে নাড়া দেবে। দুই চারটি হয়তো আপনার হৃদয়ে ঠাঁই নিয়ে নেবে দীর্ঘ দিনের জন্য।

সব শেষে একটি কথা যোগ না করে পারছি না। বইয়ের লেখা গুলো যখন করাচ্ছিলাম তখন আমার প্রয়াত বাবা খুব অসুস্থ, ঢাকায় এসেছেন চিকিৎকসা করাতে। অল্প সুস্থ হয়ে যেদিন বাড়িতে যাচ্ছিলেন সেদিন আমি টাইপ করাতে যাওয়ার সময় বাবা মাকে বললাম ‘আমার বইয়ের কাজ চলছে। আমার লেখা গুলো আপনারা একটু ছুঁয়ে দিন। আমার প্রথম বই তো…’ স্মিত হেসে বললেন, ‘তুই তো এসবে বিশ্বাস করিস না।’ আমি বললাম ‘আপনারা তো বিশ্বাস করেন, আমি আপনাদের বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করতে চাই।’ মা বাবা দুজনেই আমার লেখা ছুঁয়ে দিলেন। বাবা বললেন ‘তোর লেখার হাত ভালো। মানুষ তোর লেখা পড়বে। তুই লিখে যা।’ এটাই ছিলো বাবার সাথে আমার শেষ কথা। আফসোস একটাই, আমার প্রথম বইটি আমার প্রথম শিক্ষক, আমার দৃষ্টিতে দেখা এই গ্রহের অন্য তম সৎ মানুষ আমার মরহুম বাবা আব্দুল লতীফের হাতে দিতে পারলাম না।

>> সাইফুল বাতেন টিটো, লেখক ও মিডিয়া কর্মী।

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন