দেবদাস মজুমদার >>

বসতির ঘর নেই। নেই কোন রুটি রুজির পথ। বার্ধক্যের শেষ লগ্নে নানা রোগব্যাধি বাসা বেঁেধেছে। একসময় পৈত্রিক ভিটা বাড়ি ছিল। ভিটে মাটি অন্যের দখলে চলে গেছে। দেখার মত এক ছেলে আছে তবে সেও বৃদ্ধ বাবা মায়ের কোন তালাশ নেননা। সেই সাথে বয়স্ক ভাতা মেলেনি। বার্ধক্যের এই অসহায় জীবন কাটে কখনও পথে আবার কখনও অফিসপাড়ার সিঁড়ি ঘরে।
পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার চিরাপাড়া পারসাতুরিয়া ইউনিয়নের সুবিদপুর গ্রামের বৃদ্ধ মো. আজহার আলী(৯৪) ও আমিরুন্নেছা(৭০) দম্পতি নিয়তির নির্মম পরিহাসে এখন পথের মানুষ ।

স্থানীয়দের সূত্রে জানাগেচে, কাউখালীর সুবিধপুর গ্রামের ভোটার তালিকায় বৃদ্ধা মো. আজাহার আলী ও আমিরুন্নেছার নাম আছে। তবে সেখানে কোন তাদের বসতি নেই। উপজেলা পরিষদের পুরাতন ভবনের সিড়ির নিচে কখনও রাস্তার পাশে মানবেতর জীবন যাপন কাটছে অসহায় দম্পতির। দিনে মানুষের কাছে হাত পেতে অন্নের সংস্থান চলে। রাত হলে বৃদ্ধ দম্পত্তি একটু আশ্রয় নেয়ার জন্য উপজেলা পরিষেদ ভবনের সিড়ির নিচে ৬ ফুট দৈর্ঘ্যের ও ৬ ফুট প্রস্থ নিচে রাত্রি যাপন করেন। সন্তান থেকেও নি:সন্তান এই দম্পত্তির ভিটা বাড়ি সহায় সম্বল বলতে কিছুই নেই।
অসুস্থ আজাহার আলীকে সিড়ির নিচে রেখে স্ত্রী আমিরোন সকালে খালি পেটে বেড়িয়ে পরেন দুুমুঠো অন্নের জন্য। অন্যের কাছে হাত বাড়িয়ে যা পাওয়া যায় তা দিয়েই কোন রকম চিলে দুই বৃদ্ধের জীবন। বৃদ্ধ এ দম্পতি আজাহার আলী ও আমিরুন্নেছরা বয়স্ক ভাতার কোন কার্ডও নেই । জাতীয় পরিচয়নপত্র অনুযায়ী বৃদ্ধ আজাহারের জন্ম তারিখ ১০ ডিসেম্বর, ১৯২৩ । আজও সরকারি সাহায্য বলতে কোন কিছুই জোটেনি তাদের কপালে। এক ছেলে দুলাল সিকদার আলাদা হয়ে অন্যত্র বসাস করছেন। সে বৃদ্ধ পিতা মাতার কোঁজ নেন না। এক মেয়ে মাহফুজা বেগম বিয়ে করে নিজের সংসারে। ফলে বৃদ্ধ এই দম্পতিকে দেখার মত জগত সংসারে আর কেউ নেই।

বয়সের বাড়ে ন্যুব্জ আজাহার আলী তাই কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, পোড়া কপাল । চেয়ারম্যান মেম্বরদের ভোট দিলেও আমাগোর কোন কাজ অয়না। গত ইউপি নির্বাচনে ভোট দিতে যাইয়া মোর পা ভাঙ্গছে। হেরপরও মুই কিছুই পাই নাই। এহনো মোর পায়ে ব্যাথা। মুই খাড়াইতে পারিনা। ধলু ব্যাপারী আর মোস্তফা মিলে মোর বসতির ৪১ শতক জমি দহলে(দখলে) নিয়া গেছে। অহন মুই পথের ফহির(ফকির)।
বৃদ্ধ স্ত্রী আমিরোন্নেছা বলেন, হুনছি অনেক মাইনসেরে সরকার ঘর দেছে। মোগো একখান ঘর দ্যায়না ক্যা ?

কাউখালী উপজেলা উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি আবদুল লতিফ খসরু বলেন, বৃদ্ধ দম্পতি দীর্ঘদিন যাবৎ মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তাদের স্থায়ী কোন ঠিকানা নেই। তারা উপজেলা পরিষদের সিঁড়িঘরে রাত কাটান। তাদের একমাসের খাবার (চাল, আনুষঙ্গিক বাজার) ও ইফতার সামগ্রী তুলে দিয়েছি। এটা ক্ষুদ্র সহায়তা । তবে সহায় সম্বলহীন এ বৃদ্ধ দম্পতির বসতির জন্য ঘর ও বয়স্কভাতা অতি জরুরী।
কাউখালী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা কাজি গোলাম কবির বলেন, বৃদ্ধ এ দম্পতি খুব অসহায়। গত শীতে তাদের দুরাবস্থা দেখে ব্যক্তিগতভাবে আমি কম্বল দিয়েছি। তারা পথে ঘাটে থাকেন। বয়স্কভাতা কেন পাচ্ছেন না তা খোঁজ নিয়ে উদ্যোগ নেবো।

’এ বিষয়য়ে স্থানীয় চিরাপাড়া পারসাতুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মাহমুদ খান খোকন বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। তারা কেউ আমার কাছে আসেনি। আমি খোঁজ নিয়ে দেখব। তবে আগামী জুন-জুলাই মাসো তাদের বয়স্কভাতার তালিকাভূক্ত করা ব্যবস্থা নেবো।

বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে কাউখালী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এস.এম আহসান কবির  বলেন, এই বৃদ্ধ দম্পত্তি খুব অসহায়। তবে তার ছেলে থাকলেও সে বৃদ্ধ বাবা মায়ের খোঁজ নেয়না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে মামলা মোকদ্দমায় বৃদ্ধ আজহার আলী এখন সর্বস্বান্ত। তারা পুরানো উপজেলা পরিষদ ভবনের সিড়িঘরে থাকেন। অসহায় বলে কেউ বাঁধা দেয়না। শুনেছি বয়স্কভাতার তালিকায়ও এদের নাম নেই। মানবিক কারনে অবশ্যই তালিকাভূক্ত করা হবে। এ দম্পতিকে চরের আবাসনে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে আশ্রয় দিলে এ বয়সী দুই মানুষ খাদ্য সংকটে পড়তে পারেন। মানবিক কারনে আপাতত তারা উপজেলা পরিষদের পুরানো ভবনের সিঁড়ি ঘরে আছেন। বসতি ও বয়স্কাভাতার জন্য উদ্যোগ নেবো।

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন