দেবদাস মজুমদার ↪️
ছৈলা একটি লবন সহিষ্ণু বন্য প্রজাতির বৃক্ষ। উপকূলীয় নদী তীরবর্তী চর, জোয়ার ভাটার প্রবহমান খালের চর ও প্লাবনভূমি জুড়ে প্রকৃতিগতভাবে জন্মে। ছৈলা গাছের শেকড় মাটির অনেক গভীর অবধি যায় তাই সহসা ঝড় ও জলোচ্ছেসাসে ভেঙে কিংবা উপড়ে পড়েনা। ফলে উপকূলীয় এলাকায় প্রকৃতিবান্ধব গাছ হিসেবে ছৈলা বনবিভাগের সংরক্ষিত বৃক্ষ। কেবল কাঠের মূল্য বিবেচনায় নয় মাটি সুদৃঢ় গঠনে পর্যায়ক্রমিক একটি দরকারী বৃক্ষ প্রজাতি হিসেবে ছৈলাকে বিবেচনা করা হয়। তাই দুর্যোগ প্রবণ উপকূলে প্রকৃতিবান্ধব ছৈলা গাছ কাটা নিষেধ।

উপকূলে এখন ছৈলাগাছে ফুটেছে সুনন্দ শোভন আর নয়ণাভিরাম ফুল। কোন কোন গাছে ছৈলা ফলও ধরে আছে থরে থরে। তাই নদী তীরের ছৈলা বনে এখন অপরূপ নিসর্গের মুগ্ধতা ছড়িয়ে আছে।
ছৈলা ফুলের কলি বেশ শক্ত ও মোটা। আর ফোঁটা ফুলে পাঁপড়ির বদলে ধরে ব্রাশের মত অগণিত লোমশ কলি। সাদা আর গোলাপীর আবহে ফুটে থাকে কেশ গুচ্ছের মত। আর ফুলের মাঝখান দিয়ে বেশ বড় কেশর দ- ফুলের বাইরে দৃশ্যমান। মধূপায়ী পাখিরা আকৃষ্ট হয়ে ফুলের ওপর নাচে। তখন অপূর্ব লাগে ছৈলা বনের এ নিসর্গ।

ছৈলা ফল দেখতে অনেকটা কেওড়ার মতোন। কেওড়া আকারে ছোট ছৈলা অকে বড় । তবে দুটোই একই বৃক্ষ গোত্র। ছৈলার জ্ঞৈানিক নাম Sonneratia caseolaris. গোত্র- Sonneratiaceae ছৈলা আঞ্চলিক ভাষায় পরিচিতি ওড়া নামে।
ছৈলা ফল টক স্বাদের যা নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষ খায়। ছৈলা ফলে আবার জেলিও তৈরী হয়। ছৈলা ফুল সারারাত ভিজিয়ে অনেকে সুস্বাদু মধূ সংগ্রহও করে। আবার ছৈলা গাছের পাতা বন্যপ্রাণীর আহার বিশেষ করে হরিণের প্রিয় খাবার ছৈলা পাতা। আর ছৈলা ফল বোয়াল মাছের প্রিয় খাদ্য। জোয়ার জলাবদ্ধ ছৈলা গাছের নিচে বোয়াল মাছ আসে।

ছৈলা গাছ ম্যানগ্রোভ শ্বাসমূল হয়। ছৈলা গাছ উপকূলে ঝড় ও জলোচ্ছাস ঠেকায়। মাটির ক্ষয় রোধে কার্যকর ছৈলা বৃক্ষ। প্রকৃতি বান্ধব ছৈলা বনে পাখির অভঢ আশ্রম। আর রাতের ছৈলা বনে জোনাকি পোকারা দলবেঁধে আলো ঝড়ায়।
এমন প্রকৃতি বান্ধব ছৈলা বৃক্ষ একশ্রেণীর অসাধু চোরা কারবারীরা কেটে উজার করছে। যা উপকূলীয় পরিবেশের জন্য হুমকী ।
২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের ভয়াল জলোচ্ছ্বাস থেকে বেড়িবাঁধ সুরক্ষা করেছিল ছৈলা বন। এ ছাড়া গ্রামের খালের বেড়িবাঁধের বাঁধের পাড়ের বিস্তৃর্ণ ছৈলার বন বাঁধের মাটি ক্ষয়ের হাত থেকে প্রতিনিয়ত বাচিয়ে রাখছে।
উপকূলের নদী ও খালের দুই পাড়ে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা ছৈলা বন দুর্যোগ প্রবণ উপকূলের পরিবেশ সুরক্ষা করে চলেছে। প্রশাসনের কার্যকর নজদারীর অভাবে এক শ্রেণীর সুবিধাবাদিরা নদী চর ও খালের দুই তীরের ছৈলা বন কেটে সাবার করছে। কাঠ পাচারকারীদের প্ররোচনায় স্থানীয় এক শ্রেণীর মানুষ ছৈলা গাছ কেটে বিক্রি করছে।

উপকূলীয় পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার বলেশ্বর নদের মাঝের চর, তুষখালী মোহনার চর, সাপলেজা মোহনার চর ও বরগুনার পাথরঘাটার চরদুয়ানী খালের চর, বকুলতলা খালেরর চর,মাদারতলী খালের দুই পাড় ও বামনার উপজেলার গুদিঘাটা খালের দুই পাড়ে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে থাকা ছৈলা বন কেটে সাবার করছে এক শ্রেণীর অসচেতন সুবিধাবাদি চক্র। ফলে উপকূলীয় নদী ও খালের তীর জুড়ে বেড়িবাধের জন্য হুমকী হয়ে দাড়িয়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানাগেছে ,ছৈলা একটি লবন সুহিঞ্চু বন্য প্রজাতি যা উপকূলের নতুন জেগে ওঠা চরে বা প্লাবনভূমিতে প্রাকৃতিক ভাবে জন্মায় ও বেড়ে ওঠে। এর শিকড় মাটির বেশ গভীরে চলে যায় তাই সহসা ঝড় জলেচ্ছাসে গাছটিকে উপড়ে ফেলতে পারেনা। প্রকৃতি বান্ধব বন্য গাছটি বন বিভাগের সংরক্ষিত বনে আছে এছাড়া জোয়ার ভাটা চলাচল করে এমন সরকারি খাস জমিতেও রয়েছে। কাঠের মূল্য বিবেচনায় নয় মাটির গঠনে পর্যায়ক্রমিক একটি প্রজাতি হিসেবে ছৈলাকে বিবেচনা করে থাকে।

উপকূলীয় পাথরঘাটা উপজেলা পরিবেশ ও বন উন্নয়ন কমিটির সদস্য মির্জা এস আই খালেদ বলেন, পরিবেশ ও বন উন্নয়নে সরকার শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে বনায়নসহ পরিবেশ উন্নয়নে কাজ করছে। অথচ সুন্দরবন সংলগ্ন বলেশ্বর নদের তীরে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বনায়ন দুর্বৃত্তরা কেটে নিয়ে যাচ্ছে। সেদিকে বন বিভাগের নজরদারি জোরদার প্রয়োজন।

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন