দেবদাস মজুমদার >>

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার ভগীরথপুর গ্রামের ১ একর ১ শতাংশ দেবোত্তর সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল করে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার মিরুখালী ইউনিয়নের ভগীরথপুর বাজার সংলগ্ন শ্রী ¤্রী দক্ষিণ কালিমাতা সার্বজননীন মন্দিরের ওই দেবোত্তর সম্পত্তি ফিরে পেতে পেতে মন্দির কমিটির সভাপতি সুখরঞ্জন হাওলাদার পিরোজপুর জেলা প্রশাসক ও মঠবাড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বরাবরে ১৭৪জন গ্রামবাসি সাক্ষরিত একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

স্থানীয়রা জানান, ভগীরথপুর বাজারের উত্তর পশ্চিম পাশে এক একর এক শতাংশ জমি জুড়ে শ্রী শ্রী দক্ষিণ কালিমাতা সার্বজনীন মন্দির নামে হিন্দুৃ সম্প্রদায়ের দুটি টিনশেড মন্দির ছিল। শতবছরের পুরানো ওই মন্দিরের দুটি মন্দিরে শিব লিঙ্গ ও কষ্টিপাথরের মূর্তিসহ উপসনালয়ের মূর‌্যবান মালামাল ছিল। এখানে নিয়মিত পূজা অর্চনাদি হত। প্রতিবছর কালি পূজাসহ নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনে পুৃরো গ্রামে উতসবের আমেজ চলত। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রাণভয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গেলে স্থানীয় একটি কুচক্রিমহল মন্দির দুটি দখল করে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। পরে ওই দখলদার চক্র মন্দিরের রেকর্ডিয় পুরো এক একর এক শতাংশ জমি দখল করে নেয়। দেশ স্বাধীনের পর স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজন তাদের বসতভিটা ফিরে পেলেও সার্বজননীন মন্দিরের ওই দেবোত্তর সম্পত্তি আজও ফিরে পায়নি।

গ্রামবাসিরা জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় স্থানীয় প্রভাবশালী সফদর আলী, তোতাম্বর আলী, আবুল কাশেম ও লাল মিয়া মিলে হিন্দুদের ওই কালিমাতা মন্দিরে লুটপাট চালিয়ে ১ একর ১ শতাংশ সম্পত্তি দখল করে নেয়

অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ শিক্ষক বলরাম সাহা অভিযোগ করেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে স্থানীয় একটি স্বাধীনতা বিরোধি চক্র মন্দিরে লুটপাট চালিয়ে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ বিনস্ট করে পুরো দেবোত্তর সম্পতি দখল করে নেয়। শুধু আমরা (হিন্দুরা) নই এখানকার সচেতন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজনও ওই দেবাত্তর সম্পত্তি ফিরে পেতে চান। সেখানে আবার উপসনালয় গড়ে তোলার দাবি এখন জোড়ালো হচ্ছে। কেননা বেদখল হওয়া ওই জমি কালিমাতা মন্দিরের নামে রেকর্ডভূক্ত সম্পত্তি। যা এলাকার ঐতিহ্য।

মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় ভগীরথপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক মো. শামসুল হক গাজি(৯০) বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজন বাঁচতে গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছিল। এরপর দিনে দুপুরে একদল কুচক্রি কালিমাতা মন্দিরের টিনশেড ভবন ভেঙে লুটপাট চালায়। আমি নিজে এর প্রত্যক্ষদর্শী । স্বাধীনতার পর ওই দেবাত্তর সম্পত্তি ফিরে পাওয়ার দাবি তুললে স্থানীয় হিন্দুরা দখলদারদের নানা চাপের মুখে পড়েন। ফলে সম্পত্তি আজও পুনরুদ্ধার হয়নি।
শ্রীশ্রী দক্ষিণ কালিমাতা সার্বজননীন মন্দির কমিটির সভাপতি সখরঞ্জন হাওলাদার বলেন, শতবছরের পুরানো মন্দিরের জমি দখলমুক্ত করার দাবি জানাতে গিয়ে নানা হুমকী শিকার হচ্ছি। এমন কি এলাকার সচেতন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ যারা মন্দিরের জমির পক্ষে কথা বলছে তাদেরও দখলদারারা ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছে।

এ ব্যাপারে দেবোত্তর সম্পতি বংশানুক্রমে ভোগ দখলকারী মো. বাবুল মৃধার কাছে কাগজপত্র দেখতে চাইলে তিনি কোন কাগজপত্র না দেখিয়ে বলেন, কিসের কাগজপত্র । কাগজপত্র মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত জাহাঙ্গীরের কাছে থাকতে পারে। তবে পূর্বপুরুষের দখলী সূত্রে আমরা ওই জমি ভোগ করছি।

এ বিষয়ে ভগীরথপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কলেজের অধ্যক্ষ মো. জাহাঙ্গীর হোসেন কবির বলেন, ওই জমি দেবোত্তর সম্পত্তি কে না জানে। ওখানে কালিমাতা মন্দির ছিল। ৭১ সালে মন্দির লুটের পর পুরো জমি প্রভাবশালীরা দখল করে নিয়েছে। আজও এর প্রতিকার মেলেনি।

মিরুখালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুস সোবাহান শরীফ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ওই জমি দেবোত্তর সম্পত্তি এর বাজার মূল্য আননুুমাকি আড়াই কোটি টাকা। দখলদাররা অবৈধ। তাদের কাছে কাগজপত্র দেখতে ডেকেছিলাম। কিন্তু দখলদাররা কোন কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। এখন প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে ওই জমি উদ্ধার হওয়া সম্ভব।

এ ব্যাপারে মঠবাড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম ফরিদ উদ্দিন অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, দেবোত্তর সম্পত্তি কেউ অবৈধ দখলে রাখতে পারবেন না। সরেজমিনে গিয়ে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন