দেবদাস মজুমদার▶️

ষাটোর্ধ বয়সী জেলে খলিল শরীফের বুকের ভেতর ভয়াল ঘূণিঝড় সিডরের ক্ষত। সে ক্ষত কোনদিন আর উপশমের নয়। পরিবারের ৭জনকে তিনি চিরতরে হারিয়েছেন এই দিনে । বলেশ^র নদী তীরের জেলে খলিল শরীফদের নিয়ত জীবন বাঁচালেও সেই নদী ১৫ নভেম্বর ভয়ালরাতে ফুঁসে উঠেছিল। সেই রাতে বলেশ^রের জলোচ্ছাসে পরিবার সমেত ভেসে যায় জেলে খলিল ও তার পুরো পরিবার। ভয়ালতার রাতে তার পরিবারের ৭জন জন সদস্যসহ পুরো গ্রামে ৫৪জন মানুষের প্রাণহানী ঘটে। আর খলিল একটা গাছ আকড়ে সেদিন প্রাণে বাঁচেন। সেই সাথে ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছাসে সেদিন পুরোগ্রাম বিধ্বস্ত হয়।
উপকূলীয় পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার বলেশ^র নদ তীরবর্তী সাপলেজা ইউনিয়নের ক্ষেতাছিড়া গ্রামটি ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের উৎসমূখ। ক্ষেতাছিড়ার মোহনায় প্রথম সেই ভয়াল রাতে জলোচ্ছাসের আঘাত হানে। ক্ষেতাছিড়ার বেরিবাধ ভেঙে জলের স্রোত ভাসিয়ে নেয় পুরো গ্রাম। সেই রাতে সাপলেজা ইউনিয়নে ৮৬জন মানুষের প্রাণহানী ঘটে। সেই সাথে সিডরে মঠবাড়িয়া উপজেলায় ১৮৭জন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয় ঘূর্ণিঝড় সিডর। ঘূর্ণিঝড়ে আহত হয় অন্তত ২০ হাজার মানুষ,২৫ হাজার ঘরবাড়ি, ৩৫ কিলোমিটার বেরিবাঁধ বিধ্বস্ত আর অগনিত বৃক্ষরাজি উপড়ে যায়।
এর মধ্যে সিডরের উৎসমুখ ক্ষেতাছিড়া গ্রামের জেলে পল্লীতেই নিহত হন ৫৪জন মানুষ। ঘূর্ণিঝড় সিডরে বিধ্স্ত যে বেরিবাঁধের কারনে জলোচ্ছাসে মানুষ বিপন্ন হয়ে পড়েছিল । সিডরের ১০ বছরে দুর্গত মানুষেরা কিছুটা ঘুরে দাড়ালেও সিডরের উৎসমুখ ক্ষেতাছিড়া মোহনার বেরিবাধ আজও বিধ্বস্ত । সিডরের ক্ষত নিয়ে বেরিবাধ বিলীনের দিকে আর ক্ষেতাছিড়ার দুর্গত মানুষেদের আজও বিপন্ন দশা কাটেনি ।

ক্ষেতাছিড়া গ্রামের সিডরে স্বজন হারা জেলে খলিল শরীফ জানান, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সিডরের ভয়াল রাতে ক্ষেতাছিড়া গ্রামের বলেশ^র নদ মোহনায় প্রথম জলোচ্ছাস আঘাত হানে। মুহূর্তেই বেরিবাধ উপচে আর বাধ ভেঙে ভাসিয়ে নেয় পুরো গ্রাম। মানুষ, বসতির ঘর, গাছপালা আর গোয়ালের গরু বাছুর জলের ¯্রােতে ভেসে যায়। ভয়ালতার রাতে তার পরিবারের ৭জন জন সদস্যসহ পুরো গ্রামে ৫৪জন মানুষের প্রাণহানী ঘটে। সেই রাতে জেলে খলিল শরীফ গাছ আকড়ে বেঁচে থাকলেও তার পরিবারের ৭ সদস্য নিহত হন। বৃদ্ধা মা আলেয়া বেগম, স্ত্রী রওশন আরা, মেয়ে কারিমা, তিন নাতি সোনিয়া(৮) ও সিদ্দিক(৫), মিরাজ(৩) ও ভাই জলিল শরীফের স্ত্রী তাছলিমা বেগম নিহত হন। নিহতদের ক্ষেতাছিড়া বেরিবাধের পাড়ে গণকবর দেওয়া হয়। সেখানে অজ্ঞাত আরও তিনজনের লাশ মিলে ১০জনের গণকবর এখনও সিডরের সাক্ষ্য বহন করে আসছে।
বিপন্ন ক্ষেতাছিড়ার দুর্গত মানুষেরা টানা দেড় বছর ত্রাণের ওপর বেঁচে ছিলেন। সেদিন বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর সহায়তায় সেখানকার বিপন্ন জেলেরা জাল ও নৌকা পুনর্বাসন সহায়তা হিসেবে পেলে কিছু ঘুরে দাড়ানোর চেষ্টা চালায়। কিন্ত সিডরের উৎসমুখের সেই বিপন্ন বাঁধের দুর্দশা আজও তাদের কাটেনি। ফলে বাঁধের দুর্যোগে আজও ৬ হাজার ৫০০ জনসংখ্যা অধ্যুষিত ক্ষেতাছিড়া গ্রাম। শুধু ক্ষেতাছিড়া গ্রামই নয়, সাপলেজা ইউনিয়নের কচুবাড়িয়া ও ভাইজোরা গ্রামের মানুষেরও বিপন্ন বাঁধে জীবন কাটছে ।

সোমবার দুপুরে মঠবাড়িয়া উপজেলা সদর হতে ১৯ কিলোমিটার দুরে সাপলেজা ইউনিয়নের বলেশ^র নদ তীরের সিডরের উৎসমুখ ক্ষেতাছিড়া গ্রাম পরিদর্শন করে দেখাগেছে, সিডরের জলোচ্ছাসের ক্ষত নিয়ে বিধ্বস্ত কোন মতে টিকে আছে বাধ। বাবুরহাট থেকে ক্ষেতাছিড়া হয়ে কচুবাড়িয়া পর্যন্ত নদী তীরের প্রায় চার কিলোমিটার বাঁধ এখনও বিধ্বস্ত। বিপন্ন এ বাধ দিয়ে জোয়ারের প্লাবন ঢুকে পড়ছে গ্রামে। কৃষিজমিতে বাড়ছে লবনাক্ততা। ক্ষেতাছিড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে হাজিগঞ্জ বাজার পর্যন্ত এক কিলোমিটার বিপর্যস্ত সড়কটি আজও পাকা হয়নি। সুপেয় পানির কোন ব্যবস্থা হয়নি বিপন্ন ক্ষেতাছিড়ার মানুষের জন্য। ক্ষেতাছিড়ার বিধ্বস্ত বেরিবাধের বাইরে এখনও ৪৫০ জেলে পরিবারের বসতি। ফলে জেলে অধ্যুষিত এ গ্রামের মানুষের বাঁধ ধসের আতংক আজও কাটেনি। সিডরে নিহতদের গণ কবরটি পাকা করণ তো দুরের কথা এ গণ কবরটিও এখন নদী ভাঙনের কবলে। তবে বাবুর হাট থেকে ক্ষেতাছিড়া গ্রাম পর্যন্ত বেরিবাঁধে কিছু মাটি ভরাটের কাজ চলছে ঢিমে তালে । দায়সারা মাটি ভরাট নদীর জলোচ্ছাস ঠেকাতে কোন কাজেই আসবেনা এমন আশংকার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় জেলে পল্লীর মানুষেরা। অপরদিকে ক্ষেতাছিড়া গ্রামের কিছু অংশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় ব্লক নির্মাণের কাজ চলছে । স্থানীয়দের অভিযোগ নদী লাগোয় বিধবস্ত বাঁধের পাড়ে দায়সারা ভাবে ব্লক বসানো হচ্ছে। যা জলোচ্ছাস ঠেকানোর উপযোগি নয়। তা ছাড়া সিডরের উৎসমুখ ক্ষেতাছিড়া মোহনায় নদী শাসন কিংবা কোন ডাম্পিং ( নদীতে বালুর বস্তা ফেলানো) কাজ না করেই বিপর্যস্ত বাধের পাড়ে ব্লক নির্মাণের ফলে তা ধসে যাওয়ার আশংকা ।

৯৬ নম্বর ক্ষেতাছিড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুর রশীদ মোল্লা বলেন, ক্ষেতাছিড়া নদী মোহনাই ঘূর্ণিঝড় সিডরের উৎসমুখ । সেদিন ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র থাকলে সিডরে মানুষের এতো প্রাণহাণি ঘটতো না। তিনি জানান সিডরের পর ক্ষেতাছিড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বিধবস্ত হলে সিডর পরবর্তী স্কুল কাম সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হয়। তবে ছোট ও অপরিসর এ সাইক্লোন শেল্টারে ২০০ মানুষের বেশী আশ্রয় নিতে পারেনা। সিডরের উৎসমুখে একটি বড় সাইক্লোন শেল্টার দরকার। সেই সাথে ক্ষেতাছিড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সুপেয় পানি ও স্কুলের চারপাশে মাটি ভরাট প্রয়োজন। বাবুর হাট থেকে ক্ষেতাছিড়া মোহনার বাঁধে পাকা সড়ক প্রয়োজন।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানাগেছে, বিশ^ ব্যাংকের অর্থায়নে ৩০ কোটি টাকা ব্যায়ে ২০১৩ সালে বেরিবাধ ও ব্লক নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হয়। তমা এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এ কাজ বাস্তবায়ন করছে। ১৬ সালের জানুয়ারী মাসে ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করে।

ক্ষেতাছিড়া গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য মো. গোলাম কবির বলেন, ঘূণিঝড় সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত বলেশ^র নদের ক্ষেতাছিড়া নদী তীরের বাধে মাটি ভরাট ও কিছু অংশে মাটি ভরাটের কাজ চলছে গত চার বছর ধরে। তবে ১০ ভাগ কাজও সম্পন্ন হয়নি। দায়সারা মাটি ভরাটের কাজ দিয়ে সিডরের উৎসমুখের এ বেরিবাধের কার্যকর সুরক্ষা সম্ভব হবেনা। কারন ভাঙন কবলিত স্থানেই দায়সারা মাটি ভরাট করা হচ্ছে । তাছাড়া নদী মোহনায় কোন ডাম্পিং ছাড়াই কোনমতে ব্লক স্থাপনের পরিকল্পন নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ব্লক ছয় মাসেরও বেশী টিকে থাকবেনা। বেরিবাধ নদী তীর হতে সরিয়ে ভেতরের দিকে নির্মাণ না করা করা গেলে জলোচ্ছাস ঠেকানো সম্ভব না।

ক্ষেতাছিড়া গ্রামের বর্তমান ইউপি সদস্য মো. আফজাল হোসেন বলেন, সিডর দুর্গত ক্ষেতাছিড়ার মানুষের নদী তীরের বাঁধের দুর্ভোগ আজও শেষ হয়নি। বাবুর হাট থেকে ক্ষেতাছিড়া বাঁধের সাড়ে তিন কিলোমিটারে বিধ্বস্ত বাঁধের বাইরে এখনও ৪৫০ জেলে পরিবারের বসতি । তাদের অনেকেরই বসতির জমি নেই।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বাঁধে মাটি ভরাট আর কিছু অংশে দায়সারা ব্লক নির্মাণ কাজ চলছে। তবে তা জলোচ্ছাসের দুর্যোগ ঠেকাতে কোন কাজে আসবেনা ক্ষেতাছিড়ার দুর্গত মানুষদের।

পরে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের(পাউবো) প্রকল্প পরিচালক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ঘূর্ণিঝড় সিডর পরবর্তী উপকূল সুরক্ষায় ৭৫০ কোটি টাকার বেরিবাধ উন্নয়ন ও ব্লক নির্মাণের কাজ শুরু হয়। বিভিন্ন পোল্ডাওে এসব কাজ চলমান। মঠবাড়িয়ার ক্ষেতাছিড়াও সিডর দুর্গত হিসেবে সেখানে বেরিবাধ নির্মাণ ও ১৮০০ মিটার ব্লক নির্মাণের কাজ চলছে। বেরিবাধের পাড়ের বসতি সরিয়ে না নেয়ায় আপাতত বাঁধে মাটি ভরাটের কাজ থমকে আছে । কাজটি সম্পন্ন হলে জলোচ্ছাসের কবল হতে ক্ষোতাছিড়ার মানুষ রক্ষা পাবে।

 

 

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন