পঞ্চদশ শতাব্দীতে যখন পর্তুগীজ নাবিক বার্থোলোমিউ ডায়েস কর্তৃক আফ্রিকা আবিষ্কার হল এরপর থেকেই পর্তুগীজরা আফ্রিকা, এশিয়া অঞ্চলে কুঠি স্থাপন শুরু করল এবং তখন থেকেই মুলত বিশ্বব্যাপী ব্যবসা বাণিজ্যের উদ্ভব। এবং এই বাণিজ্যের প্রভাবে আস্তে আস্তে বিশ্বব্যাপী বৈশ্বিক  রাজনীতি শুরু হতে থাকল। শুরু হল Colonialism  বিশ্ব। এভাবে ধীরে ধীরে সমাজের প্রতিটি জায়গায় ব্যবসা বা বাণিজ্যের প্রসার হতে থাকল। যখন নবম শ্রেনিতে পড়তাম তখন ব্যবসা এবং বাণিজ্যের মধ্যে একটিা পার্থক্য লিখতে হত। ব্যাপারটি ছিল এরকম যে, ব্যবসা একটি বৃহত্তম আইডিয়া এবং বাণিজ্য তার ক্ষুদ্র একটি অংশ। যদিও প্রাচীন যুগে মানুষ বাণিজ্য শব্দটিই ব্যবহার করে আসছে। সে যাই হোক বর্তমানেও আমাদের সমাজে এ শব্দটি ব্যাপক হারে ব্যবহৃত হচ্ছে তাহল ভর্তি বাণিজ্য, মার্কেট বাণিজ্য, শিক্ষা বাণিজ্য, চাকরী বাণিজ্য ইত্যাদি, চারদিকে কেবল বাণিজ্যের ছড়াছড়ি।

২০০৭ সালের নির্বাচনের আগে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো সংসদ সদস্য প্রার্থী নিয়ে একটি রিপোর্ট করেছিল; কোন দলের প্রার্থীদের মধ্যে কতজন ব্যবসায়ী ? তখন দেখা গিয়েছিল বিএনপির দলে ব্যবসায়ীর সংখ্যা আওয়ামীলীগের চেয়ে বেশী। বিএনপির সমর্থকরা তো তখন বেজায় খুশি  কারণ ব্যবসায়ী মানে বেশী টাকা। কর্মীর পকেট গরম থাকবে। কিন্তু টাকা দিয়ে যে রাজনীতি হয় না এবং এটা যে ভুল পন্থা তা বিএনপি হাড়ে হাড়ে অনুভব করল ২০১৪ সালের সরকার বিরোধী আন্দোলনে। তখন ব্যবসায়ী মুখোশধারী নেতারা সব লাপাত্তা বা আত্মগোপনে গেল, ফলশ্রুতিতে বিএনপির পরাজয়, আওয়ামী সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসল। আওয়ামীলীগ অনেক খুশি অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা যুগের সাথে মুখোশ পাল্টিয়ে আস্তে আস্তে সম্পর্ক গড়ে তুলতে শুরু করল সরকার দলীয় নেতাদের সাথে। বর্তমান সংসদে ব্যবসায়ী এমপি কম থাকলেও ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক অন্যসব পদে ব্যবসায়ীরা শক্ত অবস্থান সৃষ্টি করেছে।  যার প্রমান মেলে আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব ওবায়দুল কাদের-এমপি-র কথায়। “কাউয়া ও হাইব্রীডের আগমন”। এটা রাজনৈতিক সুসংবাদ না বরং দুঃসংবাদ কারণ যে কাজ মেধা দিয়ে করার কথা সেটি টাকা দিয়ে করতে চাইলে আস্তে আস্তে পরাধীন হতে হয়। যেটা হয়েছে সৌদি আরবে, পাকিস্তানে; সৌদি আবর সরকার পানির লাইন বসানোর জন্যও সাহায্য নিত আমেরিকার কাছ থেকে ফলশ্রুতিতে আমেরিকার কথা ছাড়া এখন একচুলও নড়তে পারেনা সৌদি আরব। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান ও ভারতকে শায়েস্তা করতে বার বার ডেকে আনত সেনাবাহিনীকে এবং ফলশ্রুতিতে আজ পাকিস্তান সরকার সেনাবাহিনী কথা ছাড়া কিছুই করতে পারেনা। বাংলাদেশের রাজনীতিও আজ ব্যবসায়ী দ্বারা আক্রান্ত যার ফলে সমাজে দেখা যাচ্ছে সম্পদ আয়ের অশুভ প্রতিযোগিতা। সম্পদ অর্জন খারাপ কিছুনা বরং ভাল কিন্তু আয়ের পথটা খারাপ হলেই বিপত্তি।

আমি মাধ্যমিক পর্যায়ে যে বিদ্যালয়টিতে অধ্যয়ন করেছি এটি দক্ষিণ বাংলার একটি বিখ্যাত স্কুল। এটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সাফল্যের স্মারক বহন করে আসছে।  কিন্তু এ স্কুলটি আস্তে আস্তে তার ঐতিহ্য থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত এর ফল বিপর্যয় হচ্ছে। এ নিয়ে মঠবাড়িয়ার অভিবাবকদের মাঝে অস্থিরতা বিরাজ করছে। যার প্রমাণ মেলে কিছুদিন আগে এ বিদ্যালয়ের এক ছোট ভাইয়ের FACE BOOK স্ট্যাটাস দেখে। ওর ভাষ্যমতে স্কুলের কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক লেখাপড়ার প্রতি যতাযথ মনোযোগ না দেয়ায় পরীক্ষার ফলাফল প্রত্যাশিত হচ্ছেনা।

আমি শুরুতে বিষয়টি বুঝতে পারিনি । পরে বিস্তারিত শুনে যা জানলাম তা হল স্কুলের নামে বরাদ্দকৃত খাস জমিতে স্কুল কর্তৃপক্ষ মার্কেট নির্মাণ করছে এবং শিক্ষক, কমিটির লোকজন মার্কেটের দোকান বরাদ্দ নিয়ে ব্যস্ত। তাঁর এ FACE BOOK পোষ্টের আলোকে অন্য একজন কমেন্ট করেছেন তাহলে স্কুল ভেঙ্গে মার্কেট নির্মাণ করলেই তো হয়। তাঁর আইডিয়া কিন্তু চমৎকার, পর্তুগীজরা পঞ্চদশ শতাব্দীতে ব্যবসা করতে আফ্রিকায় আসতে পারলে আমরা কেন ২০১৭-এ এসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যবসা করতে পারবনা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যদি টাকা আয়ই মুল উদ্দেশ্য হয় তাহলে পড়াশোনার দরকার কি? সরাসরি টাকা ইনকামে নেমে গেলেই তো হয়। কিন্তু যার যেটি কাজ সেটি না করে অন্য কিছু করলে হয়ত শিক্ষার্থীরা পাশ করবে কিন্তু সে পাশ দিয়ে বিশ্বায়ন মার্কেটে টিকে থাকা যায় না।

যার প্রমাণ মেলে গ্লোবাল কম্পিটিশন রিপোর্টের দিকে তাকালে যেখানে ভারতের অবস্থান ৩৯তম ভুটান ৯৭তম নেপাল ৯৮তম অথচ আমরা ১০৬তম। এই হল আন্তর্জাতিক মার্কেটে আমাদের অবস্থান। আসলে যে সমস্যায় স্কুলটি আক্রান্ত তা আমাদের সমাজেরই চিত্র। সবকিছুর মানদন্ড যখন টাকা দ্বারা নির্ধারিত হয় তখন শিক্ষার মত একটি মহান পেশায় নিয়োজিত শিক্ষকরা টাকার পিছনে ছুটবে এটাই স্বাভাবিক। যখন আমি মহত্তের মধ্যে আর্থিক বিষয় নিয়ে আসব তখন সেটি মহৎ থাকবে না  হয়ে যাবে বাণিজ্য; হয়ে যাবে সেই পর্তুগীজ উপনিবেশিক আমল।  যার ফলে বিশ্ব পরবর্তীতে বিশ্ব দুটি বিশ্ব যুদ্ধ দেখেছে।

বর্তমানে আমাদের দেশের রাজনীতিতে, শিক্ষায় বাণিজ্য ঢুকে গেছে ফলাফল; শিক্ষককে কান ধরে উঠবস করানো হচ্ছে। এবং শিক্ষক ছুটছে কোচিং ও প্রাইভেট বাণিজ্যে নিয়ে। রাজনীতি, স্কুল কমিটি সবজায়গায় ব্যবসায়ী এবং প্রতেক শিক্ষক খুলে বসেছেন বাসায় রাত্রীকালীন কোচিং সেন্টার। কোন শিক্ষার্থী রাতে বাসায় বসে পড়ে না। সবাই যায় শিক্ষকের বাসার কোচিং সেন্টারে। প্রতেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মাসিক ১০০০ টাকা কোনক্ষেত্রে ২০০০ টাকা। মাস শেষে দেখা আয় ৪০-৫০ হাজার কোন শিক্ষকের ১ লক্ষ টাকাও নাকি হয়। যা একজন সরকারী প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তার ৪ গ্রেডের বেতনের সমান। বাহ টাকা আর টাকা। কিন্তু শিক্ষার মান? সে তো রেজাল্ট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় যোগ্য প্রার্থী সংকট দেখেই বুঝা যায়। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পরিসরের রির্পোট তো দেখলাম।

যখন একজন শিক্ষক, শিক্ষানুরাগী টাকার পিছনে দৌড়াবে তখন সেই সমাজে বদরুল হবেনা, শিক্ষক কান ধরে উঠবস করবে না তা তো হতে পারে না। কারণ প্রতিটি ক্রিয়ারই সমান বিপরিত প্রতিক্রিয়া থাকবে। মহৎ পেশা ও বাণিজ্য একসাথে চলে না। পৃথিবীতে কোন মহৎ ব্যক্তি পাওয়া যাবে না যে অর্থ বিত্তের পিছনে ছুটেছে। হাজী মহশিন বা বিল গেটস? তাঁরা তাদের সম্পদ পৃথিবীর কল্যাণে ব্যয় করছেন। পাঠ্য পুস্তক বা বাস্তবে যেখানে খেলার মাঠ, ছাত্রদের আবাসিক হল, শিক্ষাবান্ধব বলা হয় কিন্তু বাস্তবে যদি এগুলো না করে মার্কেট নির্মাণ করা হয় তাহলে শিক্ষার্থীর মাঝে সুশিক্ষার অভাব তো হবেই।

এতো এতো এ+ কিন্তু শিক্ষার মান কি বেড়েছে? তা দেখা মেলে কিছুদিন আগে এ+ প্রাপ্ত কিছু ছাত্রদের উপর করা রির্পোট দেখে। অপারেশন সার্চ লাইট সম্পর্কে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হলে উত্তর আসল-অপারেশন থিয়েটারে যে লাইট ব্যবহার করা হয়। যা নিয়ে ফেসবুকে জড় বয়ে গিয়েছিল। আসলে সমাজের প্রতেকটি বিষয় অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত একটি অংশ আক্রান্ত হলে অন্য অংশও আক্রান্ত হয়। যার যেটি কাজ, তা না করে অন্য কাজ করলে এর প্রভাব সমাজের উপর পরবেই। শিক্ষকের কাজ শিক্ষা দেয়া, ব্যবসায়ীর কাজ ব্যবসা করা, রাজনীতিবীদদের কাজ রাজনীতি। নিজের কাজ রেখে অন্য কাজ করলে তা যে ভাল হয়না ইতিহাস থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়। ছোট্ট একটি ঘটনা বলছি আওয়ামীলীগ সরকারে ২০০৯ এর পরের কথা, অর্থমন্ত্রী বলে ফেললেন সবকিছু বেসরকারী খাতে দিয়ে দেওয়া উচিত তাহলে আর লোকসান গুনতে হবেনা।

এর পরিপেক্ষিতে ড. শাহদীন মালিক বলেছিলেন ” সবকিছু বেসরকারী খাতে দেয়া যায় না পারলে আপনি বাংলাদেশ ব্যাংক, সেনাবাহিনী, জাতীয় সংসদ বেসরকারী খাতে দিয়ে লাভজনক করেন। সেটা সম্ভব না তাই স্কুল কর্তৃপক্ষকে বলব বিদ্যালয় হলো জ্ঞানাজর্নের  জায়গা এটা ব্যবসা বা বাণিজ্যে করার স্থান নয়। নিজেদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান খারাপ হওয়া মানে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারার সমান। এর প্রভাব ধনী গরীব সকলের উপর পরে। শিক্ষক, শিক্ষানুরাগীরা যদি শিক্ষার মাঝে বাণিজ্য নিয়ে আসেন তাহলে তা যে ভাল ফলাফল বয়ে আনেনা তা ইতিহাসই  বলে এবং শিক্ষার মাঝে যদি মনুষ্যত্ব না থাকে তাহলে সমাজে দিনদিন বদরুল, শাফাত, সাদমানদের সংখ্যা বেড়েই যাবে। তা সম্ভবত আমাদের কারোরই কাম্য নয়।

লেখক : মোস্তফা ডালিম তন্ময়, ব্যাংকার ।

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন